"আজ তোর আমার দেখা হওয়ার দিন,
আমাদের অপেক্ষার তেত্রিশ বছর পূর্ণ হলো ।
বাজেশিবতলা ? নাকি পুরনো দেউল এর ঘাট ?"
দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর
ফেসবুকের মেসেজে হঠাতই হাত চিঠি। চিঠি মানে সেই নীল ইনল্যান্ড লেটার এর বিকেলের ডাক
নয়, চিঠি মানে আন্তর্জালে আমার চ্যাট বাক্সে আসা কিছু কষ্টবোধ, কিছু অপেক্ষা আর কয়েকটা
মায়ানিবিড় কথা রাখার গল্প । বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে চশমাটা চোখ থেকে খুলে ফেললাম
।দিল্লি থেকে ফিরেছে তপু। তপু মানে তপতী। এমনিতে আমার ক্লাস নাইনের টিউশন পড়া ব্যাচের
সহপাঠিনী। কিন্তু মনে মনে ছাইচাপা আগুনের প্রথম বসন্তের নর্মসহচরী। ও ফিরেছে ওর তেত্রিশ
বছরের দাম্পত্য চুকিয়ে দিয়ে আমার শহরে ।ওর সাথেই ফিরল বোধহয় আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া,
ভোল বদলে যাওয়া, ছায়া ছায়া মফস্বল শহরটার সেই উনিশশো চুরানব্বই এর প্রায় মরচে পড়ে যাওয়া
বসন্তও। সামনের মেসেজের অক্ষরগুলো খালি চোখে বেশ ঝাপসা দেখছি কিন্তু প্রতিটি শব্দের
গায়ে গায়ে যেমন লেগে থাকে যতি চিহ্ন তেমনই যেন ওর ওই কটা কথায় লেগে ছিল ছবির পর ছবি।
অস্পষ্ট থেকে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে আসা অক্ষর যদি ফিরিয়ে নিয়ে যায় সাতচল্লিশের শরীরটাকে
চোদ্দোর অবয়বের আবছা ভোরবেলায়, তবে কি সত্যি সত্যি ফিরে যাওয়া যায়, পুরনো সিঁড়ি ভেঙ্গে
কাঁচা অঙ্কের সকালে ? ফেসবুক প্রোফাইলে যে তপুকে দেখি তাকে চিনি না, যাকে চিনতাম সেই
তপতীর সেই সময়টার চেহারা বলতে যেটা মনে পড়ছে, সেটা একটা নরম ডিমের মত মোমরং হলুদ কুসুম
মুখ, তেলতেলে গাল আর সানসিল্ক শ্যাম্পুর গন্ধ মাখা ফুরফুরে চুলের বিনুনি আর যে দিনটা
মনে পড়ে, সেটা দোলযাত্রা।
সময়টা চুরানব্বই সাল। আমি
তখন জেলা ইস্কুলের ক্লাস টেন। বসন্তের কোকিল ডাকা দুপুর। নিঃঝুম পাড়ার সব বাড়িতেই দরজা
জানলা কপাট দেওয়া। সোনালী হলদে একটা গরম অথচ ফুরফুরে হালকা হাওয়া ঘুরপাক খাচ্ছে নিরালা
পাড়ার তস্য নিঃঝুম গলিটায়। বাড়িগুলোর বন্ধ সদর দরজার সামনের রাস্তায় দুপুরের এঁটো,
কাঁটা, ভাত ইতস্তত ছড়ানো ছেটানো। গোটা তিনেক কুকুর দরজার ঠান্ডা ছায়ায় ঝিম মেরে শুয়ে
আর পাঁচিলের ওপর রূপসী ল্যাজ নেড়ে নেড়ে অপাঙ্গে দেখছে সব। রূপসী মানে সাদা ছাইছাই বেড়ালটা।
তপুদের বাড়িতে ওর নিত্য যাওয়া আসা। অবশ্য নিত্য যাওয়া আসা, সে তো ছিল আমারও।তবুও কেন
কে জানে বেড়ালটাকে মোটেও পছন্দ করতাম না। কেমন মনে হত অফিস চলে যাওয়া তপুর মা, ওকেই
পাহারায় বসিয়ে গেছেন একলা বাড়িতে। দুপুরবেলা একসাথে টেস্টপেপারটা যে ওর বাড়িতে বসেই সলভ করতে হবে সেই দুঃসাহসী ফুসমন্তর যে দিত, সে
তো ওই বসন্তের দুপুরই।
আসলে
অঙ্ক টঙ্কে আমি চিরকালই কাঁচা, কিন্তু রসায়নে বেশ চোস্ত।নইলে একটা ভয়ংকর মিথ্যে বাহানা
দিয়ে দিনেদুপুরে কিভাবে ১১, কৃষ্ণ কুমুদিনী লেনের নিরালা ভাড়াবাড়িটার একতলার ভাড়াটে
পরিবারের একমাত্র কন্যেটির সাথে গা ঘেঁষে ঘেঁষে দুপুরের পর দুপুর কাটানো যায়, সে ফিকির
আমি ছাড়া আর কেই বা জানতো ? জানতো অবশ্য আরও দুজন, তপু নিজে আর ওর ওই রূপসী বেড়ালটা।তক্তাপোষের
ওপর পা মুড়ে অঙ্ক করতে করতে ত্রিকোণমিতির কোন বাঁকে এসে ওর স্কার্ট সরে যাওয়া ফর্সা
গোড়ালিতে ভুল করে লেগে যেত আমার পা আর বুঝেও যেন কিছুটি বোঝেনি সে ভান করে আমার খাতার
ওপর ঝুঁকে পরে আমার অঙ্কের ভুল ধরিয়ে দিত সর্বনাশী। অঙ্ক তখন কোথায়, বজ্রবিদ্যুতে কেঁপে
ঘেমে নেয়ে আমি তখন অস্থির। জানলা দিয়ে ফুলছাপ পর্দা উড়ছে ফরফর করে ফ্যানের হাওয়ায় আর
পাঁচিল থেকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে সওবটুকু জরিপ করে নিছে রূপসী।যেন অফিস থেকে
মা ফিরলেই সব খবর দেবে ওই। পরের দিন ছিল দোল। সন্ধ্যে গড়ানোর সময়ে জানলা খুলে চোখে
ঝিলিক টেনে তপু বলেছিল , 'চা খাবি ?' ঘাড় নেড়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দম্পতির মত, হ্যাঁ বলেছিলাম।
খাটে শুয়ে শুয়ে বেশ দেখতে পাচ্ছি, খুব কম পাওয়ারের বাল্বের আলো জ্বালা রান্নাঘরে টুংটাং আওয়াজ করে চা বানাচ্ছে
তপু।ওর মসৃন ঘাড়ের ওপর রান্নাঘরের পশ্চিমের
জানলা বেয়ে চুঁয়ে পরছে থালার মত চাঁদের আলো।জনতা স্টোভ এ শন-শন আওয়াজ করে নীলচে আগুনে
চা ফুটছে আর পাশের খোলা মাঠ থেকে বাচ্ছারা হাততালি দিয়ে ন্যাড়া পোড়াচ্ছে। ' আজ আমাদের
ন্যাড়া পোড়া, কাল আমাদের দোল , পূর্নিমাতে চাঁদ উঠেছে , বল হরিবল'। ওই ন্যাড়া পোড়ার
মতই আগুনে যে আমিও পুড়ছি সে খবর বেশ রাখত সে। ফু দিয়ে চা খেতে খেতে তাই কি গোপনে আমন্ত্রণ
জানিয়েছিল সেদিন ? 'কাল কিন্তু খবরদার আসবি না, বলে দিলাম।' বসন্তের সেসব কথা মনে আছে
এখনো মাঝ চল্লিশের দাম্পত্য ডিঙিয়ে আসা তপতী ভৌমিকের ?
সকাল বেলা পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকেছি
আমরা তিনজন। সময় তাক করা আছে, জানি এই সময়টায় ওদের পিছনের বারান্দার দরজাটা খোলা থাকবে,
তপু থাকবে শোয়ার ঘরের সামনের একফালি ছোট বারান্দাটায়। নয় মাদুর পেতে ক্যালকুলাস করবে
নয়তো রেডিওটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিবিধ ভারতী। কিন্তু সেদিন সে গুড়ে বালি ! আমরা ঝাঁপিয়ে
পড়ার আগেই দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে বন্ধ করে খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করলো ও। দস্তুরমত
গালাগালি দিয়ে, অনুনয় বিনয় করে, ভয় দেখিয়েও কোনো কাজ হলো না, উল্টে পাশের বাড়ির ব্যালকনি
থেকে একটা বাচ্ছা ছেলে এক বালতি রং গুলে দিল আমাদের মাথার ওপরে ঢেলে। রাগে, দুঃখে মুঠোর ভিতরে রং চুঁইয়ে
চুঁইয়ে আসা সেই সকালটা কি অসম্ভব অসফল ছিল সেদিন। কিন্তু দুপুরটা বিফলে যায়নি। আর আসবে
না, এই ভেবে স্নান টান সেরে নরম গোলাপী ম্যাক্সি পরে ছাদে উঠে কাপড় মেলছিল তপু। ঠিক
সেই সময়ে দুদ্দার করে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে পৌঁছলাম আর পিছন থেকে সাপটিয়ে জড়িয়ে ধরে আশ
মিটিয়ে রং লাগালাম। 'ছাড়, ছাড় বুকুন, অসভ্য ছেলে কোথাকার ' বলে চুলের মুঠো ধরে আমায়
টানতে টানতে ছাদের পাঁচিলের ধারে নিয়ে গেছিল তপতী ভৌমিক যেখান থেকে পাশের রানীদের বাড়ি
থেকে আড়াল পরে, দেখা যায় না আর । মুখের দিকে তাকিয়ে তো আমি হতভম্ব, রং মাখার দুঃখে
না আনন্দে ওর দু চোখ ভরে জল ! সেই ছাতের ট্যাঙ্কের আড়ালে যেখানে বড় বড় ফনিমনসার গাছ
ঝোপ হয়ে ছিল, সেখানেই প্রথম ঠোঁটে ঠোঁটের ব্যারিকেড। ঠোঁট কেটে রং ঢুকে জ্বালা করছিল
শেষ অবধি। চট করে আমার অলক্ষ্যেই কখন আঙ্গুলটা ঠোঁটে চলে গেল। এই নিচের ঠোঁটটাতেই তো
? হেসে ফেললাম নিজেই। সে তো আজকের সাতচল্লিশের আমি নই, সেদিনের বছর পনেরর বুকুন। সেদিন
তপুর মুখে তখনও মাছের ঝোলের গন্ধ লেগে ছিল।সে দিনের রং ঠিক কোথায় কোথায় অবধি পৌঁছেছিল
তপু ? এতগুলো বছরে একেবারে মিলিয়ে যায়নি তাহলে! সেই রঙের আড়ালেই তো প্রথম ওলটপালট হয়ে গেছিল, বসন্তের গোপন
সব তাস। তুই বড় হয়ে গেলি, আমায় ও বড় করে দিয়েছিলি ঠিক ওই মুহূর্তটায়।
বসন্ত মানেই এমন সব প্রাথমিক,
আদ্য, মধ্য বুনিয়াদী শিক্ষার ধাপে ধাপে সিঁড়ি ভাঙ্গা পাটিগণিত। প্রেম তখনও ঠিকঠাক বুঝিনি,
সিলেবাসের 'পূর্বরাগ' শুনলে ক্লাসরুমে আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করতাম। তবু খিদে পাওয়া
বা বাথরুম পাওয়ার মতই কি যেন একটা শরীরের মধ্যে পাচ্ছে, কেমন যেন একটা থিতু হতে চাইছে
অস্থির মন , কাউকে ঘিরে মন আর হরমোনের রং-মিলন্তি এই খেলাটাই কি প্রেম নাকি অচেনা একপ্রকার
খিদে সেটা বুঝতেই কতগুলো বসন্ত কেটে গেল। বছরের পর বছর ধরে চৈত্রপবনের খোলা ক্লাসরুমে
ফাল্গুনের বসন্তসেনারা একের পর এক এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল বেবাক।কখনো খোলা পিঠের মায়ায়
আবার কখনো সদ্য শাড়ির গোড়ালির ওপরে উঠে যাওয়া একঝলক অথচ অনিবার্য রহস্যে ।কখনো বা দোলের
ছেলে, দোলের মেয়ে হয়ে হঠাৎ দলছুট হয়ে মুঠো মুঠো রঙের আবিরের অজুহাতে হাত দিয়ে ফেলা
মনের সেই গোপন দুপুরে, যেখানে রোজদিন কড়া নাড়া যায় না !
চিঠিতে লিখেছে তপু বাজেশিবতলা'র
কথা। আমাদের বাড়ি থেকে তিনটে গলি পরেই গঙ্গার ধার। চার মন্দির ঘাটের ওই বাজেশিবতলার
সিঁড়িতে বসেই কেটেছে অনেক বাসী বসন্তের দিন। সেইখানেই আবার বসব আগামীকাল। মাথার ওপরে
থালার মতন হলদেটে চাঁদ উঠবে। নদী বেয়ে টিমটিমে আলোর নৌকো ভেসে যাবে উজানের দিকে। ফর্সা
হাওয়ায় হাওয়ায় আবিরের গন্ধমাখা ডাক আসবে আবার ! অতীতের মত সমস্ত প্রাক্তন বিকেলগুলো
ঘড়ির কাঁটাকে অস্বীকার করে ফিরে আসবে পুনর্বার শেষ ট্রেনের মত। আমাদের বাড়ির তেতলার
ঠাকুরঘরের নরম লাল মেঝেতে বসে দুলে দুলে সুর করে লক্ষীর পাঁচালি পরবেন সেজঠাকুমা।"
দোলপূর্ণিমার নিশা, নির্মল আকাশ / মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস"। কি অদ্ভূত শিরশিরানি
হাওয়ায় ঠিক বুঝতে পেরে যাব, "মলয় বাতাস" শব্দটার মোলায়েম স্পর্শটুকু। পিকুদের
বাড়ির ছাদ থেকে ভেসে আসবে জ্যাঠামশাইয়ের ঘড়ঘড়ে রেডিওতে "মোরে ঘর আয়ো পিয়া....."
বৃন্দাবনী সারঙ !
সেই কবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়
লিখেছিলেন, 'অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে, তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো', ঠিক কি কারণে এ স্মৃতি
আজ অবান্তর আর ঠিক কি কারণেই বা আজও সেই অপ্রাসঙ্গিক স্মৃতিঘেরা অশ্রুসিক্ত মুখটির
কাছে আমি ফিরে গেলাম আজ ? কেনই বা মনে হলো সে অশ্রু আজ আর দুঃখের নয়, হয়ত একদিন ছিল।
আজ সে বরং গলার পেন্ডেন্টে জড়ানো একখন্ড ঝলমলে সুখের হিরেকুচির মতই দামী। আসলে স্মৃতি
সততই সুখের। নির্ভেজাল দুঃখের কোনো স্মৃতি থাকে না।এতগুলো বছর পরে সময়ের স্রোত বয়ে
যাওয়ার পর যে জলদাগ মনের ভাঁড়ারে থেকে যায়,
তার সবটাই সুখস্মৃতি। পুরনো ব্যথা, না পাওয়া, কষ্ট, যন্ত্রণার, অপমানের, দগদগে আঘাতটুকুতে
সময়ের সাথে সাথে মলম পড়ে, সেই মলম মিলিয়ে যায় আর সেই ব্যক্তিগত কাটা দাগটুকু যে স্মৃতিকে
ফিরিয়ে আনে, তাতে আর কষ্টবোধ থাকে না, থাকে অভিজ্ঞতার স্মিত প্রশ্রয়, জীবনের ঝুলি কুড়োনো
আনন্দসম্ভার। বসন্ত বোধহয় ব্যক্তিগত ভাবে সেই কষ্ট স্মৃতি, সেই নষ্ট হাওয়ার উড়ালপুল।
দোল যেহেতু উৎসব , তাই সেখানে ব্যক্তি তুচ্ছ। ব্যক্তিগত স্মৃতিও তুচ্ছ। শুধু আগলভাঙ্গা
আনন্দের, যৌবনের উল্লাসটুকু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে বয়ে যায়।তপতীর চিঠি আমার কাছে
যেমন দেরাজ খোলা সুখ আজ, তেমনিই তো শয়ে শয়ে প্রাক্তন হাওয়ারা গোলাপী সন্ধ্যেয় চিঠি
ওড়াবে এ শহরের বুকপকেটে। এই চিত্রনাট্যে মুখ্য চরিত্র শুধুই রং। সারা বছরের পান্ডুলিপি
যখন তার সব পান্ডুরতা, বিবর্ণ পাতা ঝরিয়ে নতুন রঙ্গে রাঙ্গা হয়, সেই রঙিন আবহের নামই
দোল, সেই ধপধপে সাদা থালার মত সব রঙের সংমিশ্রণই পূর্নিমা।মানুষ নয়, রংই রাঙায় আমাদের
।সে রং কার হাত থেকে কার শরীরে গিয়ে পড়ে, কোন আবির কার হৃদয় থেকে কোন হৃদয়ের কন্ঠি
বদলায়, সে খবর অবান্তর।
No comments:
Post a Comment