প্রিয় পার্থ,
এটাই সম্ভবত তোকে লেখা আমার
প্রথম ও শেষ চিঠি ! তুই আমার লেখা পড়তে ভালোবাসতিস। যদিও নিজেও এতো ভালো লিখতিস তবুও
দেখা হলে পরেই বলতিস, তোর জন্যে অন্যরকম কিছু লিখে দিতে। অন্যরকম মানে সেটা কবিতাও
হতে পারতো, বা মুক্তগদ্য অথবা ঐরকম কিছু, কিন্তু আমি চিঠিটাকেই বেছে নিলাম! আজকাল তো
আর কেউ চিঠি লেখে না, ফেসবুক অথবা হোয়াটসএপেই কাজ সারে। বেশিরভাগই ইমোটাইকোন, ইমোশন
নয় ! ছোট্ট ছোট্ট গোল মুখেই ওপর পক্ষকে জানিয়ে দেওয়া যায় হাসি, বিরক্তি, রাগ ইত্যাদি নানারকম আবেগের ওঠা
পড়া। কিছুই আর সহজে গায়ে লাগে না, কি বল ! কিন্তু দ্যাখ, চিঠিতে যত সহজে যত কথা বলা
যায়, অন্য কিছুতে যায় কি ? আর আমরা তো সেই পুরোনো প্রজন্মেরই, যারা কালি কলমে মন রাখি
এখনো, মন উজাড় করতে পারি সাদা কাগজের এক খন্ড পোস্টকার্ডের দুই ইঞ্চি জমিতেও, তাই না
! তাই লিখছি ! যদিও এতদিন পরে, হয়তো যখন তুই মনে মনে ভেবে নিয়েছিল, সে লেখা আর কোনোদিন
ও আসবে না, তবুও তোর অনুরোধটা কিন্তু মাথায় ছিল, সময়ের অভাবে লিখে উঠতে পারছিলাম না
! দ্যাখ, আমায় কিন্তু বলতে পারবি না, আমি কথা রাখিনি ! আমি রেখেছি কিন্তু তুই কথা রাখলি
না! কাল রাতে কাউকে কিচ্ছুটি না জানিয়ে চলে গেলি !
পার্থ, তোর সাথে তো এমন কথা
ছিল না। আমাদের একসাথে বুড়ো হওয়ার কথা ছিল, সারাজীবনের দস্তুরমতো দৈনন্দিন যুদ্ধে সংসার
করতে গিয়ে যা যা করতে পারিনি, সেই সব করতে পারার ইচ্ছে ছিল! আমাদের কথা ছিল, একসাথে
মানুষের জন্য একটা কিছু করার। একটা বৃদ্ধাশ্রম অথবা অনাথ বাচ্ছাদের জন্যে একটা মাথা
গোঁজার আশ্রয়, অথবা জানিনা এরকমই একটা কিছু, মনে পড়ছে তোর, সেই যে আমি বলতাম, ধুস,
ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেলে সোওজা হিমালয় হাঁটা দেব আর তুই বলতিস, কাজ করতে হলে মানুষের মধ্যে
থেকেই করতে হবে! সত্যি তো, অনেক কাজ বাকি থেকে গেলো যে! অসময়ে কথা ভেঙে চলে গেলি ?
তোর সাথে আলাপ আমার খুব বেশি
তো দিন নয়! বড়োজোর হাতে গুনে বছর দশ-বারো । প্রথম বার আলাপ করিয়ে দিয়েছিলো আমাদের দুইজনেরই
কমন বন্ধু , শুভ্র ! সেই তোদের বড়বাজারের ঘুমটি অফিসের যৌথ উদ্যোগ। তোদের একসাথে কনসালটেন্সি
ফার্ম। এক শনিবারের দুপুরে হাজির হয়েছিলাম ওখানে। তোকে প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল.....
কি মনে হয়েছিল জানিস, মনে হয়েছিল যেন খুউব চেনা। সেই যে, অপুর সংসারের মতো, যখন প্রথম
অপুকে দেখে বন্ধু পুলুর মামিমা বলে ওঠেন,' এ মুখ আগে কোথাও জানি দেখেছি,' তারপর খানিকক্ষণ
ভেবে বললেন, ' মনে পড়েছে, ঠাকুরের আসনে, ঠিক যেন কেষ্ট ঠাকুরটি।' অনেকটা সেইরকমই অনুভূতি
হয়েছিল আমার ও। তোর ঝকঝকে হাসিখুশি গোলগাল চেহারাটায় একটা অদ্ভুত ভালোমানুষ এর সংজ্ঞা
লেখা ছিল। এমন কেউ, যার ওপর চোখ বুজে ভরসা করা যায়। এমন কেউ বা কিছু, যার কাছে দাঁড়ালে
মনে হয় যেন এর মনের আকাশ আছে। সেই আকাশে অনেক জায়গা, সকলের জন্যে। নিশ্চিন্ত লাগে,
ভালো লাগে।
সেই শুরু ! তারপর থেকেই সময়ের
সাথে সাথে তুই কত কাছের হয়ে গেলি! খুব যে ফোনে কথা হতো বা দেখা হতো তা তো নয়, নিজের
নিজের জীবন নিয়ে আমরা সকলেই ব্যস্ত খুউব। তবে যখনি হতো, আমাদের মনে হতো যেন ঠিক গতকালই
দেখা হয়েছিল এবং সেই যেখানে কথা শেষ হয়েছিল আবার সেখান থেকেই শুরু। অজস্র,অযুত শব্দরা
ভিড় করতো আমাদের মুখে। আমরা কথা বলতাম ঈশ্বর নিয়ে, জীবনে বেঁচে থাকার সহজিয়া মুহূর্তগুলো
নিয়ে, ভালো রাখার ও ভালো থাকার সহজ সব উপায় নিয়ে, কোনোদিন আমাদের মধ্যে বিষয়ের অভাব
হয়নি, কি বল ! কি আশ্চর্য ভাবে আমরা তথাকথিত লাভ লোকসান নিয়ে কোনোদিন কথা বলিনি, কথা
বলিনি আর্থিক পরিকল্পনা বা গাড়িবাড়ি নিয়েও।বন্ধুদের মধ্যে কে কত বড়োলোক হলো, কে বিদেশভ্রমণে গেলো, কে আবার
অডি কিনেছে, সেই সব নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহই ছিল না। আমাদের বিষয় ঘিরে থাকতো প্রিয়
কবিতা, চেনা মানুষ আর জীবনের হাজার রকম উত্তাপের জিয়নকথা। সমস্যা আমাদের ও কিছু কম
ছিল, বল ? কিন্তু সেই মুশকিল আসানে অনিবার্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিস, সবসময়।
পরনিন্দা নয়, পরচর্চা নয় শুধু ব্যক্তিগত সংকটে ডুবে যেতে থাকা দুটো মানুষ যেভাবে অনিবার্য
বিচ্ছেদের আগে খড়কুটো আঙ্গুল বাড়িয়ে দেয় পরস্পরের দিকে, ঠিক সেই ভাবেই ছুঁয়ে থাকা,
ভরসার আঙ্গুল ধরে থাকা! অফিসফেরত দেখা হওয়ার সময় এক একদিন এমনও হয়েছে, আমাদের সেই
'কানাইলাল মিষ্টান্ন ভান্ডারের' দোকানের সামনে কথা শুরু করে সময় গড়িয়ে গেছে ঘন্টা দেড়েক,
কিন্তু আমাদের থামায়, সাধ্যি কার ! হুঁশ ফিরত বাড়ি থেকে ফোন এলে, নাঃ, এবার যেতেই হবে।
আমায় দেখা হলেই , ডাকতিস
,'কি সাহেব, কেমন আছো '? আর আমি বলতাম,' সাহেব আমি না তুই । গায়ের এমন রং তোর, অন্ধকারে
দাঁড় করিয়ে দিলেও ৪৪০ ভোল্টের মতো জ্বলজ্বল করবি তুই !' শুধু যে ফর্সা রং গায়ের তা তো নয় তোর মনের রংও ছিল ঠিক ঐরকম ফর্সা। প্রতিবার
যেমন হয়, তোর ঝকঝকে হাসিমাখা মুখ আর প্রশ্রয় ভরা কৌতুকে টুপটুপ চোখগুলো দেখলেই মনের
ভেতর কোথাও যেন একটা আনন্দের ঝাপ্টা লাগে। মনে হয়, এখানে দাঁড়াই, দু দন্ড কথা বলি।
শেষবার দেখা হলো তোর সাথে মাসখানেক আগে ! সেই স্টেশন রোডেই, তুই মেয়েকে বাড়ি পৌঁছে
দিলি আর আমার সাথে গপ্পো শুরু করলি! নানা কথার মধ্যেই আমায় বললি, 'তোর জন্য আমার খুব
গর্ব হয়। ছবি আঁকছিস, লিখছিস, ফটো গ্রাফি, এই এতসব কিছু করিস কি করে ?' আমি হেসে বললাম,'
কিস্যু করতে পারিনা রে!এসব যা করি সেটা একান্ত নিজের জন্যে করি। অন্য কিছুর জন্যে নয়
! কিছু পাওয়ার জন্যে নয় ! জীবন যে অক্সিজেনটুকু কেড়ে নেয়, সেই অক্সিজেন কোষে কোষে ভরে
নিই এসব করে।' হেসে বলেছিলি,' জীবনে বেশ আঁচড় কেটে গেলি। আমরা সবাই যারা শুধুই হাবুডুবু
খাচ্ছি, সেখান থেকেও তো তুই কিছু একটু করে যাচ্ছিস, যা মানুষকে কোথাও না কোথাও ছুঁয়ে
যাচ্ছে।' আমি বলেছিলাম,' জানিস পার্থ, আমার মনে হয়, আমার সময় খুব কম। জানিনা কাল অবধি
থাকবো কিনা, তাই যা যা করার আছে, সমস্তটুকু করে যেতে চাই।" কই, সেদিন বললি না
তো, যাওয়ার এতো তাড়া ছিল তোর ! সময় যে তোর হাতে আরো কম, বুঝিনি তো সেদিন!
গতকাল ফ্রিজভর্তি বাজার করেছিস
শুনলাম। কার জন্যে করলি ওসব ? তবে কি বুঝতে পেরেছিলি কাল থেকে কিছুদিন হলেও তোর সংসারের
চেহারাটা বদলে যাবে ! তোর স্ত্রী অভ্যেসমত রোজ ঘরের কাজ সারতে সারতে জানলা দিয়ে দেখবে,
অপেক্ষা করবে কখন আটটা বাজবে, বাইরে দরজায় বাইকের শব্দ হবে, তুই বাড়ি ফিরবি !তোর ঐ
একরত্তি মেয়ে রোজ ইশকুল যাওয়ার সময় ফিরে দেখবে তোর বাইকটা পড়ে আছে ধুলো খেয়ে, পড়ে আছে
তোর জুতোজোড়া।সে ঠিক বুঝে যাবে, বাবা তাকে আর কোনোদিনও ইশকুল ছাড়তে আসবে না।তোর বন্ধুবান্ধবেরা
এক সময় তোকে ঠিক ভুলে যাবে। সংসারের ব্যস্ততা তাদেরকে তোর স্মৃতি ফিকে করে দেবে।
পাড়ার পুজোর স্যুভেনিওরে সদ্যপ্রয়াত
দেড় স্মরণের কলামে , তুই শুধু একটা নাম হয়ে থেকে জাবি বছর কয়েক। ব্যাস , এইটুকু! আমায়
বলেছিলি, আমার বাড়ি কোনো এক রোববার দেখে আসবি, মেয়েকে নিয়ে, আমার ছবি টবি দেখাবি ওকে
। কত পরিকল্পনা। দ্যাখ , কেমন সবকিছুতে জল ঢেলে দিয়ে একা একা পালিয়ে গেলি এমন এক আলোকবর্ষে,
যেখানে এ চিঠি পৌঁছবে না কোনোদিন ও ! নাকি পৌঁছবে ? নাকি এই মুহূর্তে সেখান থেকেই আড়ালে
বসে বসে তুই সব পড়তে পারছিস, আর মুচকি মুচকি হাসছিস ?
গতকাল তোর বাড়ি গিয়েছিলাম
। গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন আর তুই সেখানে নেই। কয়েক মুঠো ছাই হয়ে মিশে গেছিস গঙ্গার জলে।
পড়ে রয়েছে তোর শূন্য ঘর। তোর বইভর্তি আলমারি, তোর সাধের কম্পিউটার সেন্টার, মেয়ের জন্যে
যত্ন করে থার্মোকল কেটে বানানো তোর সরস্বতী ঠাকুর , সওব ! সিঁড়ির নিচে ইতস্তত চটিজুতো
ছড়ানো ছিটোনো। চারদিকে শোকস্তব্ধ আত্মীয়স্বজনের মাঝখানে নীরবতা গিলে খাচ্ছিলো মুহূর্ত
গুলো। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছিলো বারেবার। ঝড়ে কাঁপতে থাকা এক জোড়া পাখির মতো বসেছিলেন,
তোর মা এবং বাবা ! আজীবনের হিসেবে হঠাৎ করে হাতে পেয়ে যাওয়ার মতো স্তম্ভিত অনুভব নিয়ে
, এক হাতে ক্ষত এবং অন্য হাতে ক্ষতি নিয়ে এই মানুষ দুটি বসেছিলেন। ওঁদের ক্ষতি পূরণ
করার সাধ্য আমাদের কারোর ছিল না রে ! তোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার সময় চোখে পড়লো
আজ পূর্ণিমা। আকাশে আর নদীতে এখন পূর্ণ চাঁদের
মায়া। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মধ্যে থেকে কি অপূর্ব জ্যোতিতে যেন চন্দ্রলোকে সভা বসেছে আজ।
শরীরের অনু, পরমাণুতে যেন চুইয়ে ঢুকছে আলো। কই, কোথাও তো এতটুকু কম পড়েনি। তোর শূন্যস্থান
দিব্যি পূর্ণ করেছে হাসি, আলো, মায়া, নিবিড় রাতের ফিসফিসে বয়ে যাওয়া সংগীত। তবে কি
তোর হাসিই ফিরে এলো আলো হয়ে ? তবে কি সত্যি শেষ বলে কিছু নেই? শেষ বলে কিছু হয়না?
No comments:
Post a Comment