Wednesday, June 22, 2016

ঠিক এই মুহুর্তে
----------------
কুশল ভট্টাচার্য্য

ঠিক এই মুহুর্তে কলকাতাগামী একটা টাটা সুমো পালটি খেয়ে
গড়িয়ে গেল পশ্চিম মামুদপুরের ডান দিকের নয়ানজুলিতে ।
তারাপীঠ ফেরত আরও গোটা চারেক গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল হতভম্ব হয়ে ।
ভিড় পেরিয়ে যা দেখা গ্যালো, একটি মেয়ে ও তিনটে ছেলের বডি,
বয়েস ওই আঠারো উনিশ থেকে তিরিশের মধ্যেই হবে ,
জলজ্যান্ত চার জন স্পট হয়ে গ্যালো , বাড়ির লোকে খবরটুকুও পেল না ।

ঠিক এই মুহুর্তে তারা টকিজ থেকে বিকেলের শো এর দুটো টিকিট
হাতের মুঠোয় ভরে বেরিয়ে এলো লাল্টু ,
সোনালী আজ দেখা করবে, মা কালির দিব্যি গেলে বলেছে ,
কোণার টিকিট কেটেছে আজ...সিনেমা দেখে সোজা বাসন্তী কেবিন ।
আজ ই, হ্যা, আজ ই ওকে প্রপোস করবে,
লাল্টুর মুখে চোখে শেষ বিকেলের অপূর্ব আলো আজ ।
সোনালীর ফোনটা কেন লাগছে না ?

ঠিক এই মুহুর্তে রাজারহাটের চোদ্দ তলার অফিসে
কফির কাপে চিনির প্যাকেট ছিড়তে ছিড়তে মলয় সেন ,
বাড়িতে ফোন করলো , সুব্রত কি আজকেও আসবে না ,
ড্রাইভার রেখে যদি নিজেকেই অর্ধেক মাস ড্রাইভ করতে হয়,
কি ফায়দা ? এদিকে কাজের যা চাপ, আজ ও ফিরতে রাত বারোটা বাজবে,
বউ বলছিল ও বোধহয় তারাপীঠ গেছে । এমাসে ওর মাইনে
কাটতেই হবে ।

ঠিক এই মুহুর্তে টিউশন গলি ছেড়ে বড় রাস্তার মুখটাতে সাইকেল ঠেলে এলো পম্পা,
আজ একবার অরুপের সাথে একটা হেস্ত নেস্ত করা দরকার ।
এ মাসে পিরিয়ড মিস করেছে ও, যদি সত্যি একটা অঘটন ঘটে যায়,
কি হবে ঠাকুর ! আর ভাবতে পারছে না পম্পা, ট্রেনে গলা দেওয়া ছাড়া,
আর কোনো উপায় ও চোখে পরছে না । অরুপের বাড়ি তে তালা ঝুলছে,
পাশের বাড়ির কাকিমা বললেন বন্ধুদের নিয়ে তারাপীঠ গেছে । এখন তো তাই করবে,
ওর সব শেষ করে দিয়ে এখন তো মস্তি করারই সময় ওর । ইতর কোথাকার ।

ঠিক এই মুহুর্তে সুদর্শনা ঠাকুরের আসনে ধুপ দেখিয়ে,
ফিনফিনে ম্যাক্সি তে ব্যালকনি তে এসে বসলেন, বাব্বা , যা গরম আজ,
আজ ও মলয়ের দেরী হবে ফিরতে, ইয়ার এন্ডিং এর সব কাজ টুকু শেষ হয়নি,
একবার অরূপ কে ডাকবে নাকি ? ফ্ল্যাট তো দস্তুরমত ফাঁকা ।
ভাবতে ভাবতেই চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে নিজেকে আয়নায় দেখে নেন সুদর্শনা ।
অরূপ কিন্তু বড় খেলোয়াড় বাবা, মুচকি হেসে মোবাইলটা কাছে টেনে নেন,
বছর চল্লিশের সুদর্শনা সেন ।

ঠিক এই মুহুর্তে কাজের বাড়ির বিকেলের রান্না সেরে মিঠুনের মা
ছাতে এসে দাঁড়ালো , মিঠুন তারাপীঠ গেছে ওরা পাঁচ জন মিলে,
মোবাইল টা কিছুতেই টাওয়ার ধরছে না , ছেলেটা বলে গ্যালো রাত্রে ফিরে খাবে,
টিফিন বক্সে মাংসের ঝোল আর দু পিস যা ধরে ভরে নিয়েছে ওপরের বৌদি কে বলে ,
রাত্রে নয় দুটো গরম রুটিই করে দেবে । কিন্তু মন টা কেন যে এত ছটফট করছে,
মা শীতলাই জানেন ।

ঠিক এই মুহুর্তে শাঁখে ফু দিয়ে সন্ধ্যে হলো,২০/ সি , মনোহরপুকুর রোডে,
সোনালীর দিদি ফোন রিচার্জ করে টানা চেষ্টা করে গেলো,
ঘড়ির মোড় এর দিকে ঘন ঘন তাকালো যদি মেয়েটার টিকি দেখা যায়,
মিল থেকে ফিরে বাবা জানতে পারলে আর রক্ষে থাকবে না,
কাল বলেছে মাসির বাড়ি গেছে, আজ আর কি বলবে সে ? ওদিকে রাত হলো কত ,
একটাও ফোন পর্যন্ত করলো না, ছি ছি, ঘেন্না ।


ঠিক এই মুহুর্তে নয়ানজুলির ধারে মুখে রুমাল চেপে দাঁড়িয়ে
আছেন দুজন পুলিশের লোক,
টেম্পোরারি সার্চ লাইটের আলোয় একটা একটা বডি টেনে তোলা হচ্ছে ম্যাটাদরে ।
একজনের ব্যাগ থেকে তারাপীঠের হোটেলের বিল পাওয়া গেছে,
লিস্টটা মিলিয়ে নিচ্ছেন সাব ইন্সপেক্টর আর বিড়বিড় করে বলছেন নামগুলো,
মেয়েটার নাম লেখা আছে শিল্পা ( সালা, ভুলভাল নাম দিয়েছে নিশ্চই )
ছেলেগুলোর .অরূপ .ঘোষ, মিঠুন সাঁতরা, আর গাড়ি চালাচ্ছিল সুব্রত বেরা ।
কলকাতায় খবর টা ফ্যাক্স করতে হবে , মাঝরাতে যত কেওড়া ।

No comments: