প্রিয় ,
তোমাকে আর কি নামে সম্বোধন করব জানি না , কবিগুরু অথবা গুরুদেব অথবা মহর্ষি বলা যেত হয়তো আর সকলের মত, তবে তাতে তোমার আমার সম্পর্কের প্রতি সুবিচার করা হত কি ? গুরুদেবের সন্মানগত দূরত্ত্বমিশ্রিত শ্রদ্ধা আর গাম্ভীর্যের নির্মোক যে খসে পরেছে অনেকদিন। আর শুধুই পৃথিবীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির মাপকাঠিতে তোমার সম্ভাষণ ধার্য হবে , সে উত্কর্ষের ভাগীদার করে নিজের হতে দুরে সরিয়ে দর্শকাসনে বসে তোমায় দেখব, অত দূরবর্তী, দারুমুর্তিও তুমি নও। তুমি কবি, তুমি দেশনায়ক, তুমি দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, শিল্পী...তুমি ঋষি প্রমুখ , কিন্তু শুধু এই বিশেষণে তোমায় ভূষিত করে তোমায় বর্ণনা করা যায় না। ....তুমি হলে তোমারি ভাষায়, আমাদের প্রানের আরাম,আমাদের আত্মার আনন্দ, আমাদের হৃদয়ের শান্তি। আর তাই আজ, তোমার জন্মদিনের শুভসকালে তোমায় আমার খোলা চিঠি। হে আমার রবিঠাকুর, আমার বন্ধু, আমার মিতা , আমার ঈশ্বর।
প্রথম কবে তোমায় দেখলুম, জানলুম মনে পড়ে না পুরোপুরি। প্রথম কবে থেকে এই যোগাযোগ,মনে রাখা সম্ভবও নয়।সম্ভবত, এইরকমই কোনো পঁচিশে বৈশাখের কালবৈশাখী ঝোড়ো বিকেলে পাড়ার অস্থায়ী মঞ্চে, প্রায় জোর করে আমার নাম লেখানো হলো আবৃত্তি প্রতিযোগিতায়।মায়ের হাত ধরে পাড়ার ইশকুল ঘরে গেলাম। তক্তপোষের ওপর ডোরাকাটা শতরঞ্চি পাতা। তার ওপরে একটা ডেকোরেটার্সের চেয়ার। চেয়ারের ওপরে সাদা চাদর পেতে, পাড়ার ক্লাবঘরে টাঙানো ছবিটাকে পেড়ে সেদিন রাখা হয়েছিল। এক ফর্সা, গম্ভীরদর্শন বুড়ো দাদুর ছবি।ফুরফুরে সাদা চুল , দাড়ি। বেশ সাধু সাধু দেখতে। ছবির ওপর রজনীগন্ধার মালা। মালায় মালায় ছবিটা ঢেকে গিয়েছে প্রায়।ধূপে, ধোঁয়ায় বেশ ভাবগম্ভীর পরিবেশ। ছবিটা কে, কি অত কিছু জানি না তখন।জানি শুধু তোমারি বীরপুরুষ কবিতাটি আবৃত্তি করানো হবে বলে আমায় নিয়ে আসা হয়েছে। তখন আমি বোধহয় পাঁচ কিম্বা ছয়। ঠিক যেমন শেখানো হয়েছিল. প্রথাগত ভাবে তালিম দেওয়া হয়েছিল, যে শুরুতেই হাত জোড় করে বলতে হবে, নমস্কার, কবিগুরু শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ...।সেই প্রথম, তোমার নাম জানা।সেদিন মনে মনে বেশ রাগ করলুম যে এমন সুন্দর লেখাটির লেখকের নাম এত দীর্ঘ কেন, বিশেষত যখন সেটি আবৃত্তিকারকে শুরুতে এবং শেষে প্রনামী স্বরূপ বলতেই হবে। সেদিন বুঝিনি, নামের মতই এই মানুষটিও তার দীর্ঘ ছায়া আরো দীর্ঘতর হয়ে একদিন আমার জীবনের পথপাশে এসে দাঁড়াবেন, বটবৃক্ষের মত ছায়া নিয়ে। আর থেকে যাবেন, ছায়া সঙ্গীর মতই। যাইহোক, তো সেই বৈশাখী বিকেলে কাঁপা কাঁপা পায়ে মঞ্চে উঠে সেই দুই ফুট চেহারা ও ততোধিক ক্ষুদ্র মননে যখনি শুরু করলাম.." নমস্কার , কবিগুরু শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "লুকোচুরি" ...", দেখলাম সামনের সারিতে বসা পাড়ার সেনকাকু, মাস্টারমশাই, গোপাল কাকা, নারুদা ওদের মুখগুলো কেমন চকচক করে উঠছিল , ঝলমলে, আলো আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল, যেন কোন মহার্ঘ দিয়ে কোন মহামানবের পুজোর প্রস্তুতি শুরু হলো এই মাত্র।
সে সময়ে ঐরকম বসে আঁকো, আবৃত্তি, গান এসব প্রতিযোগিতার ধুম ছিল খুব। আমার ফুলপিসিমা, গরমের ছুটির দুপুরবেলার নিঃঝুম প্রহরে যখন আমায় একের পর এক রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গীতবিতানের, সঞ্চয়িতার পাতা থেকে উল্টে উল্টে শেখাতেন, দেখতাম তাঁরও আবেগে, আনন্দে, থরথর ভালবাসায়, এই একটি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে আসতো গোটা অস্তিত্ব। কেন সেদিন বুঝিনি, মাঝখানে কেটে গেল অনেক গুলো বছর, না বুঝেই। স্কুলে পেলাম সহজ পাঠ। বিশ্বভারতীর ঘিয়ে সাদা প্রচ্ছদের বইটিতে দেখলাম কি সব আশ্চর্য ছবি।ঘন কালো কুচকুচে মেঘ ঘনিয়ে আসছে মাঠের ওপর, লাঙ্গল কাঁধে গরু নিয়ে টোকা মাথায় চাষী ফিরছে ঘরে, চাষী বউ মাথায় ঘোমটা দিয়ে উনুনে ফু দিয়ে ভাত রাঁধছে, ছোট খোকা হামাগুড়ি দিতে দিতে বলছে , তারপর ওই যে , ছোট খোকা বলে অ, আ , শেখেনি সে কথা কওয়া। এরপর, সহজ পাঠ শেষ হলো একসময়।পাঠ্য পুস্তকের বাইরেও পড়লাম রবি ঠাকুরের গল্প, রবি ঠাকুরের কবিতা! দেহে, মনে বড় হলাম আরো। তোমায় পেলাম আরো নিবিড় করে।
সে সময়, গ্রীষ্মের সন্ধ্যেবেলায় তখন লোডশেডিং হত খুব ।আর ঘরে ঘরে জেনারেটার এর অত চল ছিল না । লোডশেডিং মানেই পড়াশোনার হঠাত ছুটি ! আনন্দে আটখানা আমরা ছোটরা বড়দিদি, মা কিম্বা কাকিমাদের সাথে বাড়ির লাগোয়া মাঠে, এজমালি উঠোনে ঘন হয়ে বসতাম। উঠোনে করবী ফুলের গাছ ছিল একটা।গাছটার গোড়ায় ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকতো ! আর সেই অন্ধকার, তমসাময় সন্ধেগুলো ঐখানে বসে আমরা চেয়ে থাকতাম বিস্ময়ের চিদাকাশে! মেঘ সরে গিয়ে থালার মত চাঁদ উঠত একেকদিন। আকাশের একটি একটি তারা, সদ্য ফোটা জূঁই ফুলের মত আলোকময় আর সুগন্ধি হয়ে উঠত, যখন বড়দি বা জেঠিমা কেউ ধরতেন গান, তোমার গান। কখনো ." আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে" আবার কখনো বা " চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে ", এই ছিল আমাদের সন্ধ্যেবেলার চাঁদনী রাতের প্রিয় গান। সে সময় ভাবতাম, এ বুঝি আমাদের ধর্মগীতির মত, মানে ওই যে পুজোর সময় জপে বসে যেমন গুনগুন করে গাইতেন ঠাকুমা, সেইরকম গোবিন্দের গান বা ঐরকম কিছু। যদিও ও গানে ঠাকুর দেবতার কোনো কথা থাকত না, থাকতো চাঁদ, ফুল, হাসি, এইসব ,কিন্তু কি যেন অদ্ভূত মায়া। ঘোর লাগত চোখে, মায়া জাগতো বুকের নিভৃতে।এই বিস্ময় , এই মায়া কার জন্যে, কিসের জন্যে ঐটুকু বয়সে বুঝিনি সেদিন। আজ বুঝি প্রকৃতির এমন কোনো রূপ নেই, এমন কোনো নিবিড় অনুভব নেই, যা তুমি লিখে যাওনি কবি। সেদিনের সেই সবকটা জ্যোৎস্নারাতের ঋণ তোমার কাছে জমা রয়ে গেছে।
তখন সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি, ছুটির দিনগুলোয় প্রথম তোমাকে তোমার মত করে পরার অবসর পেলুম। যদিও আমার দরিদ্র বুকশেলফে তুমি নেই তখন...জন্মদিনে এক দু কপি গল্পগুচ্ছ ছাড়া। সেল্ফ মানে তাকের ওপর বইয়ের স্তুপ আর উইয়ের ঢিপি। মা অফিসে চলে যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ দুপুরে আমার একমাত্র বন্ধু হয়ে উঠেছিলে তুমিই তো ! সেজজেঠুর বাড়ির সুসজ্জিত ড্রয়িংরুম এর দেওয়াল আলমারির তাকে সারি সারি লাল চামড়ায় বাঁধানো ছিল তোমার বই, রবীন্দ্র রচনাবলী, সঞ্চয়িতা, গল্পগুচ্ছ আরও কত। মনে আছে, রোজ সকালে নাওয়া খাওয়া ফেলে কেমন ঘোর লাগার মত অকিঞ্চন লোভ নিয়ে হাজির হতাম, শুধু তোমায় পড়ব বলে।একটা একটা করে বই নিয়ে বারান্দার লাল মেঝেতে ধপ করে বসে পড়তাম। রোদ ও ছায়ার আঁকিবুকি কাটা জাফরি গুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়েছি তোমার পাতাগুলোর ওপর দিয়ে , তোমার লেখাগুলোর ওপর বুলিয়েছি আঙ্গুল, ছুঁয়েছি আলগোছে। মনের মধ্যে কোথায় জানি, টুপ টুপ করে পরা জলের ফোঁটার মত নিরবে নিভৃতে বুঝতে পারছিলাম প্রেম শব্দটার মানে। একে একে শেষ করেছি কাবুলিওয়ালা, মাস্টারমশাই, মনিহারা, নষ্টনীড়, পড়েছি অনেক কিছু, পড়া হয়নি আরো কত। বুঝেছি কিছু, না বোঝার পাল্লাও প্রচুর। কিন্তু এটা বুঝেছি ,তোমার ছায়ার চেয়ে দীর্ঘতর কোনো ছায়া নেই, তাই কেমন অক্লেশে আমার জীবনের ও আমার মত অগুন্তি জীবনের পাওয়ার, না পাওয়ার , দীন , হীন , উজ্জ্বল , নিস্প্রভ প্রতিটি মুহূর্ত তুমি লিখে গেছ সেই কবে !
তাই, শুধু সুখে নয়, আনন্দে নয়, দুঃখে, ব্যথার চরম দিনেও হাত ধরেছ সেই তুমি !অনেক জ্যোৎস্নারাত পেরিয়ে যেদিন, অনেক দুঃখরাত এলো, সেইদিনও। বাবা টাকা পাঠাচ্ছেন না অনেকদিন, মা অনেক কষ্টে সারাদিন চাকরি করে, রাত্রে জেগে জেগে ড্রাফ্টম্যানশিপের ড্রয়িং করে কোনক্রমে সংসার চালাচ্ছেন। টাল মাটাল সংসারের হাল। ইলেক ত্রিকের বিল জমা দেওয়া হয়নি তিনমাস। ওরা এসে কানেকশন কেটে দিয়ে গেল। ঠিক ঐরকম কোনো একটা দুঃখ রাতের ঘন অন্ধকারে সেদিন বাইরে অঝোরে বৃষ্টি। ঘরে তেমন বাজার নেই। কাল কি হবে, জানি না। মনে আছে সেই চরম অভাবের দিনেও আমাদের আট ফুট বাই আট ফুটের চিলতে একটুকরো নিষ্প্রদীপ ঘরে, একটামাত্র মোমের আলোর দিকে তাকিয়ে মায়ের গান, " তোমার অসীমে, প্রাণ মন লয়ে...যতদুরে আমি ধাই .."..মোমের আলোয় মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম সেদিন, জলে ভরে আসা চোখ দুটোয় সেদিন ভরসা দিয়েছিল তোমার গান। সেদিন দেখছি কবি, কি শক্তি, কি প্রগাঢ় ভরসা ছিল তোমার শব্দে। একটা সব হারানোর সংসারে, সব পাওয়ার অনুভূতি সেদিন তুমি দিয়েছিলে, অকাতরে, নিঃশব্দে।দেখেছিলাম, কি আশ্চর্য এক বিরাট আদিম ডাইনোসর এর মত তোমার অতিকায় অস্তিত্বের নিচে সুখে শান্তিতে, হাসি কান্নায় আমাদের মত হা-সাধারণ মানুষের অগুন্তি সংসার, নিরালায় বাঁচে।
এই পৌণপুনিকতা থেকে আমাদের মুক্তি কোথায় বলতে পারো ? তুমি কি ইশ্বর ? নাই যদি হবে , তবে এ কি অদ্ভূত প্রফেসি তোমার। দুটো লাইন দিয়ে শেষ করব, এই আকালেও , এই আঁধারেও স্বপ্ন লিখো, ঠাকুর।
“এই আকালেও স্বপ্ন বুনে যাবেন ,একলা, চির একলা, রবি ঠাকুর !”
No comments:
Post a Comment