' ফেসবুক সাহিত্য আকাদেমি
পুরস্কার তোমার বাঁধা হে '। সহকর্মী এক রসিক বন্ধুর এহেন বাঁকা মন্তব্য প্রায়শই
শুনি । আর হবে নাই বা কেন ! সময় পেলেই দু-চার লাইন লিখে ফেলি খসখস করে । কোথায়
একটা ছবি ছাপালুম , কোথায় এক টুকরো আঁকা, সঙ্গে গুঁজে দিলুম দু চার লাইন
রবীন্দ্রনাথ নয়তো নিজেই কলম পিষে কিছু একটা চটজলদি ইনস্ট্যান্ট ফুডের মত দু-চার
লাইন যা বেরয়, তারই কয়েক ছত্র, যত্র তত্র । তার বেশির ভাগই ফেসবুক এর টাইমলাইনে
ছড়িয়ে থাকে লাইক প্রত্যাশী তীর্থের কাকের মত সার দিয়ে । দু চারখানা লাইক পেয়েই
তারা ফুরুত । এহেন সাহিত্য সাধকদের সৃষ্টিকে যদি কেউ গণিকালয়ের সন্তানদের মত
অকুলীন আখ্যা দেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ধ্যাষ্টামো স্বীকার করে কল্পিত পুরস্কার-টার
দেন আমার সহকর্মীর তির্যক মন্তব্যের মত, তাতে ক্ষতি কি ! এলোমেলো চিন্তা ভাবনা
থেকে হঠাৎ হঠাৎ জারজ সন্তানের মত যে সমস্ত শব্দেরা জন্মায়, বেশির ভাগেরই কোনো
নির্দিষ্ট ঠিকানা জোটে না । নিদেনপক্ষে, কোনো গ্রুপের দেওয়াল শোভন নতুবা পাড়ার
বালক সংঘের স্যুভেনিয়ার , খুব বেশি হলে কোনো লিটিল ম্যাগের ব্যক্তিগত প্রচেষ্ঠায়
তাদের, ছাপার অক্ষর আলোকে আসা । তো সেইরকমই এই ডিজিটাল লেখালেখি দেখে এক বন্ধু
জানালেন , আমার লেখা নিয়ে তিনি গান বাঁধতে চান । সে তো উত্তম প্রস্তাব। মনে মনে ভাবলুম,
এ যাবত লেখা তো কিছু কম লিখিনি । কিন্তু লেখাগুলো সব গেল কোথায় ? আসলে যে মুহুর্তে
তারা জন্মেছে , উপযুক্ত লালন পালনের আগেই তারা আমায় ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছে। সংঘবদ্ধ
করে , এক জোট করে তাদের রাখিনি কোত্থাও। এখন পিতা হিসেবে এতটুকু কর্তব্য না করলে, তারা
আর আমার কাছে আসে কি প্রকারে ! এখন সময়সারণী তে তাদের খুঁজি কি ভাবে ?
না, মানে একটা দুটো নয়
অজস্র লেখা জোকা, স্রেফ হারিয়ে গিয়েছে । অনেকটা অযত্নে, এমনি এমনি, সংরক্ষণের
প্রয়োজন বুঝিনি বলে, আবার অনেকটা শুধুই এলোমেলো ভাবে ।শুধু ফেসবুক নয় , রেস্তঁরার
বিলের পিছনে, সিগারেটের রাংতার সাদা অংশে এমনকি বাজারে হাতে গুঁজে দেওয়া লিফলেটের
পিঠেও লিখেছি খসখস করে , আর তারপর কি করে, কি করে জানি কালের গর্ভে তারা সব উধাও !
পুরনো দেওয়াল পত্রিকা থেকে লিটিল ম্যাগাজিন যেখানেই হাত মকশো করেছি, সেসব খুঁজতে
গেলে কিছু পাব না আর, এ আমি বেশ জানি । এমন বেশ কিছু শব্দ- ব্রহ্ম, অসংরক্ষিত
গল্পগুচ্ছ বেবাক উড়ে গিয়েছে জীবন থেকে। অথচ যখন তাদের লেখা, তখন তারা ভারী আপনার
লোক। কত ঝড়ে ,জলে, মিনিবাসে বাদুড় ঝোলা ঝুলতে ঝুলতে, ট্রেনের দরজার ধারে এক হাতে
জীবন আর হাতে মরণের ‘শ্যাম রাখি না কুল’, খেলা খেলতে খেলতে যে সমস্ত বজ্রবিদ্যুত
ভর্তি শব্দ ঝলকের মত মাথার ভেতর সেঁধিয়ে এসেছে , দু-চার বার চমকে দিয়ে আভাস দিয়েছে
নতুনতর কবিতার , তাদেরও কেমন করে জানি হারিয়ে ফেলেছি আমি । পরে আফসোস হয়েছে খুব ।
ইশ, কি চমত্কার একটা অনুপ্রাস মাথায় এলো । আহা, এমন যুতসই একটা লাইন , বেলাইন
হওয়ার আগেই চটপট লিখে রাখলেই হত। কিন্তু, ওই অবধিই। আসলে, আমার ব্যক্তিগতভাবে
ডিসিপ্লিনের ভারী অভাব । ফেলুদা পড়া ইস্তক মনে মনে ভাবতাম, ঠিক ওই রকম নীল চামড়ায় বাঁধানো
একখানি খাতা আমার বড় দরকার । সঙ্গের হাতব্যাগে সবসময় যেন সে মজুত থাকে , যেই না
কিছু ধরা দিল মনের আয়নায় , চটপট লিখে ফেলতে হবে, নইলেই ফাঁকি । সাত সতেরো কাজের
মধ্যে সে লেখা কখন কোন ফাঁকে ফুরুত করে উড়ে যাবে, তা দেবা ন জানন্তি । তা সে
খাতা আমার আজ পর্যন্ত হলো না । কখনো এখানে একটু, কখনো ওখানে খানিক, এভাবে দশ জনের
এজমালি সংসারে আমার লেখা জোকাদের বাস ।
আমার মাতামহ শুনেছি স্বপ্নে
দেখা দৃশ্যও লিখে রাখতেন । শিয়রের টেবিলে সবসময় মজুত রাখতেন খাতা, কলম আর যেই না
স্বপ্ন দেখা , ধরমর করে ঘুম ভেঙ্গেই লিখে ফেলতেন সে সব । কত জরুরি মানসিক অবস্থার
সমান্তরাল প্রতিফলন, সে সব লেখায় পরে খুঁজে পেয়েছি । তিনি লিখতেন দু তিন রকম
কালিতে । সবুজ দিয়ে বিশেষ কোনো শব্দ গাড় অক্ষরে আবার লাল কালি দিয়ে তাকে
দাগা দিয়ে অন্যরকম মাত্রায় ওঁর লেখা ভারী ভালো লাগত পড়তে । লেখায় যত্সামান্য কাটাকুটিও
যা করতেন, সেটাও কি চমত্কার ভাবে। একটা অদ্ভূত শৈল্পিক পরিমিতি বোধ ঘিরে থাকত
মার্জিন ধরে ধরে খাতার সাদা পাতাগুলোয় । সাধারণ মোটা কাগজের দিস্তে পাতার বাঁধাই
সে সব খাতায় , মলাট দিতেন ব্রাউন কাগজে । আর খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় কেমন সুচারু ভাবে
ওঁর দীর্ঘ নামটি লিখে রাখতেন বিনম্র একটি
কোনে । শুধু মুক্তাক্ষর নয় , ওঁর লেখা পড়লে একটা ছবির মত দীপ্তিময় দৃশ্যপট জাগতো
মনে ।পাড় বাঁধানো শান দেওয়া ঘাটের পাশে নদীর বয়ে চলাটুকু দেখলে যেমন তৃপ্তি হয়,
সেইরকম । আসলে , সে সময় মধ্যবিত্ত শিক্ষিত গড়পরতা বাঙালির মধ্যে একটা অদ্ভূত
আভিজাত্য ছিল । অল্প আয়োজনের মধ্যেও পড়াশোনার জগতটা ছিল যারপরনাই গভীর ও ব্যাপ্ত ।
সে বাঙালির কলম ছিল ঋজু ও ঋদ্ধ । তার জন্যে সে সময়ের অনেকেরই ‘লেখক’ এই তকমার কোনো
প্রয়োজন পড়ত না । লেখা হত লেখার আনন্দেই । তাকে ছাপার অক্ষরে পাওয়ার জন্যে কোনো কাকুতি
মিনতিও ছিল না । ঠিক এইরকম ভাবেই তো উঠে এসেছিলেন লীলা মজুমদার । রোজকার হেঁসেল
ঠেলেও দুবেলা জীবনের অদ্ভূত আলেখ্য লিখে গেছেন আশাপূর্ণা । পড়ুয়া বাঙালির মধ্যে এক
বিচিত্র আত্মদর্শন রয়েছে , তার প্রতিফলন দেখা গেছে সেকালের অনেক লেখকের লেখাতেই ।
যারা অফিসকাছারি সেরে ট্রামে-বাসে সফর করে বাজার দোকান সেরেও লিখে গেছেন
মধ্যরাত্রি অব্দি, আর জন্ম হয়েছে এক একজন বিভূতিভূষণ , প্রমথনাথ বিশী কিম্বা
বুদ্ধদেব বসু'র ।
যাই হোক, আসল কথাটি হলো আমরা
যারা দু-চার শব্দ লিখেই নিজেদের ‘লেখক’
ভাবতে ভারী তৃপ্তি বোধ করি আর কল্পনায় গড়িয়া হাটে পাঠকদের ভিড়ে মবড হওয়ার ভয়ে ঘেমে
নেয়ে উঠি , আদপে সেই সেলিব্রিটি সুলভ মানসিকতায় একটা দেখনদারি থাকে বটে,
কিন্তু সে ভারী স্বল্পায়ু । সাহিত্য বলতে যে দীর্ঘ কালের ব্যাপ্তি, তাতে তার
অস্তিত্ব কনামাত্র নয় । লেখা আসলে বড় নির্জনচারি , কাজেই লেখকও সচেতন ভাবেই নির্জন
চর্যা করবেন , সেটাই কাম্য । কিন্তু আজ যারা আমার মত দু-চার পৃষ্ঠা হাবিজাবি লিখে
পাতা থুড়ি দেওয়াল ভরাচ্ছেন , তাদের বলার এইটেই যে আরও অনেকখানি পথ লিখতে লিখতে
তবেই বোধহয় মানুষের মনের নাগাল পাওয়া যাবে। সে পথ ঠিক কতটা , কে জানে ! কারণ সে লেখা
যতক্ষণ না নিজের নির্জন, বেআব্রু , রিক্ততম , অভিজ্ঞতালব্ধ অব্যর্থ সত্যিটুকুতে নিয়ে
উঠে আসবে, যতক্ষণ না সে লেখা নিজের কথা নিজের মত করে রেকাবি উপুড় করে বলবে, ততক্ষণ
তা সর্বজনের লেখা হয়ে উঠবে না ।
No comments:
Post a Comment