শ্রীচরণেষু মা ,
শুভ বিজয়া ।আমার প্রনাম নিও । বাবাকে আমার প্রনাম দিও । বিজয়ার পরে প্রতি বছরের
মত চিঠি তেই প্রনাম সারলাম । আশা করি তোমাদের পুজো ভালো কেটেছে । আসলে যেখানে তোমরা
আছ, সেখানে পুজো মানে আলাদা করে কোনো মুহূর্ত আছে কি..জানি না । এমনিতে পুজো মানে তো
কয়েকটা দিন, কয়েকটা মুহূর্ত ,কোথা থেকে যে আসে আর কোথায়ই বা মিলিয়ে যায় , সেটা বোঝার
আগেই তার যাতায়াত সারা । সারা বছর যে ক্যালেন্ডার এর দিকে তাকিয়ে থাকি , শুধু এই পাঁচটা
দিনের অপেক্ষায় , সে অপেক্ষা কি আদৌ ফুরোয় ? উত্সব আমার জীবন থেকে ফুরিয়েছে তো সে কবেই
, কিন্তু উত্সবের অপেক্ষা এখনো কেন ফুরায় না মা ?
আমি ভালো আছি । আমরা...ভালো আছি । তোমাদের থেকে এত দুরে ,এই সাউথ দিল্লি এক্সটেনশন
এ আমার ছোট্ট ফ্ল্যাট ।সাত তলার টেরেসের লাগোয়া এই ফ্ল্যাটটা যোগাড় করতে কম হিমশিম
খেতে হয়নি আমায় , তুমি তো জানো । অথবা ..জানো কি ? আমি এখানে একলাই থাকি, আর থাকে আমার
একরত্তি জিনো । জিনো আমার জীবনে এইমুহুর্তে একটি মাত্র ঘরে ফেরার পিছুটান । সকালবেলা
যখন অফিসে বেরোই ওর দু চোখ যেন ছলছল করে ওঠে, সামনের দুটো পা বাড়িয়ে দিয়ে আমার গাল
চেটে আদর করে ও । আর তো কেউ আমায় আদর করার নেই মা । ওকে খাবার দিয়ে , ঘর লক করে বেরই
যখন কি অদ্ভূত ভাবে তোমার সেই দু হাত জোড় করে 'দুগ্গা দুগ্গা' বলাটা খুব মনে পড়ে এখনো
। কেউই বলে না, শুধু আমার মন বলে ,মনে হয় নিচের পার্কিং থেকে গাড়িটা বের করতে করতে
ঘাড় ঘুরিয়ে সাত তলার বারান্দাতে চোখ ফেরালেই দেখতে পাব, তোমাকে । সেই আটপৌরে হলুদ মাখা
নরম হয়ে যাওয়া জরিপার তাঁতের শাড়ি, সেই তোমার তেলতেলে কপালে জড়িয়ে থাকা দু চারটে নাছোরবান্দা
উদ্বেগ আর সিঁদুরের আবছা ভরসা । সেই তোমার দু চোখ ভরা অপেক্ষা আমার স্কুল থেকে ফেরার
জন্য। সেসব কিছুই হয়না আর । তুমি কত দুরে। ..আমার এই দিল্লির বাড়ি থেকে শুধুমাত্র চিঠি
পাঠানোর ঠিকানা দুরত্বেও তোমায় পাওয়া যায়না আর ।
যাই হোক, এই দেখো ,পুজোর কথা লিখছিলাম..আর কত অন্য কথা মনে পরে গেল, এখানেও
দিব্যি পুজো হয় । না, কলকাতার মত হাউসিং এ হাউসিং এ পুজো নয়, গ্রেটার কৈলাশ , চিত্তরঞ্জন
পার্ক এইসব জায়গায় বেশ কয়েকটা হাতে গোনা বারোয়ারী পুজো । ঠিক সেই কলকাতার মতন...ঠিক
সেই নৈহাটির বাড়ির দুর্গাপূজার মতন । কতদিন নৈহাটি যায়িনা মা, খুব যেতে ইচ্ছে করে
,মনে হয় একদিন যে বাড়িটাকে ঘিরে আমার তিলে তিলে এই এতখানি বেড়ে ওঠা ,আমার মেয়েবেলা
থেকে নারী হয়ে ওঠার এই লম্বা জার্নি টা যে শহরতলি কে ঘিরে ,যে মানুষগুলোকে ঘিরে, তোমাদের
ঘিরে , সেই সব চিহ্ন গুলো কেমন জীবন থেকে একে একে অদৃশ্য হয়ে গেল ,অথচ দেখো কেমন দিব্যি
টিকে আছি একলা একলাই, কেমন কাটিয়ে দিছি দিনগুলো । তোমাকে আজ চুপিচুপি বলি, তোমার মনে
আছে কিনা জানি না , সেই যে আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে আমায় জলপাইগুড়ি তে পড়তে পাঠালে
তোমরা, সেজমাসির কাছে..বললে , ওখানে থাকলে নাকি আমার পড়াশোনায় মন থাকবে, সেইদিন ভিতরে
ভিতরে কি ভয়ংকর ভয়ে আমি কুঁকড়ে গেছিলাম মা । খালি মনে হচ্ছিল, আমায় বোধহয় অনেকদুর তাড়িয়ে
দিলে তোমরা, সরিয়ে দিলে জীবন থেকে,...ছাদের ঘরে একলা লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিলাম আর দেওয়ালে
শেওলার মধ্যে ইঁটের টুকরো দিয়ে লিখে এসেছিলাম, যে আমি আমার আসব ফিরে , এইখানে ,এই নৈহাটির
বাড়িতে । ওই বাড়ি ,ওই কুয়োতলা, ওই গঙ্গার ধার ধরে বাবার হাত ধরে বাজার যাওয়া, ওই সক্কালবেলায়
রান্গাদিদুনের বাড়ি বেড়ালের বাচ্ছা দেখতে যাওয়া , খোকা আর আমার মারপিট , অঙ্ক খাতার
পিছনে ছবি আঁকা...লক্ষী পুজোর আলপনা . সব, এ সব ছাড়া আমার আর অন্য কোনো অস্তিত্ব ছিল
নাকি ? কোনদিন তো ভাবিনি যে সত্যি সত্যিই তোমরা একদিন আমায় অনেকদুরে সরিয়ে দেবে।
..এতটা দুরে যে তোমাদের আর প্রনাম করবার মত স্পর্শটুকুও আমার অধিকার থাকবে না ।
ইকবাল চলে গেছে সাত বছর হলো । তোমাদের সঙ্গে তার দেখা হয় কি ? না হওয়ারই কথা
। তোমাদের ধর্ম নয়, তোমাদের ঘৃনা ওকে এত দুরে সরিয়ে দিয়েছিল যে নিজেদের সাধের কন্যা
কেও জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলতে তোমাদের একটুও সময় লাগেনি মা । বাবা আমায় আদর করে বলত ,
রুমনি । আর ভাই কে খোকা । খোকার ওপর আমার খুব রাগ হয় জানো, সে তো এলো আমি আসার সেই
দশ বছর পরে অথচ দেখো তোমাদের ওই নৈহাটির বাড়ি, তোমাদের মুখুজ্যে বংশের সব চিহ্নটুকু
উত্তরাধিকার সুরে কেমন সে দখল করে নিয়ে দিব্যি আছে , তার ঘরে তোমরা আছ, শুধু ইকবাল
কে ভালোবেসে ছিলাম বলে, মুখার্জি বংশের মুখে চুনকালি লাগিয়ে মুসলমান কে বিয়ে করেছিলাম
বলে , আমি কোত্থাও নেই ।কি অবলীলায় বাবা, আমায় সকালবেলার ট্রেনের দুটো টিকিট হাতে ধরিয়ে
দিয়ে বলেছিল, "তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, ভোরবেলাতেই বেরিয়ে পরো । তোমার সার্টিফিকেট
গুলো গুছিয়ে রেখেছি, আর যা যা তোমার ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে সব আছে , ওই হাতব্যাগে,
তোমার সঙ্গী কে নিয়ে আর কোনদিন এ বাড়ির দরজায় দাঁড়িও না ।" মা, বিশ্বাস কর , আমার
ঝাপসা চোখের সামনে সেদিন কেবলি ভাসছিল বাবার একটা পুরনো ছবি । সেই যে একবার আমার
পা কেটে গিয়েছিল পচা শামুকের খোলে, আর গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে দাওয়ায় আমি তখন পরিত্রাহি কান্নাকাটি করছি, বাবা অফিস থেকে ফিরে সে অবস্থা দেখে আমায়
কোলে নিয়ে আমার তিনগুন বেশি কেঁদেছিল...শিশুর মতন । সেই বাবা , আমার সেই বাবা কি অনায়াসে
আমার হাতে আমার আগামী , অনিশ্চিত , অনির্ধারিত জীবনের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আমার হাতে
ধরিয়ে দিয়েছিলেন সকালবেলার ট্রেনের দুটো টিকিট । আর তুমি, যে রুমনি কে তোমরা চোখে হারাতে,
সেই রুমনি কে চলে যেতে দেখেও, মুখে রা টি করোনি, মা । পাথরের মত ভাবলেশহীন মুখে দোতলার
ঘরে জানলার গরাদ ধরে কাটিয়ে দিলে । জেঠিমা, রান্গাকাকা, বুবুপিসী তোমরা কেউ কেউ সেদিন
তোমাদের রুমনি কে আটকালে না !
ইকবাল কে দেখেছিলাম জলপাইগুড়ি তেই একটা আর্ট এক্সিবিশনে । কি ভিশন রকম মন কেমন
করা একটা কালচে সবুজ পাঞ্জাবি তে আর এক মুখ
দাড়ি তে এক্সিবিশন ঘরের সেই আলো ঝলমলে সন্ধ্যে তে সে দাঁড়িয়ে ছিল ঘরের একটি কনে চুপ
। তার ছবি, চতুর্দিকে এত প্রশংসা ,কিন্তু মুখ চোরা ইকবাল এসবের থেকে অনেকটা পিছনে একা
দাঁড়িয়ে ছিল । প্রথম দেখাতেই কি যে একটা অদ্ভূত অনুভুতি হয়েছিল মা , মনে হয়েছিল সবার
থেকে আলাদা, সব প্রচারকে পিছনে ফেলে এক আত্মমগ্ন সন্ন্যাসী কে দেখছি কোনো পাহাড় চুরয়
দাঁড়িয়ে যেন সূর্যোদয় দেখছেন । আলাপ করলাম নিজে নিজেই , তারপর বাকিটা ইতিহাস । তোমাদের
মুখার্জি বংশের অসন্মানের, চুনকালি লেপার ইতিহাস । ইকবাল প্রথমবার দেখা হওয়ার এক বছরের
মাথায় আমায় একটা ছবি এঁকে উপহার দিয়েছিল । কি ছবি জানো ? আমাদের নৈহাটির বাড়ির দুর্গাপুজোর
ছবি । আমি ওকে ঠিক যেমনটি বলতাম, ঠিক সেইরকম । আমার ভারী আশ্চর্য লেগেছিল, যে চোখে
না দেখে এইরকম অনুমান নির্ভরে একটা মানুষ কিভাবে এত সুন্দর এঁকে ফেলতে পারে ।
... সেই আমাদের উঠোনের রাধা গোবিন্দর মন্দির এর কালো পাড় দেওয়া লাল সিঁড়ি
। সিঁড়ির উল্টোদিকে ঠাকুর দালান । আর দালানে অষ্টমীর সন্ধ্যে তে কলাপাতার ওপর একশ আট
প্রদীপ জ্বালাচ্ছ তুমি, বুবুপিসী, ছোট কাকিমা।...দালানে ঢাক বাজছে জোর, আর চক্রবর্তী
দাদু মায়ের আরতি করছেন । উঠোনের একপাশে সামিয়ানা টাঙানো..নিচে খেলা করছি আমরা কুচো
কাঁচা রা । ভোগের লুচি ভাজা হচ্ছে একপাশে ,কাঠের বারকোষে ভোগ যাচ্ছে ঘন ঘন।
.. গোটা ছবিতে জ্বলজ্বল করছিল আমাদের ছোটবেলা,
আমাদের ঐতিহ্য, আমার ফেলে আসা সবকিছু । ছবিটা পেয়ে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম মা । সেদিন
বুঝেছিলাম আসলে ইকবালের মনের আকাশ ছিল । সেই আকাশে অজস্র রং খেলা করত । সূর্যোদয় থেকে
সুর্যাস্তর সবটুকু রংবদল ঠিক যেমন, তেমন টি
হয়েই ধরা দিত ওর ক্যানভাসে ,নইলে কি করেই বা শুধু আমার মুখের গল্প শুনে অমন একটা ছবি
আঁকতে পারে ,বলত ? শিল্পীর আসলে কোনো জাত হয়না, কোনো ধর্ম হয়না , সৃষ্টি- ই তার ধর্ম,
রঙের আঁচরে আঁচরে গল্প বলাই তার কাজ । ইকবাল এর সাথে বাকি জীবনটা কাটাব, সেটা কিন্তু
শুরুতে ভাবিনি । আমার আজন্মের সংস্কার , বৃহস্পতিবারের লক্ষী পুজো, বারব্রত অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা, ছোটবেলার বেড়ে ওঠার যে শিকরবাকর গুলো মনের অজান্তেই
বেড়ে উঠেছিল ভিতরে ভিতরে আগাছার মত ,সেগুলোকে এক লহমায় উপড়ে ফেলার মত সাহস সেদিন আমার
হয়নি । কিন্তু কোথাও ইকবালের উদার , উদ্দাম জীবনের সংজ্ঞা টা আমার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল
অনেকখানি । সেদিন বুঝেছিলাম, ঈশ্বর যদি কোথাও থাকেন তিনি আছেন মানুষের মধ্যেই, মানুষের
কাজের মধ্যেই । ইকবাল যখন ক্যানভাসের সামনে
দাঁড়িয়ে তুলি ধরত, ওর চোখ মুখ বদলে যেত নিমেষে,,,কোন এক অন্য জগতের আলো এসে পড়ত সে
মুখে , সে যেন সুধু সৃষ্টি করতে এসেছে পৃথিবীতে, তার অন্য আর কোনো ঠিকানা নেই, নিশানা
নেই । সে এক অনন্য আলো । নৈহাটির বাড়ির বিজয়া ব্যানার্জির চতুর্দিকের ঘন কালো সমুদ্রের
মাঝে ইকবাল যেন এক অনিমিখ বাতিঘর হয়ে এসেছিল ।তোমাদের বিজয়ার সাধ্য কি তার থেকে চোখ
ফিরিয়ে রাখে !
আলাপ থেকে একসাথে থাকার সিদ্ধান্তে পৌছতে
আমাদের বেশিদিন সময় লাগেনি মা । প্রথম প্রথম তোমায় জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কোথাও
আমার সেই আজন্মের চেনাজানা শহরের, অচ্ছেদ্যবন্ধন আমায় বারবার পিছনে ডেকেছিল , জানতাম
এ সিদ্ধান্ত তোমরা মেনে নেবে না । ব্রাহ্মন ছাড়া অন্য কোনো বংশে বিয়ে দেওয়ার কথাই যে
তোমরা ভাবনি কক্ষনো, সেখানে ইকবাল কে মেনে নেওয়া তোমাদের চিন্তাভাবনার সাত মাইলের মধ্যেও
যে আসতে পারে, আমি ভাবিনি কখনো । তবুও, কেবলি ভেবেছিলাম,নিজের ভালবাসা, নিজের পছন্দ
কে , নিজের মনের মত , দেবতার মত এই মানুষ টিকে তোমাদের সাথে দেখা করাবো না..? একটিবার
! হতেও তো পারে ,ওর ধর্ম নয়, জাত নয়, বংশ নয়, নিখাদ সোনার মত মানুষটাকে , ওর সৃষ্টিশীল
মনটাকে তোমাদের হয়ত ভালো লেগে গ্যালো , হয় না ? জানতাম না , অনেক দোলাচলতা নিয়ে, একদিন
চলে গেলাম তোমাদের কাছে , আমার অতীতের কাছে । হাঁটু মুড়ে বসে নয় ভিক্ষা করে নেব আমার
জীবন...এমনটাই ভেবে ইকবাল কে নিয়ে গেছিলাম । নৈহাটির যে বাড়ির অন্দরের গল্প ফুটিয়ে
তুলেছিল সে তার ক্যানভাসে, সেই বাড়ির সদর টুকুও তাকে পেরোতে দাওনি তোমরা । বাইরে দাঁড়
করিয়ে রাখলে গোটা বেলা...শেষে মুখ কালো করে এক বন্ধুর বাড়িতে পাঠালাম ওকে । তোমাদের
শামীমের কথা মনে ছিল মা ? শামিম আমাদের গ্রামের বাড়িতে জন খাটত, কই, তাকেও তো পুজো
পার্বনে কাপড় দিতে, রোজ যত্ন করে খেতেও দিতে, আমার সেই ইস্কুলে পরা মনে মনে খুব গর্ব
হত ,যে জাতির অভিমান ,ধর্মের অভিমান নিয়ে আমার
মা, বাবা চলেন না । সেই অহংকার আমার সেদিন ভেসে গেছিল মা ।
এক কাপড়ে চলে আসি ঢাকাতে । ইকবালের শিকড়ে
। ঢাকাতে আমাদের নিকাহ হলো ...মসজিদ থেকে ফিরে আমার একটা নতুন নাম হলো...সায়রা , সায়রা
পারভীন । বিজয়া ব্যানার্জী থেকে সায়রা পারভীন হতে অনেকটা ছেড়ে আসলাম, মাগো । আমার বিয়েতে
কেউ উলু দিল না , শাঁখ বাজলো না ,চন্দন পরলাম বটে তবে তা তোমাদের কনেচন্দনের মতন নয়...আমায়
চন্দন পরিয়েছিল ইকবাল নিজে । ওর তুলির মাথায় সাদা রং দিয়ে একটু একটু করে সাজিয়েছিল
আমায়, ওর মতন করে । সেই ছোটবেলায় তুমি আমার চুল বেঁধে দিতে দিতে সুর করে বলতে,
.."দোল দোল দুলুনি, রাঙ্গা মাথায় চিরুনি,,," সেই দোলায় কখন আমার ঘূম এসে যেত আর ঘুমের স্বপ্ন মাখা চোখে হাজার উলুর শব্দ
ভেসে আস্ত গঙ্গার পাড় থেকে । সেই স্বপ্নে যে মানুষটি আসতেন ঘোড়ায় চেপে আমায় নিয়ে যেতে
, তার মুখ টা কি ইকবালের মত ছিল..? ঢাকায় আমার প্রথম শ্মশুর বাড়িতে দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিল
একটি দশ বছরের মেয়ে । আফসানা। ..ইকবালের বংশের শেষ আলো । সেদিন মনে আছে মা, সেই যে
ছোরদির বিয়ের পর শয্যা তুলুনি নিয়ে হুলুস্থুলু , নতুন জামাইয়ের সাথে খুনসুটি, বদমায়েশির
সেই সব মুহূর্ত গুলো খুব মনে পরছিল ,কিন্তু কাউকে একটি কথাও বলতে পারিনি সেদিন । শুধু
জানলার ধারে বসে চোখের জল ফেলেছিলাম আর পাশে বসে চুপটি করে বড় বড় চোখ নিয়ে আমায় দেখে
যাচ্ছিল , আফসানা ।
ঢাকার রূপগঞ্জের বাড়িতে ইকবালের সাথে সংসার
করলাম ঠিক ৩ বছর ২৭ দিন । ততদিনে ধানমন্ডি তে ঢাকা আর্ট কলেজ এ ইকবাল কাজ পেয়েছে পার্ট
টাইম লেকচারারের । আমিও পড়ানো শুরু করেছি একটা মেয়েদের স্কুলে । ছবি আঁকার সাথে সাথেই
ওর ছাত্র ছাত্রী রা নিত্য আসছে যাচ্ছে , ঘরভর্তি শুধু ছবি আর ছবি । রং, তুলি, পেন্সিল
, রাশি রাশি কাগজের রোল আর চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে বেশ সংসার করছিলাম আমরা, জানো । তখন
ও বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে একটা কাজ করছিল . ..একটা সিরিস ,কি যে ভালো হচ্ছিল ছবিগুলো...আমার
খুব ইচ্ছে হত যদি তোমাদের দেখাতে পারতাম কাজগুলো । সেই যে ভানুকাকা আমাদের বাড়িতে আসতেন
, রাধামাধব মন্দিরের সিঁড়িতে বসে বোজা চোখে একটার পর একটা পদ গাইতেন.. আর গানের শেষে
তোমরা সকলে কেমন মন্ত্রমুগ্ধ, তন্ময় হয়ে চুপ করে থাকতে,আর আমার সত্যি সত্যি মনে হত
গানের সুর নাকি চাঁদের আলোয় কে জানে, সমস্ত বাগানটা চন্দনের গন্ধে ভেসে গেছে, আমার
সেই সব মনে পরত মা ইকবালের ছবি দেখে । ওর ছবিতে সেই সঙ্গীত ছিল, সেই তন্ময়তা ছিল, আর
সেটা জানার জন্যে ওকে কখনো ধর্মের চৌকাঠ পেরোতে হয়নি । সারারাত ধরে ছবি আঁকত ইকবাল, খুব রাতে কখনো কখনো
আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতাম বসার ঘর থেকে একফালি আলো ভেসে আসছে, ঘুম চোখে গিয়ে দেখতাম
ইকবাল এর ক্যানভাস জুড়ে একটা বিরাট বাদামী পাহাড় আর সেই পাহাড়ের পায়ের কাছে দিগন্তবিস্তৃত
নীল্ এক হ্রদ । ..ওকে জিগ্গেস করতাম, নিয়ে যাবে আমায় এই বাদামী পাহাড়টায় ? ওর রাতজাগা
চোখ দুটো শুধু হাসত আর অমনি তুলির আগায় সাদা রং নিয়ে ওই পাহাড়ের কোলে এঁকে দিলো দুটো
বিন্দু ...দুটো মানুষ । বলত....এই যে , চলে গেলাম আমরা, যাবে তো শিমুল । তোমাদের নৈহাটির
বাড়ির রুমনি ,জীবনের এই তিনটে বছর 'শিমুল' হয়ে উঠেছিল মা , ইকবালের শিমুল । টকটকে রাঙ্গা
শিমুল ।
তখন প্রায়ই আমার খুব ইচ্ছে হত তোমাদের সাথে
কথা বলার...রোজ সকালে যখন রূপগঞ্জের বাড়ির বারান্দায় বসে সকাল দেখতাম, আমাদের নৈহাটির
বাড়ির...তোমাদের নৈহাটির বাড়ির সকালগুলো খুব মনে পরত মা । মনে মনেই কতবার চলে গিয়েছি
আর ঠিক সেই আগের মত খোকার সাথে পুকুরের সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে পারের মাছ গুলোকে মুড়ি দিয়েছি খেতে, একটা গোটা শৈশব জমাট
বেঁধে, গেঁথে রেখেছি স্মৃতিতে । খোকার
জন্য আমার মন কেমন করে এখনো , শুনেছি এখন ও সংসার করেছে ,ওর মেয়ে হয়েছে , সে মেয়ে তোমাদের
উঠোন জুড়ে খেলে, তোমাদের পাঁচিলের ধারের জামগাছের ডালে দোলনা বেঁধে দোলে ? এ সব আমার
খুব দেখতে ইচ্ছে করে যেন...তাই তো লুকিয়ে লুকিয়ে বুবুপিসী কে ফোন করেছি কতদিন...ঠিক
সন্ধ্যে নামার মুখে। আমার নাম ধরে ডাকত ওই সময়টায়, তোমাদের শহর । ঢাকা শহরটা তখন কালচে
নীল্ থেকে গার্হ অন্ধকার হয়ে মিশে যেত, রূপগঞ্জের পাড়ায় পাড়ায় মসজিদের আজান পড়ত, ঠিক
তখন। ছাদের আলসের ধরে দাঁড়িয়ে বুবুপিসিকে ফোন করতাম আর ফোনেই চোরের মত লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতাম ...তুমি নৈহাটির বাড়িতে ঠাকুরঘরে
শাঁখ বাজাচ্ছ.. সেই আওয়াজ..পিতলের ধুনুচিতে নারকোল ছোবড়া আর ধুনো'র সেই সমস্ত সুগন্ধি
কুন্ডলী পাকানো ধোয়া আমি খুব চোরের মতন আমার সমস্ত অস্তিত্ব ভরে টেনে নিতাম , মা, তুমি
কি জানতেও পেরেছ কখনো ! আমি সব্বাইকে কত হিংসে করেছি তখন, এমনকি বুবুপিসিকেও । বুবুপিসির
গায় শ্বেতির দাগ এর জন্যে ওর বিয়েই হলো না , তাও তো সে তোমাদের সঙ্গেই রইলো...আর আমার
গায়ের কলঙ্ক , আমার ধর্মান্তর , আমার পোশাক বদল কি এতটাই তীব্র ছিল , যে বাড়ি থেকে
কুষ্ঠ রোগীর মতন দ্রুত সরিয়ে ফেলতে তোমাদের একটুও দ্বিধা হলো না ।
যাইহোক,
সে সব কথা থাক ।বাবার মুখে শুনতাম বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন হলো আর রাতদুপুরে আমি
জন্মালাম তোমাদের ঘরে । ঠাকুমা নাম রাখলেন বিজয়া । আসলে বিজয়া নামটা যখন রেখেছিলে তোমরা তখনি তো আমার
জীবনের উত্সবের সমাপ্তির ঢাক বেজে গিয়েছিল , পরবর্তী কখনো না আসা উত্সবের অপেক্ষায়
। সেই বিজয়া থেকে সেরা হয়ে, শিমুল হয়ে আমার যে নতুন জন্ম তার ও একটা সাধ্যসম্মত সময়
ছিল ।সব স্বপ্নের যেমন একটা সম্ভাব্য সমাপ্তি সীমা থাকে, একটা ভ্যালিডিটি পিরিয়ড, ঠিক
সেরকমই আমার এই স্বপ্নটাও খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল । ইকবালের মস্তিষ্কে ধরা পড়ল একটা
ছোট্ট রক্তবিন্দু, একটা দানা বাঁধানো আতঙ্কে কেটে গেল তিনটে মাস । চিকিত্সা হলো যথাসাধ্য,
কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না । অতিরিক্ত রক্ত খ্হরণে একটা ডিসেম্বরের কুয়াশা ভেজা ভোরবেলায়
চলে গেল ইকবাল । আমি সারারাত রূপগঞ্জের বাড়ির জানলে আফসানা কে আঁকড়ে ধরে বসে রইলাম
। ভোরবেলায় ওরা খবর পাঠালো হাসপাতাল থেকে , ইকবালের শেষ ছবি আঁকা হয়েছে বলে । একটা
সাইকেল রিক্সা ধরে যখন পৌছলাম , ততক্ষণ সব শেষ । ইকবালের ছাত্র ছাত্রীরা ওকে সাজিয়ে
দিয়েছে কি চমত্কার সাজে । কমলা পাঞ্জাবি তে আর সাদা চাদরে , কি দারুন দেখাচ্ছিল ওকে
,জানো । শুধু কি যেন একটা অসম্পূর্ণ ছিল, কি যেন একটা নেই । সম্বিত ফিরতেই ওর তুলি
দিয়ে , ওর রং দিয়ে কপালে এঁকে দিয়েছিলাম সাদা চন্দনের ফোঁটা । ঠিক যেন শিমুল কে সাজানোর
শেষতম প্রতিদান । ওকে দাফন করা হলো ঢাকাতেই ,ওর বাবার কবরের পাশে, আর ওর শিমুল পড়ে
রইলো রূপগঞ্জের তেত্রিশ নং উকিলপারা রোড এর বাড়িতে ।
কটা দিন ঠিক কি করব আর কি করব না ভাবতে ভাবতেই
কেটে গেল । শিতলাখ্যা নদী আমাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি ছিল, ঐখানে গিয়ে বসে থাকতাম ঘন্টার
পর ঘন্টা । নদীর ধারে গেলে কেমন আমাদের মনের মধ্যে জমে থাকা মেঘগুলো ফিকে হয়ে গলে জল
হয়ে যায় ,তুমি বলতে আমায় ,মনে পরে মা ? তাই, যেতাম । আসলে এইরকম একা, একলা তো তোমাদের
রুমনি কে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি কোনদিন, নয় বাবা, নয় জ্যাঠামশাই তোমরা সকলে মিলে
সেই আমার প্রথম ইস্কুলে যাওয়া থেকে কি রঙের ফ্রক পরব, কি ফিতে দিয়ে চুল বাঁধব সেটাও
ঠিক করে দিতে ,আর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টাতে তোমরা যে কেউ ছিলে না মা ! তুমি ফোন করেছিলে
একবার ,একটি কথাও বলনি.. ভেবেছিলে আমি বুঝব না ,ফোনের ওপারে তুমি আছ ?শুধু ফোন ধরে
কেঁদে গিয়েছিলে হু হু করে । ফোনের এপারে আমিও । দূরত্ব টা কখন যে দুটো দেশ এর ভূগোল
কে মাড়িয়ে তোমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছিল, সেটা তুমিও বুঝেছিলে নিশ্চই । আর বাবা
? আমাকে কাঁধে বসিয়ে ঝাঁপানের মেলা দেখতে নিয়ে যাওয়া সেই আমার বাবা, তিনি নিশ্চই খুব
খুশি হয়েছিলেন আমার অবিমৃষ্যকারিতার এই হিসেব মেলানো অঙ্কের ফলাফল নিয়ে । বাবা কিন্তু
আমায় একটি চিঠিও পাঠায়নি আর । কি জানি, হয়ত তাঁর ও ভিতরে ভিতরে বিজয়া ব্যানার্জির মৃত্যু
ঘটেছিল অনেক আগেই ।
ঢাকা থেকে অনেক তদ্বির করে ওদের ইউনিভার্সিটির
একটা চাকরি পেলাম , খুব করে চাইছিলাম যেন দুরে কোথাও আমায় বদলি করা হয় । দিনের শেষে
রূপগঞ্জের বাড়িটা আমায় যেন গিলে খেত মা । আফসানা চলে গেল ওর চাচার কাছে আর আমি পরে
রইলাম সব শেষের শেষ নিয়ে । ঈশ্বর আমার কথা শুনলেন..দিল্লি তে পড়াশোনা আর চাকরি করার
একটা যৌথ সুযোগ এলো । আর দেরী করলাম না । রূপগঞ্জের পাট চুকলো । দিল্লিতেই বুবুপিসির
চিঠি পেলাম । বাবা চলে গেছেন । কেমন সুন্দর করে তোমাদের বহিষ্কৃত মেয়েটিকে তোমরা চিঠিতে
জানালে...বাবার মৃত্যু সংবাদ । আমার সময়...একটু একটু করে থেমে যাওয়া সময় কেমন নিষ্করুণ
ভাবে ছিনিয়ে নিল একে একে আমার অস্তিত্বের সিংহভাগ জুড়ে থাকা মানুষগুলোকে.। বাবা বলত,
'জীবনে দুঃখ অনিবার্য...কিন্তু কখনো ছোট দুঃখ তে পরে থাকবিনা রুমনি, ছোট দুঃখ থেকে
বড় দুঃখ তে উত্তরণ ঘটলে বুঝবি বাকি সবটাই আনন্দ ।' আর এই বড় দুঃখ তে নিজের ছোট অপ্রাপ্তি
গুলোকে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যম ছিল গান , রবি ঠাকুরের গান । তখন বুঝিনি কিন্তু দিল্লি তে
একেবারে একলা একটা জীবন শুরু করতে গিয়ে বাবার এই কথাগুলো খুব মনে পরত মা , আমি কোথায়
যেন বড় দুঃখের জগতজোড়া স্রোতের সাথে একাত্ম হতে শুরু করেছিলাম । হ্যান, গান শুরু করলাম
আবার । আমার শিকড়ের সাথে জড়িয়ে ছিল যে গান, সেই গানই আবার হাত ধরে ফিরিয়ে নিয়ে এলো
আমায় জীবনের মূল স্রোতে ।
দিনের শেষে অফিস থেকে ফিরে আমার এই তার ছেঁড়া
জীবন জোড়া লাগাতে সুর এর ভূমিকা ছিল অনেকখানি । কোমল নি থেকে শুদ্ধ নি তে যেমন ভোরের
রং বদলায়, ঠিক সেইরকম ফিকে গোলাপী রং এর সকাল আমার জীবনে ফিরে এলো গানের হাত ধরে ,আমার
এই সাততলার ছাদ ঘেঁষা ঘরে বেশ একলাটি সংসার পেতেছি জানো তো । পাতাবাহার গুলো জানলার
ধরে যখন সকালবেলার রোদে পিঠ দিয়ে বসে , আর আমি ভাত রান্না করি , আর আমার একমাত্র সঙ্গী
ওই চারপেয়ে খুশিতে ডগমগ হয়ে সামনের দুটো পা জানলার আলসেতে তুলে দিয়ে রোদ পোহায়, সে
যেন এক সত্যি রুপকথা । খুন্তি নাড়ানোর সত্যিটা, ভাত ফোটার গন্ধের সত্যিটা সেই ঠাকুমার
মুখে শোনা গল্পের মত প্রভাতি রুপকথা হয়ে আমায় নিয়ে যায় তোমাদের নৈহাটির বাড়িতে এখনো
। কত না বলা কথা, কতদিনের সঞ্চিত অন্দরমহলের ব্যথা সব শব্দ হয়ে গান হয়ে কমলালেবুর মত
ঝরে পরে আমার দরজায় লাগানো নেমপ্লেট তার ওপর । মিসেস সায়রা পারভীন এর ওপর । এর মাঝে
কত পুজো এলো, কত পুজো গেল । কিন্তু আমার পুজো তো সেই কোন সকালেই সারা ,চিরকালের মত
। আমাদের এপার্টমেন্ট এর পাশের কমুনিটি হলে এখানে পুজো হয় । সামিয়ানা পরছে , আলোয় সাজছে
প্যান্ডেল গুলো দেখি সব, দু চোখ ভরে । কিন্তু পুজো বলতে ঠিক যে যে অনুভূতিগুলোকে সম্বল
করে বাঁচা,সেই সব অনুভুতিগুলি যখন চির বিজয়া নিয়েছে আমার থেকে, তখন পুজোয় আমার কোনো
যোগ নেই বলে মনে হত ।
বাবা ছোটবেলায় ঠাকুর দেখতে নিয়ে যেত । বাড়ির
পুজোর কর্মকান্ড সারা হলেই বিকেল জুড়ে নতুন জামাকাপড় পরে ঝলমলিয়ে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার
আনন্দই ছিল আলাদা । খোকা তখন ও কোলে, ফী বছর তুমি ঐদিন টা কি সুন্দর সাজতে । দুপুরবেলার
খাওয়া দাওয়া মিটলে মরচে পরা শরতের আলো যখন দোতলার কার্নিশ থেকে গড়িয়ে আয়নায় তোমায় চুরি
করে দেখত, তোমায় আমিও দেখতাম, মা । পারার পুজো থেকে ভেসে আস্ত মাইকের গান, নয় হেমন্ত,
নয়তো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ,তুমি সাজতে আর গুনগুন করে একটা গান গাইতে,, তোমাদের দেশের
গান, কুষ্টিয়ার গান । তোমার ফিকে গোলাপী রঙের একটা টাঙ্গাইল ছিল, তুমি ওটা পড়তে খুব
ভালবাসতে । আর ছিল সাবেকি দু'চার খানা গয়না । তাই দিয়েই তোমায় যেন প্যান্ডেলে বসা মা
দুর্গার মতই অসামান্য রূপসী লাগত । আমার তো চোখ থেকে পলক পরত না, সারাদিনের ঘামতেল
মাখা কাজেকম্মের আমার চেনা মা ,তুমি সামান্য সেজেই কিরকম বদলে যেতে । ঠাকুর দেখে ফিরলেই
শুরু হত হাতে গুনে ,কত ঠাকুর দেখলাম সেটা বলার পালা । খোকা প্রতি বছর ই বাবার কোলে
ঘুমিয়ে পরত আর তুমি ওকে নিয়ে গাড়িতেই বসে রইতে শেষটা । আমাদের সেই চারজনের পুজো টা
বড় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল মা ।
সেবার পুজোর ঠিক আগেই বাড়ি ফিরে খোকা কে দেখলাম
আমার দিল্লির এপার্টমেন্ট এর করিডোর এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।প্রথমটায়তো আমি চিনতেও পারিনি
। প্রথমে মনে হলো, যেন বাবা কে দেখলাম...সেই পিছনে হাত দিয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ
দেখা ভঙ্গি । পরে বুঝলাম ও আমার বাবার বর্তমান ।, তোমার সেই ছোট্ট ছেলেটা কত বড় হয়ে
গিয়েছে । খোকা আর খোকা নেই , সেও এখন খুকির
বাবা । দিল্লির ঠিকানাটা ওকে কে দিয়েছিল জানি না, কিন্তু আমায় খুঁজতে এসেছে কেউ আমার
শহর থেকে, আমার অতীত থেকে, আমার ইতিহাস থেকে এটা ভেবেই আমার আনন্দে গলার স্বর বুজে
এসেছিল ,মা । ভাবলাম, খোকা বোধহয় আমায় ফিরিয়ে নিতে এসেছে , বিশ্বাস হচ্ছিল না , জানো
? মনে হচ্ছিল, এও কি সত্যি হয় ? এই এতগুলো বছর যে মেয়েবেলা ছেড়ে এসেছি পিছনে, আবার
ফিরতে পারব সেই শৈশবের দোরগোড়ায় ? খোকা কে জড়িয়ে ধরে আত্মহারা হয়ে গেছিলাম আমি । সেই
আবেগ, সেই অস্থিরতা কমলে খোকা জানালো তার আসার কারণ ।
খোকা জানালো তুমি ভালো নেই । সংসারে নিজেকে একটু একটু করে বিলিয়ে দিয়েছ এতগুলো
বছর আর ভিতর থেকে ফুরিয়ে গিয়েছ এতখানি । আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না মা, তুমিও ভিতরে
ভিতরে আমাকে ফাঁকি দিয়ে এইভাবে চলে যাওয়ার পাকাপাকি পরিকল্পনা করে এসেছিলে । লিভার
এর অসুখ যে এমন মারাত্বক আকার ধারণ করেছে, সে কথা আমায় জানানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি
তোমাদের ব্যানার্জি পরিবার । জানাতে এলে যখন তুমি শেষবারের মত আমায় দেখতে চাইলে । ভাবলে,
রুমনির সাথে শেষ দেখা করে ক্ষমা চাইবে নাকি রুমনির জন্য চিন্তাতেই তোমাদের এ পরিনতি
হলো তার বিচার চাইবে রুমনির কাছে ? আর নাকি সব ভুলে রুমনি কে আবার সাদরে গ্রহণ
করবে প্রগতিশীল , সনস্কৃতি ঋদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার ! ঠিক কোনটা সেদিন আমি
বুঝতে পারিনি , কিন্তু তোমার অবস্থা শুনে নিজেকে আটকাতে পারিনি । খোকার সাথে ছুটে গিয়েছিলাম
নৈহাটির বাড়িতে ।
মা, যেদিন নৈহাটির বাড়ির সামনে সাইকেল রিক্সা'টা দাঁড়ালো দুপুর বারোটা নাগাদ
, পাড়া সেই মুহুর্তে সরগরম । খোকা আমার জিনিস পত্র নিয়ে রিক্সা থেকে নামছে আর আমি কেমন
জরভরতের মত দাঁড়িয়ে রইলাম তোমাদের উনিশ নং. পাঠক পাড়া লেন এর সবুজ কাঠের দরজাটার সামনে
। উল্টোদিকের চায়ের দোকান থেকে খদ্দের সামলাতে সামলাতে আমায় দেখে ,গামছায় হাত মুছতে
মুছতে বেরিয়ে এলো সাধন কাকা । কাকার চোখের ঘোলাটে চশমার আড়ালেও চোখ দুটো ভিজে উঠেছে
বুঝতে পারছিলাম । থরথর কাঁপা হাতে শুধু একবারটি এসে আমার হাতদুটো ধরলেন । আরও পাড়ার
পাঁচজন ভিড় করে এলেন আমাদের বাড়ির দিকে ।সকলেরই চোখে বিস্ময়, যেন হারানো, প্রাপ্তি,
নিরুদ্দেশের ঘর পালানো মেয়েটি পাঁচ হাত ঘুরে,জাত ,ধর্ম খুইয়ে ঘরে ফিরলে তাকে ঠিক কেমন
দেখায়, সেই অবিমিশ্র অপমান আর করুনার ইঙ্গিত প্রত্যেকের চোখে মুখে । বাড়ির বহিস্কৃত,
তাড়িয়ে দেওয়া মেয়েকে দশ বছর পরে বাড়ি ফিরতে দেখার বিস্ময় কি রোজদিন পাওয়া যায় ? রিক্সা
থেকে নেমে আমার কেমন অসাড় মনে হচ্ছিল নিজেকে, রাস্তা থেকে সদর পেরিয়ে ঐটুকু পথ ও পেরোতে
পারছিলাম না । যে পাড়ায়, যে বাড়িতে আমার আবাল্য শৈশব কাটল সেখানেই নিজেকে সেদিন চূড়ান্ত
বেমানান মনে হয়েছিল । দরজাটা খুলে এসে দাঁড়ালো বুবুপিসী । ঠিক ঢোকার মুখে একবার পিছন
ফিরতেই চোখ ভরা জলের মধ্যে স্পষ্ট দেখলাম , আমার ইকবাল দাঁড়িয়ে আছে , ঠিক সেদিন যেখানটায়
ছিল, সাধনকাকুর দোকানের পাশের বাঁধানো বটগাছ টার নিচে । বিশ্বাস কর , কেমন যেন বিদ্যুত
খেলে গেল আমার সর্বাঙ্গে, মনে হলো অপমানিত, প্রত্যাখ্যাত ইকবাল পরে রইলো..আর
আমি ,কেমন নিশ্চিন্তে আবার ফিরলাম আমার কোটরে ।
এসব কথা তোমায় বলছি কেন জানো, কারণ সেদিন তুমি এর কিছুই দেখলে না । দশ বছর পরে
ঘরে ফেরা মেয়েকে দেখতে বারান্দায় এসেও তুমি সেদিন দাঁড়ালে না । শুধু ঘরভর্তি ওষুধ পথ্য,
নানারকম চিকিত্সার মাঝে আধো তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে রইলে তেতলার ঘরে । পায়ে পায়ে
গেলাম তোমার কাছে, নতুন ডাক্তার বোধহয় আমায় দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন কাকিমার কাছে
, এই বাড়িতে অনেক কিছুই নতুন, অনেকেই আমায় চেনেন না , সেটাই স্বাভাবিক। দশ বছর তো আর
একটুখানি সময় নয় । ঘরভর্তি লোকদের অতিক্রম করে যখন তোমার কাছে পৌছলাম, তোমায় সেই ছোটবেলার
মত লাগছিল । ওই যে সেবার খোকা যখন হলো ,তুমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলে সাতদিন । আমার তখন
বছর দশেক বোধহয় । আমি আর বাবা নিয়ম করে তোমায় দেখতে যেতাম দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে
। বাবা হরলিক্স গুলে তোমায় গেলাসে করে খাইয়ে দিত একটু একটু করে আর তুমি ফ্যালফ্যাল
করে আমার দিকে চেয়ে থাকতে, আর আস্তে আস্তে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে । আমি শুধু খোকাকে
দেখতাম ...সে তখন হাত পা ছুঁড়ে পাশের বেবি কটে ফোকলামুখে খেলছে, একটা তুলোর পুতুলের
মত ।... ঠিক সেই তুমি । ক্লান্ত, আধবোজা দুটো চোখ , দু হাতের নিল শিরায় শিরায় ছুটে
চলেছে নানারকম ওষুধের নল । আমায় দেখে চোখের পাতাটা খুললে খানিক, শুন্য দৃষ্টিটা একবার
শুধু স্থির হলো , উজ্জ্বল হলো....তারপরেই নিভে গেল । দশ বছরের কথা কত সহজেই বলে দিলে
মা । কিন্তু আমার যে কতকিছু তোমায় বলার ছিল । আমি কখন বলতাম তোমায় , তুমি কখন শুনতে
?
কোজাগরী পুরিমার রাত্রে তুমি চলে গেলে । চতুর্দিক তখন চাঁদের আলোয় ভাসছে । বাড়ি
বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে, ভেসে আসছে উলুর আওয়াজ । তোমাদের বাড়ি শুধু অন্ধকার
। আমি তোমার শিয়রে বসে আছি, সামনের টেবিলটায় মৃদু আলো জ্বালানো । ঘড়ির টিকটিক শব্দে
সময় জানান দিছে সে থেমে নেই । সামনের দেওয়ালটায় টাঙানো বাবার ছবির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে
ছিলাম।ছবিতে বাবার সেই অভ্যস্ত রাগী মুখ টা ছিল না, বরং জ্যাঠামশায়ের সাথে হাসি মুখে
পড়ার টেবিলে বসা একটা ছবি । কেমন যেন মনে হলো বাবা বোধহয় আমার জন্যে কষ্ট পেয়েছে ভেতরে
ভেতরে । ছবির মধ্যে দিয়ে বাবাও বোধহয় তাকিয়ে ছিল আমার দিকে একদৃষ্টে । কখন যে তন্দ্রা
এসে গিয়েছিল জানি না , হঠাত মনে হলো বাবা জানি কখন বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । আমায়
ডাকছে, " রুমনি, রুমনি ওঠ , অঞ্জলি দিবি না ? " আমিও ধর ফরিয়ে উঠেছিলাম
, সত্যি তো , সন্ধিপুজো তো সেই রাত বারোটায় । বাড়ির সক্কলে নিচের ঠাকুর দালানে আর আমি
দেখো, কিরকম ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গিয়েছি । হঠাত উঠতেই আমার হাত লেগে কাঁসার গেলাস টা পরে
গেল অন্ধকারে ,ঝনঝনিয়ে আওয়াজে সম্বিত ফিরতেই দেখলাম আধো আলো অন্ধকারে তুমি বিছানায়
উঠে বসে আছ । তোমার দৃষ্টি বিস্ফারিত..ম্লান..যন্ত্রনায় কাতর ..অভ্যস্ত চোখে বাবাকে
খুঁজলাম, বাবা কোথায় ? কোথায় সন্ধিপুজো ? সব আলো তো নিভে গেছে এখন। সে সব তো
কবেই ফুরিয়েছে । তুমি আমার হাত চেপে ধরলে একটিবার , খোকা ছুটে এলো পাশের ঘর থেকে ,
ব্যাস, শুধুই এইটুকু। তুমি চলে গেলে । পূর্নিমার আলোয় ভেসে যাওয়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম
খানিক পর ...স্পষ্ট শুনতে পেলাম পুকুরে কার ঝাঁপানোর শব্দ । বিসর্জন হলো বোধহয় ।
তোমাদের নৈহাটির বাড়িতে তুমি চলে যাওয়ার পর থাকার আর কোনো যুতসই কারণ
খুঁজে পেলাম না । যতদিন ছিলাম, খোকার মেয়ে কে নিয়ে ছিলাম । নিজেকে সত্যি খুব বেমানান
লাগছিল, জানো । মনে হচ্ছিল এই বাড়ির সাথে আমার যে নাড়ির টান, সেটা কোথায় জানি কেটে
গিয়েছে । সুর কেটে গেছে, তাল ছেড়ে গেছে , এখন শুধুই গলা সেধে আর কি লাভ । দিনের বেশির
ভাগ সময় তোমার ঘরে, বাবার ঘরে ,পুকুরপাড়ে, ছাদের ঘরে অন্যমনস্ক
হয়ে ঘুরে ফিরে বেরিয়েছি । ছেঁড়া খোঁড়া নিজের অতীতের একটা দুটো টুকরো পরে থাকতে দেখেছি
ইতস্তত , তুলে রেখেছি মনের মধ্যে সযত্নে । ইকবালের সাথে অনেক কথা বলেছি মনে মনে আর
এই চিঠিখানা লিখেছি তোমায় । জানি, এই চিঠি তোমার কাছে আর পৌছবে না , কিন্তু আমার তো
কথাগুলো বলা হবে । তোমাদের পুকুরপাড়ে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছি এ চিঠি, জানি তুমি পাবে ঠিক
। এই চিঠি তুমি যখন পড়বে , আমি তখন আমার সাউথ দিল্লি এক্সটেনশনের সাততলার টেরেস লাগোয়া
ছোট্ট ফ্ল্যাট এ । আমি, আর আমার পোষ্য জিনো ।ওকে খেতে দেব যত্ন করে , অফিসের ফোন সামলাবো,
আমার জানলার ধারের পাতাবাহারে জল দেব আর গান শুনব, রবি ঠাকুরের গান । নিজেকে ভালবাসব
,ভালবাসব আমার চারপাশের এই পৃথিবীটাকে । জানো তো, ভালবাসার কোনো জাত -পাত, প্রথম, দ্বিতীয়
হয় না । পৃথিবীতে কত রকমের মানুষ আর তাদের কত রকমফের ভালবাসা । কোনটার সাথে তাদের কোনটার
তুলনা হয়না ,মা । তারা সকলেই অপ্রতিম ।
আর মরে যাওয়া সম্পর্কের দাবী, তাকে অস্বীকার করব কেমন করে বলোতো ? অনেক
না পাওয়া উত্তরের দাবী, অনেক না করা প্রশ্নের দাবী আবার হয়ত কিছু বলতে না পারা শব্দের
নিজেদের জানানোর দাবী ! ইকবাল, বাবা, তুমি আমার জীবনে তোমাদের প্রত্যেকের দাবী।কিছু
মিটেছে হয়ত ..কিছু হয়ত চিরকালের মত নিরুদ্দেশ। .আর এ সবের মধ্যে আমি কোথায় ?
' আমার আমি ' কে খুঁজে দিয়ে গেছে আমায় ইকবাল । তাই তো তোমাদের নৈহাটির বাড়িতে নিজেকে
আর খুঁজে পেলাম না । বাবা ঠিক বলত, মা । ছোট দুঃখ থেকে বড় দুঃখের এই উত্তরণ জীবনে আমায়
অনেক বড় পথ দেখিয়েছে মা , আর এ পথ শুধুই আনন্দের , শুধুই প্রাপ্তির। আমার আর কোনো দুঃখ
নেই, দুঃখ বোধ ই নেই । আর হ্যান, ইকবালের সেই বৈষ্ণব পদাবলীর অসমাপ্ত সিরিসটার কথা
বলেছিলাম না তোমায় ? ওই ছবিগুলো এখন আমি শেষ করছি । রং,তুলি আর যে মনটা আমায়
দিয়ে গেল ইকবাল, সেই মনটাকে নিয়ে । ছবিটা কতদূর শেষ করতে পারব জানি না । তবে শেষ কে
দেখেছে বলো ! ততক্ষণ এই চলাটুকুই নাহয় প্রান ভরে নিলাম ।
নিজেকে এতদিনে খালি লাগছে, শুন্য লাগছে ।আমি ভালো আছি, যেখানেই থাক,তোমরা
ভালো থেকো । আমার ফ্ল্যাট এর পাশে একটা বিরাট শিমুল গাছ আছে । এর রক্তলাল ফুল গুলো
ছড়িয়ে রয়েছে আমার ঘর, বিছানায়, সর্বত্র । ইকবালের ভালবাসা আমায় শিমুল করে দিয়ে গেছে
মা । তাই আমায় মাফ কোরো, চিঠির শেষে আর তোমাদের রুমনি লিখতে পারলাম না ।
আমার প্রনাম ,
শিমুল
3 comments:
Darun!! Porchhi r chokher jol muche jaschi...kothai jani nijeke dekhte pachilm tomar bijoyar modhhye....khub bhalo laglo pore.
Darun!! Porchhi r chokher jol muche jaschi...kothai jani nijeke dekhte pachilm tomar bijoyar modhhye....khub bhalo laglo pore.
The only thing is that in one place u hv written mukherjee n next banerjee...
Post a Comment