অনুরণন কথাটার মানে সেভাবে আগে বুঝিনি। খুব বেশি হলে বুঝতাম, ইকো অথবা ভাইব্রেশন ! মানে, ওই পাহাড়ে গিয়ে রেলিং ধরে ঝুঁকে চেঁচিয়ে নিজের নাম ধরে ডাকলে, পাহাড় যেমন চার বার সেই নাম ধরে ফেরত ডাকে আমায়, সেইরকম ! কিন্তু অনুরণনের আসল অর্থ শুধুই যে সেই বিজ্ঞানটুকু নয়, সেটা আজ মনে হলো । অফিস আসার পথে রোজ যেমন ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে উঠে বিপুল, বিরাট জনতার ঠেসাঠেসি, চাপাচাপিতে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে ভীড় হয়ে মিশে থাকি এক কোনে, আজও তেমনি ছিলাম। মনটা নানা কারণে মেঘলা হয়ে ছিল আর অত ভীড়ে পকেট থেকে মোবাইলের হেডফোনটাও বের করার উপায় ছিল না, তাই দরজার ধারের ঝাপটা ঝাপটা গরম হাওয়ায়, চারপাশের কর্কশ আওয়াজ, গালাগালি, চেঁচামেচির মধ্যে কখন যে ভিতরে ভিতরে একা হয়ে কম্পার্টমেন্টের বহু থেকে মনে মনে একলা হয়ে গেছিলাম, বুঝতে পারিনি! মনে মনেই কখন যে পাড়ি দিয়েছি দিকশুন্যপুরে, আর কখন যে আমার মন ডুব দিয়েছে রূপসাগরে আর তুলে এনেছে ঠোঁটের ডগায় প্রিয় গান, জানতেই পারিনি! গাইছিলাম, গুনগুন করে। রবীন্দ্রনাথের গান ।" আহা, তোমার সাথে প্রানের খেলা...!" ওটা শেষ হতেই আবার গীতা দত্ত, শ্যামল মিত্র, কখনো বা নির্মলেন্দু ! খানিকক্ষণ পরেই খেয়াল করলাম, আশেপাশের মানুষ তাকাচ্ছেন, কেউ নিছক কৌতুহলে, কেউ সন্দিগ্ধ হয়ে, কেউ বা বোকার মত আবার কেউ যারপরনাই বিরক্ত হয়েও। ভাবখানা এরকম, যে এত ভীড়ে লোকের দাঁড়াবার জায়গা নেই, কোথায় দু চারটে চোখা চোখা ডায়লগ ঝেড়ে লোকের পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করবে তা নয় আবার গান !!! আদিখ্যেতা !! কিন্তু আমি তো আমিই ! আমার মত ! তাই গেয়েই চললাম! চোখ বুজে, সবাইয়ের থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে।...... একটু পরেই শুরু হলো ম্যাজিক ! সামনের ওই যে টাকমাথা সরকারী চাকুরে, মুখটা এতক্ষণ ডিস্পেপটিক বৃদ্ধের মত বিরক্তিতে কুঁচকে ছিল, সে লোকটির চোখ বুজে এলো, মৃদু মৃদু ডাইনে, বাঁয়ে মাথা নাড়তে শুরু করলেন, বুঝলাম, ওষুধ ধরেছে! কান পেতে বুঝলাম, তিনিও আমার সাথে গাইছেন। আবার আমার যেখানে গানের শব্দ দিতে ভুল হচ্ছে, আমায় ধরিয়েও দিচ্ছেন! আরেকটু পরেই ওই যে পিছনের ডান দিকের, হাতে ট্যাটু করা মুশকো ছোকরা, যে এতক্ষণ গলা ফাটিয়ে চেল্লাছিল, সেও দেখলাম চুপ ! কি একটা কিশোরকুমারের খুউব চেনা গানের সুর ভাঁজতে শুরু করেছে সেও ! তারপর গেটে ঢোকার মুখেই বিপুল ব্যাগ আর ততোধিক বিপুল পেট নিয়ে যে মার্কেটিং এ চাকরি করা বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক, এতক্ষণ সিন্ধুঘোটকের মত মুখ করে মোবাইল নিয়ে পিড়িং পিড়িং করছিলেন, তিনিও দেখলাম, প্রানপনে তার ডাবল চিনের মধ্যে দিয়ে সুর খুঁজে আনছেন, গাইছেন, "তুঝ সঙ্গ নয়ন লাগায়া.." শুধু তাই নয়, ঐযে অপ্রস্তুত মহিলা, হাজার হাজার পুরুষের ভীড়ে উঠে পরে ভারী বেকায়দায় পরে, বিব্রত মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই তিনিও। রুমালে মুখ মুছে চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তাঁর মুখেও। কি যেন একটা খুব চেনা ঠুমরীর সুর এলো ঘুরে ঘুরে তাঁর গলায়। এখন শুধু সুর, গলায় গলায় সুর, ভালোবেসে প্রিয় গান। সকলেই ফিরে যাচ্ছেন তাঁর তাঁর নিজস্ব অমরায়! গন্তব্যের নির্দিষ্ট স্টেশন আসা অবধি আপাতত আর কেউ ঝগড়া করবেন না, কেউ মারমুখী চেহারা নিয়ে তেড়ে যাবেন না, মৃদু হেসে পাশের মানুষটিকে জায়গা করে দেবেন অথবা শান্ত মনে পৌঁছবেন নিজের নিজের কাজের জায়গায় ! তখনি মনে হলো, সুর সক্কলের কাছে সমান, সঙ্গীত সক্কলের মনে এক শান্ত, নিভৃত পাড়া।নানারকম অশান্তি, অস্বস্তি থেকে মানুষকে সমে বাঁধে যে গীত, সেই তো সঙ্গীত ! সুর এত ম্যাজিক জানে তবে ? তবে চারপাশে এত অ-সুর কেন? আসলে, সেই যে হ্যামলিনের একজন বাঁশিওয়ালা ছিল, যার সুরে মুগ্ধ হয়ে গোটা শহর তার পিছু নিয়েছিল, অমন বাঁশিওয়ালা আর একটিও নেই। নেই রবি ঠাকুর, নেই হেমন্ত বাবু, নেই মান্না দে, নেই রবিশংকর। চারদিকে নেই'র পাল্লাটা বড় ভারী হয়ে উঠেছে। নইলে কবেই এই গোটা শহরটা 'আছে'র এক সুরে বেঁধে যেত, সুরের অনুরণনে চেনা, অচেনা, অগুন্তি ভিড়ের মত মানুষ এক সুরে গেয়ে উঠতেন গান, জীবনের গান। ভালোবেসে গাওয়া গান, অনুরনিত হয়ে গাওয়া গান!
No comments:
Post a Comment