Wednesday, June 22, 2016

প্রাক্তন ~ চিত্র আলোচনা

"রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা , ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন !..."
সম্ভব যে হবে , কে আর ভাবি বলুন তো ! যে সম্পর্কগুলোকে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে আসি, যে সম্পর্কের সিঁড়ি ভেঙ্গে জীবনের উজান স্রোতে আমরা এগিয়ে যাই স্মৃতিরঙিন অথবা স্মৃতিমলিন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে, কজন ভাবি সেই সম্পর্কের শব আবার দেখতে পাবো দিনের আলোয় ? ভাবি না, ভাবতে চাইও না ! অভিমানে, অভিযোগে, রাগে ঘৃণায় কালশিটে পড়া মনে যে আগুন ধিকিধিকি জ্বলে সেই আগুনের আঁচ পুইয়েই তো জেদের বশে অথবা নেহাত প্রয়োজনে নতুন করে গড়ে তোলা, খেলনামাটির ঘরের দেওয়ালের মাটি শক্ত হয় !তাই নয় ? তবে তাই যদি হবে, তবে কেন ভুলতে পারিনা পুরনো ফেলে আসা ঠিকানার চেনা ল্যান্ডমার্কটুকু ! কেন ' ব্যর্থ আশা মরিতে মরিতেও মরে না ?' কেন ওই কবিতাটা মনে পড়ে ?.....
- "ঠিক সময়ে অফিসে যায় ?/ ঠিক মত খায় সকালবেলা ?/ টিফিন বাক্স সঙ্গেই নেয়,/ না ক্যান্টিনেই ......?"
হ্যা, জয় গোস্বামীর 'প্রাক্তন' ! কি দরকার ছিল এসব জানতে চাওয়ার ? অত্যাচারিত, ক্লান্ত, রিক্ত সম্পর্ক পেরিয়ে এসেছেন যে স্ত্রী, এসেছেন নতুন ঠিকানায়, কেন এখনো জানতে চান 'প্রাক্তনের' কথা ? ছেড়েছেন তো সবকিছুই তবুও তার সওব কিছু ছেড়ে আসতে পারেননি তবে ! ক্লান্ত ভালবাসা সেই রয়ে গিয়েছে ছেড়ে আসা ঠিকানায়, ফেলে আসা আলনা, বিছানা, দেরাজে, ভাঁজ করা কাপড়ের মধ্যে রাখা একটুকরো কাগজে, একটু একটু করে... ! আসলে অভ্যেস তো ! সব একদিনে বদলায় না যে ! সুটকেস বন্দী করে নিজের যা যা ছিল, সব গুছিয়ে দাম্পত্যের সামাজিক বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে চলে আসা গেছে হয়ত, কিন্তু ও বাড়ির ছাদে দুজনের শীতদুপুরের খুনসুটিটুকু ? ওটা তো রয়েই গেল! সেবার শীতে যে হাতে বোনা সোয়েটারটা দিয়েছিলাম ? ওটা তো ফেরত নিয়ে আসা হলনা ! একসাথে বৃষ্টিভিজে পাহাড়ের পাকদন্ডি হাঁটার মুহূর্তগুলো তো ফেরত নিয়ে এলাম, কিন্তু একটা ছাতার নিচে একসাথে ভেজার, ভিজে মনটুকু যে প্রাক্তনের ব্যালকনিতে মেলে এলাম, সেটা তো ফেরত এলো না ? রয়েই গেল ! রয়েই যায়, এমন কত কিছু ! ঠিক যেন কবিতার মত! হ্যা কবিতাই, তবে জয় গোস্বামীর 'প্রাক্তন' নয় বরং রবি ঠাকুরের 'হঠাৎ দেখা'ই শিবপ্রসাদ- নন্দিতার নতুন ছবি 'প্রাক্তনের' কাব্যিক শিরদাঁড়া ! এই ছবির গল্প তাই শুধুই ফেলে আসা তিক্ততার, ছেড়ে আসা সম্পর্কের বিষাদ এলিজি নয়, প্রাক্তন দুই মানুষ মানুষীর সম্পর্কের রসায়নে কোথায়, কত ফোঁটা ভুল ছিল, সেই ভুলটিকেও দশমিকের হিসেবে ঠিক করে দেখায়, সহজ করে, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় সুদীপা আর উজানের সম্পর্কে নবাগতা তৃতীয় মানুষ মালিনীর হাত ধরে !
"........আগে ওকে বারবার দেখেছি লাল রঙের শাড়িতে, দালিম ফুলের মত রাঙ্গা, আজ পড়েছে কালো রেশমের কাপড় ,আঁচল তুলেছে মাথায়|দোলন-চাঁপার মত চিকন গৌর মুখখানি ঘিরে !"
লাল থেকে কালো ! কিভাবে একটা সম্পর্ক সময়্সরণী ধরে চলতে চলতে তার সব রং হারায় ! কালো হয়ে আসে রঙিন আসমানী বিকেল ! প্রাক্তনের গল্পটি খুব সহজ ও সরল ! মুম্বাই থেকে কলকাতার এক দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় মধ্য ত্রিশের কেরিয়ায় সফল (?) সুদিপার সাথে আলাপ হয় সহযাত্রী মালিনীর ও তার বছর ছয়েকের কন্যার ! একই ক্যুপে ট্রাভেল করা এই দুই নারীর দেখাই আসলে এখানেতে হঠাৎ, আর তাদের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসে মালিনীর বর্তমানের সুখী দাম্পত্যের জলছবি আর সুদীপার ছেড়ে আসা দাম্পত্যের প্রাক্তনীর যোগসূত্রটুকু ! হ্যা, একটিই পুরুষ তাঁদের জীবনে ! সেই উজান মুখার্জির প্রাক্তন আর বর্তমানের হাত ধরে ট্রেন এগিয়ে চলে কলকাতার দিকে। একই কামরায় ট্র্যাভেল করছেন আরও নানারকম দম্পতি! বর্ষীয়ান সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী আছেন যেমন তেমনি আছেন সদ্য হানিমুন রঙিন বিশ্বনাথ ও মানালিও ! আবার নিজের নিজের চরিত্রেই আছেন ভূমি-খ্যাত সুরজিত, অনুপম রায় আর চন্দ্রবিন্দু খ্যাত অনিন্দ্য ও উপলেরা ! এই নানারকম জুটির মধ্যেই আদরের বউকে জন্মদিনের সারপ্রাইস দিতে নাগপুর থেকে উঠে পড়েন ঋতুপর্ণার 'প্রাক্তন' সঙ্গী প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়, এ ছবির উজান !
".......মনে হলো, কালো রঙে একটা গভীর দুরত্ব ঘনিয়ে নিয়েছে, নিজের চার দিকে ,যে দুরত্ব সর্ষে খেতের শেষ সীমানায় ,শালবনের নিলাঞ্জনে।থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা ,চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে !"
যাঁর সাথে কলকাতার পথে পথে হেঁটে এই শহরটাকে চিনতে শেখা, যার সাথে ঘরকন্নার, কান্নাহাসির দাম্পত্যের সকাল বিকেল, যাঁর সারা গায়ে কোনখানে কটা তিল; কেমন গন্ধ, কখন রাগ ,কখন গুমোর, সেই সমস্তটুকু চেনা, কেমন লাগে সেই চেনা মানুষকে যখন অচেনার গাম্ভীর্যে গ্রহণ করতে হয় ? চলন্ত ট্রেনে যে দাম্পত্যের ব্যালকনিটুকুও নেই, তাই কাঁদতে হলে বাথরুমে গিয়ে বন্ধ দরজার আড়াল নেওয়াই শ্রেয় ! ঋতুপর্ণা এ ছবিতে নিজেকে সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। কালো চশমার আড়ালে নিজের চারদিকে এঁকে দিয়েছেন গভীর দুরত্ব ! দুরত্ব ঘনিয়েছে উজানেরও। বয়সে, চেহারায়, মননে ঋদ্ধ প্রসেনজিত ও ঋতুপর্ণা, প্রায় ১৫ বছর পর একসাথে কাজ করলেন এবং প্রমান করলেন, বাংলা ছবির এ যাবৎ সেরা জুটিগুলির মধ্যে তারা কিন্তু সত্যিই অন্যতম। ১৫ বছর কেন একসাথে কাজ করেননি, কোন ব্যক্তিগত অভিমান বয়ে বেড়িয়েছেন, সেসব কথা থাক, কিন্তু তাঁদের একসাথে ফিরিয়ে আনার জন্যে যেন ঠিক এই ছবিটিরই দরকার ছিল। অনুপম যখন সদ্য বিয়ে হওয়া স্ত্রী পিয়ার জন্যে এ শহরে ফিরতে মুখিয়ে থাকেন স্ব-পরিচয়েই অথবা ভূমির সৌমিত্র-সুরজিতের দলগত বিচ্ছেদ যে শ্রোতারা এখনো ভুলতে পারেন না এমন সব বাস্তবের রেফারেন্স দর্শকেরা যারপরনাই আনন্দ করে গ্রহণ করেছেন ! রিল যখন রিয়ালে মেশে, তখন সেইসব চরিত্র বা জুটিকে পর্দায় তাঁদের স্বপরিচয়ে দেখলে এক অদ্ভূত রোমাঞ্চ থাকে বৈকি ! গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটি তখন ফিকে হয়ে যায় দর্শকের কাছে, আর সেইখানেই বাজিমাত করেন পরিচালক!
বাজিমাত করলেন আরো একজন, যাঁর জন্যে একটা আলাদা প্যারাগ্রাফ লিখতেই হলো, তিনি অপরাজিতা ,অর্থাৎ এ ছবির মালিনী, সংক্ষেপে মলি ! কি স্বাভাবিক অভিনয়, কি সহজাত স্ফুর্তিতে এক সামান্য, সাধারণ, আলাপী, গল্পমুখর, উচ্চকিত গৃহবধুর চরিত্রে নিজেকে কি চমৎকার খাপ খাইয়ে নিয়েছেন তিনি ! ঠিক যেন আগেকার বাংলা ছবির সাবিত্রী দেবী! সংলাপ যেন সংলাপ নয়, অভিব্যক্তি যেন অভিনয় নয়, শুধুমাত্র চরিত্রটিকে পর্দায় আচরণ করা ! অভিনয়ের কোথাও কোনো অভিনয়ের ছাপ নেই! এই চরিত্রটি তাঁরই জন্যে শুধুমাত্র লেখা যায় যেন! বেলাশেষের পর এ ছবি, অভিনেত্রী হিসেবে অপরাজিতা আধ্যের জাত বুঝিয়ে দেয়। ঋতুপর্ণার আপাতকঠিন দেওয়ালের বিপরীত মেরুতে অপরাজিতার আপাত সরল মুখটুকু যেন পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে।
"......আমাদের যে দিন গেছে, একেবারেই কি গেছে ? কিছুই কি নেই বাকি ?"
না, এখনো বাকি রয়ে গছে বাঙালির এই আজন্মলালিত পরিচয়টুকু ! ঠিক যেমনটি ছিল এক সময়ের কালজয়ী সাদাকালো বাংলা ছবির সাফল্যের গল্পে ঠিক তেমন ঝগরুটে, খ্যাপাটে, আতুপুতু, ট্যালেনটেড, ঘরোয়া, কমপ্লেক্স ভোগা হরেক রকম বাঙালি চরিত্র তাদের স্বাভাবিকতম সেরাটুকু নিয়ে হাজির থাকে শিবপ্রসাদের ছবিতে। তাই সিনেম্যাটিক এক্সেলেন্স তখন আর সাফল্যের আয়না ধরে না, দর্শকের চেনা অনুভবই জিতিয়ে নেয় দর্শক মন। নিপাট সারল্য ও সহজ গল্প যেখানে সব বলে দেয় সেখানে সিনেমা ইশকুল সুলভ কোনো আরোপিত জ্ঞানদানের আয়োজন থাকে না শিবপ্রসাদ নন্দিতার ছবিতে ! পরিচালনার সাথেই চমৎকার এ ছবির গান, অনুপম রায়, অনিন্দ্য, সুরজিত , ইমন সক্কলে খুব ভালো গেয়েছেন। ক্যামেরার নির্ভার লিরিকাল কাজে চেনা শহর ও অচেনা প্রেমের চিরকুট নিয়ে সামনে এসেছে বারবার। ছুঁয়ে গেছে বিকেলের আলোয় জানলার কাঁচে মুখ রাখা অভিমানী নায়িকার সিলুয়েট।তাই জুটি নন্দিত এ ছবির অন্যতম পরিচালক জুটি শিবপ্রসাদ নন্দিতাও একসাথে মানুষের ভালবাসা পাচ্ছেন একটিই কারণে, সেটি হলো বাংলা ও বাঙালির শিকড়কে তারা যেমন ভাবে বোঝেন ও পর্দায় উপস্থাপনা করেন, সেটি যাকে বলে আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত উক্তির মতই আগমার্কা। শুধু একটু বদলে বলাই যায়, " ফিল্ম মেকার অফ দা বেঙ্গলি, বাই দা বেঙ্গলি, ফর দা বেঙ্গলি"।
ট্রেনে উঠে ফাস্ট ক্লাস এসি কামরায় ভ্রমন মানেই যেমন দার্জিলিং চায়ের টি-ব্যাগ থেকে রবীন্দ্রনাথ থাকেন বাঙালির সঙ্গে, তেমনি থাকে বোরোলিন, কম্বল থেকে বাথরুম নিয়ে খুঁতখুঁতানি অথবা শীতকাতুরে বাঙালির চিরকালীন আর্জি, 'এ.সি.টা বড্ড বেশি' অথবা 'চাদরে তরকারির দাগ ' এ জাতীয় অভিযোগের পাহাড় ! আবার সারা বছরের শক্তি, সুনীল, গার্সিয়ার দার্শনিকতার সাথেও নির্ভুল ব্যালেন্সে থাকে শনি মঙ্গলবার, বারব্রত, কু সংস্কারের বিচিত্র মিশেল। চার মাথা বঙ্গসন্তান এক হলেই থাকে সময় কাটানোর নিতান্ত বাঙালি আয়োজন, তাস পেত, লুডো খেলা অথবা নির্ভেজাল আড্ডা থেকে অন্তাক্ষরী। এ জাতীয় টিপিকাল বাঙালিয়ানাকে সঠিক অনুপানে মিশিয়ে তাতে আবেগের ঝাঁঝালো আরক মিশালে, যা তৈরী হয়, তা বক্স অফিস সাফল্যের নির্ভুল চাবিকাঠি! প্রমান করেছেন শিব-নন্দিত তাঁদের বিষয়ভিত্তিক অজস্র ছবিতে, এবং অবশ্যই বেলাশেষে'তে! মৌলিক পরিচালনার দক্ষতার প্রশ্নে এলে অবিশ্যি অনেক কথাই আসতে পারে, আপনি বলতে পারেন এ ছবিতে ছায়া পেয়েছেন সত্যজিত রায়ের 'নায়ক' ছবির, মিল পেয়েছেন নাসিরুদ্দিন , রেখা অভিনীত 'ইজাজত' এর, খুঁজে পেয়েছেন বাঙালির মননের গভীরে মিশে থাকা এমন আরও অনেক কালজয়ী ছবির রেফারেন্সও !
কিন্তু সব প্রাক্তন প্রেমের গল্পই কি এক জায়গায় গিয়ে একই কথা বলে না ? আর সেই বলার ভঙ্গিতে অনুলেখকটি যদি হন রবি ঠাকুর, তবে তো আর কথাই নেই! কে না জানে, বাঙালির মন জয় করতে রবিঠাকুর আজও সব জাগতিক প্রাসঙ্গিকতার উর্দ্ধে!
".....আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই , দুরে যাবে তুমি , দেখা হবে না আর কোনদিনই !"
যাত্রা শুরু হলে একসময় শেষ হয় ! শেষ স্টেশনে নেমে যায় চারপাশের সহযাত্রীরা, একসাথে কাটানো মুহুর্তগুলো গল্প হয়ে থেকে যায়, গন্তব্যে পৌছে যায় খেয়ালী মন ! তবু তো না বলা প্রশ্নগুলো থেকে যায় ! থেকে যায় ভিড় কাটিয়ে দুই প্রাক্তনের বারবার ফিরে দেখার দৃশ্য টুকু !হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় কানে এলো পাশে বসা দুই মহিলার সংলাপ, জনৈক আর জনৈকা বিবাহ বিছিন্ন কোনো দম্পতির উদ্দেশ্যে,..." ওরা এ ছবি দেখলে পারতো একবার ?" সঙ্গের বন্ধুটি বললেন," নাহ, ওরা দুজনে দুজনকে শিফট- কন্ট্রোল- ডেল করে দিয়েছে রে ! এমনকী রি-সাইকল বিনেও আর নেই !" ওদের দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে গেল হলফেরত মানুষের ভিড়ে ! প্রশ্নটাও রয়ে গেল ! কিন্তু আমার মাথায় গুনগুন করে উত্তর দিয়ে গেলেন সেই রবি ঠাকুর ,
"....একটুকু রইলেম চুপ করে, তারপর বললেম, রাতের সব তারাই আছে, দিনের আলোর গভীরে !"

No comments: