Wednesday, June 22, 2016

উড়ান বেলা

উড়ান বেলা
-------------
চিঠির প্রায় শেষের দিকে ছিল ওই কথাগুলো । যতবার পড়ছেন ততবার চোখটা জ্বালা করে আসছে সুকৃতির । নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে । চিঠিটা হৃদ লিখেছে টরন্টো থেকে । চিঠির প্রথমে আর পাঁচটা কুশল সংবাদ এর পর , খুব খানিকটা ইতস্তত করেই যেন বলল কথাগুলো । এর আগে যতবার প্রশ্ন করেছেন, খুব সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছে হৃদ ,এই ব্যাপারটা । প্রথম প্রথম সুকৃতি ভেবেছে এ আর পাঁচটা ছেলের মতই নিছক দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা । এই বয়েসে আর যাই হোক , হঠাত বিয়ের কথা বললেই ছেলেরা যেমন গুটিয়ে যায় আর কি । অমনিই মনে মনে ভেবে বসে, এই তো বেশ হাত পা ছড়িয়ে দিব্যি আছি , আবার ওসব বিয়ে টিয়ে করে হাজারটা ঝামেলা আগ বাড়িয়ে কেন ঘাড়ে নেওয়া বাপু ? তাই ব্যাপারটাকে প্রায় স্বাভাবিক ভাবেই খুব জোরাজুরির পর্যায় নিয়ে যেতে চান নি সুকৃতি । হাজার হোক, একটাই ছেলে । আজ নয় কাল, বিয়ে তো দিতে হবেই, যদ্দিন নিজের মত খেলছে ঘুরছে, থাকুক না , এই ভেবেই বেশ খানিকটা নিশ্চিন্তেই ছিলেন যেন । কিন্তু আজ এই চিঠিতে হৃদ এর লেখা শব্দ গুলো তাঁর বুকের যে ঠিক কোন জায়গায় বিন্ধছে, তা একমাত্র সুকৃতি ই জানেন । হৃদ লিখেছে , " মা , তোমায় অনেক দিন আগেই বলতে চেয়েছি, বাট আই কুড নট । অনেকবার ভেবেছি, তোমায় সবটা খুলে বলি, আর এই জন্যেই বলি, বিকস ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড টিল ডেট । তোমায় যদি সবটা না বলতে পারি, তবে কাকে আর বলব ! কিন্তু পারিনি । যে তুমি আমায় পৃথিবীতে আনলে, এতখানি বড় করলে , আমার সব ভালো খারাপ সব কিছু নিজের হাতে তৈরী করে দিলে , আই হ্যাভ বিকাম হয়াট আই এম টু ডে, জাস্ট বিকজ অফ ইউ মা । আর সেই তুমি এত বড় সত্যি টা জানো না । মা, আই এম আ গে , কি করে তোমায় বুঝিয়ে বলি । আমি আন্দ্রে কে ভালোবাসি । আন্দ্রে , আমার বন্ধু, রাশিয়ান , চমত্কার গিটার বাজায় আর খুব ভালো ছবি আঁকে । আন্দ্রে আর আমি কলিগ । আমরা একই ডিপার্টমেন্ট এ আছি । এখানে যবে থেকে আছি, ওর সাথে আলাপ । ওর বাবা মা ইউক্রেন এ থাকেন । উই ইভেন স্পোক টু দেম । ওরা এসেছিলেন ও টরন্টোতে, লাস্ট উইক এন্ড এ । আসলে এতদিন আমরা একসাথে আছি, একসাথে ঘোরা, বেড়ানো, ফিশিং আর প্রতি উইক এন্ড এ হইচই করে কখন যে এতগুলো দিন কেটে গেল বুঝতে পারিনি । বুঝলাম কিছুদিন আগে যে এই মুহুর্তে আমরা আর জাস্ট ফ্রেন্ডস নই, উই বিকেম বেস্ট অফ দি ফ্রেন্ডস , রাদার উই বিকেম...আ কাপল , বিলাভেড ।
মা, জানিনা তুমি কি ভাবে রিয়াক্ট করবে, কিন্তু বিশ্বাস করো, ইউ উড লাভ টু মিট হিম । খুব ভালো মানুষ ও । অগাস্ট এ কলকাতা আসছি , আন্দ্রে ও আসছে । মাসিমনি কে সব বলেছি, তিতাস ও জানে । ইভেন দে আর ভেরি এক্সাইটেড টু মিট আন্দ্রে ...." ।
চিঠিটা প্রায় বার পাঁচেক পড়ে বেশ খানিকটা হাপুস চোখে কেঁদে থমথমে মুখ নিয়ে জানলার কাছে বসলেন সুকৃতি । জানলা দিয়ে যতদুর চোখ যায় পাশের গেরুদের বাড়ির টানা বারান্দা । ঝুল্কালিমাখা ভাঙ্গা চেয়ার টেবিল এর ওপরে ঝোলানো টিয়াপাখির খাঁচা টায় রুগ্ন পাখিটা চুপ করে দুলছে । পাখিটা অসুস্থ অনেকদিন ধরে , কিন্তু মরে নি , এই যা । ওর পাখার জৌলুস আর নেই, রং নেই, আওয়াজ ও নেই আগের মত, ডানার ঝটপটানিও বন্ধ , ও শুধু টিকে আছে । সকাল বিকেল ছোলা খুঁটে খুঁটে খায় খানিক আর চুপচাপ ঘাড় বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে দেখে চতুর্দিক..। সুকৃতির হঠাত নিজেকে ওই পাখিটার মত মনে হলো । খাঁচায় বন্দী একটা জীবন , একটা কি প্রচন্ড রকম একা একা বাঁচা । সেই কবে থেকে এ বাড়ির দেখভাল করছেন তিনি । সেই ১৬ বছরে এ বাড়ির বউ হয়ে আসা । শ্যামলেন্দুর তখন সবে বাইশ । ভবানীপুরের গোলক ধাম , এ অঞ্চলের অনেক পুরনো বাড়ি। সেন বাড়ি বলেই চেনে সকলে । হাজারিবাগ থেকে কলকাতায় এসে , ছোট পরিবারের একমাত্র সুন্দরী , শিক্ষিতা কন্যার সম্বন্ধ ঠিক হয়ে যাওয়ায় সুকৃতির বাবা মনে মনে ভারী নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন । একে তো , শ্যমলেন্দু পাত্র হিসেবে হীরের টুকরো । বি.এ  পরীক্ষায় পাশ করে সবে জাহাজ কোম্পানি তে ঢুকেছেন মাঝারি মাপের অফিসার হয়ে । তারপর দেখতে শুনতেও ভারী ভদ্র, সভ্য ,অমায়িক ব্যবহার । আসলে সেন বাড়ির হাওয়ায় যেন কি একটা ঠিক ছিল, যা সেকেলে আর পাঁচটা পরিবারের চাইতে বরাবর ই অন্যরকম । খোলামেলা, উদার, ঠিক প্রথাগত রক্ষনশীলতা নয়, বরং প্রথা ভেঙ্গে নতুনের পূজা তেই তাঁদের আগ্রহ ভারী । বিয়ের পর পরেই এ বাড়িতে এসে প্রথম প্রথম বালিকাসুলভ আরষ্টতায় নিয়েজেক গুটিয়ে রাখলেও, সে আড় ভাঙ্গতে দেরী হয়নি সুকৃতির । একটা বিশাল উঠোন আর উঠোন ঘিরে সেই বাড়ির হাজারটা লোকের হাজার রকম কার্যকলাপ তার ভারী ভালো লেগেছিল । একতলার রাঁধুদা , মনসার মা , অরুনা ,বরুনা দুই বোন আর দরওয়ান পাঁড়ে । উপরের তলায় থাকতেন রাঙাদিদী আর ছোট তরফের দুই ভাই ও তাদের বউ । রান্গাদিদির ছেলে কমল ছিল প্রায় সুকৃতির পিঠোপিঠি । ভারী ডানপিটে । আর দু তলার ছাদের পার্টিশন টা পেরলেই, বড় তরফের দিকে থাকতেন সুকৃতির শ্বশুর মশাই ,  বড় জেঠু ও জ্যাঠায়মা আর শ্যামলেন্দু ও সে নিজে । ছোট পরিবার থেকে এত বড় বাড়িতে আসার কারণেই হোক অথবা এই খোলামেলা , আনন্দঘন পরিবেশ এর জন্যেই হোক, সেন বাড়িকে ভালবাসতে এতটুকু সময় লাগেনি সুকৃতির ।
~
তখনও হৃদ পেটে আসেনি । সদ্য কিশোরী সুকৃতি শাড়িটাকে গোড়ালির ওপর তুলে , গাছকোমর করে বেঁধে , নিচের কলঘরের পাশের ঢাকা উঠোন টায় গোল্লাছুট খেলতেন অরুনা, বরুণার সাথে ।আর বেলা বাড়লেই শ্বসুর মশাই হাঁক পারতেন ওপরের বারান্দা থেকে....বৌমা , কই গেলি রে ? আয়ে, এই বুড়োটাকে খেতে টেতে দিবি তো নাকি ? আর অমনি এক ছুট্টে তেতলার ঘরে দুদ্দার  দৌড় লাগাতেন সুকৃতি । কক্ষনো মনে হয়নি কোনদিন, যে এই বাড়িটা তার নিজের নয় । শাশুড়ি মা গত হয়েছিলেন আরো আগে, তখন শ্যামলেন্দু ছোট । তাই একটি বালিকা বধুর ভারী শখ ছিল শ্বসুর মশাই এর, বলা বাহুল্য সুকৃতি অচিরেই তাঁর চোখের মনি হয়ে উঠেছিল । মাতৃহীন সংসারে এই মেয়েটি যেন কি অবলীলায় তার আদর, যত্ন, ভালবাসা , স্নেহ, অভিমান,  দিয়ে তাঁদের বাপ ছেলের জীবনটাকে স্বর্ণময় করে তুলেছিল সে । এখন কেমন যেন সে সব কথা সিনেমার মত মনে পড়ে যায় । চিন্তার জালটা হঠাত ছিঁড়ে এলো । নিচের উঠোনে ধুনুরি তোষক বানাচ্ছে, তারই একটা অদ্ভূত টানা টানা কর্কশ আওয়াজ হচ্ছে  ,সেইটাই নাকি দরজার আওয়াজ ? চটকা ভাঙতেই সুকৃতির মনে হলো কে যেন অনেকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে । খানিকটা থেমে নিশ্চিত হলেন আওয়াজ টা দরজার'ই ।
বাইরে থেকে দরজার ঠকঠকানি'টা এতক্ষণে প্রবল হলো,, তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি , কি মনে হতে পিছন ফিরে হৃদ এর চিঠিটাকে বালিশের নিচে রেখে , গিয়ে দরজা খুললেন । তিতাস এসেছে লেক টাউন থেকে , তিতাস সুকৃতির বোন রেখার একমাত্র কন্যে । যেমন সুন্দরী, তেমনি আদরের । পড়াশোনায় যেমন ডাকসাইটে তেমনি গানের গলা । বয়ফ্রেন্ড থেকে সবরকম গোপন কথা , মাসি কে সব মনের কথা বলা চাই তার । হৃদ যবে থেকে বিদেশ গেছে , তিতাস তাঁর মনের অনেকখানি জুড়ে আছে । ঘরে ঢুকেই তিতাস প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো, 'ব্যাপারটা কি তোমার বলতো ? সেই কখন থেকে ডাকছি, তোমার কোনো পাত্তাই নেই ! করছিলেটা কি ? আমি তো ভাবছি শরীর টরির খারাপ হলো না কি । উফফ। ' সুকৃতির থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে তিতাস কতকটা আন্দাজ করতে পারল ওঁর মনের অবস্থা। .." কি হয়েছে ? দাদার চিঠি পেয়েছ ?" ভাবলেশহীন মুখে খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে খাটের ওপর বসেই পড়লেন সুকৃতি । হঠাত করে তিতাসের মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেললেন ঝরঝর করে । " ওকি , মাসি ?কাঁদছ কেন ? আরে কাঁদার মত হয়েছেটা কি ? দাদাভাই ফোন করেছিল । আর তোমার কান্নার কারণ টাও বুঝতে পারছি । কিন্তু বিশ্বাস কর , এতে কান্নার কিচ্ছু নেই । " বেশ খানিকটা গলা জড়িয়ে , অনেকটা বুঝিয়ে তিতাসে শান্ত করার চেষ্টা করলো তাকে । "দেখো , প্রতিটা মানুষের গরন’টা আলাদা ।বেড়ে ওঠাটা একেক জনের একেক রকম , তাই সকলের চিন্তা ভাবনা, জীবনের প্রেফারেন্স, পছন্দ এগুলো ও তো আলাদা আলাদা , তাই না ? তুমি দাদাভাই কে যেমন ভেবে রেখেছ, দাদাভাই যে ঠিক তেমন টাই হবে, তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে, বোলো ! দাদাভাই একটা আলাদা মানুষ মাসিমনি, তুমি জন্ম দিয়েছ, বড় করেছ ঠিকই , কিন্তু তাবলে যে মানুষটা দাদাভাই এর ভিতরে আছে, তাকে তো রাতারাতি সে পাল্টে ফেলতে পারে না , বোলো । পারে  ? হ্যান, দাদাভাই, এমন একজন কে ভালোবেসেছে, যে পুরুষ । সেটা তুমি মানতে পারছ না , কারণ সেটা তোমার দেখাশোনা , চেনা পৃথিবীর সাথে মিলছে না , তাই পারছ না । কিন্তু তোমার চেনা পৃথিবীর বাইরেও তো পৃথিবী আছে , আর দাদাভাই যে দেশে , যে পরিবেশে আছে,সেখানে সেটা আর পাঁচটা ঘটনার মতই স্বাভাবিক মাসিমনি । "
অনেকক্ষণ গোঁজ হয়ে এসব শুনলেন সুকৃতি । তিতাস যাই বলুক ,এই ধরনের ঘটনা আর যার বাড়িতে হোক না কেন, তাঁর জীবনে কেন ঘটবে ? এর কোনো ব্যাখ্যা কি তিনি নিজেকে দিতে পারেবন ? এই সেন বাড়ির একটা সামাজিক প্রেস্টিজ আছে, ঐতিহ্য আছে , পাড়ার লোকে, আত্মীয় স্বজন জানতে পারলে কি হবে ? ...ছি ছি..ছি আর ভাবতে পারছেন না সুকৃতি । অনেক আশা করে বসে ছিলেন ছেলে ঘরে ফিরলে একটা সুন্দর মেয়ে দেখে বিয়ে দেবেন, এ বাড়িতে তো নহবত বসেনি অনেকদিন । সেই স্বপ্ন কি তবে ছারখার হয়ে গেল ? তিতাসের গলা শুনে এতক্ষণে বেলা বেরিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে । তেল হলুদ লাগা হাত টা আঁচলে মুছতে মুছতে দরজার সামনে খানিক দাঁড়ালো । সকাল থেকে সেও আন্দাজ করেছে যে বৌদিদির কিছু একটা হয়েছে । তিতাসকে দেখে হালকা অনুযোগের সুরে বললে, " সেই যে সকাল থেকে দোর দিয়েচে, আর খোলার নামটি নেইকো । কত করে বললাম কিচু খেয়ে নাও, তা কে শোনে কার কতা , তুমি'ই একটু বুঝিয়ে যাও দিদি । ওই তোমার কতাই যা শোনে ।এবার ভাই এলে ভাই কেও বলব, সঙ্গে করে নে যাবে । একেবারে বে করে , মা কে নিয়ে ওদেশ টা ঘুইরে আনবে একন ।" খানিকটা রাগের সুরে প্রায় ধমকে ওঠেন সুকৃতি । "তুই যা বেলা, নিজের কাজ কর । আমার মাথা খাসনা । ছাদের কাপড়গুলো তোল, বৃষ্টি আসছে । "

~

বাইরে টা বেশ অন্ধকার করে এসেছে । এক্ষুনি আবার ঢালবে মনে হচ্ছে । বৃষ্টি নামবে চারদিক অন্ধকার করে । তিতার আর অপেক্ষা করলো না , সন্ধ্যেবেলায় ওদের গানের স্কুলের অনুষ্ঠানে আছে , মাসিমনিকে যাওয়ার জন্য পইপই করে বলে গেল, গাড়িও পাঠাবে চারটেয় । তিতাস চলে যাওয়ার পর সুকৃতি চুলটা বেঁধে সিঁড়ির ঘর দিয়ে নামতে লাগলেন । গোটা বাড়িতে এখন শুধু ছায়া ছায়া অন্ধকার শ্রাবনের আকাশের মত থম মেরে রয়েছে । এ বাড়িটা এখন বড্ড খালি খালি লাগে ।  দোতলার শ্বশুর মশাই এর ঘরটাও বন্ধই থাকে প্রায় ।রোজ  সকালে যা একটু ধোয়া মোছা ।থাকার মধ্যে তো শুধু রাঙাদিদী , তাও শয্যাশায়ী । রাঙাদিদী আসলেতে সুকৃতির ননদিনী হলেও , বয়েসের তফাত অনেকখানি ।অল্প বয়েসে বিধবা হয়ে একমাত্র ছেলে কে নিয়ে এ বাড়িতে চলে এসেছিলেন , তার পর থেকে এখানেই । কমল ও থাকলো না, বম্বে চলে গেল বিয়ে করে। কিছুদিন আগে অবধিও এই মানুষটি খল নুড়ি নিয়ে ওপরের বারান্দায় বসে সৈন্ধব লবন গুর্ড়ো করতেন , কাকভোরে স্নান সেরে আতপ চালের ভাত বসাতেন তোলা উনুনে আর সারা বাড়ি জুড়ে ম ম করত সেই গন্ধ । হৃদ যখন ছোট হৃদকে কোলে নিয়ে সে কত গল্প তাঁর । শ্যামলেন্দু ও অফিস থেকে ফিরেই দিদির ঘরে গিয়ে বসতেন রোজ । কাঁসার গেলাসে জল আর কাঁচের বয়ামে রাখা গুড়ের বাতাসা নিত্যি মজুত থাকত রাঙাদিদির ঘরে । সুকৃতি যখন এ বাড়িতে আসে, তখন মাতৃস্থানিয়া বলতে এই একটি মানুষ'ই ছিলেন  আর ছিলেন জ্যাঠায়মা । রোজ দুপুরে তিনজনে অপরের লাল মেঝে তে টানটান করে শুয়ে সে কত গল্প । সে সব চলে গেল । কিচ্ছু রইলো না । জেঠিমা চলে গেলেন সবার আগে , জেঠু কিছুদিন পরেই । হৃদ তখন সদ্য হয়েছে ।
রাঙ্গাদিদির ঘরের সামনে এসে একটু থমকে দাঁড়ালেন সুকৃতি । দরজা টা খোলাই ছিল । ঢুকতেই নার্স মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে হাসলো একটু । "এখন, কেমন আছেন ?" "ওই, আগের মতই , আপনাকে বোধহয় খুঁজছিলেন " , রাঙাদিদী বিছানায় শুয়ে , সাদা ধবধবে চাদরে ঢাকা দেহ । গলাটুকু বেরিয়ে আছে । দেখলেই বুকের ভিতরটা কিরকম  ছ্যাঁত করে ওঠে যেন । "চাদরটা বদলে দিও  , ছাপা চাদর আছে তো ওপরে , বেলা কে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি " বললেন সুকৃতি । তাঁর গলার আওয়াজেই বোধহয় চোখ খুললেন বৃদ্ধা । শীর্ণ হাত টা আস্তে আস্তে চাদরের নিচ থেকে বেরিয়ে এলো, সুকৃতির  হাতের ওপর  হাত রেখে , আঙ্গুল গুলো বোলালেন একবার । কিছু একটা যেন বলতে চাইলেন । " কিছু বলবে ? কমল এর কথা ? " বৃদ্ধা ঘাড় নাড়লেন দুপাশে, সুকৃতি বুঝলেন উনি হৃদ এর কথা জানতে চাইছেন । " হ্যা , চিঠি এসেছে , আসবে এই মাসের শেষে । আর কথা বোলো না রাঙাদি, একটু ঘুমাও । কেমন !" বৃদ্ধার ঘোলাটে চোখে আর দন্তহীন মুখে একটা অদ্ভূত হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল ।সুকৃতি জানেন, ভাইপো বউ দেখার তাঁর ও কত শখ । আগে তো প্রায়ই বলতেন, হৃদ এর বউ এলে তাকে এই দেব, সেই দেব ,আসলে কোথাও জানি, কমল এর চলে যাওয়াটা রাঙাদি একেবারেই মেনে নিতে পারেন নি ।
রাঙাদির ঘর থেকে বেরিয়েই চোখে পড়ল পশ্চিমের ঢাকা উঠোনটায় রফিক তোষক বানাচ্ছে । গোটা উঠোন মিহি তুলোয় ভরে আছে, যেন শীতের ডালহাউসি পাহাড় ।  রফিক এ বাড়ির লেপ তোষক বালিশ বানায় আজ বহুদিন । আগে ওর বাবা আসতেন । সুকৃতি কে দেখে রফিক উঠে দাঁড়ালো। এক গাল হেসে বলে, ' খোকাবাবুর বিয়ে দিচ্ছেন তাহলে ! আল্লাহ রাসুল সব ভালো করবেন দিদি । বহুত আচ্ছা বহুরানী হবে আপনি কিছু ভাববেন না, আমি সব বানিয়ে দেব । আগলে মহিনায় আমার ও লেরকার সাদী হবে দিদি । আল্লাহ সব ভালো করবেন । ' .....ঠিক এই কথাগুলোর জন্যেই প্রস্তুত ছিল না সুকৃতি , এই মানুষগুলোর মতন আরো হাজারটা মানুষ যে একই কথা বলবে তাকে । আরো কত সহস্র বার এই সব শুনতে হবে তাকে ।কাকে কাকে কৈফিয়ত দেবেন তিনি ? হৃদ তো বলেই খালাস । কি করে সবদিক সামলাবেন সুকৃতি । এই বয়েসে এসে এইসব....হঠাথ করে শ্যামলেন্দুর ওপর ভয়ানক রাগ হলো তার । সে থাকলে তো আর...এমনটা হত না । সুকৃতি তো অনেক চেষ্টা করে, অনেকখানি আগলে মানুষ করেছেন হৃদ কে , বাবা না থাকার অভাব কি এতটুকু বুঝতে দিয়েছেন ? হৃদ তখন ভালো করে বাবাকে জানতেই পারল না, যখন তিনি চলে গেলেন ।  তার পর থেকেই তো একা, একেবারে একা ঐটুকু ছেলেকে বুক দিয়ে তিলে তিলে বড় করলেন সুকৃতি । এই পরিনামের জন্যেই কি ?
~

দুপুরবেলায় খাওয়া দাওয়া মিটল নিঃশব্দেই । হৃদ একবার ফোন করলো মোবাইলে । শুধু হু হ্যা করে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন তিনি । গলা দিয়ে আজ আর কিছু নামছে না,  কি বলবেন তিনি ছেলে কে ? ও যে অসুস্থ একটা ধারনায় পড়েছে , তা যদি তিনি আগে বুঝতেন, হয়ত কিছু একটা ব্যবস্থা হতে পারত ! খেয়ে উঠে চিলেকোঠার ঘরে গেলেন সুকৃতি । এ ঘরটা অব্যবহৃতই থাকে আজকাল । বিরাট ছাদের একপাশে একলা একটা ঘর জুড়ে পরে থাকে স্মৃতি আর সময়ের অবশিষ্ট কঙ্কাল । এ ঘরে থাকার বলতে একটা পুরনো তক্তাপোষ , ভাঙ্গাচোরা বাতিল আসবাব কিছু আর পুরনো একটা দেরাজ । এই দেরাজ এ হৃদ এর ছোটবেলা থেকে ব্যবহার করা জামাকাপড়, খেলনাপাতি , ওর আঁকার খাতা ,বইপত্তর সবকিছু জমিয়ে রেখে দিয়েছেন সুকৃতি । ও হয়ত অনেকদুরে আজ, কিন্ম্তু এ ঘরে এলে, ওর জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করলেও কোথায় জানি ওই ছোটবেলাটাকে খুঁজে পাওয়া যায় । প্রায়ই মন খারাপ হলে এই ঘরে আসেন সুকৃতি । আজকেও এই মেঘলা দুপুরে আরেকবার তাঁর ইচ্ছে হলো এইগুলো দেখার, ঠিক কোথায় ভুল হয়েছিল তাঁর হৃদকে বড় করতে , ঠিক কোন সময়ে হৃদ বদলে গেল তাঁর চোখের সামনে দিয়ে, অথচ তিনি বুঝতেও পারলেন না  , একটা স্বাভাবিক পুরুষ আর তার স্বাভাবিক চাহিদা কেনই বা এরকম ভাবে....দেরাজ খুলতে গিয়েই চোখ পড়ল ঘরের দেওয়াল জুড়ে আঁকা মোম রঙ্গে হিজিবিজি ছবি, হৃদ এর আঁকা । স্যাঁতস্যাঁতে  দেওয়াল এ সময়ের সাক্ষ্য রয়ে গেছে এখনো কেমন । হৃদ এর আঁকিবুকির পাশে পাশেই একটা করে বড়দেরও হাতের আঁকা ছবি , সেটা যদিও সুকৃতির নয়, শ্যামলেন্দুর ও নয়, সেইটা এমন একজনের আঁকা, যে মানুষটা এই বাড়ির নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে জড়িয়ে ছিলেন একটা সময় । সুকৃতির সুদিন গুলো কেমন মুগ্ধ হয়ে ছিল, আজও কেমন নতজানু হয়ে রয়েছে এই মানুষটার অস্তিত্বের কাছে । নিপুদা ।
আই.সি.সি.আর থেকে বেরোতে বেরোতে ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাড়ে আট'টা ছুঁই ছুঁই । রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানের ওপর চমত্কার অনুষ্ঠান করলো তিতাসেরা । রেখা ও সুকৃতি বাইরে বেরিয়ে এসে তিতাসের জন্য অপেক্ষা করছিল । তিতাসের সাথে এলো ওর এক সহপাঠিও । ছেলেটির চমত্কার গানের গলা । যেমন সুন্দর উচ্চারণ , তেমনই গায়কী । দেখতেও বেশ । আলাপ করিয়ে দিতেই ছেলেটি মাথা নিচু করে প্রনাম করলো সুকৃতি ও রেখা কে । সুকৃতি লক্ষ্য করছিল ছেলেটির মধ্যে কোথায় জানি একটা লাবন্য লুকিয়ে আছে, যা ঠিক পুরুষোচিত নয় । মানে এমনি সব ই ঠিকঠাক, ততাসের সাথে কথা বলছে, খুব হাসাহাসি হচ্ছে ,কিন্তু  ওর কথা বলা, হেসে ফেলার সবকিছুর মধ্যেই হঠাত হঠাত যেন একটি সমবয়সী মেয়ে উকি দিয়ে যাচ্ছে, লক্ষ্য করলেন সুকৃতি  । মানে, একটা অদ্ভূত কমনীয়তা , একটা মোলায়েম রমনীয়তা যেও লুকিয়ে ওর মধ্যে । অকারণেই যেন একটা চিন্তার কালো মেঘ উঁকি দিয়ে গেল সুকৃতির মধ্যে, তবে কি , এও ....? হৃদ তো কখনো এরকম ছিল না , সে তো বেশ ডাকাবুকো দুরন্ত ছোট থেকেই । তবে কি , পুরুষের মধ্যেও প্রকৃতি থাকে ? ..হয়ত সোচ্চারে নয়, হয়ত অনুচ্চারিত ,কিন্তু থাকে বোধহয় । এঁরাই কি সমকামী ...নাকি ? তিতাস কে পরে জিগ্গেস করতে হবে ব্যাপারটা । রেখা ব্যাপারটা লক্ষ্য করেই গাড়িতে উঠে পরে  তাঁকে নিভৃতে  বলল, "তুইহৃদ এর ব্যাপার টাকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন বড়দি ? আমার কলেজে তো নিত্য এমন দেখি । এই তো তিতাস এরই এক বান্ধবী দীপান্বিতা , সেদিন একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষিপুজোর দিন বাড়িতে এলো , দিব্যি খাওয়া দাওয়া করে, হইচই করে যাবার সময় আমায় কানে কানে বলে কিনা, কাকিমা, ও হলো রাই ,আমার দোসর । বোঝো। ওরা নাকি পরস্পর কে ভালবাসে ।  মোদ্দা কথা কি জানিস, দিনকাল বদলেছে রে । একটা মানুষের আরেকটা মানুষ কে ভালবাসার কোনো প্যারামিটার হয়না রে । পুরুষ মানেই তার যে শুধূ এক নারীর সাথেই ভালবাসাবাসী হতে হবে, এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই রে । ওরা তো আসছেই, তুই নিজেই দেখনা , ছেলেটি কেমন ? হৃদ ভালো থাকলে , তোর আর কি চাই বলতো বড়দি ? " গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল ক্যামাক স্ট্রিট এর মুখেই । প্রবল ট্রাফিক জ্যাম । এত বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু ভেপসা গরম টা যদি একটু কমে ! গাড়ির কাঁচ টা নামিয়ে দিয়ে রেখা হঠাত জিগ্গেস করলো , "তোর নিপুদা কে মনে পড়ে ?"
বাড়ি ফেরা ইস্তক নিপুদার স্মৃতিতেই বুঁদ হয়েছিল সুকৃতি । আসলে নিপুদার কথা কেমন করে যেন সময় আবছা করে দিয়ে গেছিল , অনেকদিনের ঝরে পরা বৃষ্টির জলে যেমন ছাদের ঘরের আসবাব গুলো রং হারিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে , তেমনি স্মৃতিও বোধহয় জল ধোয়া ছবির মত, সময়ের স্রোতে স্রোতে ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু মুছে যায় না । যে মানুষটা একদিন এতখানি জীবন্ত ছিল যে , নিপুদা ছাড়া এ বাড়িতে একটি দিন ও কাটত না , সেই মানুষটা কবে জানি সময়ের সাথে সাথে অস্পষ্ট হতে হতে যেন বা অভিমান করেই মুখ ফিরিয়ে ছিলেন এতদিন । আসলে রেখার কথায়, কোথাও যেন একটা ইশারা ছিল , নিপুদা কে আবার করে মনে করানোর একটা তাগিদ ছিল বোধহয় ।

~
নিপুদা মানে, নিরুপম মুখোপাধ্যায় । খুব ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান । উত্তর কলকাতার বনেদী বাড়ির ছেলে নিপুদা,  যেমন রুপবান , তেমনি মনে রাখার মত মানুষ । সুকৃতির বিয়ের সময় যদিও তিনি ছিলেন না, বিয়ের পর পর এক রোববার সকালবেলায় অতর্কিতে হানা দিলেন হঠাত । প্রায় ৬ ফুট লম্বা, দীর্ঘকায়, সবুজ খদ্দরের জামা আর পাজামা পরা মানুষটির দিকে তাকালে ,প্রথম যা চোখে পড়ত, তা তার দারুন আকর্ষনীয় উজ্জ্বল দুটি চোখ । মোটা চশমার ফ্রেমের আড়ালে অমন ঝকঝকে ,স্বপ্নালু চোখ দুটো দেখে সুকৃতির কেমন মনে হয়েছিল, ওই চোখ যেন শুধু সামনের মানুষটিকেই দেখছে না, ওই চোখ যেন এ বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে, আশেপাশের সমস্ত পাড়া ছাড়িয়ে,২৪ নং ভবানী সেন লেন  এর মোড়ের মাথায় ওই অত্ত লম্বা কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে ছাড়িয়ে ,  যেন আকাশের মত ছড়িয়ে আছে প্রসন্ন দৃষ্টিতে । নিপুদা সত্যি অনেকদুর অবধি দেখতে পেত , মন টাও ছিল বিরাট, আকাশের মত । প্রথম দিন এসেই সুকৃতি কে পাকড়াও করে বলেছিল, তোর বর আমার প্রায় আদ্দেকটা । তাই বরকে যেমন যেমন যত্ন আত্তি করবি, আমাকেও দেখা চাই কিন্তু । নইলে..ইত্যাদি..ইত্যাদি । গলায় গলায় ভাব ছিল শ্যামলেন্দুর সাথে । একসাথে ফুটবল খেলা, সিনেমা দেখা, রক্তদান শিবির আয়োজন করা, কত কি ! খুব ছোট ছোট সমস্যাও নিপুদার নজর এড়াত না ! এই রাধুদার ছেলের অসুখ , এই অরুনাকে সাপে কাটল, পাড়ার কোন বাড়িতে কে ঘুড়ি পারতে গিয়ে ছাদ থেকে পরে গুরুতর জখম, নিপুদা সব জায়গার মুশকিল আসান । একটা দরাজ হৃদয় আর সদিচ্ছা নিয়ে মানুষের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে নিপুদার জুড়ি মেলা ভার ছিল ।
কত যে মজার মজার স্মৃতি আছে নিপুদা কে নিয়ে । এই হয়ত হুটপাট করে দুপুরবেলায় এসে হাজির, হাতে পূর্ণ সিনেমার ৬ টা টিকিট । খাওয়া দাওয়াই হয়নি কারো, বাড়িশুদ্ধ লোকের । তা কে শোনে কার কথা, সব্বাইকে ট্যাঁক এ গুজে নিপুদা চলল সিনেমায়, কি না "উত্তর ফাল্গুনী" দেখবে , ফার্স্ট ডে, ফার্স্ট শো । হুজুগে বলতে যা বোঝায় , তা ছিল নিপুদা । প্রতিদিন বলত, বাঁচবি তো এক্ষুনি বাঁচ দেখি, কালকের জন্য কি ফেলে রেখেছিস ! আবার একদিন, খুব বৃষ্টি সেবার । জলে ভেসে গেছে তাদের ভবানী সেন লেন এর গোটা পাড়া । আসার পথে এক বিরাট শোল মাছ ধরে গামছায় বেঁধে নিপুদা হাজির । কি না, মাছটা নাকি রাস্তায় খাবি খাচ্ছিল, কড়ায় ফেলে তবে তার মুক্তি ঘটাতে হবে । এসেই হুকুম, "বৌঠান , রান্না কর এক্ষুনি , দ্যাক কেমন মাছ ধরেছি খালি হাতে. তোর্ বর পারবে ?" বৌঠান ও বলবে আবার 'তুই' ও, এইরকম ভাবেই এই বাড়িটাতে প্রানের বাতাস বইত ,নিপুদার উপস্থিতিতে । প্রথম প্রথম সুকৃতির রাগও হয়েছে কতবার , শ্যামলেন্দু হয়ত ছুটির দিনে নিপুদার সাথেই তাস খেলছে সারা দুপুর অথবা নাটকের মহলা চলছে পাড়ার ছেলেদের নিয়ে তেতলার ছাদে ,সবজায়গায় শুধু তিনি  । সে তখন সদ্য বিবাহিতা, কোথায় তাঁকে সময় দেবে শ্যামলেন্দু , তা নয় । কিছুদিন যাওয়ার পর সুকৃতি বুঝতে শুরু করেছিল, যে এই একটি মানুষের মধ্যে এমন একটা চুম্বক আছে, এমন একটা অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ, যেটা অবহেলা করা খুব মুশকিল । সেকালে বলেই হয়ত দুটি পুরুষের বন্ধুত্বের নধ্যে কোনো অন্যরকম অর্থ খুঁজত না কেউ , একালে এসে যেটা অন্যতর একটা চেহারা পেয়েছে । কিন্তু ,একটা প্রানবন্ত , আলোকময় মন এর দিশা যে মানুষ একবার পায়, সে কি কখনো ফিরে যেতে চায় ? ভালবাসার  কি একাল সেকাল হয় ? আসলে মানুষকে ভালবাসতে পারত নিপুদা, কোনো শর্ত ছাড়াই সকলের জন্য । সেই জন্যেই, ওই অত অর্থ, প্রতিপত্তি, ব্যবসা, সব ছেড়ে ভারত সেবাশ্রমে চলে গেল যেদিন, একটিবারের জন্য ও পিছন ফিরে তাকাননি মানুষটি ।
শ্যামলেন্দু চলে গেল যখন , তখন হৃদ এর বয়েস পাঁচ । হার্টের অসুখে এভাবে একটা মানুষ দুম করে চলে যাবে, এ তো ভাবণারও অতীত ছিল সুকৃতির কাছে । মাথার ওপর আকাশ ভেঙ্গে পরার মত অবস্থা তাঁর । সামনে গোটা জীবন, একটা অনিশ্চিত লম্বা পথ । প্রথম প্রথম কটা দিন কেমন ঘোরের মত কাটল । ছাদের পশ্চিমের ঘরটা ছেড়ে কোত্থাও বেরোতেন না সুকৃতি । শুধু ছিল রাঙাদিদী আর কোলের কাছে হৃদ । আজ ও মনে পড়লে বুকের ভিতরটা কেমন কেঁপে ওঠে । রাঙাদিদী মাথার কাছে বসে শুধু চোখের জল ফেলতেন নিশব্দে আর খুব যত্ন করে সুকৃতির চুলে তেল লাগিয়ে দিতেন । ওঁর পছন্দের রান্না গুলো করতেন একটা একটা করে রোজ । কত রাত্তির অব্দি ঠায় বসে বসে শ্যামলেন্দুর ছোটবেলার কথা বলতেন রান্গাদী । হঠাত করে শ্যামলেন্দুর মৃত্যুতে আর একটি মানুষ যিনি ভেঙ্গে দুমড়ে গিয়েছিলেন, তিনি নিপুদা । একদিনের কথা মনে পড়ে, বিকেলবেলায় এলেন নিপুদা । চুলে জট, চোখ লাল, চেহারায় সেই দীপ্তিটা যেন হঠাত নিভে গিয়েছে । এসেই হৃদ কে নিয়ে সোজা চলে গেলেন চিলেকোঠার ঘরে । সেখানে অনেকক্ষণ দুজনে মিলে ছবি আঁকা হলো, ঘুড়ি ওড়ানো হলো, তারপর হৃদকে সামনের মাঠটায় খেলতে পাঠিয়ে দুজনে মাদুর পেতে ছাদে বসলেন অনেকক্ষণ । কোনো কথা নেই । কোনো কথাই যেন শ্যামলেন্দু কে ভুলতে দিচ্ছিল না তাদের । উপস্থিত না থেকেও একটি মানুষ যে এতখানি উপস্থিত থাকতে পারে, সেদিনের সূর্যাস্ত সেটাই শিখিয়ে ছিল সুকৃতি কে । অনেকক্ষণ পরে নিপুদা তাঁর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিলেন, ঠিক যেন পিতার মত, ঠিক যেন বিরাট ভরসার একটি মানুষের ছায়ায় বসলো সুকৃতি । জুড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর প্রাণ । মনটা বারবার চেয়েছিল নিপুদার বুকে তাঁর মাথা টাকে এলিয়ে দিতে । কোথায় সংকোচ, কিসের বাধা মন বোঝেনি, শুধু চোখের জলে ভেসেছিল বুক । সেদিন নিপুদা চলে যাওয়ার পর সুকৃতি বুঝেছিলেন, শ্যামলেন্দুর চেয়েও ওঁর অর্ধেক যে মানুষটা,  তাঁর মনে যে জায়গাটা তছনছ করে দিয়ে গেলেন, সেটা এই জীবনে আর কেউ পূরণ করতে পারবে না ।
~
সারারাত এপাশ ওপাশ করেই কেটে গেল । কয়েক দিন ধরেই চোখে ঘুম আসে না একটুও । খুব ভোরের দিকে আজকাল শিরশিরানি একটা ঠান্ডা পড়ে । বাইরের মেঘ ছেঁড়া আকাশে যেন একটা হালকা কুয়াশার চাদর টাঙানো । একটু বেলা বাড়লেই আবার মেঘ কেটে শরতের ঝকঝকে নীল আকাশ । আঁচলটা কে ভালো করে গায়ে জড়িয়ে ছাদে এলেন সুকৃতি । ছাদের আলসের ধরে সন্ধ্যামালতি গাছের ঝাড়ে ফুল এসেছে অনেক , বেল কুঁড়ি ও ফুটেছে চোখ মেলে । সমস্ত রাত ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির ঝিরঝিরে আদর মেখে ছাদের সারিবাঁধা টবে, গাছগুলো যেন ঝিলমিল করে হাসছে । ছাদের পশ্চিম দিকে এসেই মনটা আবার খারাপ রকম মেঘলা করে এলো । কাল রাতের স্বপ্নে ঠিক এইজায়্গাতেই নিপুদা ছিল । সে আর নিপুদা । মাঝে মধ্যে মনে হয় , বয়েসটা হলো অনেক, কিন্তু বালিকাবেলা থেকে জীবনের এই উপান্তে এসেও, কিছু কিছু স্মৃতি যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ে না । বরং আরো বেশি করে ধরা দেয় । বুকের মধ্যে কেমন একটা চুইঁয়ে চুইঁয়ে রক্ত ক্ষরণ হতে থাকে সারাবেলা । এসব কাউকে বললে পাগল ভাববে, অথবা ভিমরতি । কিন্তু ভালবাসার অভাবে একটা মানুষের তিলে তিলে যেভাবে মনের বিয়োগ ঘটে, সে কথা একমাত্র সেই বোধহয় বুঝতে পারে । একটা ভরভরন্ত সংসার যখন খালি হয়ে যায়, তখন পড়ে থাকা মানুষটির সেই স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার মত দুঃখবহ আর কিছুই নেই । সুকৃতির বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয় তাঁর অতীত, শ্যামলেন্দু কে নিয়ে কাটানো কয়েকটা দিন আর নিপুদার ছায়ার মত অস্তিত্বের বাকি কিছু আরো ,আর হৃদ এর ভবিষ্যত । এই ভবিষ্যত যদিও তার হাতে আর নেই । তিনি যে হৃদ কে বড় করলেন, মানুষ করলেন, সে আর এই হৃদ কি একই মানুষ , কে জানে । নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে তাঁর আজকাল । সিদ্ধান্ত নিতেও ভয় লাগে, বিভ্রম হয়, যদি ভুল হয়ে যায় । নিজের অপূর্ণ, অসমাপ্ত সংসার হৃদ কে দিয়ে পূর্ণ করার ইচ্ছে আজীবন পুষে রেখেছিলেন সুকৃতি । সেই স্বপ্নটা দেখা কি তবে তাঁর ভুল হয়েছিল ? যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন, আর যা দেখছে হৃদ, তার মধ্যে হাজার হাজার মাইলের দুরত্ব । শুধু দেশের নয়, মূল্যবোধের, সংস্কারের ,সময়ের ফারাক প্রচুর । হয়তআজ নিপুদা থাকলে এই সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর সুবিধে হত । শ্যামলেন্দু চলে যাওয়ার পর, নিপুদা যেভাবে সুকৃতি কে দশ হাতে সামলেছেন , সেকথা ভাবলেও শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে আজও । প্রাইভেট এম.এ. করা, বি.এড শেষ করা এই সবকিছু ওঁর প্রেরণায় । নিজে হাতে পড়িয়ে পরীক্ষা দেওয়ালেন নিপুদা আর তার মাস খানেক বাদেই এলো বেথুনের চাকরিটা । একদিকে হৃদকে বড় করা, নিজের পড়াশোনা আর শিক্ষকতা এই সব মিলিয়েই কিছু বোঝার আগেই চলে গেল অনেকটা সময় ।
আজ বাড়িতে প্রতিমা এলো । সকালবেলায় নিচের ঢাকা উঠোনে পূব দিকের দালানে পালবাবুর নাতি ও তার দলবল এসে সবকিছু সাজিয়ে গেল । আগে এ বাড়িতেই প্রতিমা তৈরী হত গোড়া থেকে । রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হত প্রতিমা গড়ার পালা । বাড়িভর্তি ছেলেপুলেরা দৌরদৌরী শুরু করে দিত মাস খানেক আগে থেকেই । পালবাবু আসতেন বিকেলের দিকে । একটু একটু করে খড় বাঁধা, একমেটে, দোমেটের পরে মা দশভূজা সেজে উঠতেন একেবারে মহালয়ার দিন । ঢাকি আসতো কৃষ্ণনগর থেকে । সে সব দিন আর নেই । সেই পুজোর জাঁকজমক ও ফুরিয়েছে কবেই ।  এখন শুধুই নমো নমো করে পুজো সারার পালা , তাই প্রতিমাও পাল বাবুর গোলাতেই অর্ধেক তৈরী হয়, এ বাড়িতে আসে ভাদ্র মাসের শেষের দিকে , অসমাপ্ত প্রতিমার সাজ সম্পূর্ণ হয় এখানে । পালবাবু গত হয়েছেন বছর আটেক । এখন তাঁর নাতি কানে ট্রানসিস্টর চেপে গান শুনতে শুনতে প্রতিমা রং করে । সময়টা সত্যি বদলে গেল অনেক, ভাবেন সুকৃতি। ছোট তরফের দাদাদের সাথে আলাপ আলোচনা সারা হলো এবারের মত । পুজোর আয়ে ব্যয়ের হিসব রাখেন সুকৃতি নিজেই । লোকবলই এখন এ বাড়ির পুজোর একমাত্র সমস্যা । ছেলেমেয়েরা সকলেই বাড়ির  বাইরে । ঝক্কি ঝামেলা সামলানোর সবই তাদের ঘাড়ে । রাঙাদিদী আগে যখন সুস্থ ছিলেন, অনেকটাই নিজে হাতে করেছেন , এখন তো তিনিও শয্যাশায়ী ।
 ঠাকুরদালান থেকে ঘরে ফিরে একটু দম নিয়ে আলমারির মাথা থেকে চাবি পারেন সুকৃতি । বেলার আজ রান্নার ছুটি । ঘরদোর পরিষ্কারটা সেরে ফেলতে হবে আজই । এর পর তার কলেজের ছুটি পড়তে পড়তে অনেক দেরী হয়ে যাবে । ওদিকে আবার হৃদ এরও আসার সময় হয়ে এলো, আর তো দিন তিনেক । আলমারিটা খুলতেই ভিতরের কালো আবলুস কাঠের দেরাজে পিতলের চাবি দিয়ে অল্প চাপ দিতেই খুলে গেল গোপন কুঠুরি । নারীর হৃদয়ে যেমন অনেক গোপন কন্দর থাকে, যার আনাচকানাচের সুলুকসন্ধান জানা পুরুষমানুষের কর্ম নয় , তেমনি এই আলমারিরও । সুকৃতির বিয়ের এই আলমারিটা আসলে একটা স্মৃতির ঝাঁপি । খুললেই যেন ঝাঁপিয়ে আসে পুরনো মানুষ, কুড়োনো মুহূর্ত কথা । ভিতরে নানা রকম কাগজ, কাপড় সরিয়ে সুকৃতি বের করে আনলেন, একটা ছোট কাশ্মীরি কাঠের ছয় কোনা বাক্স । বাক্সটার ডালায় লতাপাতার নিখুঁত কারুকার্য । ডালাটা খুলতেই, লাল ভেলভেটের ঢাকনার ভিতর থেকে ন্যাপথলিনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারদিক । ভিতরে থাকার মধ্যে রয়েছে ভাঁজ করা কয়েকটা রেশমি রুমাল, মুক্তোর গয়না দু চারটে , আর ভাঁজ করা চিঠি একটা । চিঠিটা নিপুদার শেষ চিঠি । সময়ের সাথে সাথে সুকৃতির  চেহারার মত চিঠিরও বয়েস হলো অনেক । হলদেটে কাগজটার ভাঁজে ভাঁজে পুরনো নীল কালির আঁচরগুলো জায়গায় জায়গায় ঝাপসা ও হয়েছে খানিক । তবুও কেন কে জানে, অনেকবার পড়ার পরেও আজও এই চিঠিটা সুকৃতির খুব ভরসার জায়গা । নাকের অনেকটা কাছে টেনে নিয়ে চিঠিটার ঘ্রাণ নিলেন সুকৃতি । ন্যাপথলিনের গন্ধ ছাড়িয়েও আরো একটা অদ্ভূত গন্ধ যেন নাকে এলো । সেটা অন্য কিছুর নয় আসলে, সেটা সেই বর্ণময় অতীতের গন্ধ, যা সুকৃতির হৃদয়ে আজও  জ্বলজ্বল করে আছে ।

চিঠিটা এসেছিল সুকৃতির কাছে, নিপুদা চলে যাওয়ার প্রায় মাস ছয়েক বাদে । কি একটা রিলিফ ক্যাম্পের কাজে উত্তরকাশী গিয়েছিল সেবার । রুদ্রপ্রয়াগে ভয়াবহ বন্যায় বিদ্ধস্ত মানুষজনের কাছে ভারত সেবাশ্রমের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিপুদা । যাওয়ার প্রায় মাস ছয়েক অবধি কোনো খবরই ছিল না, চিন্তায় ভাবনায় ভিতরটা অস্থির হয়েছিল তাঁর কিন্তু কাকেই বা বলার । নিপুদার থাকার বলতেও সেরকম কেউই ছিলেন না, যার কাছে খবর নেওয়া যায় । অকৃতদার মানুষটি যেন হঠাত করেই উধাও হয়ে গেলেন সুকৃতির পৃথিবী থেকে বৃহত্তর পৃথিবীর কোলে । একবার মনেও হয়েছিল, বন্যায় বোধহয় নিপুদাও...তারপরেও ব্যর্থ আশা যেভাবে টিকে থাকে, সেভাবেই মনের মধ্যে কোথাও একটা ক্ষীন আশার আলো ছিল, যে একদিন না একদিন সন্ধান পাওয়া যাবেই ।  চিঠিটা পেয়ে অনেকখানি আশ্বস্ত হয়েছিল সুকৃতি । নিপুদা লিখেছিল ত্রানের কাজে এবার বোধহয় আর তাঁর ফেরা হবে না কলকাতায় । ওখানকার মানুষের হয়ে অনেক অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে । কলকাতায় ফেরার চাইতে যেগুলো নিপুদার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ । আরও লিখেছিল ".... সংসার বলতে যতটুকু যা বুঝেছি তা হলো নিঃশেষে নিজেকে বিলিয়ে যাওয়া , মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া । একটা গোটা জীবন নষ্ট করলাম রে বৌঠান , এতখানি বয়েস হলো, কিছুই করে উঠতে পারলাম না , তবে আর নয়, এরপর যতটুকু বাঁচব , শুধু মানুষের জন্য বাঁচব, দেখিস  ।একবার শুধু ওই ভবানীপুরের বাড়ির গন্ডি টুকু ছেড়ে বাইরে এলে দেখবি, পৃথিবীটা অনেক বড় । এখানে মানুষে মানুষে, জীবনযাত্রায় কোনো দেয়াল নেই । কোথাও কোনো তফাত নেই, এতটুকুও । আসলে জীবন মানে বিরাট একটা অনুভূতির আগল খুলে বাঁচা ।  নিজেদের মধ্যে অজস্র দেয়াল তুলে , ছোট ছোট অন্ধকার খোঁয়ার গুলো ভেঙ্গে দিয়ে খোলা মাঠে, খোলা হাওয়ায় চলতে থাকার নামই জীবন । সেই চলার পথে রোদে পুড়ে, বৃষ্টি ভিজে তবে না এ মানুষ জন্ম সার্থক । ...তোর ছেলের জন্য বাজনাটা রেখে এলাম, আর তোর জন্যে একটা গোটা জীবন ।ওই যন্ত্রটায় আমার প্রান আছে । সঙ্গীত হলো জীবন , সঙ্গীত মানে মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া আনন্দের আহবান আর সেই  সুরের খোঁজ পেলে আর কোনো মনিমুক্তই জীবনে প্রয়োজন নেই বৌঠান । শুধু ভেসে যাওয়া, শুধু ডুবে যাওয়া,  সেই সুর তোর মধ্যে আছে, সেই আকাশ তোর মধ্যে আছে, তোর কাছ থেকে , শ্যামলের থেকে হৃদ এর জীবনে প্রবাহিত হবেই  সেই গান । সেই দিনটা আমি দেখে যেতে পারব না হয়ত, তবে যদি পারি আবার দেখা হবে, আবার সেই ঠাকুর দালানে বসে আমাদের গানবাজনার আসর হবে, আবার তোর সাথে, শ্যামলের সাথে সেই আগের দিনের মত তাসখেলা হবে, পুজোয় থিয়েটার হবে, হয়ত এ জন্মে নয়, হয়ত অন্য কোথাও, অন্য কোনো জন্মের সকালে। ভালো থাকিস তোরা । - ইতি, তোর নিপুদা "

................. ক্রমশ 

No comments: