Thursday, June 23, 2016

বাজীরাও মাস্তানি ! চিত্র আলোচনা ~

"অহো কি দেখিলাম, ইহ জীবনেও ভুলিব না । " ভানুশালীর লীলা দেখতে বসে মহাভারত দ্রষ্টা সঞ্জয় এরও বোধকরি এইরকম হাল ঘটবে আর সে দৃশ্য বেচারা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বর্ণনা করা বোধহয় তৎক্ষনাত ওঁর পক্ষেও সম্ভব হবে না, কেননা মশায় , ভদ্রলোককে তো দম নেওয়ার ফুরসতটুকু দিতেই হবে । দম নেবার ফুরসতটুকু আপনিও পাবেন কিনা ঘোর সন্দেহ আছে, কেননা ছবির টাইটেল থেকে শুরু করে টানা ২ ঘন্টা ৪৮ মিনিটের এই ম্যাগনাম ওপাস দেখে, পিঠের শিরদাঁড়া এবং চোখের বিশ্রামের প্রভূত প্রয়োজন হবে আপনারও । সঞ্জয় লীলা ভানুশালীর কাছে যদিও এসব নিছকই "মেগায়িত" ঐতিহাসিক প্রেমের লার্জার দ্যান লাইফ "লীলায়িত আখ্যান "।কারণ যে দাপটে এবং যে মুন্সীয়ানায় তিনি পেশওয়া বাজীরাও এর জীবনের এমন বৃহদাকার মহাকাব্যিক আউটপুট পেশ করেন , এমন সব জীবনাপেক্ষা বিরাট বহুমাত্রিক চালচিত্র আমদানি করেন ও মেগা ঝলমলে দৃশ্যপটে আপনাকে ৩৬০ ডিগ্রীর ভার্চুয়াল ট্যুর করান , সে দাপট এর আগে একমাত্র "মুঘল-এ-আজম " অথবা "তাজমহল" জাতীয় খানকয়েক বিশ্ববন্দিত আগমার্কা ভারতীয় ইতিহাসের ছবি ছাড়া দেখা যায় না ।
ভানুশালীর কাজের সাথে যারা পরিচিত আছেন, তাদের কাছে অবিশ্যি এ নতুন কথা কি ? উনি চাকচিক্য, জাঁক জমকে, দেখানেপনায় বড় উগ্ররকম বিশ্বাসী । সাদামাটা মনুষ্য জীবনের সাধারণ রোজকেরে গপ্প ওঁর মোটে পছন্দ নয় । উনি দিন কে রাত, রাত কে দিন আখচার করে থাকেন ও শিল্পের খাতিরে শরত চাটুজ্যের দেবদাসের মত অমন সাদামাটা পারাগায়েঁর গপ্পকেও এমন ডামাডোল বাজিয়ে হীরামানিক খচিয়ে গাছে চড়িয়ে দেন, যে মনে ধ্বন্দ জাগে, স্বয়ং শরতচন্দ্রও ওই গাছ থেকে নামতে মই খুঁজে পাবেন কিনা । তা যাকগে । ভানুশালীর সাম্প্রতিকতম এই লোমহর্ষক প্রেমকাহিনী দৃষ্টিসুখের উল্লাসে আপনাকে আগাগোড়া মাতিয়ে রাখবে । উফ, কি সব পোশাক আশাক , উফফ কি দারুনটাই না দেখিয়েছে দীপিকা পাদুকোন কে , থুড়ি মস্তানিবাইকে । প্রেমের দিওয়ানি, জওয়ানির পরে ওঁর পাগড়িতে এমনধারা মস্তানির পালক বসিয়ে দীপিকা একেবারে চারচন্দ্র লাগিয়ে দিয়েছেন বলিউডের প্রেমাকাশে । নিন্দুকে যাই বলুক, গুগল ঘেঁটে একবার দেখুন তো মস্তানিবাই এর ব্রিটিশ শিল্পীকৃত তৈলচিত্র আর হাতে গরম মিলিয়ে নিন দীপিকার সাথে । কোনো ফাঁকি পাবেন না । অনবদ্য সব কস্টিউমের কাজ আর দীপিকা রনবীর এর শরীরী ভাষার গুমগুমে আগুনের ধক্ধকে আঁচের রসায়ন একেবারে মুচমুচে ও গরমাগরম ।রনবীর সিং এ ছবিতে এতটাই সহজাত , উচ্চকিত ও কনফিডেন্ট যে ওঁকে বাদ দিয়ে ঐতিহাসিক চরিত্র এবার তৈরী করা যাবে কিনা সন্দেহ আছে । চরিত্রটির জন্যে একেবারে সঠিক পছন্দ রনবীর আর উনি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য একটি জায়গা তৈরী করেছেন শ্রীমন্ত এর চরিত্রে । যেমন বীরত্বব্যঞ্জক তেমনি রমনীরঞ্জক ও । মাসল টাসল ফুলিয়ে একেবারে দর্শকের চোখের আরাম ( পড়ুন, বিশেষত মহিলা দর্শকের ও পুরুষের ঈর্ষার কারণ ) । এবার আসি এ ছবির তৃতীয় স্তম্ভ প্রিয়াঙ্কার কথায় । প্রিয়াঙ্কা যে একজন জাত অভিনেত্রী , সে কথা আর বলে দিতে হয় না । তাঁর এ ছবিতে অভিনীত চরিত্রটি নিয়ে যখন ইতিহাসও আশ্চর্য রকম ভাবেই নীরব, সেখানে পরিচালকের দেখানো পথেই কাশিবাই প্রিয়াঙ্কা হেঁটেছেন, একেবারে অন্যরকম একটা ধাঁচে । তেমন প্রামান্য কোনো রেফারেন্স ছাড়াই বাজীরাও এর প্রথম স্ত্রী কাশিবাই এর চরিত্রের ছেলেমানুষী, ঘরোয়া স্ত্রী সুলভ ন্যাকামি, বোকামির সাথেই স্বামীর অন্য মেয়েমানুষে আসক্তি মেনে নেওয়ার অসহায় বিষাদটুকু চমত্কার ফুটিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা । অবিশ্যি তাঁর চরিত্রের চেহারাগত 'লুক'টির ক্রেডিট যে রাজা রবি বর্মার আঁকা স্বনামধন্য ছবিগুলির সৌজন্যে, সে সৌজন্য পরিচালক মশাই দেখালেন না দেখে আশ্চর্য বোধ করলুম । বিশেষ ভাবে যার কথা না বললেই নয় , তিনি তানভী আজমি । বাজীরাও এর মা রাধাবাই এর চরিত্রে ওঁর আশ্চর্য রকম শক্ত ,নির্বিকার চরিত্রায়ন একেবারে শতকরা একশভাগ অভিনয়হীন অভিনয় । মিলিন্দ সোমান এ ছবিতে এক দারুন আবিষ্কার । খুব তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকায় দারুন কাজ করেছেন তিনি ।
তবে ওপরে যা যা বললুম, সে তো এই মুখ্য চরিত্রগুলির অভিনয়, পোশাক আশাক ও ঝাঁ চকচকে সেট নিয়ে । হাতে রইলো বাকি গল্পটা আর পরিচালকের কারিংকুরিং এর কাটা ছেঁড়া । একন, ইতিহাস ঘাঁটলে কি বলে জানি না, তবে উইকিপিদিয়া যতটুকু বলে বাজীরাও এর ব্যাপারে, সঞ্জয়ও ততটুকুই বলেছেন এবং তার সাথে 'আপন মনের মাধুরী মিশায়ে' রচেছেন 'মুঘল এ আজম' পার্ট - টু, ব্রডওয়ে স্টাইল অপেরাসুলভ ধামাকা দিয়ে । সেই শাহজাদা সেলিমের শিশমহল এখানে হয়েছে আয়না মহল, সেই মধুবালার মেহেরুন্নিসা এখানে হয়েছেন মস্তানি বাই এবং প্রেমের ওপর জাত ধর্মের উপর্যুপরি অত্যাচারের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে শহীদ হচ্ছেন শেষ অবধি প্রেমিক যুগল ও প্রেমের গজদন্ত মিনারের ওপর ধ্বনিত হচ্ছে ' জব প্যার কিয়া তো ডারনা কেয়া'র অকুতোভয় প্রভাতফেরী , এই অবধি ফর্মুলাটা একইরকম । যা আলাদা, তা হলো ভি-এফ-এক্সে আকাশ থেকে আগুনে তীর বৃষ্টি, এনিমেশনে ভয়াল ভয়ংকর যুদ্ধ, ' ৩০০' বা 'ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন ' এর মত নামজাদা হলিউড ছবি থেকে স্ক্রিন টু স্ক্রিন একশন টেক্শন এর অনুপ্রেরণা । ঐসব ভিজ্যুয়াল এলিমেন্ট বাদ দিলে গল্পটা ওই সরলরেখায়, দু চার কথায়ই শেষ । মিউসিক বেশ সময়োচিত । নাচে গানে ভরপুর । তবে দেবদাসের "ডোলা ডোলার " ওই একটি কিনলে, আরেকটি ফ্রি ফর্মুলাতে, পেশোয়ার দুই রানীকে একসাথে নাচানোর কি খুব প্রয়োজন ছিল ? ইতিহাস কি বলছে ? খোদায় ..থুড়ি, ভানুশালীই জানেন ।

No comments: