Thursday, June 23, 2016

বছর শেষের ফুল পঞ্জিকা : সাল ২০১৫ ~

বছর শেষ । এক বছরের হিসেব কিতেব খোলা খাতায় রইলো পরে, হাতে রইলো শুন্য । পাওয়ার হিসেব , হারানোর হিসেব সব যে যার, তার তার । আমি শুধু ক্যালেন্ডারের মত , খবর কাগজের পাতার মত ,লিখে রাখলুম, যা যা পড়ল মনে । হাজার হোক, এক বছরের ইতিহাস, সে তো আর চাড্ডিখানি কথা নয় রে বেল্লিক । জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বরের এই দেশ দশের কথায় অনেক ভুললাম, আপনাদের মনে থাকলে কমেন্ট করে জানাবেন, কি কি মিস কল্লুম ।
জানুয়ারী ~
বারাক ওবামা এলেন ভারতে । রিপাবলিক ডে'তে সে এক প্রবল মোচ্ছব হলো । বলি, এমনি এমনি তো নয় , এ তো রামা, শ্যামা নয় এ বামা , মানে "ওবামা " । গোটা পৃথিবীর মাথায় এঁরা নাকি কতায় কতায় হাগেন , পান থেকে চুন খসলে এঁদের একটি টুসকিতে গণতন্ত্র ছলকে ছত্তিরিশ । হ্যা, একবার ওই ওসামা না কে জানি, ওদের টুইন টাওয়ারের গজদন্তমিনারে বিমান বোমা পাঠিয়ে ইগোর প্রাসাদ সে এক্কেবারে চুরচুর করে ভেঙ্গে দিয়েছিল, সে আলাদা কথা । তবে, এ অ্যামেরিকা বলে কতা । সেই দেশের প্রেসিডেন্টকে নেমন্তন্ন করে আনলেন আর গৃহকত্তা সাজুগুজু করবেন না ,সেও কি হয় ! তাই নরেন্দ্রবাবু ঘন ঘন পোশাক বদলালেন । কমলা শালে কাশ্মীরি স্টিচ অথবা স্যুটপিসে মোদী-নামা খুদে হরফে , " ফ্যাশনহীনতায় , কে বাঁচিতে চায় রে ? " ওবামা গিন্নি অনাথ আশ্রমে ইশকুল টিশ্কুলে গিয়ে খুদেদের সাথে এট্টু নাচানাচি কল্লেন আর ওবামা ক্যালেন্ডারে " মেরা ভারত মহান" ক্যালেন্ডারে যা যা দেকতে পাওয়া যায়, সেই সব দেকলেন । কূটনীতির সম্পক্কে অবিশ্যি বিশেষ কোনো হেলদোল হলো না নিন্দুকে বলে ঠিকই , কিন্তু কানাঘুষো শোনা গেল, মোদীর ফ্যাশন ডিজাইনার ভদ্দরলোকটি নাকি বেশ দু পয়সা পিটিয়েছেন ফাঁকতালে ।
ফেব্রুয়ারী ~
ওরেবাব্বা । ১৪ তারিখে ভিক্টোরিয়ায় কোনের বেঞ্চিতে বসে ভালেন্টাইন মানাবো কি, দেশ জুড়ে সোয়াইনের বাচ্ছারা কি একটা সাংঘাতিক অসুখ ছড়ালে । বাপের জম্মে শুনিনি ফ্লু'এরও আবার কুকুর, বেড়াল, শুয়োর হয় । ফ্লু মানেই ওই নাক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ, গা জ্বর জ্বর , পাড়ার মোড়ের সলিলকাকুর অ্যালোপ্যাথি দোকান থেকে চারটে ট্যাবলেট গিললেই ঠিক হয়, আর শীতকাল হলে রাতের দিকে এট্টু রামনাম গরম জল দিয়ে...হেঁ..হেঁ , মানে বুজতেই পাচ্ছেন আর কি । তা এ যে কি সাংঘাতিক হলো সক্কলে দেখি রাস্তায় কালো মুখোশ পরে নাক, মুখ ঢেকে দৌরচ্চে ।দেশশুদ্ধু লোক রাতারাতি সব্বাই উগ্রপন্থা নিলে । ট্রেনে কুড়ি টাকায় মুখোশ বিকোলো । কে যে সোয়াইন আর কে যে ওয়াইন কিছু বোঝার আগেই প্রায় ৬০০ জান নিল এই সোয়াইন ফ্লু । শুয়োর দেকলেই লোকজন দৌড় মারছে চো চা করে । কি ভাগ্যিস নাসিরুদ্দিন শাহ "পার" ছবিটা অদ্দিনে পার করে এয়েছেন । নইলে আর শুয়োরের নাতি'দের উপায় ছিল ? ওদিকে এত ফ্লু'য়ের পরেও দিল্লিতে শেষ হাসি হাসলেন আম আদমী অরবিন্দ কেজরীওয়ালা । গলায় মাফলার ছিল বলেই বোধহয় বেঁচে গেলেন সে যাত্রা । ফেব্রুয়ারী তো এমনিতে প্রেমের মাস বলেই লোকে জানে । কিন্তু ২০১৫'৪ ফেব্রুয়ারী অন্য কথা বলল । বাংলাদেশে অভিজিত রায় নামের এক ব্লগার'কে নৃশংস ভাবে খুন করলো মৌলবাদীরা । তাঁর অপরাধ , তার মুক্ত মনের খোলা চিন্তাধারা, লেখাপত্তর । ইসলামী মৌলবাদ সেটি মোটে সাপোর্ট করেন না, তাই তাঁকে দিনদুপুরে বইমেলা মাঠে রক্তাক্ত করা হলো । সেই শুরু ।
মার্চ~
মার্চে অবিশ্যি স-ও-ব ভালো ভালো ব্যাপার হলো । একে বসন্তকাল । কোকিল ডাকছে কু-উ , কু- উ অষ্ট প্রহর । ট্রেনে বাসে, আপিসে, ক্লাসে সবার মোবাইলে এক রিংটোন । সব্বাই এট্টু ন্যাকামি মিশিয়ে বলছে "বসন্ত এসে গ্যা-চ-ছে, বসন্ত এসে গ্যা-চ-ছে ।" চতুষ্কোণ , সে 'বই' তো বেরিয়েছিল সেই আগের বছর কিন্তু দ্যাকো, ওই একটা গানের সে কি ক্রেজ । অ্যাদ্দিন আপামর বাঙালি হেদিয়ে মরছিল কেননা বসন্ত না আসা অবধি কেউ এ গানটা বুকে হাত রেকে গাইতে পারছিল না বলে , এইবার আর কোনো গোল নেই । হোলে হোলে দোলে দোলে, ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে....ধুত্তর, ওটা ব্যাক ডেটেড । লগ্নজিতা খায় না মাথায় মাখে কেউ জানে না, কিন্তু সে কি শুভ লগ্ন মায়িরি , এই গানটা সুপারহিট হয়ে গ্যালো । আরও ভালো ভালো যা হলো মার্চে , অটলবিহারী ভারতরত্ন পেলেন । ওনার পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দের কবিতাটুকু অবিশ্যি শোনা গেল না, মিডিয়া নাকি নরেন মোদী'র ফরেন ট্যুরের বাইট নিতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পরেছিল, ( আসলে ব্যাপারটা সময় সাপেক্ষ কিনা ! ) তাই অটলবাবু অতলেই রইলেন । ওদিকে বাড়ির কাছে আরশিনগর ,বাংলাদেশে আবার পরপর ব্লগার হত্যা । এবার ওয়াশিকুর রেহমান । মৌলবাদের কারবারীদের সাফ কথা ধর্ম, অধর্ম নিয়ে খোলা মনে আলোচনা করার আপনি কে বাপু ? ওসব তো কুরআন শরীফেই লেখা আছে । আপনি রনভির, দীপিকাকে নিয়ে ব্লগ লিখুন, গরম থেকে বাঁচতে গোলাপ জলের প্রয়োগ নিয়ে ব্লগ-বক করুন, কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ইমান ধরম নিয়ে কোনো কথা হবে নাকো ।
এপ্রিল ~
ও মাসটাও 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলেই' গেসলো যদ্দুর মনে পরছে । না, মানে এপ্রিল ফুলে ছাপ তো চুপচাপ অ্যাদ্দিন দিয়েই আসছিল জনতা । বোকা হওয়ার আর বাকি কি ? কিন্তু সরকার বাহাদুর যে এভাবে বোকা বানাবেন , সে কি আর জানতুম রে ভাই । বলে কিনা, এল.পি.জি'র সাবসিডি ছাড়ো । গরিব মানুষে গ্যাস পাবে । বলি, আমরা কি পেটে গামছা বেঁধে দিন কাটাব ? একে মা রাঁধে না ! তায় তপ্ত আর ... আর মাসে চাদ্দিন মাংস খাই বলে আমরা গরিব নয় কে বলেছে ? ওদিকে অমিতাভ বচ্চন, দিলীপ কুমার পদ্মবিভূষণ পেলেন , উফ, কি আনন্দ । আরও সঙ্গে সঙ্গে কারা কারাও পেলেন, তবে তাদের আর কে চেনে । অঙ্কের মাষ্টার মঞ্জুল ভার্গব , কম্পুটার বিজ্ঞানী বিজয় ভাত্কর আর স্পিরিচুয়াল গুরু স্বামী সত্যমিত্রানন্দ , আগা খান এরাও পদ্ম সম্মান পেলেন, কিন্তু আমরা বাপু ফিলিম এস্টার ছাড়া আর কাউকে চিনি না, এই বলে রাখলুম । শিবপ্রসাদ নন্দিতার নতুন ছবি বেলাশেষে রিলিস করলো এ মাসে সঙ্গে আবার সৃজিত মুখুজ্যের 'নির্বাক' ও । ওরে কাকা , সেকি নির্বাক চলচ্চিত্র মাইরি । কেউ কিসসু বুঝলো না, স-ও-ব মাথার ওপর দিয়ে ট্যান । তবে হ্যা, বেলাশেষে দেখিয়ে দিল বাঙালি সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে বেওসা করতে শিকে গ্যাছে বাংলা ছবি । এ ছবিতে নিভু নিভু শেষ বেলার দাম্পত্য একেবারে জোরদার । সেন বাবু, ঘোষ বাবুদের পছন্দের লিস্টে একেবারে গোড়ায় এ ছবি । বেলা তো শেষ হলো কিন্তু মাসের শেষের দিকে এমন যে একটি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে, সেরকম তো কতা ছিল না । কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটলো । নেপালে এমন মাটি কাঁপলো , সে কাঁপন একেবারে খোদ কলকাতায় বসে আমরা টের পেলুম । ভূমিকম্পে নেপাল তো হুরমুরিয়ে মাটি চাপা পড়লই, প্রকৃতির রোষ যে কি জিনিস, সে জিনিস হিল্লি দিল্লি টের পেলুম সক্কলে ।
মে ~
সে কি গরম বাপু ! কলকাতার শহরে বসে বেলুচিস্তানের মত ধু ধু, লু বইছে । গরম পিচের রাস্তায় যখন তখন জুতোর শুকতলা গলে আটকে যাচ্ছে, এমন আগুন হল্কা হাওয়ায় । সে প্রায় ৪০০ লোকের নিকেশ করলো তাপপ্রবাহ দেশ জুড়ে । আগুন জ্বললো বাংলাদেশে আবার । মোমবাতি জ্বললো আরেক ব্লগার হত্যায় । এবার মুক্ত মনের খেসারত দিলেন অনন্তবিজয় দাস । ইদিকে আগুন জ্বললো তামিলনাড়ু'তেও । জয়া আম্মা ধরা পড়লেন হিসেববিহীন সম্পত্তি রাখতে গিয়ে । বলি হতচ্ছাড়া, তোরা হিসেবের বুজিসটা কি ? হাতিশালে হাতি, আর ঘোড়া শালে ঘোড়া, এ হিসেব তো সেই রূপকথার আমল থেকে গপ্পে পড়ে এসেছি । জয়া আম্মা কি আর যে সে নেত্রী বাপু । তার হাজার হাজার শাড়ি থাকবে কয়েক'শো গাড়ি থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক । তার গয়নার হিসেব দেকলে , রামপ্রসাদেরও চোখ কপালে উঠবে , "এত গয়না ,বেটি কোথায় পেলি ?" অমন মুক্তোর মত রুপুলি পর্দার ঝকঝকে নায়িকা বলে কথা, প্রাক্তন বলে কি তার একটা 'ইয়ে' থাকবে না । বলি, সবাই কি আর তোদের পিসিমণি, যে হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে আর টালির চালের নীচে শুয়ে সস্তার সেন্টিমেন্ট-কুর্নিশ আদায় করবে দুবেলা ! বাঙালি হয়েচ মানেই ওই পটল ডাঙার ইউনিভার্সাল প্যালারাম । পেট ছাড়া আর পেটের রোগ ছাড়া তোদের আর আছেটাই বা কি ! দারোগা হওয়া তো হলনা কাজেই পেটরোগা হয়ে আর জেলুসিল খেয়ে 'ভাস্কর ব্যানার্জি' হয়েই দিন কাটাও ! এইতো, সদলবলে 'ওমিতাভ বচ্চনের' নতুন বাংলা 'বই' পিকু দেখতে গ্যালো বাঙালি, তা কি দেখলো ? সেই অম্বল আর কোষ্ঠকাঠিন্যের বাথরুম বৃত্তান্ত এবার সর্বভারতীয় মান্যতা পেল, এই আর কি। ওদিকে গোধরা কান্ডের গুজরাট কিন্তু থেমে নেই। এত্ত কান্ডের পরেও উন্নয়ন সেখানে অখন্ড । ইতিমধ্যে নরেন বাবু কিন্তু দারুন দারুন সব যোজনা, বিমা রিলিস কল্লেন ।প্রধান মন্ত্রী বিমা, জীবন জ্যোতি বিমা, অটল পেনশন যোজনা সে লিস্টি মস্তবড়, ইন্সুরেন্স তো হলো ভবিষ্যতের জন্যে, বলি এখন খাব কি ? এ তো দেখি, প্রধানমন্ত্রী মশায় প্রায় এল. আই. সি এজেন্টের মত পিছনে পড়ে গেলেন ? এটিই বোধহয় ' আচ্ছে দিনের ' , আচ্ছা প্রস্তাবনা ছিল ! বোঝো !
জুন ~
জুন মাসটা খবরের কাগজের লোকজনদের জন্যে মোটে ভালো নয়, এ জিনিস বুঝিয়েছে ২০১৫'র জুন । মম্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির জুর্ম এ সাংবাদিককে জ্যান্ত জ্বালানো হলো পুলিশের অনুপ্রেরনায় । লাখনাউ তে এ ঘটনা, একেবারে সাংঘাতিক ও সাংকেতিকও । মানে, অসহিষ্ণুতার আগুন যে কোথায় পৌঁছেছে দেশ জুড়ে , তার একটা সিগনাল দিল এই ঘটনা । মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জিলা থেকেও আরেক সাংবাদিককে অপহরণ করে খুন করা হলো, শাসকের বিরুদ্ধে মুখ খোলার অপরাধে । গণতন্ত্রের কতটা তেলে আর কতটা জলে, তা কে মাপবে ? আর সকলে জানে, তেল-জল মিশ খায় না । দুঃখের কথা, ওই সাহসী সাংবাদিক দুজন বোধহয় এটি জানতেন না । ওদিকে মনিপুরে মিলিট্যান্ট আক্রমনে গোলাগুলি চলল ব্যাপক । দু-ডজন মানুষ কমপক্ষে গত হলেন । অবিশ্যি , মনিপুর-টুর তো আবার ঠিক আমাদের অ্যাণ্টেনায় ধরা পরে না, সে'রম মেনস্ট্রিম নয় কিনা । আমরা বরং নরেন মোদী তেই ফিরে আসি । হ্যা, এইবার আমাদের 'ইয়োগা'র ' একটা হিল্লে হলো । প্রধানমন্ত্রী মশাই আমাদের 'ইয়োগা' কে পৃথিবী জুড়ে স্বীকৃতি দেওয়ার একটা বিধি ব্যবস্থা কল্লেন । বাবা রামদেব যতই এক চোখ বুজে ফোঁস ফোঁস করে পেট কুঁচকে আসন দেখান না কেন, ইন্টারনেশনাল বিশ্বসভায় 'বিশ্ব যোগ দিবস' তো আর তিনি করে ফেলতে পারলেন না , ওঁর দৌড় ওই রামলীলা ময়দান পর্যন্তই । কি বললেন ? 'যোগ' মানে 'যোগাসন' এর উপকারিতা আগেও জানতেন ? বলেন কি, মশয় ?
জুলাই ~
তব্বে ! খুব যে বলেছিলি আমরা ডিজিটাল হতে পারবনা , আজীবন অ্যানালগই থাকবো । দ্যাখ দিখি । মন্ত্রী মশাই এতদিনে ডিজিটাল ইন্ডিয়া'র উদ্বোধন কল্লেন । ফেসবুকে জনে জনে প্রোফাইল ছবিতে ডিজিটাল তেরং লাগালো। অবশ্য দমদম বস্তি'র লাগোয়া কলোনির লোকজন কিম্বা দুবরাজপুরের ওঁরাও পরিবারের অন্ত্যজদের তাতে বিশেষ কি সুবিধে হলো , সেটা ঠিক বুইতে পারিনি এখনো , তবে আশা আছে , নিশ্চই বুজে যাব খুব শিগগিরই । জুলাই মাস এমনিতেই শোকের মাস । বিশেষত বাঙালিদের কাছে, কারণ এ মাসেই উত্তম কুমার চলে গেছিলেন আমাদের মনের রুপালি পর্দা ছেড়ে । তার ওপর কালাম সাহেব ও চলে গ্যালেন এইবার । স্মরনকালের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি ও বৈজ্ঞানিক, লেখক, ও হেভিওয়েট ম্যানেজমেন্ট গুরু এপিজেকে ভালো বাসতেন না, এমন মানুষ কম । শিলং এ একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে রাখতেই নাটকীয় ভাবে শেষ হলো ওঁর জীবন । স্মরণে , বরণে কালাম থেকে যাবেন মানুষের মনে, শুধু মসনদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয় । শোকের অবিশ্যি তখনও বাকি ছিল । অন্ধ্র প্রদেশের রাজামুন্দ্রীতে তীর্থ করতে গিয়ে পায়ে চাপা পড়ে তীর্থযাত্রা সফল করলেন ২৯ জন পুন্যার্থী । ওঁদের স্বর্গপ্রাপ্তি হয়েছিল কিনা জানি না, তবে এ দেশের তীর্থস্থানগুলোতে এই ২০১৫ সালেও যদি এত অব্যবস্থা থাকে, তবে ডিজিটাল ইন্ডিয়া কার কি উপকার কল্লে, খোদায় জানেন । ওদিকে 'কোমেন' না কি সব ঝড় এসে তো উপকূলবর্তী বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে সে কি ঝড় দিলে । বৃষ্টিতে দেশকাল একেবারে ডুবুডুবু । তবে কিনা আয়লা বা ক্যাটরিনার মত যত গর্জালো, তত বর্ষায়নি কোমেন, এই যা রক্ষে । অল্পের ওপর দিয়ে বাঁচলুম আমরা ।
অগাস্ট -
আবার ব্লগার হত্যা !! বলি, এ কি চলছে ? তালিবানি নিধন যজ্ঞ ? এবার নিলয় চ্যাটার্জি ।ঢাকার বাড়িতে ঢুকে পিটিয়ে মারা হলো তাকে । সিনেমা হলে সিটি দিতে দিতে সদ্য মুক্তি পাওয়া ব্লকবাস্টার বাহুবলির শিব উপড়ে ফেলা দেখতে দেখতে সুচিন্তিত দু- চারটে সিটি দিতে তো কেউ ছাড়লে না, কিন্তু পড়শি দেশের বুক থেকে আতঙ্কের এই বাজার নিয়ে তো কেউ দু- চার শব্দ কয় না দেখি । এমন কি পড়শি কেন , এ দেশেই প্রখ্যাত কন্নর লেখক ডক্টর এম.এম.কালবুর্গি কে বাড়িতে ঢুকে বুলেট বিঁধিয়ে দিল অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা । মৌলবাদ তাহলে এ দেশেও ঘাঁটি গেড়েছে গোপনে গোপনে, শুধু রংএর কল্যানে আপনেরা 'জানতি পারেন নি' । সবুজ আতঙ্ক, আতঙ্ক আর গেরুয়া অত্যাচার , আতঙ্ক নয় ? সেক্ষেত্রে মোমবাতি মিছিলেই কাজ সারা ? অগাস্টে যখন এসে গিয়েছেন আরেক ভাইজান, যিনি কিনা বাজরাঙ্গি'র মতই বাহুর বলে বলীয়ান এবং যার সাদা মনেও এতটুকুন কাদা নেই, তিনি স্বনাম ধন্য সালমান খান । হাসতে হাসতে সাজা প্রাপ্ত কেসের আসামী সিনেমার দৌলতে ক্যামন 'হিউম্যান' হয়ে উঠলেন , বলুন দিকি । মাঝরাতে মদ্যপ হয়ে ফুটপাতে গরিব মানুষের বুকের ওপর গাড়ি চাপিয়ে দিলেই বা কি, এমন ব্লকবাস্টার তো তোরা রোজ রোজ দিতে পারিস না । কাজেই, গরিবের কিবা দিন, কিবা রাত , বেঁচে থাকুক ষ্টারডম । সত্যমেব জয়তে ( ইতি বি.আর.চোপড়ার টিভি সিরিয়ালে ) । দু দুটো সুপার হিটের বাজার সামলাতে সামলাতে চুপচাপ গুটি কয়েক ছবিঘরে মুক্তি পেল তসলিমা নাসরিনের জীবন আশ্রয় করে বানানো ছবি 'নির্বাসিত' । আমরা তো আমাদের শুভ বুদ্ধিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছি আগেই, তাই ও নিয়ে আমাদের বাপু বিশেষ মাথাব্যথা ছিলনা । ও বলতে ভুলে গেছি, চুলচেরা অপারেশনে দেশ থেকে জনা চার উগ্রপন্থী এই মাসে ধরা পরেছে পুলিসের জালে ।
সেপ্টেম্বর ~
দুগ্গাপুজোর বাজনা বেজে গ্যাছে । বাঙালির আর নিশ্বাস ফেলার জো নেই । তবে ভূ-ভারতের তো আরও অন্য কাজও আছে রে বাপু । এই যে রেল কতৃপক্ষ, গুগলের সাথে গাঁট ছড়া বেঁধে দেশ জুড়ে ৪০০ স্টেশনে ফ্রি'তে ওয়াই-ফাই দিলে সেপ্টেম্বরের গোড়ায়, সে কথাটা এবলা বলে দেওয়া যাক । স্মার্ট ফোনের দৌলতে সক্কলে পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে পাশাপাশি ফোনের বোতাম টিপে নেটে ঘেঁটে দেখছেন, শুধু কেউ কারোর সাথে কথা কইছেন না , এ দৃশ্য দেখার জন্যে আমাদের এমন অনেক বিপ্লব সহ্য করতে হবে ভদ্রমহদয় গণ । এই যে মানুষে মানুষে শুধু ফোন আর চ্যাটে কথা কয় , এ বড় সুসময় । আমরা প্রায় 'ষ্টার ওয়ারস' এর কাছাকাছি চলে এসেছি । যন্তর ছাড়া কথাবার্তা প্রায় বন্ধর দিকে । তবু হাজার হোক, বছরের ক্যালেন্ডারে এইটে একটা বড় সংযোজন । গুগলের মত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষ পদে বসলেন আমাদের 'সুন্দর পিচাই' । এর থেকে সুন্দর আর কিই বা হতে পারে । ভারতীয় হিসেবে আমাদের আজ আল্হাদে গদগদ অবস্থা , কিন্তু আদপেই এই সন্মান দেশের জন্যে কতটা উপকারী সেইটেই দেখার, দেখা যাক কোথাকার জল কদ্দুর গড়ায় ! ওহ বলতে ভুলে গিয়েছি, আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে এখন লন্ডনের বিগ বেন ঘড়ি বিশ্বে দুটি । একটি, ওই..মানে, লন্ডনেই আরেকটি হেঁ...হেঁ, খোদ কলকেতার বুকে লেক টাউনে । একদিন দেকেই আসুন না, কেমন ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজছে ঘন্টায় ঘন্টায় , আর আমরা আন্তর্জাতিক বাঙালি হচ্ছি । কানাঘুষো শুনলাম লন্ডন এর পরে এবার শহরটাকে প্যারিস বানাতেও মুখ্যমন্ত্রী কসুর করবেন না । এদিকে দেশ কতটা আন্তর্জাতিক হলো তার নিরিখে আরেকটি খবর না বললেই নয় । শুনে আপনি খুব আনন্দ পাবেন, নিয্যস বলছি, উত্তর প্রদেশের দাদরি'তে ফ্রিজে গোমাংস রাখার 'অপরাধে' ৫২ বছর বয়সী প্রৌড় মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে খুন করেছেন কে অথবা কারা । এ দেশে মানুষের চেয়ে এখন 'গরুর' দাম বেশি, জানেন তো ?
অক্টোবর ~
ঢাকের আওয়াজ বেজে গেলে বাঙালির আর মাথার ঠিক থাকে না , এই সাফ বলে দিলুম । পুজো নিয়ে আমরা হেব্বি বিজি এখন । দিদি ভুটান থেকে ফিরেই রাজ্যের সব ক্লাবকে লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে সার্বজনীন দুগ্যত্সবের পিদিম জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেছেন । নীল আর সাদা রঙ্গে প্রতিমা রং করতে পারলে আবার সে পুজোর সমস্ত খরচ ট্যাক্স ফ্রী । তবেই বুঝুন । আপনারা বাড়ি, গাড়ি , শাড়ি যা পাচ্ছেন এবলা নীল সাদা রং করে ফেলুন দিকি । দিদির পছন্দ তালিকায় আপনি থাকবেন সবার ওপরে । এবার কলকাতায় পুজো একটু টিমটিমে ঠিক ই , হাজার হোক সারদা কান্ডের পরে বাজেটের হেভি টান , পাবলিকের টাকায় মোচ্ছব না হলে , আর কিসের মজা রে ভাই ! চাঁদায় কি ওসব হয় ? এর মধ্যেই সৃজিতের হেবিওয়েট রাজকাহিনী রিলিস হলো পুজোর মুখে । সে, দেশ ভাগ আর মেয়ে মানুষ নিয়ে কিসব টানাহেঁচরা ছবি ভাই । ইতিহাস, টিতিহাস বুঝি না , মোদ্দা কথা, অনেকগুলো আদুর গায়ের মেয়ে দেখিয়েছে, এইটেই বড় প্রাপ্তি । দুঃখ একটাই দাদা, এ সমস্ত আমাদের সবার 'কাছের মানুষ, কাজের মানুষ ' মদনদা দেখে যেতে পারছেন না । ভদ্দরনোক'কে নাহক লাস্ট এক বছর ধরে ধরপাকর করে সি.বি.আই কি অত্যাচারটাই না চালাচ্ছে । একবার হাসপাতাল, একবার জেলখানা আর মাঝের সময়টুকু কোর্টের এজলাসেই ওঁর এ বছরটা গেল । 'চিরদিন, কাহার সমান নাহি যায় ', আহারে !
নভেম্বর ~
ওরেবব্বা , কি বৃষ্টিটাই না হলো চেন্নাইতে । যে দেশে গড় বৃষ্টিপাত সাধারণের নিচে, সেখানে উপর্যুপরি বৃষ্টিতে এক মাস ধরে চেন্নাই এর সে এক সাংঘাতিক বেহাল হলো । ২০১৫ সাল চেন্নাইবাসী মনে রাখবেন আজীবন । ঘর, বাড়ি, দোকানপাট, রেল লাইন, মায় বিমানবন্দর ডুবে গিয়ে সে এক কেঁচে গন্ডুষ অবস্থা । সেরে উঠতে চেন্নাই এর সময় লাগবে বেশ কিছুদিন । এর মধ্যে দেশ জুড়ে আবার নতুন কেলো, সব শিল্পী, সাহিত্যিক , বৈজ্ঞানিক সকলে মিলে গভীর ষর করে সরকার কে নাগাড়ে সব পুরস্কার ফেরত দিলে শুরু কল্লো । আমির খান তো আবার এক ধাপ এগিয়ে , বলে কিনা বউ বলছে, দেশ ছেড়ে চলে যাব, এত ভয় কচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি । বলি, এত যখন ইচ্ছে, যা না বাপু, পাকিস্তানে গিয়ে থাক । তোদের এ দেশে কে হিরো করেছে রে ? খাচ্ছিস, দাচ্চিস, হিরো হচ্ছিস , সে সব তো পাবলিকের পয়সায় তা আবার অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে 'পতিবাদ ' !!! যত্তসব ! কিসের অসহিষ্ণু রে ! রামরাজ্যে বসে গোমাংস খেয়েছে, পিটিয়ে মেরেছি, তার আবার অসহিষ্ণু কি ? যেখানে যেখানে হিন্দুত্বর খাতা থেকে ইদিক ওদিক বেচাল দেকবো, আমরা ছেড়ে কতা কইবো না । লোকের হেঁসেলে ঢুকব, বেডরুমে ঢুকব, বাথরুমে ঢুকব, সর্বত্র আমাদের লম্বা হাত । কাউকে ছেড়ে দেব না আমরা । সে তুমি যতই রঙের খোঁটা দাও, আমি শাহরুখ খানের মত দুদিকে হাত ছড়িয়ে বলবই বলব, 'মোহে রং দে তু গেরুয়া ' । গেরুয়ার এমনি প্রভাব , বাবা । অবিশ্যি দিদিমনি বলেছেন গুলাম আলী আর কোত্থাও না হোক, আমাদের শহরে গাইতেই পারেন । আমরা যাকে বলে, ইয়ে..মানে সেকুলার আর কি ।
ডিসেম্বর ~
এমাসটা টোটাল খিল্লির মাস । ঠান্ডা পরেছে জমিয়ে । নাহম'স এর কেক খান , এট্টু আধটু সন্ধ্যের পর চোখ লাল হোক । ভিড় বারুক ইকো, নিকো সব পার্কে। শাহরুখ, কাজল ২০ বছর পরে একসাথে ফিলিম করেছে 'দিলোয়ালে' ওদিকে আবার সঞ্জয়, লীলা দেখিয়েছেন বাজীরাও মস্তানি'তে কত বছর বাদে । কাকে ছেড়ে কাকে ধরি । দীপিকা, প্রিয়াঙ্কা, কাজল ঠান্ডায় সব গরম গরম গ্ল্যামার । এ মাসটায় শুরুর দিকেই ভারত পাক সম্পর্কে অমনি অনেক গরম গরম আতিথ্যের আঁচ পাওয়া গেল , কেউ বলছেন বরফ গলছে, কেউ বলছেন , রোসো বাপু , আগে দ্যাখো কদ্দুর কি হয় । মোদী সাহেব নওয়াজ কে দেখতে পেলেই জড়িয়ে ধরছেন, এমনকি নাতনির বিয়ে অব্দি খেয়ে এলেন ভরপেট আড্ডা মেরে । ওদিকে সুষমা স্বরাজও চোস্ত উর্দুতে কথা বলে নায়াজের মায়ের মন জিতে নিলেন, এ সব বড় আনন্দের কতা । শুধু কষ্ট হয় ওই বর্ডারে নিত্যি গোলাগুলিতে দুই দেশের যে নিরপরাধ প্রাণগুলি চলে যাচ্ছে, তাদের জন্যে । রাজায় রাজায় তো গলায় গলায় ভাব দেখছি, কিন্তু উলুখাগড়া ? ওদিকে সমকামিতা আইনে সংশোধন আনতে সুপারিশ দিয়েছেন শশী থারুর । তাই নিয়ে আবার কংগ্রেসের অন্দরমহলেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া । একে রামে রক্ষে নেই, তায় সুগ্রীব দোসর । তবে আজকাল আর কিছু থাকুক না থাকুক, স্মার্ট ও সময়োপযোগী হতে হলে, আপনাকে দুটি জিনিস করতে হবে, এক , সেলফি তুলতে হবে, ভেটকি মাছের মত ঠোঁট উল্টে আর দুই , সেম সেক্স এর একটি পার্টনার যোগার করে ফেসবুকে ছাপাতে হবে সেই যুগান্তকারী খপর । ব্যাস, আপনাকে আর পায় কে ? লাইকের বন্যা বইবে , সে আপনি সমকামী হোন ছাই নাই হোন, ট্রেন্ডি তো হলেন , নাকি !

No comments: