Wednesday, June 22, 2016

সিনেমাওয়ালা ~ চিত্র আলোচনা

আমার একজন সিনেমাওয়ালা কাকু ছিলেন ! এই ছবিটা নিয়ে লিখতে বসে কেন এই ব্যক্তিগত গল্পটি করছি, বা সেই মানুষটির কথা টেনে আনছি তার একটা বিশেষ কারণ আছে। অনেকটাই সিনেমাওয়ালা কাকু সব্বার থাকে না বলে আর বাকিটা আমরা যারা ওই নব্বইয়ের দশকে প্রাচী, মিত্রা, নবীনা আর এরকম অগুন্তি নাম জানা / না জানা ছায়া ছায়া মফস্বলের সস্তার ইউরিন্যাল গন্ধে আমোদিত সিনেমাহলগুলোয় 'বড় পর্দায়' ছবি দেখে 'বড়' হয়েছি, তারা এই গল্পটার সাথে নিজের অনুভূতিগুলো আবার ফিরে পাবেন বলে। হলে গিয়ে ছবি আমরা সকলেই দেখি, দেখেছি কিন্তু সেই হলের ব্যালকনির সিঁড়ির ওপরে আরও যে একটি খুপরি ঘর থাকে, যেখানে দরজায় লাগানো থাকে 'নো এডমিশন' বোর্ড আর ভেতরে থাকেন স্বয়ং সেই সিনেমাহলের মালিক, কজন সে ঘরে গিয়েছেন ? কজন দেখেছেন ওই যে ধুলোধুসর ঘুলঘুলিওয়ালা ঘরের থেকে লন্ঠনের মত কাঁচ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে  বড় পর্দায়  আলো আর পর্দা জুড়ে তৈরী হয়ে, মুভি ম্যাজিক, আর ঘরঘর শব্দে ফিল্মের রিল ঘুরে ঘুরে প্রজেকশন রুম থেকে ছবি ফেলেন যে টেকশিনিয়ান ভদ্রলোক, কজন দেখেছি তাদের?

আমি দেখেছি, কারণ এমন  এক jon manush বেশ বড় মাত্রায় ছিলেন আমার জীবনে! এসব কথা কেন বলছি জানেন ? কারণ ছবিটা দেখতে দেখতে আমার সেই মানুষটার কথা এই এতদিন পর খুব খুউব মনে পরছিল+ মনে পরছিল সেই বঙ্গবাসী সিনেমার তেতলার অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে ওই অল্প আলোয় সস্তার কেবিনে বসে থাকা মানুষটার কথা, যে আমায় বলেছিল, আমায় কোনো নতুন ব্যবসার সন্ধান দিবি ভাই? সিনেমায় আর পয়সা নেই রে ! সেই দিন নেই, লোকে আজকাল ওই ডিজিটাল ছাড়া কিছু দেখে না ! ডাবিং সাউথের ছবি দেখিয়ে আর কদ্দিন টানবো? সেই জামানা শেষ ! মাছ, মাংস আর দামী মদ ছাড়া যার সন্ধ্যাবেলার ডিনার হত না, সেই মানুষটাকে ঠোঙ্গায় করে সস্তার চপ আর মুড়ি খেতে দেখেছিলাম আমি।বুঝতে পারছিলাম সময়টা বদলে যাচ্ছে। বস্তুত বদলে গেছিল অনেক কিছু।সেই ঝকঝকে চেম্বার, সেই চকচকে গেলাসে দামী হুইস্কি, কিছু ছিল না, ছিল শুধু সেই আদ্যিকালের প্রজেকশন রুম, গিলে খেতে আসার মত বিশাল একটা সিনেমাঘর, সিঁড়ির মুখে মুখে ঝুলকালি মাখা তারজালে ঘেরা তস্য পুরনো ছবির পোস্টার ফ্রেমে বাঁধানো আর হাঁক দিলেই যাকে পাওয়া যায়, সেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা পনের বছর একসাথে ঘর করা সেই সন্ব্সময়ের সঙ্গী...কার্তিক। সময়টা ক্যালেন্ডারের হিসেবে ২০০৮।

আজ ২০১৬ তে কৌশিক আমায় সব মনে করিয়ে দিলেন! আজ আমার সেই সিনেমাওয়ালা কাকু সিনেমা ব্যবসা বিক্রিবাটা করে দিয়েছেন! বয়েসও হলো অনেক ! আর তার মত আরও অনেকেই ! কিন্তু কৌশিকের এ ছবি না দেখলে তাদের কথা কি আদৌ ইতিহাস মনে রাখত !  সেইসব মাছ ওয়ালা, প্রমোটার, চালের ব্যবসায়ী  , সঙ্গে সিনেমা হলের মালিকদের কথা আলাদা করে মনে রাখার কোনো রকম কৌলিন্য জনিত কারণ কি ছিল ইতিহাসে র দায় বোধের ? কিন্তু কৌশিক যে বরাবরই আলাদা ! আলোর যে পিঠে অন্ধকার, মানুষের যে হাতটা জখম, পরিবারের যে মানুষটির কথা সক্কলে ভুলে গেছে, সমাজের অন্ত্যজ এমন কেউ যাকে নিয়ে কেউ কোনদিন আলাদা ফ্রেমে ভাবেনি, ভাবেনা কৌশিকের ছবিতে যে তাদেরই সহজ পাঠ! মাটি থেকে উঠে আসা সেসব গল্প বলাই যে তাঁর কাজ ,সিনেমাওয়ালার কাজ !

বিশ্বাস করুন কৌশিক, শেষ দৃশ্যে যখন আগুনের কুন্ডলীতে, ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ঢেকে গেল কমলিনী, প্রনবেন্দু হাঁটতে হাঁটতে  চলে গেলেন বড় পর্দায় অমর হয়ে, হলে জ্বলে উঠলো সিনেমা শেষের আলো, স্থবির হয়ে, ছবির মত চেয়ার আঁকড়ে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ! পর্দায় ছবি শেষের টাইটেল যাচ্ছে, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর সরোদে বাজছে বাগেশ্রী, আসেপাশের মানুষজন সিট্ ছেড়ে উঠছেন, গলা খাঁকরে মোবাইল অন করে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সারছেন, সার বেঁধে বেরোচ্ছেন বাইরের দিকে, আমি উঠতে পারিনি! কি যে একটা দমবন্ধ করা কষ্টে আপনি আমায় বেঁধে ফেললেন, গলার নিচটায় দলা পাকিয়ে উঠছিল, একটা নিস্তব্ধ কান্নার ফুলে ফুলে ওঠা বারবার ঠেকাতে চেষ্টা করেও পারিনি। আমি আটকে ছিলাম ২০০৫ সালের এক বৃষ্টি ভেজা বিকেলে! আমার সেই ফেলে আসা মফস্বলের ২০০৫ এর সিনেমাওয়ালা কাকুর ভাঙ্গা ছবিঘরের ধুলো ধুসর করিডরে ! কানে বাজছিল সেই শেষ কথাগুলো, '' আমায় কোনো নতুন ব্যবসার সন্ধান দিবি রে ভাই ?" কি বলবেন একে কৌশিক ? প্রফেসি? সিনে ম্যাজিক ? নাকি আপনার ছবির প্রনবেন্দুর মতই দুহাত ছড়িয়ে চিত্কার করে বলব, " এ-টা, সি- নে- মা.....বি-গ, স্ক্রি- ন -ন !!!!"


পরান বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনের সেরা কাজ করেছেন ! সেরা কাজ করেছেন প্রত্যেকেই ! পরমব্রত ,সোহিনী  বাকি পার্শ্ব চরিত্র রা সকলেই ! কিন্তু এ ছবি যে মানুষটিকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়, তিনি অরুন গুহঠাকুরতা! প্রনবেন্দুর ডান হাত দীর্ঘকালের টেক নিশিয়িয়ান হরির চরিত্রে ইনি শুধু অনবদ্যই নন, অমরত্বের দাবি করতে পারেন !

No comments: