"রথযাত্রা লোকারণ্য , মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে
প্রনাম,পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী
।"
এই
পর্যন্ত বলে প্রায় অন্তর্যামীর মতই একটা মধুর হাসি হেসে বইটা বন্ধ করতেন আমার
মাতামহ ।খুব ছোট বেলায় এই কবিতার শেষ দুটো লাইন ঠিক বুঝতাম না কিন্তু মাতামহর ওই
হাসিটুকু তে বুঝতাম, আসলেতে দেবতা বোধহয় সত্যি রথে চড়ে আসেন না , আসলেতে তিনি
থাকেন রাস্তার ভিড়ে, সাধারণ মানুষের মধ্যেই কাঁধে কাঁধ দিয়ে পায়ে হেঁটে । যদিও
রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও যিনি আমায় রথ চিনিয়েছিলেন আরো ছোটবেলায়, তিনি বঙ্কিম ।আমাদের
বাড়ির বইয়ের তাকে বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ এর প্রকাশিত এক কপি 'রাধারানী' ছিল.। কভার এ
লালের ওপর হালকা কমলা রঙের অস্পষ্ট রথের ছবির সিলুয়েট আর সামনে এক করুন
কাকভেজা বালিকার ছবি, নিচে সাদা অক্ষরে গোটা গোটা করে লেখা বঙ্কিম চন্দ্র
চট্টোপাধ্যায় প্রণীত 'রাধারানী' । বইটা মায়ের বিয়েতে উপহার পাওয়া । প্রথম পাতায়
বেগুনি কালি দিয়ে লেখা ছিল, শুভেচ্ছা সহ বেনুদি, নিচে মায়ের বিয়ের তারিখ ।সেকালে
বিয়ে অন্নপ্রাশনে ,বই দেওয়ার চল উঠে যায়নি তখনও । ছোটবেলায় অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগে,
মা পড়ে শুনিয়েছে দু এক বার । একটা ছাপানো বই তে ছাপার অক্ষরে আমাদের এই
শ্রীরামপুরের কথা, মাহেশের এই রথের কথা লেখা হয়েছে অত বছর আগে, সেসব ভাবলেও একটা
অদ্ভূত রোমাঞ্চ হত । কেমন একটা চোখ বুজলেই দেখতে পেতাম রথের মেলা পিছনে ছেড়ে ,আকাশ
ভাঙ্গা বৃষ্টিতে কাকভিজে, অন্ধকার কাদাজল মাখা রাস্তায় বেলফুলের একটা করুন মালা বুকের
কাছে নিয়ে বাড়ি ফিরছে, ছোট একটি মেয়ে । তার মালাটা বিক্রি হয়নি মেলায় ।
মাহেশের
দুরত্ব আমার বাড়ি থেকে ৩০ মিনিটের । সেখানকার রথের বর্নাঢ্য ইতিহাস তো সকলেরই জানা
। সেই যে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীধামে গেলেন আর প্রভু কে নিজের হাতে ভোগ
খাওয়াতে চাইলেন, যা ওখানকার পান্ডা পুরহিতেদের বিধানে নিষিদ্ধ করা হলো । মনোকষ্টে
ব্রহ্মচারী যখন মৃত্যুশয্যা নিলেন, তখন স্বয়ম জগন্নাথ প্রভু স্বপ্নাদেশ দিলেন
,তিনি হুগলির অনতিদূরে মাহেশ গ্রামে দারুমূর্তি হিসেবে উত্থিত হবেন । ধ্রুবানন্দ
স্বামী এলেন, এবং সেই দারুমূর্তি আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠা করলেন মাহেশের বিখ্যাত
মন্দির এবং শুরু করলেন ইতিহাস বিখ্যাত রথযাত্রার সারম্বর সূচনা । নব চূড়া অর্থাত
নয়টি চূড়ার এই রথ আর রথের গায়ে আঁকা পৌরানিক ছবি তৈরী হলো নব কলেবরে । শ্রী চৈতন্য
দেব এলেন । হুগলির ইতিহাসের এক নতুন সূচনা হলো । লক্ষ মানুষের ভিড়ে প্রায় ৬০০ বছর
বয়েসের আঁচর পড়ল আজকের এই রথযাত্রায় , তবুও উদযাপনের উত্সাহে ভাঁটা পরেনি একটুও ।
যদিও
তখনও রথ বলতে যা বুঝতাম,তা হলো বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় নারকোল গাছের সারিটানা
রাস্তায় শেষ বিকেলে লগবগে লাল রঙের টানা পলকা কাঠের রথ , সে রথ টানা হত ছেলেমানুষী
রশি তে , তাতে শোভা 'যাত্রা' র বর্নাঢ্য গমন কতটুকু হত, দেবা না জানন্তি , তবে
আমরা ভারী আল্হাদ পেতাম । খুব ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জীবনের যাত্রার মানটা
হঠাত বদলে গেছিল, তাই সেই বদলে যাওয়া জীবন কে নিয়ে দোলাচলতার মধ্যেই এই নানারকম
অনুষ্ঠান আরম্বরের পুজো পাব্বন বেশ অন্যরকম রং নিয়ে ধরা দিত জীবনে । বেশিটাই করুন
রং । নিজেদের একটা গোটা রথ কেনার সারম্বর উদযাপন সম্ভব ছিল না আমাদের ভাইবোনের
।তবে ছবি আঁকার ও টুকটাক শিল্পনৈপুন্যের সুবাদে , ডাক পড়ত আমার জেঠুর বাড়ির রথ
সাজানোর । আমার জ্যাঠাতুত ভাইটির জন্য তিনতলা রথ কেনা হত প্রতি বছর । একতলায় বেশ
সাজানো গোছানো লাল টুকটুকে মেঝে, দোতলায় আরেকটু ছোটো, ওখানেই জগন্নাথ প্রভু ভাই
বোন নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বসতেন কুরুষের আসনে আর তিনতলায় ছিল প্রসাদী সন্দেশ, মঠ আর
ফুল টূল রাখার জায়গা । রথের দিন দুপুর থেকেই সে এক উত্তেজনাময় প্রস্তুতি । আষার
দুপুরের ছায়া ছায়া আকাশে, বাড়িতে সবাই যখন ভাতঘুমে , ঠাকুমার ঘরের লাল মেঝেতে বসে
, একটা একটা করে নীল, সবুজ, রুপোলি, সোনালী কাগজ কেটে কেটে নকশা বানাতাম আর
জেঠিমার হাতে তৈরী আটা জ্বাল দেওয়া আঠা দিয়ে সেঁটে সেঁটে রথসজ্জা হত ধাপে ধাপে ।
প্রতিবারই বেশ আলাদা আলাদা রকম ,নতুন তর ছাঁদ । নতুন কিছু একটা করে সবাইকে তাক
লাগিয়ে দেয়ার ফিকির হত । আমি একমনে রথ সাজাতাম, আর ছোট ছোট ভাই বোন গুলো হাতে হাত
মিলিয়ে এটা ওটা সরবরাহ করত আর কখন জানি বিকেলের মুখে একেবারে ঝলমলিয়ে প্রস্তুত
হতেন বলভদ্র ও সুভদ্রা বিহারে জগন্নাথ স্বামীর গাড়িটি । ঠাকুমা এসে শাঁখে ফু দিয়ে
ধুপ ধুনো জ্বালিয়ে দিলেই এবার রথ টানার শুরু । টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই কাঁসর ঘন্টা
নিয়ে বেরিয়ে পরত আমাদের রথ আর আমি মনে মনে শুধু হা-পিত্যেস করে বসে থাকতাম
কখন মা অফিস থেকে আসবে। আসলে হাতে করা এই সাজানোটা ঠিক কতটা বর্নাঢ্য ও চমকদার
হলো, সেই রেকগনিশনটা মায়ের কাছ থেকে না পেলে মন শান্ত হত না ।
প্রথম
প্রথম মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা গুলো বেশ করুন । বেশির ভাগটাই একা অথবা ভাইবোন দের
সাথে । এবং অবধারিত ভাবেই টাকা থাকতনা অবশ্যম্ভাবী । তবুও রথের রশি তে টান
পরলেই প্রায় ছুটে চলে যেতাম ওখানে , কারণ বড় হয়ে যাওয়ার আনন্দ বরাদ্দ ছিল ওই
যাওয়াটা তে । মা অফিসে, তাই একলা বিকেলগুলোয়, দুপুর পেরোতেই হাওয়াই চটিতে পা গলিয়ে
হনহন করে হেঁটে সেই আনন্দের প্লাবনে ভেসে যাওয়াটা ছিল একটা স্বপ্নের মত ব্যাপার ।
রাস্তার দুধারে বিরাট বিরাট সব জলসত্র বসত । পুন্যলোভি মানুষের খানিকটা পুণ্য করে
নেওয়ার সুব্যবস্থা । বড় বড় ঠান্ডা জালায় জল ভরে গেলাসে গেলাসে জল ঢেলে দেওয়া হত
আগত দর্শনার্থীদের , সঙ্গে সাদা অথবা লাল গুড়ের বাতাসা । সেসব খাওয়াটা ছিল
অবশ্যকর্তব্য । গ্রাম,গঞ্জ, মফস্বল থেকে আসা আবিল আনন্দ বিভোর জনস্রোত ,
মায়া মায়া কচিমুখের ভিড় , রাস্তার দুধারে অসংখ্য খেলনাপাতির দোকান , তেলেভাজা,
জিলিপি, পাঁপর এর গন্ধ আরও হরেক কিসিমের সার্কাস, জোকার, নাগরদোলা , হরবোলা এসব
দেখতে দেখতে কেমন একটা সম্মোহনে ডুবে যেতাম আর কখন জানি ভুলে যেতাম, আমার পকেটে
পয়সা বিশেষ নেই। বড়জোর একটু পাঁপর ভাজা বা আইসক্রিম খাওয়া যেতে পারে । কিন্তু এই
আনন্দ যজ্ঞের অংশীদার হতে পরেই সে যে কি খুশি, কি আনন্দ, তা বর্ণনার অতীত, আজও
। ফিরতি পথে তালপাতার একটা পলকা ভেঁপু অথবা টিয়াপাখি আঁকা ছবির বই যদি কিনতে
পারতাম কখনো, সে তো এক পরম পাওয়া । বাকি পথ সেই ঘোরটুকু রথযাত্রার মায়া কাজল এর মত
চোখে মেখে বাড়ি ফিরতাম । ঘুমোবার সময়েও হাতের মুঠোয় ধরে রাখতাম সেই মেলায় কেনা
তালপাতার বাঁশিটা । এখনো ঘুমের ঘোরে ফিরতে ইচ্ছে করে সেই মেলার মাঠে , সেই মাইকের
ধারাবিবরণী, সেই পাটকাঠির সাপ আর বাড়ি ফেরার সময়ে পকেটে খবর কাগজের ঠোঙ্গায় মোড়া
ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কাঠবাদাম , আর কি ফিরে আসবে সে সব কার্নিভালের মত বিকেলগুলো ?
No comments:
Post a Comment