Wednesday, June 22, 2016

স্নিগ্ধতার আরেকটি নাম বর্ষাকাল ?

আমার মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া
একটা গোটা বর্ষাকাল আছে,
না, ঠিক এক জন্মের নয়,
চুরাশি লক্ষ বা তারও বেশি.. যত জন্ম, যত যোনি
ছিঁড়ে ছিঁড়ে এসেছি, সেই সওব বর্ষাকাল,
জলছাপের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে গেঁথে রয়ে গেছে,
আমার স্মৃতিতে, আমার সত্তায়,
আমার অস্তিত্বের গোটাটা জুড়ে !

বৃষ্টি হলেই ময়ূর ডানা মেলে। আলিপুর চিড়িয়াখানায়
দেখাতে নিয়ে গেছিলো কাকামনি,
সেটাও জুলাই মাসের বর্ষাকালেই,
রোদ্দুর ছিল খটখটে , ময়ূর নাচেনি।
কিন্তু বাড়ির ছাদে সাতঘুঁটি খেলতে খেলতে যেদিন বিকেলের মুখে,
আকাশ কালো করে বৃষ্টি এলো !
আমাদের গোটা পাড়াটা তখন ঘুমে বেহুঁশ আর
স্লেট রঙের আকাশের বুকে কি বিচিত্র আলো নিয়ে ঝেঁপে এলো একরাশ,
সেদিন দেখলাম আমার হাতগুলো আর হাত নেই,
ফ্রকের হাতার নিচ থেকে সওব ডানা হয়ে গিয়েছে ।
আমি থরথর করে নাচছি, আমি বৃষ্টির জলে উন্মুখ
আমি ভাঙ্গছি, আমি নামছি,
................
আমি ঠিক জানি, ময়ূর মেঘ দেখলে কেন নাচে।

আমি কোনোজন্মে ঠিক গাছপালা ছিলাম,
নইলে কি করেই বা বুঝবো, শিকড়ে শিকড়ে জল নেমে
যাওয়ার নাভিস্নান ! কোচিং থেকে ফেরার পথে,
ফাঁকা গলি পেলেই আমি ছাতা সরিয়ে দিতাম,
বৃষ্টি এলেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত দিদিকে চেয়ার ঠেলে ঠেলে বারান্দায়
নিয়ে যেতাম, বলতাম,' দ্যাখ, দিদি, কেমন বৃষ্টি পড়ছে, দেখবি না ?'
দিদি কি বুঝতো কে জানে ? ফ্যালফ্যাল শূন্য চোখে বারান্দা পেরিয়ে
তাকিয়ে থাকতো শুধু। কিন্তু আমি ? আমার পা কাঁপতো, মেদুর হরিণীর মতো,
কোন কস্তুরিগন্ধে আমায় টানতো ভিজে উপুড় জঙ্গল !
আমার মেয়েজন্ম যে কেবলি ভিজতে চায়,
সেটা মা কোনোদিনও বোঝেনি ! হয়তো বুঝতো, কিন্তু মানতে চাইতো না,
ঠিক যেমন আমার দিদিমাও মাকে কোনোদিন বোঝেনি।
খরস্রোতা যেমন করে ফুঁসলে নেয়,
একলা, বিষন্ন, মাইল মাইল উপত্যকাদের !
ঠিক তেমন করে, বৃষ্টি ছেঁচা জল ঢুকতো আমার বুকের বিভাজিকা ধরে,
আমায় আকুল ভিজিয়ে নিতো সেই কোন গোপন অবধি !
আমি ঠিক বুঝতাম সালোয়ারের নিচে,
আমার পা দুটো আর পা নেই,
উদ্ভিন্নযৌবন চাঁপা গাছের শেকড় হয়ে গেছে।

বৃষ্টি এলেই আমার গোপনে গোপনে গর্ভ হয়,
গোটা শহরটা যখন ধূমল হাওয়ায় জল স্যাঁতস্যাঁতে ,
ছপাৎ ছপাৎ শব্দ করে জল ঠেলে একতলার ঘরে পড়াতে আসতেন নবীন মাস্টার,
ভারী চশমার নীচে তার চোখ দুটো ভারী করুন ।
হাতের ছাতাটাকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে পাজামাটা হাঁটু অব্দি গুটিয়েই,
বসতেন সেদিন, এলোমেলো চুলটায় হাত দিয়ে হয়তো বৃষ্টির ছাঁট মুছছেন।
আমি ভূগোল বই খুলবো কি, ওঁর দিকে তাকিয়েই অস্থির।
একতলার বারান্দার নিচের জল কখন যে আমার গর্ভ অবধি চলে এসেছে,
কই, বুঝতেই পারিনি !
কি অসম্ভব রমণ ইচ্ছে জাগতো, মনে হতো নবীন মাস্টার যদি
আকাশ হতো, আর আমি মাটি ! শেষ রাতের বৃষ্টিতে সেদিন
আমার গর্ভ হতো খুব, পেটে হাত চেপে শুয়ে থাকতাম বেলা অবধি !
মা ডাকতো, বকাবকি করতো, শাপশাপান্ত ও, কিন্তু আমি শুয়ে শুয়ে চেয়ে থাকতাম,
জানলার বাইরে আকাশে, আকাশের বাইরে মেঘজলছাপ শহর,
ঐ যেখানে ৫৫ নং. খেলাত ঘোষ লেন বড়রাস্তায় গিয়ে মিশছে,
সেখানে ! আমি শুধু মনে মনে দেখতাম,
পাজামাটা হাঁটু অব্দি গুটিয়ে নবীন মাস্টার জল কাদা ঠেলে ঠেলে করুন মুখে আমায়
পড়াতে আসছেন, সে স্বপ্ন এখনো দেখি,
শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি এলে !

কে জানি বলেছিলেন, তোমরা জানো না, স্নিগ্ধতার আরেকটি নাম বর্ষাকাল ?
বর্ষাকাল মানে শুধুই স্নিগ্ধতা বুঝি? এই যে এক একটি দৃশ্য, আত্মসাৎ করে রেখেছি,
আমার স্মৃতি জুড়ে, সারা জীবন ! তাদের এখন কি বলে বিদায় দিই ?
শুধুই কি স্নিগ্ধ, বলে থুতনি ধরে আদর করা যায় ?
আমার প্রেম, আমার না পাওয়া প্রেম, আমার মফস্বল শহর ছেড়ে আসা বর্ষাকালের
গোঙানি, রক্তপাত, সওব কি বিয়ের ১০ বছরের মধ্যে ভুলে যেতে হয় ?
বলেছিলাম না, আমার মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া
একটা গোটা বর্ষাকাল আছে, সে বৃষ্টি সমস্ত ফেলে এসেছি মফস্বলের জঙ্গলে !
আজ এই দুপুরবেলায় যখন ক্যালেন্ডারে দেখছি পয়লা আষাঢ়,
তখন খাঁ খাঁ দুপুরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছি, ট্রেনগুলো যাচ্ছে আর আসছে,
অসাফল্যের সিটি বাজছে কর্কশ স্বরে, এ শহরে বৃষ্টি হয় না !
শুধু তোমাকে দেখতে চাইছি আরো হাজার বার।
আমার অস্তিত্বের গোটা শহর জুড়ে তুমি ব্রণর মতো ছড়িয়ে পড়ছো ,
মেঘের মতো গর্জাচ্ছো, কুটোপাটি করছো ঝড়ে,
শুধু ঝরে পড়ছো না , হে বর্ষাকাল !
আমি তোমাতে ভিজছে চাইছি আরো কয়েক হাজারবার ।

No comments: