Thursday, June 23, 2016

গল্প হলেও সত্যি !!

গল্প হলেও কিছু কিছু মানুষ সত্যি তো হন বটেই! সেরকমই একজনকে নিয়ে আজকের দিনে কথা বলতে হয়, শুনতে হয়, পড়তে হয়, নইলে কিন্তু অবশ্যই পিছিয়ে পড়তে হয়। তিনি বাঙালির প্রাণভোমর , তিনি ছদ্মবেশী দেবদেবতা, তিনি চিরকালীন মূল পর্দার বাইরের উইংসের পাশে দাঁড়ানো একা বোকা সম্রাট, যার ওপর কচ্চিত কদাচিত এক মুঠো আলো এসে পড়ে, তাও নায়কের মুখ থেকে ফোকাস ঘোরানোর সময় টময়। তিনি অধুনা কালিঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটের রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। যাঃ, চেনা গেল না বোধহয় ! হ্যা, ইনিও রবীন্দ্রনাথ বটে, তবে কালিঘাট থেকে জোড়াসাঁকোর মতই প্রায় দওশ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থান করা ইনি ওঁর নাথত্ব হারিয়ে, দস্তিদারি হারিয়ে, মানুষের স্মরণে চিরকালই নেহাতই সংক্ষিপ্তসারে 'রবি ঘোষ' হয়ে থেকে গেছেন। আসলে নিজে ছোটখাটো হলেও অত বড় নাম বয়ে বেড়ানোর মত কব্জির জোর মানুষটির ছিল, কিন্তু প্রায় স্বতপ্রণোদিত ভাবেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ওই ছোট নামটিই। আসলে কোথায় জানি, তিনি মনে মনে জানতেন যতই ব্যায়াম ট্যাম করুন, আসলে তো সাফল্যের উচ্চতার কাছে পৌঁছনো তার মত হা -সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, হাজার হোক , তিনি তো আর 'উত্তমকুমার' নন, বড়জোর ছবির পর্দায় তাঁর প্রেমিকাকে একবার রিকোয়েস্ট করে দেখতে পারেন সেকালের সব ঈর্ষাকাতর পুরুষের মত, 'আমায় একবার উত্তমকুমার বলবে?' তাই তথাকথিত রূপহীন, ক্ষমতাহীন, মানুষটির ঢাল হয়ে উঠেছিল তার মোটর স্কিল , তার অঙ্গভঙ্গির তাক লাগানো রিফ্লেক্স, তার নিখুঁত কমিক টাইমিং আর সেই বাঙালির জীবনবোধ, জানিয়ে প্রায় প্রফেসির মত একটি ছবি বানালেন, তপন সিনহা এবং গল্প হলেও এক চিরকালীন সত্যির জন্ম দিলেন সে ছবির গৃহভৃত্য ধনঞ্জয় ! শুধুমাত্রই বিবেক হয়ে দাপিয়ে বেড়ালেন পর্দায় এবং অভিনয় করতে শুরু করলেন জীবন নাট্যের সেই এক্সট্রা ভূমিকাটিতে যেখানে শেষ অবধি জিতে যায় ব্যাং রাজপুত্তুর। যেখানে সব হ্যা হ্যা, হো হো, বেঁটে মানুষটার প্রতি খ্যাঁক খ্যাঁক হাসি, বিদ্রুপ, কলুষ, টিটকিরির পরেও সিনেমা শেষের পথে ট্রামের টিকিট কেটে আপনার সঙ্গে বাড়ি যান, নাহ, নায়ক নয়, নায়িকাও নয়, আপনার চিরচেনা এই মানুষটিই তো। বাঙালির হাতের পাতার মত এই নাড়ি নক্ষত্র জানা মানুষটিই ছিলেন রবি ঘোষ।চরকি পাক ঘুরে, বোকার মত ফিক করে হেসে খানিকটা চোখ পিটপিট করে, খানিকটা মাথা চুলকিয়ে, অনেকটা হীনমন্যতা নিয়ে এই বিপুল পৃথিবীর মস্ত ত্রস্ত কান্ডকারখানা দেখে যিনি 'বাঘা বাইনের' ছদ্মবেশে কি করুন করে বলতে পারেন ..... 'কি দাপট!' আসলেতে এই কথাটা বাঘা বায়িনের মুখ দিয়ে বলেন সেই উনিশ শতকের বাঙালি, যারা শেকড় থেকে উঠে আসা, উদ্বাস্তু কলোনি থেকে উঠে আসা, বেড়া ডিঙিয়ে উঠে আসা সেই ভিতু, আত্মবিশ্বাসহীন, মেদুর অথচ স্বপ্ন দেখা, প্রত্যয়ী বাঙালি, যাদের প্রতিনিধি ছিলেন সর্বজনপরিচিত কৌতুক অভিনেতা রবি ঘোষ, যাঁর নামটা ছবির পোস্টারে 'শ্রেষ্ঠাংশেতে' থাকে না, থাকে অনেক নিচে , ছোট ছোট অক্ষরে ! পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এঁদের জন্ম হলে কি হত জানি না তবে এহেন ট্যালেন্ট, এইরকম প্রজ্ঞার মানুষ, জন্মেছিলেন এই দেশে তাই চিরকাল 'ছোটদের মত' প্রতিনিধিত্ব করেছেন মূর্তিমান খাপছাড়া, যেমন তেমন, উদ্বৃত্ত, বেঁচে যাওয়া, বাড়তি, ফাউ মানুষের আর হাসতে হাসতে আমরা যখন চোখের জলে, নাকের জলে অস্থির তখন আড়াল হয়ে সরে গেছেন সেই অন্ধকারে, যেখানে আলো পড়ে না, পড়ে নি কোনদিনও।

No comments: