Thursday, June 23, 2016

পড়ন্ত হেমন্ত দিনে

"সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে। ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল,পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে,পান্ডুলিপি করে আয়োজন ,তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল....।"- জীবনানন্দ দাস
একমাত্র ভালবাসার কাছেই বোধহয় এইরকম চুপ করে যাওয়া সাজে। উল্লাস নয়, হাহো গিটকিরি নয়, গমক নয় শুধুমাত্র বেহাগের মীড়ের মত শান্ত, আলাপী, স্নিগ্ধ চুপ করে থাকার নাম হেমন্তকাল। পায়ের কাছে যেমন ঘুমিয়ে থাকে দুপুরবেলার বাধ্য পোষ্য, খেয়ালী ঘুমে রূপসীর হাত থেকে খসে যায় উলের গোলা আর পোষা বেড়ালের পায়ে পায়ে ঘোরে পশমের মখমল, সমস্ত সম্পর্কের জটিলতা জুড়ে আরও নিবিড়, জটিল হয়, তেমনি থেমে থেমে ম্লান, স্তিমিত হাসি হাসে এই স্বল্পায়ু, অল্প কথার , হেমন্ত মানুষ, তার ছায়াময় অস্তিত্ব নিয়ে।
ইস্কুলের সময়সীমা যখন শেষের দিকে, তখন প্রথম বোধহয় আর পাঁচটা ঋতুর চেয়ে হেমন্ত যে একটু অন্যরকম, সেটা বুঝতে পারলাম । আমরা যারা শহর কলকাতায় থাকতাম না , আমরা যারা ঘুমেল , নির্লিপ্ত শ্রীরামপুর, বরানগর কি বোলপুরের মত অখ্যাত মফস্বলের মায়া মাখা দিকশুন্যপুর গুলোর বাসিন্দা ছিলাম, তারাই বোধহয় ঋতু পরিবর্তনের দিনগুলো বেশ আলাদা আলাদা বুঝতাম । ঋতুগুলো প্রায় সাবান মাখার মত গায়ে মেখে বড় হতাম । রোজ যেমন ছিল, অঙ্কের পিরিয়ড হয়ে ইস্কুলের শেষ ঘন্টা বাজত বিকেল ৪ টায় । ব্যাগপত্তর নিয়ে হাওয়াই চটি ফটফট করতে করতে মাঠ, ঘাট, সদরের রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরা । মরা বিকেলের আলোয় কেমন একটা কুয়াশা লাগা বিষন্নতার নিস্তেজ হাসি লেগে থাকত আমাদের বুড়ো শহরটার বুকে । শুধু মনে হত , বাড়ি ফিরে মাকে দেখতে পাব না, অফিস থেকে ফিরতে তার যে অনেক দেরী। আজও একলা একলা ভাত বেড়ে খেতে হবে , আজও সেই আঁকার ইস্কুলে ঝোলা কাঁধে একলাটি যাওয়া , আজও সন্ধ্যে বেলায় ঘরে ফিরে হাত পা ধুয়ে ছাদে গিয়ে, একলাটি রাত্রির আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে একলার প্রতিক্ষা । সে এক অদ্ভূত বিষন্ন অথচ অশরীরী সন্ধ্যে । রঙিন কাগজের ঘেরাটোপে একটি মাটির প্রদীপকে বাঁশের ডগায় বেঁধে উঁচুতে তুলে দেওয়া, এই ছিল তার দস্তুর । মা বলতেন, যে পূর্বপুরুষেরা ছেড়ে চলে গেছেন , তাঁরা আকাশপথে যাতে তাদের বংশপ্রদীপদের ঠিক ঠিক চিনে নিতে পারেন, তাই এ সময়টায় আকাশ প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম । দীপাবলীর ঠিক পরে পরেই, হেমন্তের ঠান্ডা কুয়াশার সন্ধ্যেগুলোয়, সেই অল্প আলোয় আকাশের দিকে তাকিয়ে ঠাঁয় দাঁড়াতাম । মনে হত, সত্যি বোধহয় ওঁরা কোন বন, জঙ্গল অরণ্যের অন্ধকার আকাশ পার হয়ে যাচ্ছেন আর এই একরত্তি শিখার আলোয় ঠিক চিনে নিতে পারছেন তাঁর বংশের এই সামান্য সলতেটুকুর দীপ্তি ।
আর একটু বড় তখন ।কলেজের দিনগুলোতে নভেম্বর মাসের শেষ দুপুরের পর সব ক্লাস থেমে যেত মোটামুটি ...মাঠে, ময়দানে, ল্যাব, কেন্টিন সর্বত্র কেমন একটা ভাঙ্গা হাট, ছেঁড়া কাগজ কুড়োনো বিষন্নতা ,উৎসব শেষের থমথমে ছবি । চার তলার ছাদের কেমিস্ট্রি ল্যাব এর সামনের করিডোরের শেষ কোনটায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকত একজন । সেই কালীপুজোর পর কলেজ খুললে তবে দেখা হবে ,কথা দিয়েছিল । তখন তো আর এত ঘন ঘন মুঠোফোনের রেওয়াজ ছিল না । তাই হাতচিঠিতে সামান্য দু লাইন কোনক্রমে হাতে গুঁজে দিয়েছিলাম , " ছুটির পরে কেমিস্ট্রি ল্যাব এর সামনে , দেখা হচ্ছে "। ছুটি ফুরোলো যেদিন , কলেজেই যাওয়া হলো না। সাড়ে তিন জ্বর নিয়ে বাড়িতেই শুয়ে রইলাম তিনদিন । পরে শুনেছিলাম, সে ঠিক দাঁড়িয়েছিল কেমিস্ট্রি ল্যাব এর সামনে । ইংলিশ অনার্সের ক্লাস ছুটি হয়ে যাওয়ার পরও, শেষ বিকেলের আলো নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল এই অধমের । শ্যামনগর এর ট্রেন অনেক পরে পরে, বাড়ি ফিরতে খুব দেরী হয়ে যাবে, মা বকাবকি করবে খুব তার পরেও...তার পরেও .. অনেকক্ষণ, অপেক্ষা । সমস্ত বিকেল জুড়ে তার দাঁড়িয়ে থাকাটা, তার অপেক্ষাটা , আজ মনে পড়ে। ...বুঝি ওই অপেক্ষার ভালবাসাটা অথবা ভালবাসার অপেক্ষাটা আসলেতে একটা অনন্ত দুপুরের করিডোর। সেই দুপুরটা যদি জীবন হয় তবে ওই করিডোরটা ঠিক হেমন্তকাল । আকাশ প্রদীপ যেমন চুপটি করে জেগে থাকে ছাদের মাথায় , একা চাঁদ সঙ্গী করে, ঠিক তেমন অপেক্ষায় হলুদ হয় হেমন্তকাল ।
নিজেকে প্রথম যৌবনে খুব অপু মনে হত । বিভূতিভূষণের নয়, সত্যজিত এর অপু।সেই যে অপুর সংসারের ..." জীবন বিষম বস্তু, অপূর্বকুমার" ,কলকাতায় এসে লেদ মেশিনের কাজ খুঁজে যার মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো রেল লাইনের ধারের দুঃখী চিলেকোঠায় । সেই তবে থেকে , রেল লাইনের ধারে অভুক্ত, আহত, ধোঁয়া আর শেওলা ঢাকা বাড়িগুলো দেখলে, আজও আমন্ত্রন্হীন দুঃখ জাগে । হেমন্ত নিয়ে লিখতে গিয়ে আজও কেন যে ঠিক সেই ধোঁয়াটে সন্ধেগুলোর কড়া নাড়া অনুভুতিটাই জাগে, কে জানে ! মনে পড়ছে, মীনাদিদির কথা । মীনা দিদি আমার এক দূর সম্পর্কের মাসি ছিলেন। মাসি, অথচ তাকে দেখলে আমার আজীবন দিদিই মনে হত, অনেকটা পথের পাঁচালির সেই রানুদিদির মত। অল্প বয়েসে মা, বাবা হারিয়ে দাদার সংসারে সারা জীবন পড়ে রইলেন তিনি । অথচ মুখ থেকে হাসিটি উধাও হতে দেখিনি কোনদিনও । মীনাদি আজীবন তাঁর ছোট বোনেদের বিয়ের পিঁড়ি আঁকলেন যত্ন করে, তত্বতালাশ সাজিয়ে দিলেন কি অনায়াস সুন্দর চিন্তায় , বাড়ির ছোট থেকে বড় সবার কখন কোনটির প্রয়োজন, তা তার নখদর্পনে ছিল আজীবন, অথচ অবিবাহিত হয়েই কাটিয়ে দিলেন জীবনের বাকিটা । বিয়ে তার হলো না। তাঁর গায়ের রংটি তেমন খোলতাই ছিল না।পাত্রপক্ষ তাই তাকে চিরকাল রিজেকশনের লিস্টিতে বসিয়ে রাখলেন। মামারবাড়ির সেই লম্ফজ্বলা শীতের সন্ধ্যেয় তার লম্বা বিনুনি করা স্নেহসম্বল মুখটা মনে পরে যখন আজ, খুব কষ্ট হয় ।ওঁকে ও আমার হেমন্ত কাল বলে মনে হয়। কেমন জানি শুধু অন্যের জন্য বেঁচে থাকার, আর কারোর জন্যে টিকে থাকার, অভিমান জর্জর, ধুলোমাখা , চৌকাঠ পুরান ।
ভালবাসায় চুপ করে নিঃশব্দ ,নিঃশর্ত ,উদাসীন অথচ সব জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া একটা প্রদীপের মতই থেকে যায় এ ঋতু । ঠিক যেমন, হ্যাজাকের আলোয় মরে সন্ধ্যের পতঙ্গের দল। তখন, মফস্বলের দিকে সে সময় যাত্রা থিয়েটারের আসর বসতো । গলি, বস্তির নিম্নবিত্ত পাড়ায় পাড়ায় বসতো তিনদিন ব্যাপী সাইকেল খেলার আসর । অন্ধকার , বেরং পাড়ার একটিমাত্র খেলার মাঠ সম্বল করে একটি লোক সেখানে মাস্তুল খাটিয়ে , রঙিন দড়ি, শিকলির সামিয়ানা খাটিয়ে, সাইকেলে চড়ে খেলা দেখাতেন রাত্রিদিন । সাইকেলেই স্নান, সাইকেলেই খাওয়া, আবার রাত্তিরে শুনেছি , সেইখানেই ঘুমোনো । সে এক বিষম ব্যাপার । সেইসব মাঠে বড় বড় পেট্রো ম্যাক্সের আলোয় ভিনভিন করত শ্যামা পোকার দল , ঠিক যেমন ভিনভিন করে ভিড় করে খেলা দেখতে জমে উঠতাম আমরা , ছেলে ছোকরার দল। তেমনি আগুন দেখে , আলো দেখে ছুটে আসতো পোকাগুলো, পুড়েও মরত ওই আগুনেই। রাত্রি আটটা-নটার সময় যখন মাইক এর গলাও ক্লান্ত হয়ে ছুটি নিত, ঘরে ফেরার সময় দেখতাম হিমঝরা হ্যাজাকের গায়ে মরে হিম হয়ে জমে রয়েছে হাজার হাজার পোকা । হেমন্ত মানেই কি এক ধরনের মৃত্যুমুখীনতা ? ক্ষণজীবি এক একটা জন্মের আগুনের ফুলকির মত জ্বলে নিবে যাওয়া ? এ প্রশ্নটা জাগলো আজ, এতগুলো বছর পরে । যদিও তখনও জীবনানন্দ পড়েছি শুধু পাঠ্যবইতেই ,কিন্তু ওই মৃত্যুর আর জীবনের ফিরে ফিরে আসার অনুষঙ্গ টা অনুভবের তারে তারে আঙ্গুল ছুঁয়ে গেছে বারবার ।
হেমন্তের রংটি ঠিক কেমন ? অন্যান্য ঋতুর মত তীব্র নয় বরং হেমন্তের রং বোধহয় তেজপাতার মত ।শরতের তীব্র হলুদ থেকে রং ঝরিয়ে একটা ম্লান হলদেটে আভায় এসে রফা করে এ ঋতু । হেমন্তের ঠিক রংটি এঁকেছিলেন একজন । যার ছবি দেখে মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে বড় হয়ে যদি ছবি আঁকতেই হয় ,তবে ঠিক ঐরকমটিই আঁকতে হবে, তিনি অবনীন্দ্রনাথ । হেমন্তের ঠিক ঠিক রংটি তিনি যেমন এঁকেছেন তার অজস্র ছবির টেম্পারা আকাশে , সেই শেষ বিকেলের না হলুদ, না গোলাপী, না বেগুনি রঙের আশ্চর্য মনখারাপি আভা , আজো সৃষ্টি করতে পারলাম না ক্যানভাসের দেওয়ালে । সেই যে বৃদ্ধ শাজাহান তাকিয়ে আছেন অলিন্দর জাফরী দিয়ে অদুরনির্মিত তাজমহলের দিকে, আর আকাশের হেমন্ত ক্যানভাসে ফুটে উঠছে একটি একটি করে রাত্রির উত্সবের আয়োজন ,অবন ঠাকুরের সেই বিষন্ন ,রিক্ত, ক্লান্ত ছবিটা দেখলে অনুভব করি, যে সব অনুভব ব্যক্ত করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায় মাত্র।
অনুভব করেছিলেন, প্রকাশ করেছিলেন আরও একজন যাঁকে ছাড়া এ ঋতু অসমাপ্ত, তিনি জীবনানন্দ । তাঁর একের পর এক শব্দের ছবিতে তিনি লিখে গেছেন হেমন্তের খোয়াবনামা । কার্তিকের ভোরে কুয়াশায় ভেজা বাংলার করুন ডাঙায়, ঘাটে, মাঠে জীবনানন্দের পংক্তিরা আজও ভিড় করে আসে মশারির ধারে সারারাত ।ওদের চেনা মুখগুলো ঘুমোতে দেয় না আর । নিস্তব্ধ শহরের ঘুমিয়ে পরার পর সতর্ক নিঃশব্দে উঠে বসি, টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে ফিরে আসি প্রিয়তম বইটির কাছে । পাতায় আঙ্গুল রেখে , পর্ণমোচী জঙ্গলের পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফিরে যাই আমরা , আমাদের ব্যক্তিগত হেমন্তদিনে । ঘুমের শহরে একের পর এক পাতা উল্টে যায়," হয়ত এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে , সরু সরু একরাশ ডালপালা কালো কালো মুখে নিয়ে তার ,,,,তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার, আমার !" কেঁপে যাওয়া উত্তুরে হাওয়ায় কখন দেরাদুনগামী ট্রেনের আওয়াজ ভেসে আসে , ডাক আসে, ডাক আসে । চেনা সম্পর্ক তার আস্তিনের সব তাস খুইয়ে, মায়াময় জোছনায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরে ট্রামলাইন ধরে একলা । একলা ঘরের তালা খুলে, ফ্রিজে রাখা জলের বোতল থেকে খায় দুই এক ঢোঁক ,তারপর আর কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ে । শেষ রাত্রের কার্তিকের শীতে তাঁর চোখ ভিজে যায় হিমে ,অথচ গায়ের চাদরটুকু টেনে দেওয়ার মানুষটি যার নেই, হেমন্ত সেই অভিমানী সহপাঠী হয়ে ফিরে যায় । শব্দ ধরে ধরে, অক্ষর মিলিয়ে যায় , স্মৃতির গাড়, গভীর কুয়াশায় ।

No comments: