বিঃ দ্রঃ : অনিবার্য কারণবশতঃ আরশিনগর ছবির কোনো রকম রিভিউ দেওয়া গেল না ।
......................................................
ভেবেছিলাম, এইরকমটাই লিখবো । কেননা, যাঁর ছবি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি , যাঁকে সুন্দরী নায়িকা ছাড়াও সংবেদনশীল পরিচালক হিসেবে বহুবার পেয়েছি , যাঁর কাজের ধারে ও ভারে তার মেধা ও প্রজ্ঞা নিয়ে এতটুকু সংশয় কোনদিন হয়নি, সেই অপর্ণা সেনের সাম্প্রতিক ছবি 'আরশিনগর ' দেখে এসে এতখানি হতাশ হয়েছি, সে অভিজ্ঞতা লিখতেও যারপরনাই কষ্ট হবে, কেননা পরিচালকের নাম 'অপর্ণা সেন '। বিশ্বাস করুন, ঋতুপর্ণ ঘোষের অকালশুন্যতায় এবং অনুপস্তিথিতে যদি একটিই নাম মনে পরে, তিনি অপর্ণা । বাংলা ছবিতে তাঁর কাজের সংবেদন নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না । অপর্ণার লেখার হাত ও ছবি পরিচালনায় একের পর এক মাইলস্টোন তাঁর ছবিকে এমন এক উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে যেখানে প্রত্যাশিত ভাবেই প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে । বিশেষত 'গয়নার বাক্স'র মত চমকপ্রদ ক্লাসিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর শেষ ছবিও তেমনটাই চমৎকার , যেমনটি অপর্ণার ক্ষেত্রে এ যাবৎ হয়ে এসেছে , কিন্তু কেন এই 'আরশিনগর ' ? এ কোন অপর্ণা ?
সাম্প্রদায়িক প্রেমের এই হিন্দু মুসলিম গপ্পে প্রতিটি চরিত্র একবারে পিকচার পোস্টকার্ডের মতই নিখুঁতভাবে সাজেন । এঁদের পোশাক আশাক, আদব কায়দা অবিশ্বাস্য রকম চড়া ও প্রতীকী , ঠিক যেন ঠিয়েটার। হিন্দু হলেই সিঁদুর, চাদর, মন্দির আর মুসলমান হলেই দাড়ি, টুপি, নমাজ ? বস্তির লোক মানেই ঝি , চাকর, আর ইস্ত্রীওয়ালা এবং ততোধিক স্বপন সাহা সুলভ সরলীকৃত ভ্যাদভ্যাদে আবেগে বস্তি উচ্ছেদ ও শপিংমল নির্মানের প্রটোটাইপ রাজনীতি ! রাজনৈতিক নেতা মানেই ঘুষখোর এবং সাংঘাতিক দুর্নীতিগ্রস্ত এবং উঠতে বসতে কালো টাকার কারবারীদের থেকে পার্সেন্টেজ নিয়ে দর কষাকষি ও বস্তুত সাধারণ মানুষের ঘর কেটে পুকুর চুরি ! প্রোমোটার মানেই তোলাবাজ অতএব গলায় সোনার চেন ও হাতে পিস্তল ! প্রেমিক মানেই আগমার্কা রোমিও ! বিশেষত 'রোমিও'র 'হোমিও' ( পড়ুন দেশীয় ) অবতার মানেই মাথায় ঝুঁটি ও কাঁধে গিটার নিয়ে 'ব্যান্ড' বাজাও হোমেযজ্ঞে না লাগা দুষ্কৃতি বাপের সুপুত্তুর ছেলে 'প্রেমিক রনো' । 'জুলিয়েট' মানেই প্রায় মধ্যযুগীয় মানসিকতার মুসলমান বাড়ির মেয়ে জুলেখা যে বন্ধুদের সাথে ডিস্কোথেকেও যায় মাথায় 'হিজাব' চড়িয়ে ! আর 'আরশিনগর ' মানেই, এই সাররিয়াল শহরের বস্তি থেকে রাজবাড়ি, গলি থেকে রাজপথ সর্বত্র ঝিকিমিকি 'আরশি' ফিট করা যেখানে নিজেদের আত্মস্বরূপ দেখছেন সকলেই , শুধু কোন সময়ের গপ্প এটা, সেইটে ধরা যাচ্ছে না মোটেই। এইসব চিরপরিচিত আশির দশকের ক্লিশে নিয়ে ইসে মানে .... ছবি করছেন অপর্ণা , ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল !
এ ছবির স্টারকাস্ট একবার মন দিয়ে লক্ষ করুন । কে কে আছেন ? বলুন , কে নেই ? শুধু 'মিষ্টি প্রেমের' হ্যান্ডসাম নায়ক 'দেব' না নবাগতা রূপসী দুষ্টুমিষ্টি 'ঋত্বিকা' নয়, যে নামজাদা অনসম্বল চরিত্রদের নিয়ে অপর্ণা বারবার কাজ করেন , সেই চেনা কৌশিক, রুপা, অপরাজিতা, শান্তিলাল , কমলেশ্বর , শুভাশিস, পরান, অনিন্দ্য, যিশু, শঙ্কর, জয়া শীল'রাও তাদের সুন্দর অভিনয় দিয়ে শেষ অবধি এ ছবি বাঁচাতে পারেন নি । আর ওয়াহিদা রেহমান ! ওঁর মতন এক অসামান্য অভিনেত্রীকে ঠিক কেনই বা নেওয়া হলো, কিই বা করানো হলো বোধগম্য হয়নি একফোঁটাও। রোমান্টিক দেবকে ঠিক সেটাই করতে হয়েছে যেটা তিনি তাঁর বাজার চলতি স-ও-ব ছবিতেই করেন । গোটা ছবি জুড়ে হয় গান নয় মারপিট, অভিনয়ের বিশেষ সুযোগ ওঁর ছিল না । ঋত্বিকা ছিপছিপে শরীর আর পাখির মত কন্ঠস্বর নিয়ে জুলিকে নায়িকাসুলভ বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছেন । গ্যাংযুদ্ধে কাজল পরা চোখের 'তায়াব' রুপী যীশু, নেগেটিভ চরিত্রে চোখ টেনেছেন , তবে অনেকের চেয়ে অনেক বেশি চোখ টেনেছেন চরিতাভিনেত্রী স্বাগতা মুখার্জি । ছোট পর্দার খল চরিত্রে খোলতাই অভিনয়ে চেনা মুখ স্বাগতা এ ছবিতে অনেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন এবং যথাসাধ্য ভালো কাজ করেছেনও ।
এ ছবি দেখতে গিয়ে খুব চেষ্টা করলাম, রীতিমত অপেক্ষাও যে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত ভালো কিছু দেখব। কিন্তু হাহতোস্মি । দুর্বোধ্য সাংকেতিক স্টাইলরোপিত এ ছবির সর্বত্র শুধুই হরেকরকম পরীক্ষার ছাপ যা ছবিটাকে কালচার খিচুড়ি ছাড়া আর কিছুই বানাতে পারেনি ।তাই এ মুহুর্তে যাকে মনে হলো শেখকবির 'মিড সামারস নাইট ড্রিম' এর বাংলা অনুভব যেখানে সমাজের আলাদা আলাদা স্তরের মানুষেরা 'দ্যাখ না দ্যাখ' কথায় কথায় চড়ারকম বৃন্দগানসুলভ নাচগানের মাধ্যমে তাদের রাগ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, প্রেম ইত্যাদি বর্ণনা করছেন পরমুহুর্তেই আবার সেটি মনে হলো কোনো "মিউসিকাল" বা সাঙ্গীতিক অপেরাটাইপ অর্থাত নায়ক নায়িকা কথায় কথায় গান গাইচেন , কিম্বা ছড়া মিলিয়ে মিলিয়ে কথা বলছেন অবিকল থিয়েটারি ভঙ্গিতে। সেটের কাজও তথৈবচ । বাড়ির ফার্নিচার সকলই দেওয়ালে আঁকা ছবি ও আদ্যিকালের বাংলা ছবির মত কার্ডবোর্ডে আঁকা আকাশ ও শহর । এ সমস্ত গজব রকম কাঁচা কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে দেখিয়ে আর এতরকম নাটুকে প্রতীক জুড়ে জুড়ে শেক্সপিয়ার সাহেবের কালজয়ী ক্লাসিক 'রোমিও জুলিয়েট' কে দেশকাল ভেদে একালষেঁড়ে একটা শিশুবোধ্য বাংলা গপ্পের পোশাক পরিয়ে , বেশকিছু থিয়েটার এবং অপেরাসুলভ প্রতীকি চিহ্ন টিহ্ন দিয়ে , আদপে যেটা বানানো হলো, সেটি হলো ওই যাকে বলে গিয়ে 'দেব এর 'বই ' । না, অভিনেতা দেবকে আমি কোনো অংশে ছোট করছি না , তবে ছবিকে 'বই' বলার অর্থে এক বিশেষ শ্রেনীর দর্শকের রেফারেন্স এই কারণেই দেওয়া হলো, যাদের কাছে ভালো সিনেমা নয়, 'ঝাড়পিট' অথবা 'গরমাগরম' রোমান্সে, নাচে, গানে, একশনে ভরপুর ,'বই' দেখতে যাওয়াটা হপ্তাশেষের শ্রেষ্ঠ বিনোদন । সেই বিনোদনী চাহিদাও যদি এ ছবি পূর্ণ করতো সৎভাবে , তবেও হয়ত শেষ অবধি পরিচালকের মুন্সিয়ানা নিয়ে প্রশ্ন উঠত না । প্রশ্ন উঠছে এইকারণেই , কেননা ছবিটি কোনো নির্দিষ্ট ধারা কিম্বা রীতিতেই সৎ নয় ! কেনই বা অসম্ভব চেনা এই গল্প নিয়ে অত্যন্ত খারাপ চিত্রনাট্যে , দুর্বোধ্য 'লালন ফকিরি' দর্শন দেখানোর এই অপচেষ্টা ? কেনই বা শেষ অবধি সেই ধুমধারাক্কা খুনখারাপি এবং ছুরি চাকু বন্দুকে এক্কেবারে ষোলো আনা 'বাংলা' মারপিটে প্রায় হলিউডি 'ম্যাট্রিক্স' আর 'পরান যায় জ্বলিয়া রে'র মাঝামাঝি একটা দোআঁশলা কিছু তৈরী করার ফিকির ? ক্যামেরার কাজ বা স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত চোখকে যেমন ভারাক্রান্ত করে, মনকে তেমনি করে ক্লান্ত । দেবজ্যোতি মিশ্রের সুর সুফিতে শুনতে বেশ ভালো তবে তার সাথে ধরতাই দেওয়া ওই কান ফাটানো ব্যান্ডের গানগুলো ? অবিশ্বাস্য রকম খারাপ ।
মোদ্দা কথা আরশিনগর একটি আদ্যন্ত ধোঁয়াটে 'সাররিয়াল' শেক্সপিরিয়ান আখ্যানের আধাকাঁচা ইন্টারপ্রিটেশন । তবে হ্যা, আরশিনগরে দুটি জিনিস শুধু ভালো । এক, পার্বতী বাউলের দুটো মনকাড়া গান আর দুই ক্যারামেল ফ্লেভার্ড পপকর্ন । ওই দুটির অনুপান ছাড়া এ ছবি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে, নিশ্চিত থাকুন ।
No comments:
Post a Comment