Wednesday, June 22, 2016

শিশু দিবস


সেই যে পাঁচ বছরের একরত্তি অনুজপ্রতিম দাস ! চেনেন নাকি ? চিনতে পারেন, সব পাড়াতেই বাস । চার চারটে মিসের কাছে সকাল থেকেই বাঁধা , অঙ্ক কষে তুখোড় ,আর ইংরিজিতেও পাকা, দাবা থেকে সাঁতার, গিটার সবকিছুতেই সে পয়লা নম্বর। শুধু ওর ছোটবেলা বলে কোনো অনুভুতি নেই, শুধু নামেই অনুজ কিন্তু আসলেতে বড়মাপের একটি মানুষ ছোট্ট দেহের আড়ালে ।

শিশু দিবস নিয়ে দুম করে লিখতে বলার আর্জিটা যখন এলো, কি যে লিখব প্রথমটায় ভেবে পেলুম না । শৈশব কথাটার মধ্যেই কেমন একটা চিরকালীন অন্তর্লীন মায়া আছে,সেই মায়া কাজল মাখা আধফোটা কুসুম দিন ছাড়িয়ে এসেছি অনেক কাল আর এখন তো শিশুর পিতা হওয়ার পর থেকে ওদের সাথেই আবার নতুন করে বড় হওয়ার পালা । হচ্ছিও, প্রতিদিন তিলে তিলে একটু একটু করে । এ একটা অনন্ত চক্রাকার আবর্তন । আবার সেই গোরুর দুধ এর মত নীলচে সকাল এর ছোটবেলা দেখি ওদের চোখে যখন গোটা দিনটাই 'সকাল' মনে হত ,খুব নতুন কিছু শুরুর মত খাঁটি। কমলালেবু রং টিফিন বাক্স আর গুঁড়ো গুঁড়ো রং পেন্সিল নিয়ে টলমল পায়ে পাড়ার লিচুতলা মনমোহিনী ইস্কুলের গেট এ মায়ের ছেড়ে আসাটা মনে পরে, পড়া-পড়া খেলা শেষে বাড়ি ফিরে সারাদিনের দুদ্দার দুষ্টুমি আর রাত্রি হলেই মায়ের কোল ঘেঁষে, বুড়ো আঙ্গুল চুষতে চুষতে ঘুমের দেশে তলিয়ে যাওয়ার সেইসব ম্যাজিক মাখা দিন মনে পরে যায় ।
কিন্তু শৈশবের আকার প্রকার বদলেছে , সত্তর আশির দশকের আমরা যারা তাদের সাথে আজকের কচিকাঁচাদের শৈশব যে এক নয় , তা নিশ্চই আমাদের সব্বার জানা। আর সেটা ঠিক কতটা চিন্তার তা জেনেশুনেও কি অদ্ভূত ভাবে,আমরা ছোট্ট মাথাগুলোকে নড়া ধরে কাক ভোরে ইংরিজি ইশকুলে পাঠাই। যেন সেরকম কিচ্ছুটি ঘটেনি, শৈশব টইসব ওসব কিছু নয়, আসল হলো দু চার পাতা পড়ে আমাদের মতন গেরামভারী হওয়া এমন ভাব দেখিয়ে ঘুম ভাঙ্গা মুখে গিলিয়ে দি কর্ন ফ্লেক্স আর দুধের মন্ড। কেতা দুরস্ত ইউনিফর্ম পরিয়ে গলায় বেঁধে দি  বাহারি টাই এর ফাঁস আর শুধুমাত্তর শেখায় কি করে আন্টি'দের গ্রিট করতে হয় সকাল বিকেল, কিন্তু প্রনাম করতে শেখাই না মোটে । তোতাপাখি মানুষ, প্রোগ্রামড মানুষ তৈরির লাইনে দাঁড়ায় আমার আপনার আরিয়ান, আরুষি, আহান'দের দল, প্রথা মেনে টকাটক "গুড মর্নিং" বা "গুড ইভনিং" এর নিত্যদিনের ডেটা ফিড করা হয় নির্ভুল ,কিন্তু কখনোই ভালো সকালের ফিকে গোলাপী সূর্য ওঠার মুহূর্তটাকে দেখানো হয় না ওদের, বিকেল এর রং বদলানোর বেলায় কখনই ওদের কে নিয়ে ছুটতে যাওয়া হয় না কোনো নাম না জানা হারিয়ে যাওয়ার  মাঠে। বৃষ্টির পর ভেজা ঘাসের ডগায় বসা গঙ্গাফড়িং ধরে সুতোয় বেঁধে ঘুড়ি করে উড়ানো বা জোনাকি ধরে শিশিতে জমিয়ে রাখার মত আবোল তাবোল বাঁচার সময় এ প্রজন্মের নেই। খুব হিসেব কষে বড় হওয়া বাপু, যত্ত ছোট্ট হতে পর, তোমার জন্য মাপা ততটুকুই দু চার বছর,তার পরের হিসেবটা কিন্তু খুব কঠিন এবং কড়া।

আসলে একটা ননসেন্সিকাল এপ্রোচ যেটা যে কোনো ছোটবেলার জন্য খুব দরকারী ,সেটা বদলে গিয়েছে আমূল ।ইতিহাস পাল্টে গেছে ।জোড়া সাঁকোর বাড়ির সেই ছেলেটির গল্প আমরা জানি, যাঁর সঙ্গী সাথী ছিল না মোটেই তাই বারান্দার রেলিংগুলো হত তার ছাত্র আর তিনি তাদের অঘোষিত গুরুমশাই হয়ে হাতে বেত নিয়ে তাদের শেখাতেন প্রথম ভাগ।তার বাড়ির বিশাল বারান্দায় ঝাঁট দিয়ে জড়ো করা ধুলোয় পুঁতে ফেলতেন ছোট গাছের বীজ, আর তাতে রোজ জল দিতে দিতে যেদিন পরম বিস্ময়ে দেখলেন সকালের রোদে ঝিলমিল করছে দুটো সদ্য জন্মানো কচি পাতা , সেদিন প্রানের আনন্দে ..আঁকা বাঁকা হাতের লেখায় হিসেবের খাতার ওপর লিখে ফেল্লেন দুটো লাইন ."জল পরে, পাতা নড়ে ", আর বদলে গেল বাংলার ভবিষ্যতের ছবি, সেদিনের সেই শিশুটি ছিলেন রবি ঠাকুর । প্রকৃতির সাথে যে বড় হয়ে ওঠা, গাছ, মাঠ, ফুল, ফল,মানুষের সাহচর্যে যে শৈশবের পুষ্টি ও লালন, সেই লালনের ফল দেখা গেছিল সেই প্রজন্মের অমন অনেক মহার্ঘ জীবনে।আকাশকুসুম অবাক হওয়াটা ছিল নিত্য । এই বুঝি বা মেঘ ফুঁড়ে বেরোলেন কেষ্ট ঠাকুর,এই বোধহয় ঝড়ের ভূত ঢুকে পড়ল ঘরে, রাতের বেলায় ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে কালো কালো তালগাছের মাথায়  জোনাকির দপদপানি আলো মানেই ভয়ংকর সব হাড় হিম হাড্ডিসার "ওয়াঁদের " দল আর লোড শেডিং মানেই তো নিমেষে পাড়ার সব বাড়ি যক্ষপুরী ।হাঁড়িতে ভাত ফুটছে আর ফুটছে বড় জেঠিমার গলায় গল্পের সুবাস আর লম্ফের কাঁপা কাঁপা আলোয় রান্নাঘরের বারান্দায় গায়ে গা ঘেঁষে জনা পাঁচ ছয় বিচ্ছু গল্প শুনছে নাগাড়ে, আহা, সেইসব দিন আর আজকের প্রজন্ম পাবে না। ছোট থেকে বড় রুটিনের ,হোম টাস্কের দেওয়ালে আপনি ঢেকে দিয়েছেন ওদের জীবনের সমস্ত ফাঁক ফোকর । আলো, হাওয়ার প্রবেশ সেখানে নিষেধ, বড় হওয়ার বাসনা সেখানে ঠাসা ।অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কাদামাটি মাঠে দৌড় কি জিনিস জানবেনা আজকের অপু বা দুগ্গারা । অবন ঠাকুরের সেই বুড়ো আংলা ,রিদয় কে আজকের প্রজন্ম চিনবে না ।ওরা জানবে না, সুবচনী'র খোঁড়া হাসের ইতিকথা ,কাঠবেড়ালির বৌ চুরির মজার মজার সব মন্তাজ , এমন কি কোজাগরীর রাতে ঠাকুমার পাশে শুয়ে শুয়ে ঝুলি থেকে বেরোনো শঙ্খমালা, লালকমল দের লাল নিল দুনিয়া ।

এখনও খুব ভোরের দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেলে সেই ছোটবেলার ঘুম ভাঙ্গা চোখে একটা মস্ত বড় পৃথিবী কে খুব আশ্চর্য হয়ে দেখাটা কে খুব মিস করি ।আজকের অনুজ প্রতিমরা তাদের সব বিস্ময় বোধের পোশাকটুকু হারিয়ে কেমন সাদামাটা একটা বেঁচে থাকায় থিতু হয়েছে, কারণ ছোটবেলা হারানোর সেটাই যে দস্তুর ।

No comments: