...............
চিঠিটা শেষ করে বেশ খানিকক্ষণ স্মৃতির ভারে ডুবে
রইলেন সুকৃতি । চোখের ওপর ভাসছে
, দুর্গাপুজোর দশমীর রাত । ঠাকুর ভাসানের পরে চাঁদের আলোয়
ভেসে যাচ্ছে চরাচর
। ঠাকুর দালানে শুন্য মন্ডপে একটি
একলা প্রদীপ শরতের
শেষ রাত্রের হাওয়ায় কাঁপছে মিটিমিটি আর নিপুদা বসে বাজাচ্ছেন সেতার । কোলের ওপর হালকা একটা
মুগার চাদর আর রাজার মত দু বাহু জড়িয়ে সেতারের সুরে সুরে চতুর্দিক যেন কেঁপে কেঁপে
উঠছে । সুকৃতি আর শ্যামলেন্দু একসাথে বসে , হৃদ কোলে ঘুমিয়ে কাদা । মালকোষের সুরে , দুধের
সরের মত হালকা
চাঁদের আলো যেন জমাট বেঁধে বেঁধে
ধুপের ধোয়ার মত মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে, বিশ্ব চরাচর
স্তব্ধ যেন সেই গন্ধর্বের সামনে । তেমন বাজনা সুকৃতি যেন আর কোনদিন শোনেনি, আর কোনদিন শুনবেন ও না । অনেকদুর থেকে
ভেসে আসছে বিদায়ী ঢাকের আওয়াজ আর চোখের কোল ভিজে
গলা বেয়ে গড়িয়ে
পরছে অশ্রু । কিসের যে অপূর্ব সুখবোধ, কিসের যে অপূর্ণ দুঃখভার এফোঁড়
ওফোঁড় করে দিছে
সুকৃতির হৃদয়, তা কি সে সেদিন
বুঝতে পেরেছিল ? সম্বিত ফিরল বেলার কথায়
। " অমা, বসে রইলে
যে, ও ঘর টা পস্কের কত্তে
হবে না ?" হ্যা, তাইত ,এখনো কত কাজ বাকি । উঠে দাঁড়ালেন সুকৃতি । সদরের ঘরটায়
গিয়ে একবার বাজনাটার সামনে দাঁড়ালেন । কাশ্মীরি কাজের ঢাকায় এখন জায়গায় জায়গায় জোড়া
তালি । ধুলোয় ঢেকে শুয়ে আছেন
নিপুদা । এ বাজনা এ বাড়িতে আর কেউ কোনদিন ও বাজাবে না, যা যায়, যে যায়, তারা বোধহয়
চিরদিনের জন্যই যায়,
কিছুই তার বাকি
থাকে না । একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে এলো সুকৃতির ।
~
এয়ার পোর্টে গাড়ি পাঠিয়েছিল রেখাই । তিতাস আর রেখা গেছিল ওদের
রিসিভ করতে । সুকৃতি যাননি । এই কদিনে নিজেকে অনেকবার ভেঙ্গে চুরে..
নতুন করে গড়ে বারবার চেষ্টা করেছেন, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে , নতুনকে স্বীকার করে নেওয়ার । কিন্তু নিজের কাছেই নতিস্বীকার করতে হয়েছে বারবার । এতদিনের সঙ্গস্কার , এতদিনের তিলে তিলে তৈরী
হওয়া স্বপ্ন, আজন্মলালিত বিশ্বাস এর দেওয়াল তিনি ভাঙতে পারবেন না এভাবে । ছেলে ফিরল
সঙ্গে করে আরেকজন পুরুষকে নিয়ে, যে কিনা তার ভবিষ্যত জীবনসঙ্গী ...না, না, এ কিভাবে মেনে
নেবেন সুকৃতি । কাল সারারাত ঘুম হয়নি সেভাবে । শুধু এপাশ ওপাশ
করেই রাত কেটে
গেলো । চাপা একটা অস্থিরতায় প্রায় আচ্ছন্ন অবস্থায় যখন ভোরের দিকে চোখটা
লেগে এসেছে হৃদ এর ফোন এলো,
ওদের ফ্লায়িট তখন ট্রানসিট এ ।
নিচে একটা
হইচই শুনেই সুকৃতি বুঝলেন, সে এসেছে
। ওপরের জানলার খড়খড়ি ফাঁক করে অস্থির দুটো চোখ খুঁজে গেল, হৃদ কে । গাড়ি থেকে নেমেই হৃদ ওপরের দিকে তাকালো, তার চোখ ও খুঁজছে মাকে । আকুল ভাবে খুঁজছে এদিকে, ওদিকে । ছোট তরফের আত্মীয়স্বজন সবাই এগিয়ে এলো
, হৃদ একে একে প্রনাম করছে, হাসছে
।
একে একে নেমে
এলো রেখা ও তিতাস ও । সুকৃতির বুকের
মধ্যে যেন হাজার
ঢাকের বাদ্যি, কই, আর কেউ তো সঙ্গে নেই, তবে কি হৃদ একলাই
এলো ? থরথর করে পাতলা ঠোঁট দুটো
কাঁপছে তার । আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন তিনি
। এ যাত্রা কি বদলে গেল ওর সিদ্ধান্ত ? রতন ,বেলা গিয়ে লাগেজপত্তর নামাতে নামতেই হৃদ গিয়ে গাড়ির জানলায় মুখ রেখে কাকে
কিছু বলার পরেই
নেমে এলো, ওই ছেলেটি । বুকের ভিতরটা ধক করে উঠলো সুকৃতির । এ কাকে
দেখছেন তিনি ? নিজের
চোখ দুটোকেও যেন অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে
হচ্ছিল তাঁর , ঠিক যেন সেই । হৃদ এর মাথায়
মাথায় লম্বা, অস্বাভাবিক ফর্সা চেহারা আর ঝাঁকরা বাদামী চুল । কিশোর সুলভ মুখটায় পাতলা দাড়ি গোঁফ
আর লালচে আভায়
একটা অদ্ভূত উজ্জ্বলতা আর মুখের রেখায়
এ দেশকে আষ্ট্রে পৃষ্টে দেখার, জানার,
বোঝার আকুল অনুসন্ধিত্সা । চোখ দুটোয় যেন শতাব্দীর বিষন্নতা আর শান্ত সন্ধ্যে নীলচে
কালো জলে ডুব দিয়ে স্থির হয়ে আছে । এ চোখ যেন সেই চোখ, যে চোখটা
অনেকদুর অবধি দেখতে
পেত । এ বাড়ি ছাড়িয়ে, ছাদ পেরিয়ে , আশেপাশের সমস্ত পাড়া
ছাড়িয়ে,এমনকি ২৪ নং ভবানী সেন লেন এর মোড়ের
মাথায় ওই অত্ত
লম্বা কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে ছাড়িয়ে , যেন আকাশের মত ছড়িয়ে
আছে প্রসন্ন দৃষ্টি টা । ঠিক সেই চোখ । পাশে হৃদ , যেন ঠিক সেই প্রথম
একুশের শ্যামলেন্দু । সেই দোহারা চেহারা । সেই মোটা জুলপির পাশে টানা টানা,
ভাসা ভাসা চোখের
মানুষটি । জানলাটা চেপে
ধরে বন্ধ করে দিলেন প্রানপনে সুকৃতি । আচ্ছা, হৃদ কি বুঝতে পারছে
তিনি এখানে, এই জানলার পিছনে ? কখন জানি চোখটা ঝাপসা
হয়ে এলো সুকৃতির , নিজেকে সামলানোর চেষ্টাটা বন্ধ করে দিলেন তিনি
। জলছবির মত সময় যেন পলকের
মধ্যে চূড়ান্ত গতিতে
পিছিয়ে গেল অনেকগুলো বছর । চারপাশে যেন বাজছে হাজারটা ঢাকের
আওয়াজ, জ্যাঠায়মার থালা সাজানো, বারান্দা জুড়ে বারকোষে চাকা চাকা
ফল কাটা হচ্ছে
, ধুনোর গন্ধ বাড়ি
জুড়ে, সেতারের মূর্ছনা ভেসে আসছে , শ্বসুর মশাই এর তেতলা
থেকে হাঁকডাক করছেন
, সদ্যযুবক শ্যামলেন্দু বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখে
নিচের দিকে তাকিয়ে, আর সদ্য বিবাহিতা গাছকোমর করে শাড়ি
পরা একটি মেয়ের
গোল্লাছুট খেলা, সব, সব, স্মৃতি যেন অযুত বছরের দেওয়াল ভেঙ্গে ভিড় করে এলো , সুকৃতির মাথায় । বাইরে বৃষ্টি এলো তুমুল ।
সারাদিন খাবার দাবার এর বন্দোবস্ত করলো বেলা, তিতাস ওরাই। হৃদ ঢুকেই ঘরে এসেছিল সকালে । বেশ খানিকক্ষণ মাকে জড়িয়ে বসে রয়িল স্থির হয়ে। সুকৃতিও কিছুই বললেন না। চুপ করে জানলার দিকে চেয়ে রইলেন, মুখের একটি রেখাও সরল না তার । রেখা এসে বেশ খানিকক্ষণ বকাবকি করে, তারপর গেল ওদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে । আন্দ্রে ছেলেটি ও এসেছিল । অনেকক্ষণ কিংকর্তব্যবিমুর ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল দরজায়, রেখা বলাতে এসে একবার প্রনাম ও করলো । একটা নতুন দেশে এসে সে দেশের রকম সকম, রীতিনীতি জানাটাই প্রাথমিক ভাবেই দুরূহ । সেখান থেকে একটা সম্পর্কের ভিত গড়তে যে সময় লাগে, তা সুকৃতির ও অজানা নয় । আসলে, সম্পর্কের উষ্ণতা আসতে সময় লাগে , অনেক রোদ, জল, মেখে, তবে না নির্মান । তবে ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে সুকৃতি বুঝলেন, সে চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং যা আছে, তা একটা নির্মল প্রছন্ন প্রশ্রয় । সুকৃতি কে বুঝতে তাঁর যতটুকু সময় এর প্রয়োজন ততটুকু পেরলেই যেন সে ভারী আপনার হয়ে উঠবে, সেই আত্মবিশ্বাসে সে যেন ভিতরে কোথাও ভরপুর ।
বরং হৃদ এর চোখে অপরাধবোধ, লগ্ন হয়ে আছে ,বুকের মধ্যে একটা সবসময় আঁচর কাটা অনুভূতি , কি করে মাকে খুশি করা যায়, কি করে এই অদ্ভূত পরিস্থিতির অস্বস্তি থেকে বেরিয়ে আসা যায়, হৃদ সেই রাস্তায় খুঁজছে যেন । দুপুরে স্নান সারা হলে একটা অদ্ভূত বায়না করলো আন্দ্রে । সে ভারতীয় পোশাক পড়তে চায় । আটপৌরে পাঞ্জাবি আর পাজামা তার চাই, হৃদ এর তো তেমন নেই , শেষমেষ আলমারি খুলে শ্যামলেন্দুর পাটভাঙ্গা পাঞ্জাবি বেরোলো আজ এত বছর পরে । গোলাপী খাদির পাঞ্জাবি আর পাজামায় আন্দ্রে রুব্লিয়েভ যখন খাবার টেবিলে এসে দাঁড়ালো, সবগুলো চোখ তখন তাঁর দিকেই । রাজপুত্রের মত দেখাচ্ছে যেন । অস্বাভাবিক তৃপ্তি নিয়ে একটা একটা করে পদ খেল দুজনে । সুকৃতি মুখে কিছু বললেন না, শুধু অনুভব করলেন, তাঁর এই সতেরো বছরের একাকিত্বে যে ধুলোর পাতলা সর জমেছিল স্মৃতির দেরাজে, সে দেরাজ এতদিন অধিকার ছিল শুধুই তার, আজ যেন সে দেরাজে ভাগ বসালো বর্তমান ।
রান্গাদিদী এই অসুস্থ শরীরেও দুজন কে জড়িয়ে ধরলেন । হৃদ কে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন তিনি । মুখে ভাষা ফুটল না বৃদ্ধার, শুধু চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দাশ্রু । দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর সুকৃতি ওপরের বারান্দা থেকে লক্ষ্য করলেন হৃদ আর আন্দ্রে ঘুরছে বাড়ির অনাচ কানাচ । আন্দ্রের হাতে একটা বড়সড় বিদেশী ক্যামেরা আর নোট বুক , হৃদ দুর্গাপ্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে কিছু বোঝাচ্ছে....আর পরম উত্সাহে সে ছেলে ছবি তুলছে পটাপট, আবার কি সব লিখেও রাখছে নোট বুকে । এ বাড়ির ঐতিহ্য, এ বাড়ির ইতিহাস, কতটাই বা বলতে পারছে হৃদ, কতটাই বা বুঝবে ওই ছেলে ! এই এতগুলো বছর যে স্মৃতি বুকে করে আগলে রইলেন সুকৃতি, সেই অতীত এর নিস্তরঙ্গ দিঘিতে আলোড়ন ফেলে, কি লাভ ? কার লাভ ?
খুব এক চোট বৃষ্টি হয়ে গেল শেষ বিকেলে। তিতাস আর হৃদ এর বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব এলো সন্ধ্যেবেলায় । সকলে মিলে গানবাজনা হবে , খাওয়া দাওয়া হবে ইত্যাদি । সুকৃতি ঘর ছেড়ে গেলেন না কোথাও । চুপচাপ বই পড়ে কাটালেন দুপুরটা । ওঘর থেকে হইচই শোনা যাচ্ছে খুব । তরুণ প্রজন্মের বাঁধভাঙ্গা হাসি, খিলখিল গল্প আর আগল ভাঙ্গা গান...আজ অনেকদিন পর এ বাড়িতে বাজছে । হাসিখুশি আলো গান এ আবার যেন ভরে উঠছে সুকৃতির মেয়েবেলার সেন বাড়ির আনন্দ নিবিড় দিনরাত । হঠাত হৃদ ঢুকলো ঘরে, 'মা, নিপুকাকার একটা সেতার ছিল না ? সেটা কোথায় ?' , 'কেন ? কি হবে সেটা দিয়ে ?' প্রশ্ন করলেন সুকৃতি । তিলে তিলে যত্ন করে জমানো স্মৃতির পাহাড় একদিনের উত্সবে হুরমুর করে ভেঙ্গে পড়বে, তা তিনি চান না । নিপুদার যন্ত্র ছিল নিপুদার প্রান । অনেক সন্ধ্যে, অনেক সকাল কেটেছে এ বাড়িতে সেই গানবাজনা ঘিরে । সেই যন্ত্র আর কারো হাতে বাজবে না, জানেন সুকৃতি । তিনিও বাজতে দেবেন না । হৃদ যখন বুঝলো না , তাঁর অনুভূতি, যখন এতটুকুও দাম দিল না মায়ের ইচ্ছের , তখন তিনিই বা কেন, ওর হতে তুলে দেবেন , তাঁর আনন্দবিষাদের একট একটা মুহূর্ত ? গলার কাছে হঠাত যেন একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠছে, নিজেকে সম্বরণ করে উদাস গলায় বললেন,' নিচের সদর ঘরের আলমারির পাশে দেখো, নাহলে বেলাকে বলো, ও বের করে দেবে ।' হৃদ খানিকক্ষণ মায়ের মুখের দিকে চেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো লঘু পায়ে । এ বাড়িতে তার ছোটবেলা'টা যতদুর মনে পরে, সেখানে খুব ছোটবেলায় নিপুকাকা কেই বাজাতে শুনেছে দু একবার । আর নিপুকাকা চলে যাওয়ার পর তো আর কেউই কোনদিন যন্ত্রটি বাজায় না । সদর ঘরটা খুলতেই আবছা অন্ধকারে চোখে পড়ল আলমারির পাশে সযত্নে রাখা সেতারটা । ওপরে কাশ্মীরি কাজের সুঁচের কাঁথা কাজের ঢাকা । মায়ের তৈরী । জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে একটু আধটু । খুব যত্ন করে ঢাকা টা খুলতেই দু চারটে আরশোলা স্থানচ্যুত হয়ে উড়ে বেরিয়ে গেল এদিক ওদিক । সেতার এর বুকে হাত রাখতেই একটা হালকা করে গং আওআজ ভেসে এলো....যার অনুরননে এই ঘরের হাওয়ায় ছড়িয়ে গেল শতাব্দীর জমা ধুলোর স্তর....অনেক কথোপকথনের আদর আবদার এর বিকেল জ্যান্ত হলো যেন , অনেক পুরনো মানুষের মুখের মিছিল স্পষ্ট হলো আবারও । বেশ খানিকক্ষণ বিমূর হয়ে বসে রইলো হৃদ । তার কেবলি মনে হচ্ছিল কবর খুঁড়ে যেন নিপুকাকা কে সে বের করে আনলো আবার । সেই যেমন বুকের ওপর ফেলে হৃদ কে নিয়ে ঘুরতে যেত ছোটবেলায় , ঠিক সেই অনুভূতিটা মোচড় দিয়ে উঠলো অনেক ভিতরে কোথাও । সেভাবে বাবার মুখ তার মনে পড়ে না, কিন্তু নিপুকাকার হাসি, গল্প বলা, গানবাজনা, ঘুরি ওড়ানোর একটা একটা আলগোছে রাখা মুহূর্ত যেন ছিটকে ছিটকে আসছে এই সেতারের বুক থেকে । স্মৃতি কি ভারমুক্ত হলে হালকা হয়ে যায়, না আরো গভীরে গিয়ে ভারী হয়ে চেপে বসে ?
বরং হৃদ এর চোখে অপরাধবোধ, লগ্ন হয়ে আছে ,বুকের মধ্যে একটা সবসময় আঁচর কাটা অনুভূতি , কি করে মাকে খুশি করা যায়, কি করে এই অদ্ভূত পরিস্থিতির অস্বস্তি থেকে বেরিয়ে আসা যায়, হৃদ সেই রাস্তায় খুঁজছে যেন । দুপুরে স্নান সারা হলে একটা অদ্ভূত বায়না করলো আন্দ্রে । সে ভারতীয় পোশাক পড়তে চায় । আটপৌরে পাঞ্জাবি আর পাজামা তার চাই, হৃদ এর তো তেমন নেই , শেষমেষ আলমারি খুলে শ্যামলেন্দুর পাটভাঙ্গা পাঞ্জাবি বেরোলো আজ এত বছর পরে । গোলাপী খাদির পাঞ্জাবি আর পাজামায় আন্দ্রে রুব্লিয়েভ যখন খাবার টেবিলে এসে দাঁড়ালো, সবগুলো চোখ তখন তাঁর দিকেই । রাজপুত্রের মত দেখাচ্ছে যেন । অস্বাভাবিক তৃপ্তি নিয়ে একটা একটা করে পদ খেল দুজনে । সুকৃতি মুখে কিছু বললেন না, শুধু অনুভব করলেন, তাঁর এই সতেরো বছরের একাকিত্বে যে ধুলোর পাতলা সর জমেছিল স্মৃতির দেরাজে, সে দেরাজ এতদিন অধিকার ছিল শুধুই তার, আজ যেন সে দেরাজে ভাগ বসালো বর্তমান ।
রান্গাদিদী এই অসুস্থ শরীরেও দুজন কে জড়িয়ে ধরলেন । হৃদ কে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন তিনি । মুখে ভাষা ফুটল না বৃদ্ধার, শুধু চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দাশ্রু । দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর সুকৃতি ওপরের বারান্দা থেকে লক্ষ্য করলেন হৃদ আর আন্দ্রে ঘুরছে বাড়ির অনাচ কানাচ । আন্দ্রের হাতে একটা বড়সড় বিদেশী ক্যামেরা আর নোট বুক , হৃদ দুর্গাপ্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে কিছু বোঝাচ্ছে....আর পরম উত্সাহে সে ছেলে ছবি তুলছে পটাপট, আবার কি সব লিখেও রাখছে নোট বুকে । এ বাড়ির ঐতিহ্য, এ বাড়ির ইতিহাস, কতটাই বা বলতে পারছে হৃদ, কতটাই বা বুঝবে ওই ছেলে ! এই এতগুলো বছর যে স্মৃতি বুকে করে আগলে রইলেন সুকৃতি, সেই অতীত এর নিস্তরঙ্গ দিঘিতে আলোড়ন ফেলে, কি লাভ ? কার লাভ ?
খুব এক চোট বৃষ্টি হয়ে গেল শেষ বিকেলে। তিতাস আর হৃদ এর বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব এলো সন্ধ্যেবেলায় । সকলে মিলে গানবাজনা হবে , খাওয়া দাওয়া হবে ইত্যাদি । সুকৃতি ঘর ছেড়ে গেলেন না কোথাও । চুপচাপ বই পড়ে কাটালেন দুপুরটা । ওঘর থেকে হইচই শোনা যাচ্ছে খুব । তরুণ প্রজন্মের বাঁধভাঙ্গা হাসি, খিলখিল গল্প আর আগল ভাঙ্গা গান...আজ অনেকদিন পর এ বাড়িতে বাজছে । হাসিখুশি আলো গান এ আবার যেন ভরে উঠছে সুকৃতির মেয়েবেলার সেন বাড়ির আনন্দ নিবিড় দিনরাত । হঠাত হৃদ ঢুকলো ঘরে, 'মা, নিপুকাকার একটা সেতার ছিল না ? সেটা কোথায় ?' , 'কেন ? কি হবে সেটা দিয়ে ?' প্রশ্ন করলেন সুকৃতি । তিলে তিলে যত্ন করে জমানো স্মৃতির পাহাড় একদিনের উত্সবে হুরমুর করে ভেঙ্গে পড়বে, তা তিনি চান না । নিপুদার যন্ত্র ছিল নিপুদার প্রান । অনেক সন্ধ্যে, অনেক সকাল কেটেছে এ বাড়িতে সেই গানবাজনা ঘিরে । সেই যন্ত্র আর কারো হাতে বাজবে না, জানেন সুকৃতি । তিনিও বাজতে দেবেন না । হৃদ যখন বুঝলো না , তাঁর অনুভূতি, যখন এতটুকুও দাম দিল না মায়ের ইচ্ছের , তখন তিনিই বা কেন, ওর হতে তুলে দেবেন , তাঁর আনন্দবিষাদের একট একটা মুহূর্ত ? গলার কাছে হঠাত যেন একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠছে, নিজেকে সম্বরণ করে উদাস গলায় বললেন,' নিচের সদর ঘরের আলমারির পাশে দেখো, নাহলে বেলাকে বলো, ও বের করে দেবে ।' হৃদ খানিকক্ষণ মায়ের মুখের দিকে চেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো লঘু পায়ে । এ বাড়িতে তার ছোটবেলা'টা যতদুর মনে পরে, সেখানে খুব ছোটবেলায় নিপুকাকা কেই বাজাতে শুনেছে দু একবার । আর নিপুকাকা চলে যাওয়ার পর তো আর কেউই কোনদিন যন্ত্রটি বাজায় না । সদর ঘরটা খুলতেই আবছা অন্ধকারে চোখে পড়ল আলমারির পাশে সযত্নে রাখা সেতারটা । ওপরে কাশ্মীরি কাজের সুঁচের কাঁথা কাজের ঢাকা । মায়ের তৈরী । জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে একটু আধটু । খুব যত্ন করে ঢাকা টা খুলতেই দু চারটে আরশোলা স্থানচ্যুত হয়ে উড়ে বেরিয়ে গেল এদিক ওদিক । সেতার এর বুকে হাত রাখতেই একটা হালকা করে গং আওআজ ভেসে এলো....যার অনুরননে এই ঘরের হাওয়ায় ছড়িয়ে গেল শতাব্দীর জমা ধুলোর স্তর....অনেক কথোপকথনের আদর আবদার এর বিকেল জ্যান্ত হলো যেন , অনেক পুরনো মানুষের মুখের মিছিল স্পষ্ট হলো আবারও । বেশ খানিকক্ষণ বিমূর হয়ে বসে রইলো হৃদ । তার কেবলি মনে হচ্ছিল কবর খুঁড়ে যেন নিপুকাকা কে সে বের করে আনলো আবার । সেই যেমন বুকের ওপর ফেলে হৃদ কে নিয়ে ঘুরতে যেত ছোটবেলায় , ঠিক সেই অনুভূতিটা মোচড় দিয়ে উঠলো অনেক ভিতরে কোথাও । সেভাবে বাবার মুখ তার মনে পড়ে না, কিন্তু নিপুকাকার হাসি, গল্প বলা, গানবাজনা, ঘুরি ওড়ানোর একটা একটা আলগোছে রাখা মুহূর্ত যেন ছিটকে ছিটকে আসছে এই সেতারের বুক থেকে । স্মৃতি কি ভারমুক্ত হলে হালকা হয়ে যায়, না আরো গভীরে গিয়ে ভারী হয়ে চেপে বসে ?
~
আজ রাতেও ঘুম হলো না তেমন । রাত পোহালেই মহালয়া ।পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবীপক্ষের সূচনা । এ বাড়ির পুজো আদতে মহালয়া থেকেই শুরু । শ্বসুর মশাই এর আমলে তেমনটাই দেখেছেন সুকৃতি । এখন যদিও মহাষস্থী থেকেই কল্পারম্ভ । প্রতিমার কাজ প্রায় শেষ । পাল মশাই এর নাতি এসে আজ চক্ষু দান করে গেল । কাঁচা হলুদ রং এর সোনার বরণ দুর্গাপ্রতিমার মুখে টানা টানা কাজলকালো চোখ দুটো দেখলেই যেন বুকের গভীরে কাঁপন ধরে আজো । ছোট একটা হালোজেনের আলোয় মায়ের চোখ আঁকা হচ্ছে, আর প্রতিমা ঘিরে বসে আছে মুগ্ধ চোখে হৃদ আর আন্দ্রেই । ওদের চোখেরও পলক পরছেনা যেন । সুকৃতি আর নার্স মেয়েটি মিলে রাঙাদি কে একটা চেয়ারে বসিয়ে ঘরে পৌছে দিয়ে এলো । রাত হলো অনেক । কাল আবার সাতসকালে , ভবানীপুরের এই পাড়ায় ঘরে ঘরে, এই শহরটার অলি গলি তে বেজে উঠবে বীরেন ভদ্রর অমোঘ কন্ঠস্বর । মহিষাসুর মর্দিনীর স্তব বেজে উঠবে, এ বাড়িতেও । সুকৃতি ওদের রাতের খাবার দিয়ে নিজের ঘরে চলে যান । শেষ রাতের দিকে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল হঠাত । পাতলা ঘুম ছিঁড়ে গেলে যেমন একটা বিরক্ত অনুভুতি জাগে, ঠিক তেমনটা নয় , বেশ অন্যরকম , বুঝতে পারলেন সুকৃতি । কারনটা , সুর । হ্যান, সেতার বাজছে যেন কোথাও। ছোট ছোট মীরের গমকে , একটা অদ্ভূত রকম লোকগীতির সুরে একটু অন্যরকম ভাবেই যেন সেতারের আওয়াজ ভেসে আসছে । খানিকক্ষণ কান খাড়া করে শুনে সুকৃতি বুঝলেন আওয়াজ টা আসছে, নিচের উঠোন থেকে । ভূতগ্রস্তের মত উঠে বসলেন বিছানায় । এ তিনি কি শুনছেন, কে বাজাচ্ছে ? তবে কি , তবে কি নিপুদা ফিরে এলো , নাকি তিনি এখনো স্বপ্নেই আছেন । পাশ ফিরে শুয়ে ভালো করে চোখ মেলে দেখলেন সুকৃতি , জানলার ফাঁক দিয়ে হালকা আলোর রেখা ভেসে আসছে , ভেসে আসছে সেই অচেনা সুরটাও ।
দরজাটা অল্প করে চাপ দিয়ে খুলতেই, বাইরের বারান্দায় চাপ চাপ অন্ধকার । খানিকটা দাঁড়ানোর পর চোখ সয়ে গেল, অভ্যস্ত পায়ে নিচে এসে সুকৃতি রাঙাদির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন । ঠাকুর দালানে প্রতিমার সামনে ছোট বাল্বের আলো জ্বলছে একটা । জ্বলজ্বল করছে মা দুর্গার সালঙ্কারা মূর্তি । প্রতিমার সামনে দালানে হাঁটু মুড়ে বসে আছে...আন্দ্রেই । কোলে সেতারটাকে নিয়েছে একটু অনভ্যস্ত ভাবে আর প্রায় গিটার বাজানোর ভঙ্গিতে বাজাচ্ছে নিপুদার যন্ত্র । চোখ বুজে কি একটা অদ্ভূত বিদেশী সুর বাজাচ্ছে একটানা ....চোখ দুটো বুজে ঝুঁকে এসেছে বুকের কাছে.....একটা একটা করে তারের ওপরে ওর দীর্ঘ আঙ্গুল গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে সেন বাড়ির আকাশে ঢেলে দিচ্ছে সুর । সামনে বসে হৃদ । হাঁটুতে মাথা রেখে শুনছে একমনে । সুকৃতি বারান্দাতেই বসে পড়লেন । এভাবেও কি ইতিহাস নিজেকে ফিরিয়ে আনে পুনর্বার ? সেই যে নিপুদা বলেছিল আসলে জীবন মানে বিরাট একটা অনুভূতির আগল খুলে বাঁচা । নিজেদের মধ্যে অজস্র দেয়াল তুলে , ছোট ছোট অন্ধকার ঘরগুলো ভেঙ্গে দিয়ে খোলা মাঠে, খোলা হাওয়ায় চলতে থাকার যে ডাক দিয়ে গিয়েছিল নিপুদা, সেই ডাক কি আজকের বর্তমান হয়ে, হৃদ এর হাত ধরে, অন্দ্রেয়ির হাত ধরে ফিরে এলো এই বাড়িতে ? জীবনের যে বৃত্ত অসমাপ্ত ছিল এতদিন, যে বৃত্তকে সমাপ্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সুকৃতি তাঁর নিজের মত করে, সে স্বপ্নের কি তবে এইরকম সমাপ্তিই নির্ধারিত ছিল ? জানেন না ,,কিছু জানেন না সুকৃতি । শুধু তাঁর দু চোখ জুড়ে ভেসে ওঠে বিজয়া দশমীর এক রাত্তির । চরাচর জোড়া এক মুগ্ধতা । তাঁর হৃদয় থেকে ভেসে ওঠে সেই সুরের উদ্ভাস যে সুর তিনি ছেড়ে এসেছেন অনেকদিন আগে, যা আবার ফিরে এলো উদ্বোধনের এই শুভলগ্নে । কখন যে তিনি পায়ে পায়ে এসে বসেছেন হৃদ এর পাশে সুকৃতি জানেন না । কখন যে হৃদ সেই ছেলেবেলার মত মুখ গুঁজেছে তাঁর কোলে সুকৃতি জানেন না । ওঁদের চোখের সামনে তখন শুধুই নিপুদা , সম্রাটের মত সুর তুলেছেন মুদারায় । শুধু অন্য চেহারায়, অন্য রূপে , অন্য কোনো জন্মের সকালে।
( সমাপ্ত )
দরজাটা অল্প করে চাপ দিয়ে খুলতেই, বাইরের বারান্দায় চাপ চাপ অন্ধকার । খানিকটা দাঁড়ানোর পর চোখ সয়ে গেল, অভ্যস্ত পায়ে নিচে এসে সুকৃতি রাঙাদির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন । ঠাকুর দালানে প্রতিমার সামনে ছোট বাল্বের আলো জ্বলছে একটা । জ্বলজ্বল করছে মা দুর্গার সালঙ্কারা মূর্তি । প্রতিমার সামনে দালানে হাঁটু মুড়ে বসে আছে...আন্দ্রেই । কোলে সেতারটাকে নিয়েছে একটু অনভ্যস্ত ভাবে আর প্রায় গিটার বাজানোর ভঙ্গিতে বাজাচ্ছে নিপুদার যন্ত্র । চোখ বুজে কি একটা অদ্ভূত বিদেশী সুর বাজাচ্ছে একটানা ....চোখ দুটো বুজে ঝুঁকে এসেছে বুকের কাছে.....একটা একটা করে তারের ওপরে ওর দীর্ঘ আঙ্গুল গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে সেন বাড়ির আকাশে ঢেলে দিচ্ছে সুর । সামনে বসে হৃদ । হাঁটুতে মাথা রেখে শুনছে একমনে । সুকৃতি বারান্দাতেই বসে পড়লেন । এভাবেও কি ইতিহাস নিজেকে ফিরিয়ে আনে পুনর্বার ? সেই যে নিপুদা বলেছিল আসলে জীবন মানে বিরাট একটা অনুভূতির আগল খুলে বাঁচা । নিজেদের মধ্যে অজস্র দেয়াল তুলে , ছোট ছোট অন্ধকার ঘরগুলো ভেঙ্গে দিয়ে খোলা মাঠে, খোলা হাওয়ায় চলতে থাকার যে ডাক দিয়ে গিয়েছিল নিপুদা, সেই ডাক কি আজকের বর্তমান হয়ে, হৃদ এর হাত ধরে, অন্দ্রেয়ির হাত ধরে ফিরে এলো এই বাড়িতে ? জীবনের যে বৃত্ত অসমাপ্ত ছিল এতদিন, যে বৃত্তকে সমাপ্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সুকৃতি তাঁর নিজের মত করে, সে স্বপ্নের কি তবে এইরকম সমাপ্তিই নির্ধারিত ছিল ? জানেন না ,,কিছু জানেন না সুকৃতি । শুধু তাঁর দু চোখ জুড়ে ভেসে ওঠে বিজয়া দশমীর এক রাত্তির । চরাচর জোড়া এক মুগ্ধতা । তাঁর হৃদয় থেকে ভেসে ওঠে সেই সুরের উদ্ভাস যে সুর তিনি ছেড়ে এসেছেন অনেকদিন আগে, যা আবার ফিরে এলো উদ্বোধনের এই শুভলগ্নে । কখন যে তিনি পায়ে পায়ে এসে বসেছেন হৃদ এর পাশে সুকৃতি জানেন না । কখন যে হৃদ সেই ছেলেবেলার মত মুখ গুঁজেছে তাঁর কোলে সুকৃতি জানেন না । ওঁদের চোখের সামনে তখন শুধুই নিপুদা , সম্রাটের মত সুর তুলেছেন মুদারায় । শুধু অন্য চেহারায়, অন্য রূপে , অন্য কোনো জন্মের সকালে।
( সমাপ্ত )
No comments:
Post a Comment