Wednesday, June 22, 2016

ভালো থাকার পাসওয়ার্ড ~


সত্যি বিশ্বাস করেন , আপনার সাথে ভালো কিছুও হতে পারে ? মানে বলছিলাম, খারাপ কিছু ঘটার যে আশু সম্ভাবনা সবসময় মাথার ভেতর গিজগিজ করছে, তার থেকে মুক্তি কি আদৌ সম্ভব ? সকালে বাড়ি থেকে এক পেট ভাত খেয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে ট্রেন ফেলের আতঙ্ক নিয়ে অফিসের পথে দৌড়লেন আর অবধারিত ভাবে ট্রেনটা নাকের ডগা দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে বেরিয়ে গেল।অফিসে পৌঁছে বসের চোখ রাঙ্গানির ভয়ে পা টিপে টিপে যেই না টুপ করে কিউবিকলের অন্দরে সেঁধিয়ে যাবেন ভাবলেন, অমনি সেই তিনিই সশরীরে হাজির ! হায় হায় । বাড়ি ফেরার সময় কলেজের সেই বান্ধবী, মানে যার প্রতি আপনার একটু ইয়ে ছিল... আর কি, তার সাথে হঠাত বাসন্তী কেবিন এর সামনেই দেখা । তা এত বছর পর দুটিতে একটু মোঘলাই খেতে খেতে গপ্প করবেন, এইটেই আশা ওদিকে মনের মধ্যে মেঘ ডাকছে, গিন্নির আবার স্টেশনের এদিকে আজ আসার কথা ছিল না ? তা বলবি বল, হাতে গরম তিনি সামনে । সেজবৌদীকে সঙ্গে নিয়ে, আপনাকে ( থুড়ি আপনাদের ) আপাদমস্তক মেপে নিয়ে অগ্নি ঝরা দৃষ্টি ঝেড়ে উল্টোদিকের ফুটপাথে ব্লাউস এর দোকানে ঢুকতে ঢুকতে যা এক্সপ্রেশন দিলেন, অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, আজ বাড়িতে এসো একবার , তারপর..... মন্দ ভাগ্য আমাদের তাড়া করে ফেরে রোজ , ঠিক যে যে অঘটন ঘটবে না বলে মোড়ের মাথার হনূমান মন্দিরে ফি মঙ্গলবার তিন বার পেন্নাম ঠুকি সংকট মোচনের জন্যে, দৈব দুর্যোগে ঠিক সেই, সেই দুর্ঘটনাই ফলে যায় নিয্যস ! বলি, এ কেমন অবিচার বলুন তো ?

বিশেষজ্ঞরা কিন্তু অন্যরকম বলছেন । এন্টিসিপেশন কিন্তু শুধু খারাপ কিছুর ক্ষেত্রেই ঘটে না ,বরং উল্টোটাও ঘটে। আর সেই চমকপ্রদ খবরটা আপনাদের সাথে শেয়ার করব বলেই, এই দশচক্রের অবতারণা । সম্প্রতি পড়ে ফেলা কিছু বৈজ্ঞানিক বই থেকে যা জানলাম, তা এই যে আমাদের চিন্তাধারা অতি সহজ বস্তু নয় । মানে, এই যে সারাদিনে চৌষট্টি হাজার রকম ভেবে ফেলছেন, হ্যা, ঠিকই পড়েছেন , সারাদিনে আমরা গড়ে প্রায় চৌষট্টি হাজাররকম চিন্তা ভাবনা করি বটে। খেতে, শুতে, পথ চলতে চলতে, এবেলা, অবেলা, কালবেলা জুড়েই চিন্তামনি হয়ে প্রাত্যহিক কাজকম্ম আমাদের । গাড়ু থেকে নাড়ু অব্দি সব ভেবেই চলেছে । ভাবনা কি কম, কত ভাবনা বলুন দেকি ! ছেলেটা উচ্ছন্নে গেল, এবার নিশ্চই ক্লাসের পরীক্ষায় গাড্ডু প্রসব করবে । মেয়েটা নির্ঘাত পাশের বাড়ির পল্টুর সাথে প্রেম করছে, কোনদিন না বাড়ি থেকে পালিয়ে কপাল ফাটিয়ে আসে ! গিন্নির পায়ের ব্যথাটা এক্কেরে আর্থারাইটিস্ , না হয়েই যায় না ! হু হু বাবা, এদ্দিন ধরে কি আর এইটুকু বুঝব না ! সংসার অসাড় ।..মনটা হু হু করে কাঁদে ।

তো এই হাজার হাজার চিন্তার বাজার এর মধ্যে সদর্থক ভাবনা কতগুলি ? বেশির ভাগই যে, রাগ, দুঃখু, হতাশা আর যাবতীয় কি কি পেলুম না, কি কি হলো না'র হতাশনামা । আবার তার সাথে দোসর জোটে, কি কি হবার সম্ভাবনা সমূলে বিনাশ হলো, তার নালিশ । এই সমস্ত গজরানি, এই সমস্ত নালিশের পাশবালিশ চোখের জলে ভিজিয়েই আমাদের রুদালীরাত্তির কাটে আরেকটি দুঃখুদিনের মেঘলা সকাল ভোর হবে বলে । অথচ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন আমাদের চিন্তার এই সত্যতা কিন্তু অনিবার্য । অর্থাত কিনা, ঠিক যেটা ভাবছি, সেটাকে যদি সম্পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে ভাবি, তবে সেই চিন্তাধারা এই মহাবিশ্বের কোনে কোনে গিয়ে খুঁজে বের করে আনে ঠিক একরকম ভাবনার হুবহু প্রতিলিপি । কাজেই আপনি সাত ভাবলে তার ফেরত পাবেন সত্তরগুন , তা আপনি 'ভানু পেল লটারি'ই ভাবুন অথবা 'পা পিছলে আলুর দম'ই ভাবুন । সেইটেই হবে এবং সত্তরগুনেই হবে । সোজা বাংলায়, এ একেবারে কেবল টিভির বেত্তান্ত । তরঙ্গে তরঙ্গে ভাসছে ছবি , আপনি তাকে যেই ট্রান্সমিটারে টেনে বসার ঘরের চার চৌকো পর্দায় এনে ফেললেন, অমনি সে এক 'কান্না হাসির দোল দোলানো , পৌষ ফাগুনের পালা '। ঠিক অমনি, আকর্ষণের নিয়মও এ কথাই বলে যে সদর্থক চিন্তা আপনাকে হাতের মুঠোয় এনে দেবে সেই সব , আপনার যা যা পাওয়ার ছিল । গাড়ি, বাড়ি, নারী থেকে আর যা যা দরকারী , স - ও - ব । শুধু চিন্তার প্যাটার্নটা বদলাতে হবে মশাই ।

আপনি যা ভাবলেন ,তাই হইলেন । তা বলে নিজেকে আয়নার সামনে ছত্রিশ বার নানারকম বিভঙ্গে দেখে ,নিজেকে মাধুরী দীক্ষিত আপনি ভাবতেই পারেন , কিন্তু তাতে আপনি শ্রীমতি নেনে হয়ে যাচ্ছেন না ঠিকই, তবে কায়া পলট না ঘটলেও মায়ার পটে যে বদল ঘটবে, ওতে বেফিকর থাকুন বিলকুল ।আবার ধরুন পরীক্ষার আগে সম্বত্সর আড্ডা মেরে পরীক্ষার আগের দিন খামকা ভেবে বসলেন ,যে মেডেল গলায় নিয়ে সেলফি তুলছেন, তা তো আর হচ্ছে না । উপযুক্ত পরিশ্রম এর সাথে প্রবল আত্মবিশ্বাস আর ভালো ফলের একটা অনুমানযোগ্য ছবি মনে মনে ভেবে ফেলুন...দেখুন না ,দশচক্রে ভূত ও ভগবান হয় কিনা ! ভাল চিন্তার বীজ পুঁতে ফেললে সে চিন্তার গাছ ও একদিন ফুলে ফলে আপনাকে ফিরিয়ে দেবে হাজার গুন ।

একটা টোটকা বলি..সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠেই ভো ভো মাথায় হঠাত করে এক একদিন , এক একটা গান পায় না ! অনেকেরই হয় । সে গান আপনি যতই পাল্টাতে চান, মৌমাছির মত গুনগুন করে ভাঙ্গা রেকর্ডের মত সে একটানা বেজেই চলে মাথার মধ্যিখানে , ম্যালা জ্বালা হয় বয়িকি । আমরা প্রায়ই ভাবি, হঠাত করে এ গানটাই বা সাত সকালে বাজছে কেন , তেমন কিছু তো ভাবিনি ! আসলে এও একটা চিন্তা খেলার জাদু । হয়ত কস্মিনকালে কোনো একটা অনুভূতির সাথে খাপসই কোনো একটি গান আপনার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল , গত রাতের স্বপ্ন দেখা সকালে, স্বপ্নের ল্যাজ ধরে ধরে সেই অনুভূতি হঠাত করেই মনের মধ্যে যেমনি সেঁধিয়েছে, অমনি সেই গান এর গুনগুন, মনের গ্রামোফোনে চালু । আর সেই অনুভূতি বা চিন্তাধারা তার পছন্দসই একরকম চিন্তাদেরও ধরে ধরে আনছে অবিরাম , আর আপনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না ইদিকে।

তাইলে চিন্তা নিছক তরঙ্গ নয়, সে বস্তুও বটে। মনে মনে গাড়ি, বাড়ি যা চাই, সেটা একনিষ্ঠ হয়ে ভাবলে, ভাবনার প্যাঁচ পয়জার আপনাকে ঠিক পৌঁছে দেবে সেই প্রাপ্তিনগরের দোরগোড়ায় । হ্যা, এবেলা আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, যে তাই যদি হবে , তবে আপনি, আপনারা, গোটা জাতটার সিংহভাগ এখনো কেন চারামাছ আর কাটাপোনা খেয়ে ভাড়া বাড়িতেই পঞ্চাশ বছর কাটিয়ে দিলেন..? ফি বছর মাইনে আর ডি. এ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লো পাশের বাড়ির ঘোষদার , সেনবাবুর ছেলে তো আমেরিকায় সংসারই পেতে ফেলল, বাপকে কেমন পেল্লাই বাড়ি করে দিয়েছে আর আপনি হাড়ে হাড়ে বাতের ব্যথা আর রক্তে রক্তে চিনি নিয়ে, ডাক্তার ওষুধ করে করে, স্থুলকায়া সহধর্মিনীর দন্তরুচিকৌমুদী দেকে আর শুনেই, এজমালি জীবনটা কাটিয়ে দিলেন ! সুখ নামক অলিক বস্তুটি সাদাকালোর সুচিত্রা সেন এর মত অধরাই থেকে গেল !ময়দানে বাদাম ভাজা খেতে খেতে ডিস্পেপটিক বুড়োদের দলে নাম লিখিয়ে হতশ্বাস ফেললেন, "এই তো জীবন, কালীদা !"

আসলে কি হয়েছে জানেন, আপনি যে বাঁচা ইস্তক সেই সেই নৈযর্থক চিন্তাভাবনা করে গেলেন , ..." আজ বোধহয় বাজারে মাছটা ঠিক পচা দিলে, " , " মাইনে বাড়ার আগামী পাঁচ বছরে আর কোনো সম্ভাবনা নেই নির্ঘাত ", "বুঁচকির বিয়েটা এ বছরেও দিতে পারব না বোধহয় "...তো এই 'পারছি না ', 'পারব না', 'নেই' , 'হবে না 'র নাগাড়ে এপিডেমিক নেগেটিভ চিন্তারা কোমর কষে আপনাকে সাহায্য করবে ,যাতে ওই, ওই প্রাপ্তিগুলো আপনার কাছে চিরকালই না পাওয়া থেকে যায় । আসলেতে এ এক অদ্ভূত নিয়ম, হারুন অল রশিদ থেকে নটেশাকের রসিদ যারা পকেটে করে হিসেব কষেন দিনগত পাপপুণ্যের খুচরো, এ নিয়ম তাদের সব্বার জন্যে । এই 'ল অব এট্রাকশন' অথবা আকর্ষণের নিয়মাবলী স্থান কাল পাত্র ভেদেই প্রযোজ্য । সুচিন্তা শুভ ফল দেবে , দুশ্চিন্তায় দুর্যোগ । আপনার মধ্যে, একটা মস্ত বড় চুম্বক যে আছে, তা তো আপনি এদ্দিন "জানতি পারেন নাই ", কিন্তু ভূমা বিশ্ব যে তা জেনে ফেলেছে । এখন সে চৌম্বকতরঙ্গের হাতছানি অগ্রাঝ্য করে, জগতের সাধ্য কি । মন্দ ভাবনা যেই না ভেবে ফেলেছেন, অমনি সে ভাবনা বহুগুনে অপরাপর মন্দ ভাবনাগুলিকে আপনার কাছে ঝাঁকে ঝাঁকে টেনে আনবে আর ধনাত্বক চিন্তায় ও তথৈবচ । কাজেই চিন্তা যখন শুভকারী, তখন আর দেরী কেন..? ভালো চিন্তা করুন আর ভালো ফল পান । কিন্তু দুশ্চিন্তা ? নৈব নৈব চ । অভিযোগ তো আরো খারাপ । মুখে না বললেও মনে মনেও যদি কারুকে নিয়ে, কিছুকে নিয়ে অভিযোগ করেন নিত্যি , সে অভিযোগ হাজার গুনে সত্যি হয়ে আপনার আশংকাকে একেবারে খাঁটি সোনা করে দেবে । কাজেই সাধু সাবধান । বেলাবেলি কি ভাবছেন, কেন ভাবছেন , ভেবে ভাবুন মশাই। কথায় বলে না ,'ভাবিয়া করিও কাজ'...আমি বলব, ভাবিয়া করিও ভাবনাও।

তবে হ্যা , আজকাল বড় শব্দ চাদ্দিকে । চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন । দৃশ্য, শব্দ, ছত্রিশ রকম ভ্যানতারা আর ক্যানেস্তারা পিটিয়ে শুধু রাশি রাশি জিনিস বিকোচ্ছে একদল আর কিনছে আরেক দল। এত সবের মধ্যে সোয়াস্তি কোথায় ? চিন্তার গতিপথ বদলানোর জন্যে যে নিশ্চিন্দিপুর দরকার, তাও তো দূর দূর তক অনুপস্থিত । এইখানে, একটিই জিনিস আছে, যা আপনাকে দু-দন্ড শান্তি দিতে পারে । না , নাটোরের বনলতা সেন নয়, বরং দিনের মধ্যে দশটি মিনিট পদ্মাসনে চোখটি মুদে বসা । 'ইয়োগা ' ইস্কুলে ভর্তি হতে হবে বলছি না, বাড়িতেই প্র্যাকটিস করলেন নাহয় । এতে কাজের কাজ এটিই হবে, খামোকা দুশ্চিন্তা আসবে না , আর যদি বা আসেও, তাকে কুলোর বাতাস দিয়ে , শান্ত মনে শরতের সাদা মেঘের মত ফুরফুরে ভালো ভালো চিন্তা আহ্বান করুন দিকি ।আর মনে মনে বলুন ."আমার চিন্তার মালিক আমি, এখানে কোনো দুশ্চিন্তার সেলসম্যানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ।"

ওতেই কেল্লা ফতে , অন্তত এমনটাই বলছেন জ্ঞানী গুনি বিশ্ব জনেরা ।পরের বার রুপুলি পর্দায় শাহরুখ খান যদি ডায়লগ ঝাড়েন , " আগর কিসী চিজ কো দিল সে চাহো, তো পুরি কায়ানাত উসে তুমসে মিলানে কি কোশিশ মে লাগ জাতি হ্যায় ।" , বলিউডি দাওয়াই ভেবে উড়িয়ে দেবেন না মায়িরি , বরং আমিরী চালে বুকের বা দিকে হালকা চাপড় মেরে বলবেন "আল ইজ ওয়েল" , "আল ইজ অয়েল" ।এরপর আপনার ভালো থাকা, ঠেকায় কে ?

বিঃ দ্রঃ: এই লেখাটি পড়বার পর , জীবনে ভালো ভালো কিছু পরিবর্তন হলে ডাকযোগে মাত্র ১০১ টাকা পাঠিয়ে দেবেন এই কলমচির ঠিকানায়, এই বলে রাখলুম ।

( শেষ )

No comments: