রায়ার
ফোনটা রেখেই আকাশের দিকে চোখ পড়ল অনীকের । ভালো রকম কালো করে এসেছে । মাঝে মধ্যেই গোলাপী
গোলাপী আলো চমকে উঠছে মেঘের গাড় অন্ধকার থেকে । আজ ঢালবে ভালো রকম । যদিও কাঁচের এপার
থেকে হাওয়াটা টের পাওয়া যাচ্ছে না, তবে গাছের মাথাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে, আজ কপালে
দুঃখ আছে । আজ রাত্রে ১০.৪০ এ দিল্লির ফ্লাইট । এখন বাজে ৬ টা । চট করে ঘড়িটা দেখে
নিয়ে অনীক মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় আজ তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পরবে । এয়ার পোর্টে পৌঁছে
ওয়েট করা ভালো , রাস্তায় যদি বৃষ্টিতে আটকে যায় আবার । কার পুলে ফোনটা করে দিয়েই একবার
ওয়াশরুম থেকে ঘুরে আসে অনীক । কাল সকালে মিসেস চাওলার সাউথ দিল্লির বাংলোতে ইন্টারভিউ
, এই হলদে পাঞ্জাবি আর জীন্সে কি খুব খারাপ দেখাচ্ছে ওকে ? খানিকক্ষণ নিজেকে আয়নায় দেখে মুখ দিয়ে অদ্ভূত ভাবে ফুঃ করে একটা আওয়াজ করে
ওয়াশ রুম ছেড়ে বেরিয়ে ডেস্কে ফেরে অনিক । দেখালেই বা কি এলো গ্যালো ? সাংবাদিকতাতে
এতগুলো বছর পরে এসব আর ম্যাটার করে না ওর কাছে । এমনিতেই এ ধরনের ছোট্ট স্টোরি কভার
করতে গেলে এক রাতের জন্য কোনো চেঞ্জ নেওয়া ওর জাস্ট পোষায় না , রায়া তাও জোরজার করে
প্যাক করে দেয় খানিক । হাজার হোক, রাজ্যের প্রথম শ্রেনীর সংবাদপত্রের সিনিয়র জার্নালিস্ট
বলে কথা । যদিও এসব ভার্শন রায়ার । অনিকের এসব কিছুই মনে হত না , এখনো হয় না ।
দিল্লির
স্টোরিটা আসলে একটু অন্যরকম । অনীক যে ধরনের লেখালেখি করে মানে হার্ডকোর পলিটিকাল স্টোরি
,
এটা
কিন্তু তার থেকে আলাদা । এবারের স্যাটারডে সাপ্লিমেন্টারি'র বিষয় ."অন্য রকমের
ভালবাসা " । ভালবাসা নিয়ে বিয়ের আট বছর পরে আর কি’ই বা লেখা যায়...তাও আবার অন্য
রকমের ভালবাসা ! আইডিয়াটা দিয়েছিল মধুমিতা দি। সেই যে সুনীল গাঙ্গুলির লাইন..."আমি
এক অন্য রকমের ভালবাসার গয়না নিয়ে জন্মেছিলাম " সেই থেকেই কভার স্টোরির জন্ম ।
অনিক লিখতে চেষ্টা করেছিল মৌলিক কিছু...কিন্তু কেন জানি না. মায়ের মুখটা ছাড়া আর বিয়ের
আগে আগে রায়ার সাথে কাটানো কিছু মুহূর্ত ছাড়া আর কিছুই ওর মনে এলো না, পেন এর ডগাতেও
নয় ।
মা
আদ্যাপীঠে থাকেন, আজ প্রায় বছর আটেক । কলকাতার
বাড়িতে মায়ের দম আটকে আসে । ওখানে , ছোট ছোট বাচ্ছাদের পড়াশোনা দেখা, আশ্রমের কাজ,
আর পুজো ধ্যান, এসব নিয়ে মা বেশ আছে । কলকাতার বাড়িতে শুধু অনীক আর রায়া । আজ আট বছর
পরেও ওদের কোনো ইস্যু নেই । রায়া ও একটা নামকরা নিউস চ্যানেল এ এসিস্টেন্ট । সাত সকালে
ব্রেড টোস্ট আর অমলেট খেয়ে দুজনে দু’দিকে । রাতে কোনদিন দেখা হয়, কোনদিন হয় না । এর
মধ্যে অন্য রকমের ভালবাসা নিয়ে লিখতে গেলে ভাবতে হয় বইকি । দুদিন পেন চিবিয়েও যখন মাথায়
কিছু এলো না, শেষমেষ দিল্লির এই এন. জি.ও কে
নিয়ে স্টোরি’টা করার আইডিয়া এলো অনীকের । ভদ্রমহিলা পাঞ্জাবি , নামকরা এক শিল্পপতির
স্ত্রী । সম্প্রতি ওই রেড লাইট এরিয়ার বাছাদের নিয়ে অনেক কাজকর্ম করছেন, জীবনের মূলস্রোতে
ফেরানোর চেষ্টা করছেন...ইত্যাদি, ইত্যাদি । আর সেটা কভার করলে ব্যবসার দিক থেকেও বেশ
কিছু মুনাফা আসতেই পারে । সুরঞ্জনদা তাই কাল রাত্রেই ফোনে জানালেন, এটা মিস করিস না
। রথ দেখা, কলা বেচা দুটোই সেরে ফেল । প্রপান্গাডা ও হলো আবার আমাদের ইসুর সাথেও একেবারে
খাপে খাপ ।
সুরঞ্জন
দার কথা টা শুনে একটু রাগ হলেও, অগত্যা এ ছাড়া আর কিছু উপায় তো নেই । সকালে ঘুম থেকে
উঠে অনীকে আজ খেয়াল করলো রায়া র চোখ মুখ বেশ
ফোলা ফোলা । ঠান্ডা লেগেছে কিনা জিগ্গেস করতেই প্রশ্ন টা এড়িয়ে, কফির কাপটা নিয়ে কিচেনের
লাগোয়া টেবিলটায় গিয়ে বসলো রায়া । কাছে গিয়ে কাঁধে আলতো করে হাত রাখল অনিক , রাগ টা
কেন বুঝতে পারলনা । এমাসে তো এখনো পর্যন্ত
সবে হাতে গুনে ম্যাক্সিমাম দিন দশেক রাত্রে
বাড়ি ফেরেনি ও, অন্যবার তো আরও লেট হয় । খানিকক্ষণ আকাশ কুসুম বোঝার চেষ্টা করার পরে
রায়া হঠাত ওর হাতে ধরিয়েছিল ডাক্তার খাস্তগীরের রিপোর্টটা । সাদা এনভেলপে'র মধ্যে ভাঁজ
করা দামী লেটার হেডটা খুলতেই রিপোর্ট জানান দিল , এবারেও নেগেটিভ । চোখ ফোলার কারণ
বুঝতে পারল অনীক । তার মানে কালকেও সারারাত ঘুমোয়নি রায়া । শহরের সেরা ইনফার্টিলিটি
ক্লিনিকে কন্সাল্টেশন করেও আজ ৫ বছর ধরে কোনো ফল আসছে না ওদের । একটা সন্তানের জন্যে
এত চেষ্টা , অর্থের অভাব নেই, কিছুর অভাব নেই ওদের, কিন্তু সন্তান এলো না । প্রথম চার বছরের মাথায় যখন প্রেগনেন্সির খবর শুনেছিল, আনন্দে
সেদিনই একটা ইয়াব্বর হাসিখুশি বাচ্ছার পোস্টার নিয়ে বেডরুমে লাগিয়েছিল অনীক । চার মাস
পরে ধরা পরেছিল..বাচ্ছা ওর নষ্টহয়ে গেছে । ডাক্তারি পরিভাষায়. .'ড্রাই প্রেগনেন্সি
' । অসম্ভব ভেঙ্গে পরেছিল রায়া । অনীকও যে মনে মনে ভেঙ্গে পরেনি না নয়, কিন্তু অদেখা
অজানা সেই শিশুর থেকেও তার মন পরেছিল রায়ার দিকে । সে যাত্রা সামলে উঠতে রায়ার অনেকদিন
সময় লেগেছিল, তারপর অফিসে জয়েন করার পর আস্তে আস্তে সুস্থ হয়েছিল সে। সেই থেকে আজ আরো
চার বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু ওদের ঘর খালিই রইলো । গরিয়ার এই নতুন ফ্ল্যাট এ প্রথম প্রথম
ভালো লাগলেও , এখন আবার ওদের মধ্যে একটা শুকনো দুরত্ব তৈরী হয়ে গেছে । কোথাও যেন একটা
মস্ত বড় রকমের তাল কেটে গিয়েছে ।
কারপুল
থেকে ফোনটা আসতেই , ল্যাপটপ , ব্যাগ, ক্যামেরা আর ডিকটাফোনটা গুছিয়ে প্যাক করে নিয়ে
চট করে বেরিয়ে পড়ল অনীক । রিসেপশন এর ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে আসতেই হাওয়ার
দাপটে চোখ মুখ অন্ধকার । ধুলোর ঝড় উঠেছে বেতাল রকম । বাইরের চায়ের দোকানের খোলার চাল
গুলো উঠছে, পরছে । কালো কুচ কুচে মেঘের নিচে আধ ভূতুড়ে লাগছে চেনা শহরটা । কোনক্রমে
ভারী ব্যাগটাকে এম্বাসাডর এর পিছনের সিটে রেখে ড্রাইভারের পাশে বসে পড়ল অনিক । শম্ভুদা
পুরনো লোক । হালকা হেসে বলল ...আজ এত জলদি বেরোলে যে, ফ্লাইট তো সেই রাত্রি দশ’টা ।
অনিক ইঙ্গিতে সামনের আকাশের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো । হা হা করে খানিক হেসে শম্ভুদা
বলল, ঠিক করেছ, আজ ভোগাবে । গনেশ এভিনিউর সিগনাল তখন লাল থেকে সবুজ হয়েছে আর গাড়ি ছুটল
উত্তর কলকাতার দিকে । সামনের উইন্ড স্ক্রিনের গায়ে ততক্ষণে বড় বড় হিরে কুচির মত জলের
ফোঁটা । উজ্জ্বল লাল আলোয় সেগুলোকে রক্তের ফোঁটার মতই দেখাচ্ছে । এরপরে শুরু হলো শিলাবৃষ্টি
। শোভা বাজার এর মেট্রোর আগেই গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল জ্যাম এ । সামনে উদ্দাম ঝড় আর ঝড়ো হওয়ার
সাথে মুষলধারে বৃষ্টি । আকাশ যেন প্রায় ফুটো হয়ে এসেছে আজ । গাড়ির কাঁচ তুলে দিয়েও
রেহাই নেই, কাঁচের ফাঁক দিয়ে কলকল করে জল গড়িয়ে এসে ভিজিয়ে দিছে পাঞ্জাবির ডান পাশটা
। মিনিট পনের’র মুষলধারে বৃষ্টি প্রায় ভাসিয়ে দিল শহরটা কে । অনীক লক্ষ্য করছিল ছাতা
ছাড়া অফিস ফেরত বাড়িমুখো ভিড় কিভাবে অসহায়ের মত ছুটোছুটি করে একটু শেল্টার এর জন্যে
দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এদিক, ওদিক । জল ঠেলে বেশ খানিকটা এগোনো গেলেও, বিধি বাম । সামনে একটা
বিরাট আমগাছের ডাল ভেঙ্গে ট্রাম লাইনে পরে গেছে । সেটাকে না সরালে গাড়ি নড়ার কোনো সম্ভাবনা
নেই...ওদিকে পিছনের রাস্তাতেও বিরাট জ্যাম ।এদিকে, অনিকের গাড়িও নড়ছে চরছে না । শম্ভুদা বেগতিক দেখে জানালো, কার্বুরেটরে জল ঢুকেছে
, গাড়ি সার্ভিসে নিয়ে যেতে হবে, যদিও হাতে খানিকটা সময় আছে, তবুও কোথাও একটা শেল্টার
নিতে হবে, শম্ভু দা গাড়ি ঠিক হলে ফোন করে জানাবে ।
গাড়ি
থেকে নেমেই ডানদিকের একটা পুরনো বাড়ির গাড়ি বারান্দায় আশ্রয় নিল অনিক । এবার পাঞ্জাবিটা
পুরোপুরি ভিজলো , পিঠে ব্যাগ আর মোবাইল, জল থেকে আড়াল করে পকেট থেকে রুমালটা বের করতে
গিয়ে খেয়াল হলো, ওটা বোধহয় গাড়িতেই ফেলে এসেছে । চশমার কাঁচ বেয়ে টপটপ করে জল , কিছু
না হলেও সেটা না মুছলে তো দেখাই অসম্ভব । ঠান্ডা বরফের মত হাওয়ার দাপটে আরও দু চারজন
জড়ো হলো ওখানে । সকলেই ভিজে চুপচুপ । সকলেরই মুখে চোখে উদ্বেগ । বাড়ি ফেরা হবে কি করে
? হঠাত অনিকের চোখে পড়ল দুটো বাচ্চার ওপর । কত আর বয়েস হবে ? ওই চার- পাঁচ । একটা ছেলে
আর আরেকটা তার বোন্ । সারা গায়ে ছেঁড়া একটুকরো জামা , খালি পা , খালি মাথায় বৃষ্টির
ঠেলা খেতে খেতে কোনক্রমে মাথা গলিয়ে দিয়েছে ওই ভিড়ের মধ্যে । মেয়েটার চোখেমুখে আতঙ্ক...তার
এই ছোট্ট জীবনে এমন বৃষ্টি সে আগে বোধহয় দেখেনি । ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সে তার হাত
দুটোকে জোড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে । বোধহয় যেন ঈশ্বর কে ডাকছে, যেন এই প্রলয় বন্ধ
হয় । ন্যাড়া মাথা ছেলেটার কদমফুলের মত মাথায় বৃষ্টির জল কুচি কুচি হয়ে আটকে রয়েছে আর
দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে সবার পায়ের নিচে ওরা দুটিতে চুপ করে বসে থির থির করে কাঁপছে
। অনিকের মনে হলো, ওরা যেন ঝরে ডানা ভেঙ্গে
যাওয়া, বাসা উড়ে যাওয়া দুটো শালিখ পাখি । প্রথমটায় , জোর করেই চোখ সরিয়ে নিল সে । পকেট
থেকে সিগারেট ধরিয়ে মোবাইলের দিকে তাকালো...জেট থেকে এস.এম.এস করেছে ফ্লাইট ডিলেইড
। রাত্রি ১১.৩০ এর আগে বোধহয় ছাড়ার চান্স নেই । শম্ভুদা গাড়ি নিয়ে আসতে আসতে অবশ্য
দেরীই হবে । সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অনিক লক্ষ্য করলো, কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ওর
। না, ভেজার জন্যে নয় । ওই বাচ্চা দুটোর ভিতু, অসহায় চোখ গুলো ওকে কি অদ্ভূত একটা অস্বস্তি
দিচ্ছে । পিছন ফিরে দেখল, এখনো ওরা ওই ভাবেই...কাঁপছে । প্রশ্ন করলো অনিক, ...''কোথায়
থাকিস তোরা ? বাড়ির লোক কোথায় ?" ছেলেটা মাথা তুলে ঢোঁক গিলে গিলে জানালো ওরা
ট্রাফিক সিগনালে ভিক্ষা করে ।
ওরা
মানে ওদের মা আর ওরা দুজন । শোভাবাজার মেট্রোর অন্য মুখে যে লালমন্দির তার পাশে কোথাও
একটা থাকে । বৃষ্টি শুরুর সময় যে ধুলোর ঝড় শুরু হয়েছিল , তখন থেকে ওরা ওদের মা কে খুঁজেছে
এদিক ওদিক ..কিন্তু আর পায়নি । তার মধ্যে শিলাবৃষ্টি আর জলের তোড়ে প্রায় মোচার খোলার
মত ভাসতে ভাসতে এখানে এসে উঠেছে । অনীকের গলার
কাছটা কেমন দলা পাকিয়ে উঠলো । কি একটা ভাবতে ভাবতেই মোবাইল আর রিস্টওয়াচ'টাকে ব্যাগ
এর ভিতর পকেটে চালান করে ব্যাগটা পিঠে ভালো করে বেঁধে নিয়ে অনীক, বাচ্চাগুলোকে বলল
, "চল, আমার সাথে যাবি ? আমি নিয়ে যাব তোদের মায়ের কাছে ।" মেয়েটা কাঁপতে
কাঁপতেই ঘাড় নাড়ল । আর ছেলেটা বিস্ময় মেশানো চোখে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো
অনিকের দিকে । তার এই বছর পাঁচের লাথি ঝাঁটা আর গালাগালি খাওয়া জীবনে এমন অদ্ভূত কথা
সে বোধহয় এর আগে শোনেনি । কিছু বলার আগেই আসে
পাশের লোকজন একটু উশখুশ করে উঠলেন..আরে, ভিখিরি'র বাচ্চা, এদের নিয়ে আবার এত নাটকের
আছেটা কি ? এরা তো রাস্তাতেই থাকে । অনিকের চোয়ালটা একটু শক্ত হয়ে এলো, কিন্তু এদের
সাথে মুখে কিচ্ছু বলার প্রয়োজন অনুভব করলো না সে ।
মেয়েটাকে
কোলে তুলে আর আরেকহাতে ছেলেটাকে প্রায় ঝুলিয়ে নিয়ে দুর্যোগের রাস্তায় পা রাখল অনীক । লোকজনের মুখগুলো বিস্ময়ে
খানিকটা বিস্ফারিত হলো ঠিকই , কিন্তু তাতে
আর কে পরোয়া করে । প্রায় হাঁটু জল ভেঙ্গে রাস্তার আরেকদিকে যাওয়াটা খুব সহজ নয় এই অবস্থায়
। তবু দুটো শিশু কে আঁকড়ে ধরে এই যাওয়াটুকু মনে মনে খুব উপভোগ করছিল অনীক । ওর এই বত্রিশ
বছরের জীবনে, এমন ঘটনা আগে বোধহয় ঘটে নি, যেখানে কেউ ওর ওপর ভরসা করে , ওর দিকে তাকিয়ে
রয়েছে । বাচ্চা মেয়েটা দুটো হাত দিয়ে ওর কাঁধ প্রায় জাপটে ধরে আছে আর ছেলেটা ওর কোমরের
সাথে আটকে । রাস্তার অন্য দিকে সিগনালের কাছে পৌছতে পৌছতেই প্রায় মিনিট দশেক কেটে গেল
। এক একটা গাড়ির ধাক্কায় রাস্তায় জমা জলে ঢেউ এর মত স্রোতে হাঁটাটাই দুঃসাধ্য । তার
ওপর ভারী চামড়ার বুটে জল ঢুকে যা হলো, এর্কেবারে ত্রহস্পর্শ । ছেলেটা আঙ্গুল দিয়ে দেখালো
সিগনাল পেরিয়ে ফুটপাথের ধারের একটা পরিত্যক্ত বাস স্ট্যান্ড ..ওখানেই ওর মা থাকে ।
মানে ঝড়ের আগে অবধিও বোধহয় ছিল । জলের তোড়ে ফুটপাথের ধারের প্লাস্টিক ছাউনি গুলো একেবারে
বেসামাল । হাঁড়ি , কড়াই, নিত্য প্রয়োজনের টুকি টাকি, তেলের শিশি , ভেসে আসছে রাস্তায়
। এভাবেও মানুষ বেঁচে আছে এই শহরে ! অনীক ভাবলো ।
কুপি জ্বালানো..এক একটা সংসার...কাগজ দিয়ে , প্লাস্টিক দিয়ে, পলিথিন দিয়ে বানানো
মাথার ওপরের এক টুকরো আচ্ছাদন সম্বল করেই এই মানুষ গুলোর এক একটা গোটা জীবন বাঁচা
!
বাস
স্ট্যান্ড এ পৌঁছে বাছা দুটোকে রেখে, অনীকের মনে হলো ওদের গা মোছানোর কিছু একটা দরকার
। ঠান্ডায় ,ভিজে কুঁকড়ে থাকা দুটো প্রাণ ওরই
মুখের দিকে তাকিয়ে । এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু না পেয়ে শেষে মরিয়া হয়ে আবার জল পেরিয়ে
রাস্তার অন্যদিকে এসে চোখে পড়ল হেলে পরা চায়ের দোকান এর পিছনেই উঁকি মারছে আলো ঝলমলে
একটা বিউটি পার্লার । কাঁচের দরজায় টোকা দিতেই এক মাঝবয়েসী নেপালি মহিলা উঁকি দিয়ে
বললেন...”কেয়া মাংতা ?” অনেক কষ্টে অনিক বোঝালো , যে ওর একটা তোয়ালে চাই । পুরনো হলেও
চলবে । “নেহি হ্যায়” । মুখের ওপর স্পষ্ট বলে দিলেন মহিলা । আবার দরজা নেড়ে অনিক বোঝালো,
দুটো বাচ্চার জন্য ওটা প্রয়োজন খুব । সঙ্গে সঙ্গে মহিলার গলাও ভিজে এলো, ওহ..করে একটা
বিস্ময়সূচক আওয়াজ করে সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে নিয়ে এলেন একটা গোলাপী রঙের হাত তোয়ালে
।“এটা যে আর ফেরত দিতে পারব না”...অনীক এর কথার সঙ্গে সঙ্গেই..মহিলা বললেন..”.না ,
না দিতে হবে না...ইউ কিপ ইট ম্যান ।“ ...গলার কাছে আবার যেন দলাপাকিয়ে উঠলো অনিকের
। এই জন্যেই এই শহরটা আজ ও এত জীবন্ত । জল ঠেলে বাস স্ট্যান্ড এ পৌঁছিয়ে বাছা দুটোকে
আপাদমস্তক মুছিয়ে ওদেরই শুকনো একটা পুঁটলি থেকে বেরোলো কয়েকটা ময়লা ন্যাকড়ার মত জামা
কাপড় । সেইগুলো পরিয়ে অনীকের মনে হলো ওদের একটু গরম দুধ খাওয়ানো দরকার । এবার দুধের
সন্ধানে আহীরী টোলার রাস্তা ধরা ছাড়া আর উপায় ছিল না । রাস্তার মোড়ের বিদ্যুত সংযোগ
প্রায় ছিন্ন । টিমটিমে আলোয় আর জল ঠেলে মিনিট পাঁচেকের চেষ্টাতে একটা চায়ের দোকান খুঁজে
পাওয়া গেল অতি কষ্টে । দুধ এর কথা বলতেই বিহারী
দোকানদার পান খাওয়া দাঁত বের করে বললেন, দুধ দেওয়া যাবে না , ও শুধু চায়ের জন্যে ।
অগত্যা একটা খালি মিনারেল ওয়াটার এর বোতল কিনে তাতেই বেশি করে দুধ দেওয়া গরম চা আর বিস্কিট ভরে , রওয়ানা
দিল অনিক । বৃষ্টিটা একটু ধরে এসেছে তখন ।
বাস
স্ট্যান্ড এ পৌঁছেই জরোসর দুই শিশু’র সাথে এক বৃদ্ধাকে দেখল অনীক ।মা হওয়ার বয়েস এর
নেই, তবে সম্ভবত এঁকেই বাচ্চারা মা বলে ডাকছিল । বৃদ্ধা ওঁর দুটো শীর্ণ হাতে বাচ্ছা
দুটোকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলেন । অনিক পৌঁছতেই বাচ্ছারা হাত বাড়িয়ে দিল ওর দিকে । বিস্কিটের
প্যাকেট ছিঁড়ে একটা একটা করে গোগ্রাসে গেলা তৃপ্তির সেই মুখ আর গরম চায়ে চুমুক দিতে
দিতে ওদের তিনজন এর সেই পুনর্মিলন অনেকক্ষণ
প্রাণ ভরে দেখল অনিক । তারপর আস্তে আস্তে ওদের দুটো ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে যখন অনীক তার পৃথিবীতে ফিরছে, তখন রাস্তায় ঘোলা জলে বৃষ্টি শেষের
তর্জন গর্জন মুছে ,মোচার খোলের মত ভাসছে অজস্র, খেলনাপাতি সংসার ।হাওয়া দিচ্ছে জ্বর
শেষের বিকেলের মত । অসম্ভব হালকা লাগছে অনেকদিন পর । মনে হচ্ছে হাত দুটো যেন ডানা আর
বুকের উপর থেকে অনেকটা ওজন যেন নেমে গেছে আজ |আজ বাড়ি ফিরে রায়া’কে আবার নতুন করে ভালবাসবে
সে । আবার মন বাঁধবে...পোস্টার এর বাচ্চাটা ওদের জীবনে আসবেই একদিন । পিছনের দিকে ফিরে তাকালো অনীক, একটুর জন্যে| ঝাপসা
কাদার মত বৃষ্টিতে শুধু চোখে পড়ল তিন জোড়া উজ্জ্বল চোখ । অনেকখানি কৃতজ্ঞতা গাঁথা ছিল
ওই দৃষ্টিতে । আকাশের জল কখন যে অনিকের চোখেও
জল এনে দিয়েছে, খেয়াল করেনি সে । খেয়াল করলো যখন, তখন ব্যাগ এর ভিতর মোবাইলটা বেজে
চলেছে তারস্বরে । সম্বিত ফিরলে ব্যাগ খুলে ফোনটা বার করলো অনীক । শম্ভুদা অপেক্ষা করছে
অনেকক্ষণ হাতিবাগানের মুখটায় । তাড়াতাড়ি পা বাড়ালো সে । মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল
সুনীল গাঙ্গুলির লাইনগুলো। .." আমি এক অন্য রকম ভালবাসার গয়না শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম.."
কই, এতদিন টের পাইনি তো ! ফোনটা আবার বাজতেই
স্ক্রিনে এবার রায়ার মুখ । ফোন তুলেই অনিক জানালো, তারাতারি বাড়ি ফিরো, আজ খিচুরী খাব
রাত্রে । রায়া ফোনের ওদিকে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে , অনেকটা অবাক হয়ে , শুধু অস্ফুটে
বলল, মানে ? তোমার স্টোরি ? দিল্লির ফ্লাইট
? অনিক মুচকি হেসে বলল..." দরকার নেই । স্টোরি পেয়ে গেছি ।"
~
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment