Thursday, June 23, 2016

কিস্তিমাত !! -Film review

"উজির" কথাটার বাংলা প্রতিশব্দ বোধহয় মন্ত্রী। যদিও রাজা, উজির কথায় কথায় প্রায়ই মেরে থাকি আমরা। কিন্তু ''ওয়াজির'' মানে সাদা বাংলায় ''উজির'' দেখতে গিয়ে আপনি তেমন কোনো উজির'কে খুঁজে পাবেন না। যাদের পাবেন তারা হলো এক সাসপেন্ডেড পুলিশ অফিসার , এক হুইলচেয়ার আঁকড়ে থাকা দু'পা কাটা বৃদ্ধ দাবাড়ু আর চৌষট্টি খোপের সাদা কালো দাবার ছক ঘিরে মূলত এই দুজন অসমবয়সী বন্ধুকে ঘিরে, সাদা কালো আরো কয়েকটি চরিত্র। এদের মধ্যে কেউ প্রথাগত ভাবে ভালো অর্থাত সাদা আর কেউ প্রথা মেনেই সাংঘাতিক খারাপ অর্থাত কালো। কেউ এক কদম চাল চাললে আরেক পক্ষ দুই কদম চাল দিয়ে কিস্তিমাত করে। এবং শেষ অবধি দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনই হয়, যেমনটি হওয়ার কথা ছিল এবং যেমনটি শেষতক 'ঢিসুম ঢিসুম' হিন্দি ছবিতে হয়ে এসছে।কিন্তু.....না. না ভয় পাবেন না! ওরকম করে তাকানোর কিছু নেই।এখানে সত্যিই একটা কিন্তু আছে। আর সেই কিন্তুটা কি তা দেখার জন্যেই এই ছবিটা আপনাকে দেখতেই হবে। মানে ওই ইংরিজিতে যাকে বলে 'মাস্ট ওয়াচ'।ভালো আর খারাপের লড়াইতে শতরঞ্জ খেলার সিমেট্রিটা নিপুন হাতে বুনেছেন এ ছবির তৃতীয় চরিত্র, এর চিত্রনাট্য। অনেকদিন আগে দেখা একটি ছবি মনে পরছে, স্বনামধন্য সত্যজিত রায়ের সে ছবিতে লাখনাউ এর পড়ন্ত দুই নবাবের নবাবিয়ানা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল দেশকাল, ইতিহাস ও সামাজিকতার প্রেক্ষিতে যার মূলেও ব্যবহার করা হয়েছিল এই বুদ্ধির মার প্যাঁচের খেলাটিকে। হ্যা, আমি 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি'র কথাই বলছি।এ নবাব পেয়াদা এগোয় তো, ও ঘোড়া। এ হাতি পাঠায় তো আরেকজন মোক্ষম চালে নৌকো। কিন্তু গোড়ায় গলদ তাই তো বান্দা ছেড়ে কখন বেগম হারাতে বসেন নবাব সেই প্রতিপাদ্যই সেই অসম্ভব ভালো ছবিটির গল্প। যুদ্ধু যুদ্ধু খেলার ভি.এফ.এক্স ধুন্ধুমার অ্যাকশন ছেড়ে শুধু বুদ্ধির খেল, শুধু মগজাস্ত্র! তবে কিনা সে ছবিতে শতরঞ্জ অর্থাত দাবার ছক ব্যবহার হয়েছিল প্রতিকী হিসেবে, একটা অলস অথচ ভিতরে ভিতরে গুমরে ওঠা একটা ঐতিহাসিক 'পিরিয়ড'কে তার সিগনেচার ভিসুয়াল দিয়ে ধরবার জন্যে। তবে হালফিলের এই 'উজির' সে ধার মাড়ায় না মোটে।এ ছবিতে দাবাখেলা এ ছবির শিরদাঁড়া। এ ছবির প্রতিশোধী চরিত্রদের হাল jujহকিকত থেকে কিস্তিমাতের অন্তিম মুহূর্ত অবধি সন্তর্পনে চাল চালে। পাশা উল্টে যায়, খেলা বদলে যায়, ভালো নবাব বোকা পেয়াদাকে 'হাত' করে পর্যুদস্ত করেন বদমাশ 'নবাব'কে। ফ্রেমে ফ্রেমে শীতল রহস্য আর আদ্যপান্ত হলিউডি থ্রিলে দর্শক মেরুদন্ডে অনুভব করবেন শীতল স্রোত এবং শেষ অবধি 'দি বিগ বি'কেও ছাড়িয়ে জিতে যায় এ ছবির চিত্রনাট্য।
গল্পটা খুব সোজা ও সরল। আহামরি কোনো ব্যাপার স্যাপার নেই। মাথাগরম ( সামান্য গামবাট ) সুপারকপ ফারহান আখতার ( যিনি কিনা অ্যান্টি টেররিসম স্কোয়াডের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত অফিসার ) দানিশ, ছবির শুরুতেই খুব হালকা ও রোমান্টিক এবং দৃশ্যত ফুরফুরে। খুব সাদামাটা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত রোমান্টিক কোলাজ ঘিরে দেখানো হয় দানিশ ও তার স্ত্রী অদিতি রাও হায়্দারির বিয়ে, সংসার, ঘর, গেরস্থালি। তাদের একমাত্র আদরের কন্যাকে ঘিরে তাদের জীবন। হঠাতই এক টেররিস্ট'কে ধাওয়া করতে গিয়ে ব্যাপক গোলাগুলি, সংঘর্ষ, এনকাউন্টারে মারা যায় দানিশের কন্যাটি। ছবির মোড় ঘোরে এখান থেকে। অদিতি ছেড়ে যান তার স্বামী ফারহানকে এনং ঘটনার অনিবার্য নাটকীয়তায় চিত্রনাট্যে প্রবেশ করেন, আপাত নিরীহ, বিপত্নীক, পঙ্গু অধ্যাপক, বৃদ্ধ পন্ডিত শ্রীওমকার নাথ ধর অর্থাত কিনা এ গল্পের আসল খেলোয়াড় শ্রীবচ্চন, যিনি প্রখর বুদ্ধিধর, ঝাঁঝালো দাবাড়ু এবং মরমী রসিক তো বটেই তার সাথেই 'জখমী'ও বটে। তাঁর নিজের মেয়েকেও তিনি এক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন।স্ত্রীকে হারিয়েছেন এবং হারিয়েছেন নিজের দুটো পাও। শুধুমাত্র হুইল চেয়ার আঁকড়ে থাকা এই একলা মানুষটির সাথে দাবাখেলার আপাতনিরীহ আবহে সময় কাটানোর অছিলায় দানিশের সাথে বন্ধুত্ব হয় তার। এই বন্ধুত্বের শেষতক পরিণাম ? সেটা জানার জন্যেই এ ছবি দেখতেই হবে ! বাজি রেখে বলতে পারি, পয়সা উশুল যদি কোনো ছবির উত্কর্ষের মানদন্ড হয়, তবে আপনি নির্দ্বিধায় আড়াইশো টাকা খরচ করে এ ছবি দেখে আসতে পারেন। প্রথমার্ধে টানটান উত্তেজনা, থ্রিল ও অল্পস্বল্প অ্যাকশন এর সাথেই কন্যা হারানো দুই পিতার আবেগের সমানুপাতিক টানাপোড়েন ও ব্যাস্তানুপাতিক বন্ধুত্ব, সফল হলিউডি ছবির ততোধিক সফল বলিউডি অনুসরণ।দ্বিতীয়ার্ধে, এ ছবির গতি একটু স্লথ। গল্পের সুতো সময়ের একটু আগেই যেন জট খুলতে শুরু করে আর আপনি একদম বুঝে যান, রাজা উজিরের এই যুযুধান লড়াইয়ে রাজাটি কে আর উজিরটিও বা কে ? পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারদ্বয় বারবার ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করে সন্দেহের কাঁটার অভিমুখ অবধারিত ভাবে দর্শকের হাতে তুলে দেন, আর তুরুপের তাস হাতে পেয়ে গেলে পেশাদারী 'হু ডান ইট' এ যা হয় , অর্থাত টানটান সাসপেন্স আর নির্মেদ ছবি দেখার বুদ্ধিদীপ্ত কিকটা তেমন করে আর ঝাঁকুনি দেয় না, আপনিও হাতঘড়ি দেখতে থাকেন, ছবি শেষে শেষ ট্রেনটা পাব তো ?
অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে নতুন কোনো কথা বলতে হলে অভিধান খুঁজেও লাভ নেই। লোকটি যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন নিজেকেই ছাপিয়ে, নিজেকেই হারিয়ে, শেষ খেলার থেকে বিজয়্সুচক পয়েন্ট আরো একঘর বাড়িয়ে স্কোর করছেন আর জিতে যাচ্ছেন আবার বিপুল নম্বরে। শুধুমাত্র একপিস হুইলচেয়ারে বসে শরীরের অপরের অংশ ব্যবহার করে ওই লেভেলের অভিনয় বা অনভিনয় করা, শুধু বোধহয় ওঁর পক্ষেই সম্ভব।ওঁর জন্যে চরিত্র লেখা হয়, হয়েছে এবং হবেও।ফারহান আখতার যত না ভালো পরিচালক তার চাইতেও বোধহয় ভালো অভিনেতা হয়ে উঠছেন। টানটান শরীরী ভাষা আর ভাবলেশশুন্য বুদ্ধির দৌড়ে ফারহান টক্কর দিয়েছেন বচ্চনের সাথে। জন এব্রাহামের হাতে সত্যি কাজ নেই বোঝা যায় নইলে এমন ছোট একটি চরিত্রে তিনি কাজ করতেন না আর নিল নিতিন মুকেশ সাইকো খুনির কাল্পনিক তরজায় বেশ কাজ করেছেন কিন্তু কোনটা অতি অভিনয় আর কোনটা অভিনয় না করেও অভিনয় সেই মাপকাঠি তাকে শিখতে হবে ! অদিতি রাও এর বিশেষ কিছুই করার ছিল না তবে প্রায় সংলাপ শুন্য তার চরিত্রটির অভিব্যক্তি ফারহান কে সাহায্য করেছে তার চরিত্রটিকে তৈরী করতে। একজনের কথা বলতেই হয় যিনি এ ছবির এক বুদ্ধিদীপ্ত আবিষ্কার, তিনি মানব কাউল। খুরেশির চরিত্রে তার ক্ষিপ্র অথচ শান্ত অভিনয়, বলিউডে জায়গা করে নেবে।
শেষমেষ বলি, এ ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন বিধুবিনোদ চোপরা ও অভিজাত জোশী ( মুন্নাবাই খ্যাত ) ! কি বললেন ? হতেই পারে না ? সেটাই হয়েছে মশাই। বিধুবিনোদ বললেই আপনারা ললিত লাবন্যের লাভ স্টোরি ভেবে বসেন তো ! এবার দেখুন , ছুরি ছোরা, গুলি গোলা দিয়ে কি কান্ডটাই না বাধিয়ে বসেছেন ভদ্রলোক ! এর পরেও শুধোবেন 'উজির'টা কে ?

No comments: