Friday, June 24, 2016

জীবনস্মৃতি ~চিত্র আলোচনা

ঝাঁকি দর্শন~
অধীর অপেক্ষার অবসান ঘটিল জীবনস্মৃতি দেখিলাম বহু প্রতিক্ষার পরে, ফলবান গাছে যেমতি পুষ্প ফুটিলে, চিত্ত পুলকিত হয় , সে পুলক জাগিল , কিন্তু ক্ষণিক মাত্র    পুষ্পের গন্ধ বড় স্থায়ি হইলো না ঋতুপর্ণ ঘোষ যে ছবির ব্যবস্থাপক চিত্র পরিচালনার ভার লইয়াছেন , এবং সর্বপরি ভবদীয় শ্রীল শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় এর জীবনপঞ্জি যে ছবির বিষয় , তার প্রতি প্রথম হয়িতে দর্শক কুলের এক অদম্য কৌতুহল গড়িয়া উঠিবে, ইহাই স্বাভাবিক কিন্তু রবিজীবনির সর্বজনবোধ্য ,শিশুপাঠ্য তথ্য গুলিকে সরলীকৃত করে পরিবেশনা, একদিকে যেমন ইহার 'তথ্যচিত্র' নামাঙ্কন কে সঙ্গত কারণেই সমর্থন করে, অপরদিকে দর্শক কুলের বিপুল চাহিদার যোগান দিতেও কোথাও  অসমর্থ হয় বৈকি বিশেষত ,স্বর্গীয় ঋতুপর্ণ বাবুর পরিচালিত বলিয়াই বোধহয়, তথ্যচিত্র দেখিতে গিয়াও , সাধারণ দর্শক অপেখ্হায় থাকেন কিছু অসামান্য মুহূর্ত প্রতক্ষ করার , যা ঠিক সহায়িকা পুস্তকের ন্যায় প্রাঞ্জল তথ্যবহুল নহে বরং রবি   ঠাকুরের কীর্তিময় জীবনের অন্তরালে অসংখ্য প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির যে দুঃখময় মরমী ইতিহাস রহিয়াছে, এই চিত্রে প্রত্যাশিত ভাবেই পরিচালক তাহার থেকে ইতিহাস টুকু সযত্নে বাদ দিয়াছেন , এবং শিল্পিত সহমর্মিতায় সখ্যতার সহিত গল্পকার হিসেবে তাহাকে চলচিত্রায়িত করিয়াছেন , যাহার মধ্যে ফ্রেম বাঁধানো মুহুর্তমঞ্জরিও , প্রানের আলোকে  উদ্ভাসিত হয় ,এক অনুপম আলেখ্যে , কিন্তু তাহার সময় বড় কম এই  দীর্ঘ জীবনের যে বিস্তার প্রসার , তাহাকে যদিচ অল্প সময়ে প্রত্যক্ষ করানোযে কোনো চলচিত্রকারের পক্ষে, বিষম জটিল , তাহা অনস্বীকার্য তদুপরি, সরকার বাহাদুরের , অর্থানুকুল্যে এই চিত্র নির্মানের সময় ইহাকে শুধুমাত্র তথ্যবহুল করিবার যে শৃঙ্খলিত প্রচেষ্টা চোখে পরে, তাহা পরিচালক কেও কতটা সৃষ্টিশীল আনন্দ  দিয়াছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকিয়া  যায় তাই ঝাঁকিদর্শন এর ন্যায়, বাল্য, কৈশোর, যৌবন সায়ংকালের রবীন্দ্রনাথ এর জীবন পঞ্জিকার বেশ কিছু মূহুর্তর এক অনুপম মন্তাজ হইয়াই এই বিপুল সম্ভাবনাময় উদ্যোগের পরিসম্পাতি ঘটিল
চরিত্র  নির্বাচন চিত্রায়ন এর মুন্সিয়ানা লক্ষনীয় যদিও তাহা, ঋতুপর্ণ ঘোষ এর দর্শক দিগের জন্য নতুন কিছু নহে প্রভুতভাবে, চরিত্রের কণ্ঠদান যে ভাবনার সাক্ষর পরিচালক রাখেন, তাহা তারিফ যোগ্য বিশেষত, যুবক রবির কন্ঠে কৌশিক সেন , এবং বার্ধক্যে জয় গোস্বামী , এই স্বর প্রয়োগ বিশেষ মাত্রা  আনিয়াছে সুর স্বরের কৌশলী প্রয়োগ এবং প্রেক্ষাপটে সঙ্গীত ধ্বনির নির্মেদ উপস্থিতি , যথেষ্ট রিতুপর্ণচিত, নিঃসন্দেহে তবে, এডিটিং নিয়া কিছু প্রশ্ন থাকিয়া যায় তথ্যচিত্র ধর্মানুযায়ী , নেপথ্যে ভাষ্য পাঠে একটি কণ্ঠস্বরের বদলে, ভিন্ন কন্ঠের উপস্থিতি ছবিকে, কিছুটা হইলেও ,অন্যতর মাত্রা প্রদান করে তবে কিছু কিছু স্থানে , বিশেষত মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আরো কিছু চরিত্রের রূপসজ্জা নিয়া একটু যত্নের অভাব চোখে পরে


এক্ষণে একটি কথা বিশেষ রূপে বলার, বেশ কিছু দৃশ্যে যেভাবে পরিচালক তার বহু চর্চিত এবং পরীক্ষিত ছবির ভিতর ছবি অর্থাত , Film within Film এর নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন , তাতে তার রবিন্দ্রবিক্ষণের এতটুকু ত্রুটি সাধন ঘটে নাই যে দৃশ্যে মেঘলা মেদুর দিনে, কিশোর রবি খাটের ওপর উপুর হইয়া লিখিতেছেন , 'গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে', আর অন্বেষক ঋতুপর্ণ তার  কোমল দৃষ্টি তে দরজার ফাঁক হইতে তাকে দেখিতেছেন , সে দৃশ্য টি আমাদের মনে এক অপরূপ স্থান করিয়া লইলো কোথায় যেন পরিলাম, পরিচালক বলিয়াছেন, রবীন্দ্রনাথ কে খুঁজিয়া পায়িবার জন্য , যতগুলি চাবি খুলিয়া , যতগুলি দরজা খুলিয়া, জোড়াসাঁক স্থ  ভবনে  তিনি তাহার অনুসন্ধান করিয়াছেন , তাহা যথেষ্ট নহে সত্য বটে তাঁকে প্রত্যক্ষ করিবার যে রত্ন ভান্ডার তিনি বিশ্ববাসী কে দিয়া গেলেন ,তাহা অশেষ চিরকালীন সেই ঋষি ,সেই দার্শনিক কবিজিবনী কে , ঠিক তার চরিত্র চিত্রায়ন এর মতই ,দর্শক প্রথম হইতে শেষ অবধি প্রত্যক্ষ করে এক গুঢ়ো অনুভব অনুভূতির মেলবন্ধন "মধুর তোমার শেষ নাহি পাই."......!

রথ ভাবে আমি দেব~

"রথযাত্রা লোকারণ্য , মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রনাম,পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী ।"

এই পর্যন্ত বলে প্রায় অন্তর্যামীর মতই একটা মধুর হাসি হেসে বইটা বন্ধ করতেন আমার মাতামহ ।খুব ছোট বেলায় এই কবিতার শেষ দুটো লাইন ঠিক বুঝতাম না কিন্তু মাতামহর ওই হাসিটুকু তে বুঝতাম, আসলেতে দেবতা বোধহয় সত্যি রথে চড়ে আসেন না , আসলেতে তিনি থাকেন রাস্তার ভিড়ে, সাধারণ মানুষের মধ্যেই কাঁধে কাঁধ দিয়ে পায়ে হেঁটে । যদিও রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও যিনি আমায় রথ চিনিয়েছিলেন আরো ছোটবেলায়, তিনি বঙ্কিম ।আমাদের বাড়ির বইয়ের তাকে বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ এর প্রকাশিত এক কপি 'রাধারানী' ছিল.। কভার এ লালের ওপর  হালকা কমলা রঙের অস্পষ্ট রথের ছবির সিলুয়েট আর সামনে এক করুন কাকভেজা বালিকার ছবি, নিচে সাদা অক্ষরে গোটা গোটা করে লেখা বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত 'রাধারানী' । বইটা মায়ের বিয়েতে উপহার পাওয়া । প্রথম পাতায় বেগুনি কালি দিয়ে লেখা ছিল, শুভেচ্ছা সহ বেনুদি, নিচে মায়ের বিয়ের তারিখ ।সেকালে বিয়ে অন্নপ্রাশনে ,বই দেওয়ার চল উঠে যায়নি তখনও । ছোটবেলায় অক্ষর পরিচয় হওয়ার আগে, মা পড়ে শুনিয়েছে দু এক বার । একটা ছাপানো বই তে ছাপার অক্ষরে আমাদের এই শ্রীরামপুরের কথা, মাহেশের এই রথের কথা লেখা হয়েছে অত বছর আগে, সেসব ভাবলেও একটা অদ্ভূত রোমাঞ্চ হত । কেমন একটা চোখ বুজলেই দেখতে পেতাম রথের মেলা পিছনে ছেড়ে ,আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টিতে কাকভিজে, অন্ধকার কাদাজল মাখা রাস্তায় বেলফুলের একটা করুন মালা বুকের কাছে নিয়ে বাড়ি ফিরছে, ছোট একটি মেয়ে । তার মালাটা বিক্রি হয়নি মেলায় । 

মাহেশের দুরত্ব আমার বাড়ি থেকে ৩০ মিনিটের । সেখানকার রথের বর্নাঢ্য ইতিহাস তো সকলেরই জানা । সেই যে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীধামে গেলেন আর প্রভু কে নিজের হাতে ভোগ খাওয়াতে চাইলেন, যা ওখানকার পান্ডা পুরহিতেদের বিধানে নিষিদ্ধ করা হলো । মনোকষ্টে ব্রহ্মচারী যখন মৃত্যুশয্যা নিলেন, তখন স্বয়ম জগন্নাথ প্রভু স্বপ্নাদেশ দিলেন ,তিনি হুগলির অনতিদূরে মাহেশ গ্রামে দারুমূর্তি হিসেবে উত্থিত হবেন । ধ্রুবানন্দ স্বামী এলেন, এবং সেই দারুমূর্তি আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠা করলেন মাহেশের বিখ্যাত মন্দির এবং শুরু করলেন ইতিহাস বিখ্যাত রথযাত্রার সারম্বর সূচনা । নব চূড়া অর্থাত নয়টি চূড়ার এই রথ আর রথের গায়ে আঁকা পৌরানিক ছবি তৈরী হলো নব কলেবরে । শ্রী চৈতন্য দেব এলেন । হুগলির ইতিহাসের এক নতুন সূচনা হলো । লক্ষ মানুষের ভিড়ে প্রায় ৬০০ বছর বয়েসের আঁচর পড়ল আজকের এই রথযাত্রায় , তবুও উদযাপনের উত্সাহে ভাঁটা পরেনি একটুও ।

যদিও তখনও রথ বলতে যা বুঝতাম,তা হলো বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় নারকোল গাছের সারিটানা রাস্তায় শেষ বিকেলে লগবগে লাল রঙের টানা পলকা কাঠের রথ , সে রথ টানা হত ছেলেমানুষী রশি তে , তাতে শোভা 'যাত্রা' র বর্নাঢ্য গমন কতটুকু হত, দেবা না জানন্তি , তবে আমরা ভারী  আল্হাদ পেতাম । খুব ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জীবনের যাত্রার মানটা হঠাত বদলে গেছিল, তাই সেই বদলে যাওয়া জীবন কে নিয়ে দোলাচলতার মধ্যেই এই নানারকম অনুষ্ঠান আরম্বরের পুজো পাব্বন বেশ অন্যরকম রং নিয়ে ধরা দিত জীবনে । বেশিটাই করুন রং । নিজেদের একটা গোটা রথ কেনার সারম্বর উদযাপন সম্ভব ছিল না আমাদের ভাইবোনের ।তবে ছবি আঁকার ও টুকটাক শিল্পনৈপুন্যের সুবাদে , ডাক পড়ত আমার জেঠুর বাড়ির রথ সাজানোর । আমার জ্যাঠাতুত ভাইটির জন্য তিনতলা রথ কেনা হত প্রতি বছর । একতলায় বেশ সাজানো গোছানো লাল টুকটুকে মেঝে, দোতলায় আরেকটু ছোটো, ওখানেই জগন্নাথ প্রভু ভাই বোন নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বসতেন কুরুষের আসনে আর তিনতলায় ছিল প্রসাদী সন্দেশ, মঠ আর ফুল টূল রাখার জায়গা । রথের দিন দুপুর থেকেই সে এক উত্তেজনাময় প্রস্তুতি । আষার দুপুরের ছায়া ছায়া আকাশে, বাড়িতে সবাই যখন ভাতঘুমে , ঠাকুমার ঘরের লাল মেঝেতে বসে , একটা একটা করে নীল, সবুজ, রুপোলি, সোনালী কাগজ কেটে কেটে নকশা বানাতাম আর জেঠিমার হাতে তৈরী আটা জ্বাল দেওয়া আঠা দিয়ে সেঁটে সেঁটে রথসজ্জা হত ধাপে ধাপে । প্রতিবারই বেশ আলাদা আলাদা রকম ,নতুন তর ছাঁদ । নতুন কিছু একটা করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়ার ফিকির হত । আমি একমনে রথ সাজাতাম, আর ছোট ছোট ভাই বোন গুলো হাতে হাত মিলিয়ে এটা ওটা সরবরাহ করত আর কখন জানি বিকেলের মুখে একেবারে ঝলমলিয়ে প্রস্তুত হতেন বলভদ্র ও সুভদ্রা বিহারে জগন্নাথ স্বামীর গাড়িটি । ঠাকুমা এসে শাঁখে ফু দিয়ে ধুপ ধুনো জ্বালিয়ে দিলেই এবার রথ টানার শুরু । টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই কাঁসর ঘন্টা নিয়ে বেরিয়ে পরত আমাদের রথ আর আমি মনে মনে  শুধু হা-পিত্যেস করে বসে থাকতাম কখন মা অফিস থেকে আসবে। আসলে হাতে করা এই সাজানোটা ঠিক কতটা বর্নাঢ্য ও চমকদার হলো, সেই রেকগনিশনটা মায়ের কাছ থেকে না পেলে মন শান্ত হত না ।

প্রথম প্রথম মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা গুলো বেশ করুন । বেশির ভাগটাই একা অথবা ভাইবোন দের সাথে । এবং অবধারিত ভাবেই টাকা থাকতনা  অবশ্যম্ভাবী । তবুও রথের রশি তে টান পরলেই প্রায় ছুটে চলে যেতাম ওখানে , কারণ বড় হয়ে যাওয়ার আনন্দ বরাদ্দ ছিল ওই যাওয়াটা তে । মা অফিসে, তাই একলা বিকেলগুলোয়, দুপুর পেরোতেই হাওয়াই চটিতে পা গলিয়ে হনহন করে হেঁটে সেই আনন্দের প্লাবনে ভেসে যাওয়াটা ছিল একটা স্বপ্নের মত ব্যাপার । রাস্তার দুধারে বিরাট বিরাট সব জলসত্র বসত । পুন্যলোভি মানুষের খানিকটা পুণ্য করে নেওয়ার সুব্যবস্থা । বড় বড় ঠান্ডা জালায় জল ভরে গেলাসে গেলাসে জল ঢেলে দেওয়া হত আগত দর্শনার্থীদের , সঙ্গে সাদা অথবা লাল গুড়ের বাতাসা । সেসব খাওয়াটা ছিল অবশ্যকর্তব্য । গ্রাম,গঞ্জ, মফস্বল থেকে আসা আবিল আনন্দ বিভোর  জনস্রোত , মায়া মায়া কচিমুখের ভিড় , রাস্তার দুধারে অসংখ্য খেলনাপাতির দোকান , তেলেভাজা, জিলিপি, পাঁপর এর গন্ধ আরও হরেক কিসিমের সার্কাস, জোকার, নাগরদোলা , হরবোলা এসব দেখতে দেখতে কেমন একটা সম্মোহনে ডুবে যেতাম আর কখন জানি ভুলে যেতাম, আমার পকেটে পয়সা বিশেষ নেই। বড়জোর একটু পাঁপর ভাজা বা আইসক্রিম খাওয়া যেতে পারে । কিন্তু এই আনন্দ যজ্ঞের অংশীদার হতে পরেই সে যে কি খুশি, কি আনন্দ, তা বর্ণনার অতীত, আজও  । ফিরতি পথে তালপাতার একটা পলকা ভেঁপু অথবা টিয়াপাখি আঁকা ছবির বই যদি কিনতে পারতাম কখনো, সে তো এক পরম পাওয়া । বাকি পথ সেই ঘোরটুকু রথযাত্রার মায়া কাজল এর মত চোখে মেখে বাড়ি ফিরতাম । ঘুমোবার সময়েও হাতের মুঠোয় ধরে রাখতাম সেই মেলায় কেনা তালপাতার বাঁশিটা । এখনো ঘুমের ঘোরে ফিরতে ইচ্ছে করে সেই মেলার মাঠে , সেই মাইকের ধারাবিবরণী, সেই পাটকাঠির সাপ আর বাড়ি ফেরার সময়ে পকেটে খবর কাগজের ঠোঙ্গায় মোড়া ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কাঠবাদাম , আর কি ফিরে আসবে সে সব কার্নিভালের মত বিকেলগুলো ? 


হারিয়ে যাওয়া লেখাদের উদ্দেশ্যে ~

' ফেসবুক সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার তোমার বাঁধা হে '। সহকর্মী এক রসিক বন্ধুর এহেন বাঁকা মন্তব্য প্রায়শই শুনি । আর হবে নাই বা কেন ! সময় পেলেই দু-চার লাইন লিখে ফেলি খসখস করে । কোথায় একটা  ছবি ছাপালুম , কোথায় এক টুকরো আঁকা, সঙ্গে গুঁজে দিলুম দু চার লাইন রবীন্দ্রনাথ নয়তো নিজেই কলম পিষে কিছু একটা চটজলদি ইনস্ট্যান্ট ফুডের মত দু-চার লাইন যা বেরয়, তারই কয়েক ছত্র, যত্র তত্র । তার বেশির ভাগই ফেসবুক এর টাইমলাইনে ছড়িয়ে থাকে লাইক প্রত্যাশী তীর্থের কাকের মত সার দিয়ে । দু চারখানা লাইক পেয়েই তারা ফুরুত । এহেন সাহিত্য সাধকদের সৃষ্টিকে যদি কেউ গণিকালয়ের সন্তানদের মত অকুলীন আখ্যা দেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ধ্যাষ্টামো স্বীকার করে কল্পিত পুরস্কার-টার দেন আমার সহকর্মীর তির্যক মন্তব্যের মত, তাতে ক্ষতি কি ! এলোমেলো চিন্তা ভাবনা থেকে হঠাৎ হঠাৎ জারজ সন্তানের মত যে সমস্ত শব্দেরা জন্মায়, বেশির ভাগেরই কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা জোটে না । নিদেনপক্ষে, কোনো গ্রুপের দেওয়াল শোভন নতুবা পাড়ার বালক সংঘের স্যুভেনিয়ার , খুব বেশি হলে কোনো লিটিল ম্যাগের ব্যক্তিগত প্রচেষ্ঠায় তাদের, ছাপার অক্ষর আলোকে আসা । তো সেইরকমই এই ডিজিটাল লেখালেখি দেখে এক বন্ধু জানালেন , আমার লেখা নিয়ে তিনি গান বাঁধতে চান । সে তো উত্তম প্রস্তাব। মনে মনে ভাবলুম, এ যাবত লেখা তো কিছু কম লিখিনি । কিন্তু লেখাগুলো সব গেল কোথায় ? আসলে যে মুহুর্তে তারা জন্মেছে , উপযুক্ত লালন পালনের আগেই তারা আমায় ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছে। সংঘবদ্ধ করে , এক জোট করে তাদের রাখিনি কোত্থাও। এখন পিতা হিসেবে এতটুকু কর্তব্য না করলে, তারা আর আমার কাছে আসে কি প্রকারে ! এখন সময়সারণী তে তাদের খুঁজি কি ভাবে ? 

 না, মানে একটা দুটো নয় অজস্র লেখা জোকা, স্রেফ হারিয়ে গিয়েছে । অনেকটা অযত্নে, এমনি এমনি, সংরক্ষণের প্রয়োজন বুঝিনি বলে, আবার  অনেকটা শুধুই এলোমেলো ভাবে ।শুধু ফেসবুক নয় , রেস্তঁরার বিলের পিছনে, সিগারেটের রাংতার সাদা অংশে এমনকি বাজারে হাতে গুঁজে দেওয়া লিফলেটের পিঠেও লিখেছি খসখস করে , আর তারপর কি করে, কি করে জানি কালের গর্ভে তারা সব উধাও ! পুরনো দেওয়াল পত্রিকা থেকে লিটিল ম্যাগাজিন যেখানেই হাত মকশো করেছি, সেসব খুঁজতে গেলে কিছু পাব না আর, এ আমি বেশ জানি । এমন বেশ কিছু শব্দ- ব্রহ্ম, অসংরক্ষিত গল্পগুচ্ছ বেবাক উড়ে গিয়েছে জীবন থেকে। অথচ যখন তাদের লেখা, তখন তারা ভারী আপনার লোক। কত ঝড়ে ,জলে, মিনিবাসে বাদুড় ঝোলা ঝুলতে ঝুলতে, ট্রেনের দরজার ধারে এক হাতে জীবন আর হাতে মরণের ‘শ্যাম রাখি না কুল’, খেলা খেলতে খেলতে যে সমস্ত বজ্রবিদ্যুত ভর্তি শব্দ ঝলকের মত মাথার ভেতর সেঁধিয়ে এসেছে , দু-চার বার চমকে দিয়ে আভাস দিয়েছে নতুনতর কবিতার , তাদেরও কেমন করে জানি হারিয়ে ফেলেছি আমি । পরে আফসোস হয়েছে খুব । ইশ, কি চমত্কার একটা অনুপ্রাস মাথায় এলো । আহা, এমন যুতসই একটা লাইন , বেলাইন হওয়ার আগেই চটপট লিখে রাখলেই হত। কিন্তু, ওই অবধিই। আসলে, আমার ব্যক্তিগতভাবে ডিসিপ্লিনের ভারী অভাব । ফেলুদা পড়া ইস্তক মনে মনে ভাবতাম, ঠিক ওই রকম নীল চামড়ায় বাঁধানো একখানি খাতা আমার বড় দরকার । সঙ্গের হাতব্যাগে সবসময় যেন সে মজুত থাকে , যেই না কিছু ধরা দিল মনের আয়নায় , চটপট লিখে ফেলতে হবে, নইলেই ফাঁকি । সাত সতেরো কাজের মধ্যে সে লেখা কখন  কোন ফাঁকে ফুরুত করে উড়ে যাবে, তা দেবা ন জানন্তি । তা সে খাতা আমার আজ পর্যন্ত হলো না । কখনো এখানে একটু, কখনো ওখানে খানিক, এভাবে দশ জনের এজমালি সংসারে আমার লেখা জোকাদের বাস ।

আমার মাতামহ শুনেছি স্বপ্নে দেখা দৃশ্যও লিখে রাখতেন । শিয়রের টেবিলে সবসময় মজুত রাখতেন খাতা, কলম আর যেই না স্বপ্ন দেখা , ধরমর করে ঘুম ভেঙ্গেই লিখে ফেলতেন সে সব । কত জরুরি মানসিক অবস্থার সমান্তরাল প্রতিফলন, সে সব লেখায় পরে খুঁজে পেয়েছি । তিনি লিখতেন দু তিন রকম কালিতে । সবুজ দিয়ে বিশেষ কোনো শব্দ গাড় অক্ষরে  আবার লাল কালি দিয়ে তাকে দাগা দিয়ে অন্যরকম মাত্রায় ওঁর লেখা ভারী ভালো লাগত পড়তে । লেখায় যত্সামান্য কাটাকুটিও যা করতেন, সেটাও কি চমত্কার ভাবে। একটা অদ্ভূত শৈল্পিক পরিমিতি বোধ ঘিরে থাকত মার্জিন ধরে ধরে খাতার সাদা পাতাগুলোয় । সাধারণ মোটা কাগজের দিস্তে পাতার বাঁধাই সে সব খাতায় , মলাট দিতেন ব্রাউন কাগজে । আর খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় কেমন সুচারু ভাবে ওঁর  দীর্ঘ নামটি লিখে রাখতেন বিনম্র একটি কোনে । শুধু মুক্তাক্ষর নয় , ওঁর লেখা পড়লে একটা ছবির মত দীপ্তিময় দৃশ্যপট জাগতো মনে ।পাড় বাঁধানো শান দেওয়া ঘাটের পাশে নদীর বয়ে চলাটুকু দেখলে যেমন তৃপ্তি হয়, সেইরকম । আসলে , সে সময় মধ্যবিত্ত শিক্ষিত গড়পরতা বাঙালির মধ্যে একটা অদ্ভূত আভিজাত্য ছিল । অল্প আয়োজনের মধ্যেও পড়াশোনার জগতটা ছিল যারপরনাই গভীর ও ব্যাপ্ত । সে বাঙালির কলম ছিল ঋজু ও ঋদ্ধ । তার জন্যে সে সময়ের অনেকেরই ‘লেখক’ এই তকমার কোনো প্রয়োজন পড়ত না । লেখা হত লেখার আনন্দেই । তাকে ছাপার অক্ষরে পাওয়ার জন্যে কোনো কাকুতি মিনতিও ছিল না । ঠিক এইরকম ভাবেই তো উঠে এসেছিলেন লীলা মজুমদার । রোজকার হেঁসেল ঠেলেও দুবেলা জীবনের অদ্ভূত আলেখ্য লিখে গেছেন আশাপূর্ণা । পড়ুয়া বাঙালির মধ্যে এক বিচিত্র আত্মদর্শন রয়েছে , তার প্রতিফলন দেখা গেছে সেকালের অনেক লেখকের লেখাতেই । যারা অফিসকাছারি সেরে ট্রামে-বাসে সফর করে বাজার দোকান সেরেও লিখে গেছেন মধ্যরাত্রি অব্দি, আর জন্ম হয়েছে এক একজন বিভূতিভূষণ , প্রমথনাথ বিশী কিম্বা বুদ্ধদেব বসু'র ।

যাই হোক, আসল কথাটি হলো আমরা যারা দু-চার শব্দ লিখেই নিজেদের  ‘লেখক’ ভাবতে ভারী তৃপ্তি বোধ করি আর কল্পনায় গড়িয়া হাটে পাঠকদের ভিড়ে মবড হওয়ার ভয়ে ঘেমে নেয়ে উঠি , আদপে সেই সেলিব্রিটি সুলভ মানসিকতায় একটা দেখনদারি  থাকে বটে, কিন্তু সে ভারী স্বল্পায়ু । সাহিত্য বলতে যে দীর্ঘ কালের ব্যাপ্তি, তাতে  তার অস্তিত্ব কনামাত্র নয় । লেখা আসলে বড় নির্জনচারি , কাজেই লেখকও সচেতন ভাবেই নির্জন চর্যা করবেন , সেটাই কাম্য । কিন্তু আজ যারা আমার মত দু-চার পৃষ্ঠা হাবিজাবি লিখে পাতা থুড়ি দেওয়াল ভরাচ্ছেন , তাদের বলার এইটেই যে আরও অনেকখানি পথ লিখতে লিখতে তবেই বোধহয় মানুষের মনের নাগাল পাওয়া যাবে। সে পথ ঠিক কতটা , কে জানে ! কারণ সে লেখা যতক্ষণ না নিজের নির্জন, বেআব্রু , রিক্ততম , অভিজ্ঞতালব্ধ অব্যর্থ সত্যিটুকুতে নিয়ে উঠে আসবে, যতক্ষণ না সে লেখা নিজের কথা নিজের মত করে রেকাবি উপুড় করে বলবে, ততক্ষণ তা সর্বজনের লেখা হয়ে উঠবে না ।


Thursday, June 23, 2016

পড়ন্ত হেমন্ত দিনে

"সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে। ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল,পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে,পান্ডুলিপি করে আয়োজন ,তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল....।"- জীবনানন্দ দাস
একমাত্র ভালবাসার কাছেই বোধহয় এইরকম চুপ করে যাওয়া সাজে। উল্লাস নয়, হাহো গিটকিরি নয়, গমক নয় শুধুমাত্র বেহাগের মীড়ের মত শান্ত, আলাপী, স্নিগ্ধ চুপ করে থাকার নাম হেমন্তকাল। পায়ের কাছে যেমন ঘুমিয়ে থাকে দুপুরবেলার বাধ্য পোষ্য, খেয়ালী ঘুমে রূপসীর হাত থেকে খসে যায় উলের গোলা আর পোষা বেড়ালের পায়ে পায়ে ঘোরে পশমের মখমল, সমস্ত সম্পর্কের জটিলতা জুড়ে আরও নিবিড়, জটিল হয়, তেমনি থেমে থেমে ম্লান, স্তিমিত হাসি হাসে এই স্বল্পায়ু, অল্প কথার , হেমন্ত মানুষ, তার ছায়াময় অস্তিত্ব নিয়ে।
ইস্কুলের সময়সীমা যখন শেষের দিকে, তখন প্রথম বোধহয় আর পাঁচটা ঋতুর চেয়ে হেমন্ত যে একটু অন্যরকম, সেটা বুঝতে পারলাম । আমরা যারা শহর কলকাতায় থাকতাম না , আমরা যারা ঘুমেল , নির্লিপ্ত শ্রীরামপুর, বরানগর কি বোলপুরের মত অখ্যাত মফস্বলের মায়া মাখা দিকশুন্যপুর গুলোর বাসিন্দা ছিলাম, তারাই বোধহয় ঋতু পরিবর্তনের দিনগুলো বেশ আলাদা আলাদা বুঝতাম । ঋতুগুলো প্রায় সাবান মাখার মত গায়ে মেখে বড় হতাম । রোজ যেমন ছিল, অঙ্কের পিরিয়ড হয়ে ইস্কুলের শেষ ঘন্টা বাজত বিকেল ৪ টায় । ব্যাগপত্তর নিয়ে হাওয়াই চটি ফটফট করতে করতে মাঠ, ঘাট, সদরের রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরা । মরা বিকেলের আলোয় কেমন একটা কুয়াশা লাগা বিষন্নতার নিস্তেজ হাসি লেগে থাকত আমাদের বুড়ো শহরটার বুকে । শুধু মনে হত , বাড়ি ফিরে মাকে দেখতে পাব না, অফিস থেকে ফিরতে তার যে অনেক দেরী। আজও একলা একলা ভাত বেড়ে খেতে হবে , আজও সেই আঁকার ইস্কুলে ঝোলা কাঁধে একলাটি যাওয়া , আজও সন্ধ্যে বেলায় ঘরে ফিরে হাত পা ধুয়ে ছাদে গিয়ে, একলাটি রাত্রির আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে একলার প্রতিক্ষা । সে এক অদ্ভূত বিষন্ন অথচ অশরীরী সন্ধ্যে । রঙিন কাগজের ঘেরাটোপে একটি মাটির প্রদীপকে বাঁশের ডগায় বেঁধে উঁচুতে তুলে দেওয়া, এই ছিল তার দস্তুর । মা বলতেন, যে পূর্বপুরুষেরা ছেড়ে চলে গেছেন , তাঁরা আকাশপথে যাতে তাদের বংশপ্রদীপদের ঠিক ঠিক চিনে নিতে পারেন, তাই এ সময়টায় আকাশ প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম । দীপাবলীর ঠিক পরে পরেই, হেমন্তের ঠান্ডা কুয়াশার সন্ধ্যেগুলোয়, সেই অল্প আলোয় আকাশের দিকে তাকিয়ে ঠাঁয় দাঁড়াতাম । মনে হত, সত্যি বোধহয় ওঁরা কোন বন, জঙ্গল অরণ্যের অন্ধকার আকাশ পার হয়ে যাচ্ছেন আর এই একরত্তি শিখার আলোয় ঠিক চিনে নিতে পারছেন তাঁর বংশের এই সামান্য সলতেটুকুর দীপ্তি ।
আর একটু বড় তখন ।কলেজের দিনগুলোতে নভেম্বর মাসের শেষ দুপুরের পর সব ক্লাস থেমে যেত মোটামুটি ...মাঠে, ময়দানে, ল্যাব, কেন্টিন সর্বত্র কেমন একটা ভাঙ্গা হাট, ছেঁড়া কাগজ কুড়োনো বিষন্নতা ,উৎসব শেষের থমথমে ছবি । চার তলার ছাদের কেমিস্ট্রি ল্যাব এর সামনের করিডোরের শেষ কোনটায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকত একজন । সেই কালীপুজোর পর কলেজ খুললে তবে দেখা হবে ,কথা দিয়েছিল । তখন তো আর এত ঘন ঘন মুঠোফোনের রেওয়াজ ছিল না । তাই হাতচিঠিতে সামান্য দু লাইন কোনক্রমে হাতে গুঁজে দিয়েছিলাম , " ছুটির পরে কেমিস্ট্রি ল্যাব এর সামনে , দেখা হচ্ছে "। ছুটি ফুরোলো যেদিন , কলেজেই যাওয়া হলো না। সাড়ে তিন জ্বর নিয়ে বাড়িতেই শুয়ে রইলাম তিনদিন । পরে শুনেছিলাম, সে ঠিক দাঁড়িয়েছিল কেমিস্ট্রি ল্যাব এর সামনে । ইংলিশ অনার্সের ক্লাস ছুটি হয়ে যাওয়ার পরও, শেষ বিকেলের আলো নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল এই অধমের । শ্যামনগর এর ট্রেন অনেক পরে পরে, বাড়ি ফিরতে খুব দেরী হয়ে যাবে, মা বকাবকি করবে খুব তার পরেও...তার পরেও .. অনেকক্ষণ, অপেক্ষা । সমস্ত বিকেল জুড়ে তার দাঁড়িয়ে থাকাটা, তার অপেক্ষাটা , আজ মনে পড়ে। ...বুঝি ওই অপেক্ষার ভালবাসাটা অথবা ভালবাসার অপেক্ষাটা আসলেতে একটা অনন্ত দুপুরের করিডোর। সেই দুপুরটা যদি জীবন হয় তবে ওই করিডোরটা ঠিক হেমন্তকাল । আকাশ প্রদীপ যেমন চুপটি করে জেগে থাকে ছাদের মাথায় , একা চাঁদ সঙ্গী করে, ঠিক তেমন অপেক্ষায় হলুদ হয় হেমন্তকাল ।
নিজেকে প্রথম যৌবনে খুব অপু মনে হত । বিভূতিভূষণের নয়, সত্যজিত এর অপু।সেই যে অপুর সংসারের ..." জীবন বিষম বস্তু, অপূর্বকুমার" ,কলকাতায় এসে লেদ মেশিনের কাজ খুঁজে যার মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো রেল লাইনের ধারের দুঃখী চিলেকোঠায় । সেই তবে থেকে , রেল লাইনের ধারে অভুক্ত, আহত, ধোঁয়া আর শেওলা ঢাকা বাড়িগুলো দেখলে, আজও আমন্ত্রন্হীন দুঃখ জাগে । হেমন্ত নিয়ে লিখতে গিয়ে আজও কেন যে ঠিক সেই ধোঁয়াটে সন্ধেগুলোর কড়া নাড়া অনুভুতিটাই জাগে, কে জানে ! মনে পড়ছে, মীনাদিদির কথা । মীনা দিদি আমার এক দূর সম্পর্কের মাসি ছিলেন। মাসি, অথচ তাকে দেখলে আমার আজীবন দিদিই মনে হত, অনেকটা পথের পাঁচালির সেই রানুদিদির মত। অল্প বয়েসে মা, বাবা হারিয়ে দাদার সংসারে সারা জীবন পড়ে রইলেন তিনি । অথচ মুখ থেকে হাসিটি উধাও হতে দেখিনি কোনদিনও । মীনাদি আজীবন তাঁর ছোট বোনেদের বিয়ের পিঁড়ি আঁকলেন যত্ন করে, তত্বতালাশ সাজিয়ে দিলেন কি অনায়াস সুন্দর চিন্তায় , বাড়ির ছোট থেকে বড় সবার কখন কোনটির প্রয়োজন, তা তার নখদর্পনে ছিল আজীবন, অথচ অবিবাহিত হয়েই কাটিয়ে দিলেন জীবনের বাকিটা । বিয়ে তার হলো না। তাঁর গায়ের রংটি তেমন খোলতাই ছিল না।পাত্রপক্ষ তাই তাকে চিরকাল রিজেকশনের লিস্টিতে বসিয়ে রাখলেন। মামারবাড়ির সেই লম্ফজ্বলা শীতের সন্ধ্যেয় তার লম্বা বিনুনি করা স্নেহসম্বল মুখটা মনে পরে যখন আজ, খুব কষ্ট হয় ।ওঁকে ও আমার হেমন্ত কাল বলে মনে হয়। কেমন জানি শুধু অন্যের জন্য বেঁচে থাকার, আর কারোর জন্যে টিকে থাকার, অভিমান জর্জর, ধুলোমাখা , চৌকাঠ পুরান ।
ভালবাসায় চুপ করে নিঃশব্দ ,নিঃশর্ত ,উদাসীন অথচ সব জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া একটা প্রদীপের মতই থেকে যায় এ ঋতু । ঠিক যেমন, হ্যাজাকের আলোয় মরে সন্ধ্যের পতঙ্গের দল। তখন, মফস্বলের দিকে সে সময় যাত্রা থিয়েটারের আসর বসতো । গলি, বস্তির নিম্নবিত্ত পাড়ায় পাড়ায় বসতো তিনদিন ব্যাপী সাইকেল খেলার আসর । অন্ধকার , বেরং পাড়ার একটিমাত্র খেলার মাঠ সম্বল করে একটি লোক সেখানে মাস্তুল খাটিয়ে , রঙিন দড়ি, শিকলির সামিয়ানা খাটিয়ে, সাইকেলে চড়ে খেলা দেখাতেন রাত্রিদিন । সাইকেলেই স্নান, সাইকেলেই খাওয়া, আবার রাত্তিরে শুনেছি , সেইখানেই ঘুমোনো । সে এক বিষম ব্যাপার । সেইসব মাঠে বড় বড় পেট্রো ম্যাক্সের আলোয় ভিনভিন করত শ্যামা পোকার দল , ঠিক যেমন ভিনভিন করে ভিড় করে খেলা দেখতে জমে উঠতাম আমরা , ছেলে ছোকরার দল। তেমনি আগুন দেখে , আলো দেখে ছুটে আসতো পোকাগুলো, পুড়েও মরত ওই আগুনেই। রাত্রি আটটা-নটার সময় যখন মাইক এর গলাও ক্লান্ত হয়ে ছুটি নিত, ঘরে ফেরার সময় দেখতাম হিমঝরা হ্যাজাকের গায়ে মরে হিম হয়ে জমে রয়েছে হাজার হাজার পোকা । হেমন্ত মানেই কি এক ধরনের মৃত্যুমুখীনতা ? ক্ষণজীবি এক একটা জন্মের আগুনের ফুলকির মত জ্বলে নিবে যাওয়া ? এ প্রশ্নটা জাগলো আজ, এতগুলো বছর পরে । যদিও তখনও জীবনানন্দ পড়েছি শুধু পাঠ্যবইতেই ,কিন্তু ওই মৃত্যুর আর জীবনের ফিরে ফিরে আসার অনুষঙ্গ টা অনুভবের তারে তারে আঙ্গুল ছুঁয়ে গেছে বারবার ।
হেমন্তের রংটি ঠিক কেমন ? অন্যান্য ঋতুর মত তীব্র নয় বরং হেমন্তের রং বোধহয় তেজপাতার মত ।শরতের তীব্র হলুদ থেকে রং ঝরিয়ে একটা ম্লান হলদেটে আভায় এসে রফা করে এ ঋতু । হেমন্তের ঠিক রংটি এঁকেছিলেন একজন । যার ছবি দেখে মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে বড় হয়ে যদি ছবি আঁকতেই হয় ,তবে ঠিক ঐরকমটিই আঁকতে হবে, তিনি অবনীন্দ্রনাথ । হেমন্তের ঠিক ঠিক রংটি তিনি যেমন এঁকেছেন তার অজস্র ছবির টেম্পারা আকাশে , সেই শেষ বিকেলের না হলুদ, না গোলাপী, না বেগুনি রঙের আশ্চর্য মনখারাপি আভা , আজো সৃষ্টি করতে পারলাম না ক্যানভাসের দেওয়ালে । সেই যে বৃদ্ধ শাজাহান তাকিয়ে আছেন অলিন্দর জাফরী দিয়ে অদুরনির্মিত তাজমহলের দিকে, আর আকাশের হেমন্ত ক্যানভাসে ফুটে উঠছে একটি একটি করে রাত্রির উত্সবের আয়োজন ,অবন ঠাকুরের সেই বিষন্ন ,রিক্ত, ক্লান্ত ছবিটা দেখলে অনুভব করি, যে সব অনুভব ব্যক্ত করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায় মাত্র।
অনুভব করেছিলেন, প্রকাশ করেছিলেন আরও একজন যাঁকে ছাড়া এ ঋতু অসমাপ্ত, তিনি জীবনানন্দ । তাঁর একের পর এক শব্দের ছবিতে তিনি লিখে গেছেন হেমন্তের খোয়াবনামা । কার্তিকের ভোরে কুয়াশায় ভেজা বাংলার করুন ডাঙায়, ঘাটে, মাঠে জীবনানন্দের পংক্তিরা আজও ভিড় করে আসে মশারির ধারে সারারাত ।ওদের চেনা মুখগুলো ঘুমোতে দেয় না আর । নিস্তব্ধ শহরের ঘুমিয়ে পরার পর সতর্ক নিঃশব্দে উঠে বসি, টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে ফিরে আসি প্রিয়তম বইটির কাছে । পাতায় আঙ্গুল রেখে , পর্ণমোচী জঙ্গলের পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফিরে যাই আমরা , আমাদের ব্যক্তিগত হেমন্তদিনে । ঘুমের শহরে একের পর এক পাতা উল্টে যায়," হয়ত এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে , সরু সরু একরাশ ডালপালা কালো কালো মুখে নিয়ে তার ,,,,তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার, আমার !" কেঁপে যাওয়া উত্তুরে হাওয়ায় কখন দেরাদুনগামী ট্রেনের আওয়াজ ভেসে আসে , ডাক আসে, ডাক আসে । চেনা সম্পর্ক তার আস্তিনের সব তাস খুইয়ে, মায়াময় জোছনায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরে ট্রামলাইন ধরে একলা । একলা ঘরের তালা খুলে, ফ্রিজে রাখা জলের বোতল থেকে খায় দুই এক ঢোঁক ,তারপর আর কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ে । শেষ রাত্রের কার্তিকের শীতে তাঁর চোখ ভিজে যায় হিমে ,অথচ গায়ের চাদরটুকু টেনে দেওয়ার মানুষটি যার নেই, হেমন্ত সেই অভিমানী সহপাঠী হয়ে ফিরে যায় । শব্দ ধরে ধরে, অক্ষর মিলিয়ে যায় , স্মৃতির গাড়, গভীর কুয়াশায় ।

আমি অপার হয়ে বসে আছি

“নদী আমাদের কাছে ঠিক কেমন ছিল জানিস ? মায়ের মত । আমার তো মা ছিল না ।" এই পর্যন্ত বলেই হঠাত কেমন উদাস হয়ে,কাঁসার বাটি থেকে এক গাল মুড়ি নিয়ে চিবোতে শুরু করতেন আমার মাতামহ ।ওঁর এতক্ষণ ধরে বলে চলা নদীর গল্পের আঁকাবাঁকা চলনের রুপোলি খেইগুলো হারিয়ে যেত হঠাৎ| জানলার বাইরে কুয়াশা কুয়াশা কাদা ছাড়িয়ে, পানাপুকুর ছাড়িয়ে, সন্তুদের বাঁশবাগান ছাড়িয়ে, গঞ্জের বাজার ছাড়িয়ে , এমনকি দুরে রেল লাইনে থমকে থাকা কলকাতামুখো ট্রেন ছাড়িয়ে, মাতামহের দৃষ্টি স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকত । আমিও অপলক তাকিয়ে থাকতাম ওঁর মুখের দিকে আর সেই নীরবতাটুকুকে বাঙ্ময় করে একসময় ট্রেনের বাঁশির আওয়াজ তীব্র হয়ে বাজত । ওঁর চোখের কোন ভরে উঠত টলটলে জলে , আমি মনে মনে বেশ দেখতে পেতাম, খুব সকালের গাড় কুয়াশা ঘন হয়ে থমকে আছে পদ্মার বুকের ওপর। জেলেনৌকাগুলি দাঁড় টেনে টেনে জাল গুটোচ্ছে পাড় ধরে ধরে । আর বছর চোদ্দ পনেরর একটি কিশোর মাথায় বইপত্তর তুলে, ইস্কুলের জামাকাপড় পোঁটলা পাকিয়ে , কোমরে গামছা জড়িয়ে বুকজল ঠেলে ঠেলে উজান স্রোতে এগিয়ে চলেছে নদীর ওপারে । নদী পেরিয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার হাঁটলে তবে সে পৌঁছবে তার সদর ইস্কুলে । মাতামহর কাছে তার ফেলে আসা ফরিদপুরের শৈশবের ওই হাঁটুজল পেরোনো পাঠশালে যাওয়া মরাস্রোতের নদী, সাঁতার দিয়ে পেরোনো জেদ চিরে চিরে যাওয়া ইস্কুলের নদী, ঝড়ঝঞ্ঝার ফোঁসফোঁসানি যৌবনের নদীর এত রূপ শুনতে শুনতে কখন যে পদ্মাকে মনে মনে চিনে ফেলেছি হাতের পাতার মত, বুঝিনি । বুঝলাম, যেদিন বড় হলাম খানিকটা , নিজেও স্কুলে ভর্তি হলাম , আর প্রথমবার গঙ্গা দেখলাম ।
বছর ছয় -সাত বয়স হবে, যখন বড় ইস্কুলে ভর্তি হই। সে ইস্কুলের বিরাট ফিকে গোলাপী রঙের স্কুলবাড়ির প্রধান বিশেষত্ব ছিল, তার বিরাট বিরাট জানলা দিয়ে ক্লাসরুমের ঠিক পাশ দিয়েই দেখা যেত, আদিগন্ত স্লথ গতিতে বয়ে চলা স্লেট রঙের ভাগীরথী ।ভাগীরথী নামটা অবিশ্যি ভূগোল বইতে পড়া, জ্যাঠা মশাই বলতেন 'পতিতপাবনী গঙ্গে' আর ঠাকুমা গঙ্গাস্নানে যাওয়ার নাম শুনলেই হাতজোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে স্মিত হেসে বড় বড় প্লাস্টিকের জেরিকেন ,কৌটো নিয়ে প্রস্তুত হতেন, গঙ্গাজল বাড়িতে নিয়ে আসবেন বলে । আমার কাছে যদিও এ নদী , নদীই ছিল । তাকে আমি মনে মনে জানতাম গঙ্গা বলে, তবে তাকেই আবার পদ্মা, যমুনা বা গোদাবরী ভেবে নিতেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না । তখন মনে হত, এ তো সেই গল্পে শোনা নদী । একই রকম । এমনটাই তো । তবে মাতামহ যে বলতেন, সে আলাদা দেশ ! আলাদা মুলুক ! তখন বুঝিনি, এখন বুঝি। নদীর কোনো দেশ হয় না । যুগযুগান্তের গন্তব্যহীনতার ওপর দিয়ে , সমস্ত অর্থ, অনর্থ, ধর্ম, অধর্মের ওপর দিয়ে, সব দিকচিন্হ মুছে দিয়ে বয়ে চলাটাই তার ধর্ম ।
"কে কাকে প্রশয় দেয় ? নৌকা নাকি ধাবমান স্রোত ?
নৌকা কি গন্তব্য চেনে ? চেনে নাকি চির- প্রান্তদেশ ?
স্রোতও চিনেছে শেষ ? জেগে গেছে চির নির্বাপণ ?
নৌকা ও স্রোত আসলে এক অন্যের উপনিবেশ ।
মা জল । মা সেই স্রোত । ভেসে আছি গর্ভবাসকালে ।
কে কাকে চেনাবে আলো, অন্তিম অন্ধকার ফুরালে ?" (রেহান)
উপরের কবিতাটি নদীর কথা বলে ।আবার বলতে বলতে শেষে এসে মায়ের কথা বলে, স্রোতের কথা বলতে বলতে গর্ভে ফিরে যায় । ঠিক সেইটাই কারণ এই কবিতাটি আরেকবার ফিরে পড়ার । পৃথিবীর যে কোনো দেশের, যে কোনো নদীর মধ্যে এক একজন মা বাস করে, যেমন মাতামহ বলতেন । আর মায়ের সাথে সম্ম্পর্কটা ঠিক যেমন , তেমনিই নদীর পাশে এসে বসার অভিজ্ঞতাটুকু । মনের ভেতর মহলের যত কষ্ট, অপমান, আশংকা, যন্ত্রণা, যা আর কাউকে বলা যায় না, জলকে বলা যায় । জলের কাছে এলে, নদীর কাছে এলে, মানুষ হালকা হয়ে যায় । জমাট বাঁধা দুঃখগুলো এক সময় নোনা হাওয়ায় হলদে বালির মত ঝুরঝুর করে উড়ে যায় মোহনার দিকে । ঠিক কখন যে বয়ে আনা কষ্টের বোঝাটা হালকা হয়ে গেল, তা বোঝার আগেই আমরা আরো একবার জীবনের কাছে রেকাবি পাতি , আরো একদান খেলা হোক । ইস্কুলের বাংলা পরীক্ষার ‘ভারত একটি নদীমাতৃক দেশ’ ইত্যাদি রচনা কমন পরতো , সেখানে যে দু চার কথা সাজিয়ে গুছিয়ে মুখস্ত করে লিখতাম , আর রোজকার চেনা নদীর সাথে যে জীবন, সেটা কিন্তু মিলত না । এ কথা বুঝিয়ে বলতে বললে কি বোঝাব জানি না , যেখানে নদীর বয়ে চলার নিরবিচ্ছিন্ন সত্যিটুকু আমার অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে , সেখানে তার গভীরতার আন্দাজ কি আদৌ দেওয়া যায় ? জীবন যেভাবে বয়ে যায় নদীর বয়ে চলাটুকুও ঠিক তেমনি সমান্তরাল এক জীবন ! হয়ত বা , নদী ছাড়া আমার ব্যক্তিগত জীবনটা প্রায় অর্ধেক জীবনও। জানিনা । আসলে সব জিনিস জানা যায় না, জানলেও বোঝানো যায় না, বোঝানোর প্রয়োজনও অনুভব করি না, শুধুই অনুভব করতে পারি ।
"মনে হয় যে নদীকে চিনি, সেও ঠিক নদী নয় ,আভাসে ইঙ্গিতে কিছু জল " - আল মাহমুদ
আমার জন্মের আগে মা স্বপ্ন দেখেছিল , গঙ্গার ঘাটের শেষ সিঁড়িটিতে বসে একটি শিশু খেলা করছে আর মা কাছে যেতেই সে খিলখিল করে হেসে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে ফল, ফুল । স্বপ্নের শিশুটি আমি ছিলাম কিনা জানি না, তবে নদীর ইঙ্গিতটুকু ছিল, চেতনার মধ্যে মিশে বরাবর । তাই গর্ভের অন্ধকার থেকেই বোধহয় দাঁড় টানার আওয়াজ শুনে অভ্যস্ত ছিল কান । ক্লাসরুম যখন টিফিনের পরের ঘন্টায় ঘুম ঘুম হয়ে উঠত, পাটিগণিত ছেড়ে তাকিয়ে থাকতাম নদীর দিকে । কি জানি মনে হত, জটিল সমীকরণে ভরা ব্ল্যাক বোর্ডের চেয়ে অনেক বড় একটা সত্যি আছে নদীর বয়ে চলায় ।অনেক সত্যের মাঝে একটা ছিল মৃত্যু | মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্যি আর কি বা হতে পারে ?একদিন মনে আছে ক্লাস চলছে তখন,, হঠাত হইহই শুনে গঙ্গার ধারের আলসেতে ঝুঁকে পড়েছে সক্কলে, ভিড় ঠেলে দেখেছিলাম, জোয়ারের স্রোতে কচুরিপানার স্তুপ আর ঘাসের ভেসে যাওয়া বড় বড় চাপড়ার সাথে আটকে রয়েছে একটা মানুষ ,একটা গোটা মানুষের দেহ । প্রায় দিন দুই ধরে ভেসে আসা সেই নিথর, নিস্পন্দ দেহটা পচে জলে সাদা হয়ে গিয়েছিল । তার সেই শক্ত দুটো মুঠো করে ধরে থাকা হাত আর খোলা দুটো চোখের পাতা ,জলের ওপর দিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে, অনেকক্ষণ । ঘুমোতে পারিনি কয়েকটা রাত । মৃত্যু যে কি ভয়ংকর শক্ত হয়ে জীবনকে শাসাতে পারে, নদীই দেখিয়েছিল প্রথম । আবার সেই নদীই তো ফিরিয়ে এনেছিল জীবনের সুধাও । রবীন্দ্রসদনের পিছনের গেটে ঢোকার মুখে যে একচিলতে বাগান, সেখানে এক ফাল্গুন বিকেলে একসাথে বসে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে আনমনে একটি মেয়ে বলেছিল,' আপনার কাছে এলে কেমন মনে হয় জানেন ?' জিগ্গেস করেছিলাম, কেমন ? তাঁর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখটিকে অনেকদুর শীতলপাটির মত বিছিয়ে দিয়ে সে বলেছিল,' মনে হয়, বড় কোনো নদীর ধারে এসে বসলাম । জলকে যে সব বলা যায় । আপনিও ওই জলেরই মত ।' তাঁর পরের দিনই মেয়েটির ট্রান্সফার হয়ে যায় উত্তর বঙ্গে আর বলা বাহুল্য তাঁর সাথে আর দেখা হয়নি আমার কোনদিনও । কিন্তু জলের সাথে সেই অন্ত্যমিল টুকু আমার এ জীবনের অনেকটা বড় পাওনা ।
প্রথম যেদিন মা বলেছিল উপার্জন করতে না পারলে আর ঘরে ফিরিস না , সেকথা প্রথম শুনেছে আমার নদী । প্রথম যেদিন বৃষ্টির অন্ধকার বিকেলে, ঘাটের পৈঠায় বাঁধা ফাঁকা নৌকার গলুইতে বসে একটি মানুষের শরীর চিনলাম , চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো শিখলাম , চোখ মেলে দেখল , প্রিয় নদী । এক দিনের জ্বরে হার্টের অসুখে যখন বাবা ছেড়ে চলে গেলেন , তখনও সাথে ছিল নদী । রাত্রির কালো জল ঠেলে ঠেলে হাতের মধ্যে গঙ্গা মাটির পিন্ড আর তাতে গনগনে চিতা থেকে খুঁজে নেওয়া আমার জন্মদাতা পিতার নাভি, অস্থিটুকু নিয়ে যখন বিসর্জন দিলাম, নদীর গহ্বরে, তখন কোথাও কি একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো ? কে জানে । কলেজ ছুটির পরে নদীর ওপর ঝুঁকে পড়া একটা বটগাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতাম অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে আর যতক্ষণ না দিনের শেষ আলোটুকু নিভে মরচে পরে আসে , ততক্ষণ জলের সাথে কথা চলতো অনর্গল । বন্ধু ছিল অনেক, সাইকেল নিয়ে তারা চলে গেলেও , আমার মনে হত এই একটি নিজের জায়গা আছে, যার কাছে বসলে দু দন্ড শান্তি পাওয়া যায় । মনে হত নদী যেমন বোঝে আমায়, তেমন করে আর কেউ বোধহয় বোঝে না । তাই টিউশনের ক্লাস কাটা বিকেল, পদ্য লেখা গরিবের ঘোড়া রোগের বিকেল , রাত কালোতে সব হারানোর অস্থিরতার বিকেল সবেরই আশ্রয় ছিল নদী, প্রিয় নদী । আমার আলো-আঁধারী মফস্বলের নুয়ে পড়া কষ্টদুপুরগুলো, সাদা পাতায় লিখে একটা একটা করে ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিয়েছি নদীর শরীরে কতবার । মনখারাপের এক একটা হলদে নেশার করাত কেটে কেটে ধোঁয়া করে উড়িয়েছি নদীর বুকেই। সেসবের সাক্ষ্য এখন বোধহয় পলি চাপা পরে গেছে । কিন্তু পলি সরলেই দেখা যাবে আমাদের শৈশবের উপন্যাস ,কেমন নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে নদীগর্ভে |
'এই জীবনে এই সুখ হলো, আবার কোথায় যাই না জানি ,
আমি পেয়েছি এক ভাঙ্গা তরী, জনম গেল ছেঁচতে পানি,
আবার কোথায় , যাই না জানি ।' - লালন
এখন অফিস আসি, নদী পেরিয়ে রোজ । গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, শরতে নদীর আলাদা আলাদা রূপ দেখি । আলাদা আলাদা রং দেখি । এখন বুঝি, নদী বদলায় না কাউকে, শুধু বদলে যায় নিজে। আরো স্নেহ নিয়ে, মায়া নিয়ে, আপন করে নিয়ে নিজেকে সকলের জন্যে সাজিয়ে নেয় রোজ | বয়ে চলে যায় দিকশুন্যপুরের দিকে, গন্তব্যহীন গন্তব্যের দিকে। সেই বদলটা টের পাই , কারণ বদলেছি আমিও অনেকটা । সেই অনিশ্চিত , আজ জুটেছে, কাল কি হবে ? কালের ঘরে শনি'র সেই আধখানা মানুষটা বদলে গেছে । এখন সংসারের কথা ভাবি , গেরস্থের মত । ঠিক সময়ে দফতরে যাই, ফিরি । শুধু যাতায়াতের পথে আমায় লক্ষ্য রাখে আমার পুরনো বন্ধুটি । আমার নদীর বুক চিরে আমার অতীতের ফেরি বয়ে যায়, ভবিষ্যতের দিকে ।ছলাত করে পাড়ের ঢেউ গুলো জিগ্গেস করে ফিকে হেসে, কি হে ? কি বুঝছ জীবনটা ? আর আমি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই জোয়ারের জলে ভেসে যায় আমার আজীবনের সংস্কার , উত্তর থেকে দক্ষিনের দিকে বয়ে চলে রুপোর পাতের মত ঝকঝকে শানিত তলোয়ার । আমি নৌকোর ছায়া থেকে ভীতুর মত তাকিয়ে থাকি সেই রুদ্র রূপের দিকে । কোজাগরীর চাঁদ ওঠে যখন নিঃশব্দে নদীর বুকে , মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি এই অপার্থিব দৃশ্যের দিকে । কথা থেমে যায়, শব্দ ঝরে যায় , শুধু রুপোর পাতের মত অলক্ষ্যে বেজে চলে সারেঙ্গীর সুর । আবার ভাঁটার টানে ভেসে আসতে দেখি খড়, বাঁশে আঁটা প্রতিমার কাঠামো , ভাসান বেলায় যার সাথে পাশাপাশি ভেসে চলে মৃত কুকুরের পেটফোলা দেহ। বর্ষার কালো মেঘের ছায়া যখন ঘন হয়ে, ভিড় করে আসে জলের বুকে , বৃষ্টি আসার আগের মুহুর্তে ফিসফিসিয়ে কানের কাছে লোভ দেখায় গাঙের হাওয়া, বলে ঝাঁপ দে, ঝাঁপিয়ে পড় । জীবনটাকে স্রোতের বিপরীতে সরীসৃপের মত এঁকেবেঁকে কাটিয়ে বেরিয়ে যা । মধ্যবিত্ত পা দুটো আঁকড়ে থাকে নৌকোর পাটাতন আর আমিও বুড়ো মাঝির মত মেপে নিই জল, দেখি চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে একলা নির্ভীক একপাটি হাওয়াই চটি, হু হু করে ।
“আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়।। পারে লয়ে যাও আমায়। আমি একা রইলাম ঘাটে ভানু সে বসিলো পাটে, তোমা বিনে ঘোর সংকটে না দেখি উপায়।। নাই আমার ভজন সাধন চিরদিন কুপথে গমন। নাম শুনেছি পতিত পাবন তাইতে দেই দোহাই।। অগতির না দিলে গতি ঐ নামে রবে অখ্যাতি লালন কয় অকুলের পতি কে বলবে তোমায়।।

শীতলপাটি ও অঘ্রানের গল্প

কিছু কিছু কিসসা কোনদিন ফুরায় না , কিছু কিছু শীতকাল ও । তামাম ছোট বেলা থেকে দৈর্ঘে প্রস্থে বড় হয়ে ওঠাটার গায়ে গায়ে যে দ্বিতীয় ত্বকের মত স্নেহরং বোরোলিন লাগিয়ে দিত মা , জীবনের ওঠা পড়া যাতে সহজে গায়ে না লাগে।সেই বোরোলিন এখনো গায়ে লেগে আছে, অনভ্যস্ত চামড়ায় । অথচ জীবনের সব ওঠা পরা, ছেঁড়া কনুই এর চোট, পায়ের পাতার নিচে আড়াআড়ি কাটা, স্মৃতি সবই গায়ে লেগে গেছে নির্ভুল । ঠিক সেই ছিয়াশি সালের মত বছর সাত আটের আঠালো কুয়াশা এখনো ভিজে উঠছে পুরনো দস্তানার আড়ালের আরো পুরনো আঙ্গুলগুলোর ভাঁজে । নইলে কি ভাবেই বা ঘুম ভাঙলে এখনো ইঁদুরে কাটা লেপের লাল শালুর কভার দেওয়া বিছানা বালিশের সেই ট্রাঙ্ক-পত্তর খোলা ন্যাপথলিন এর গন্ধটা এখনো এই মধ্য তিরিশেও নাকে লেগে থাকে । আসলে মনে মনে বালক দিনের রেশমপোকা, সুতো জড়িয়ে জড়িয়ে যে মসলিন বোনে , সে মসলিনের স্মৃতি সোয়েটার বোনা শেষ হয়না কখনো । কত সহস্র শীতকাল ধরে , কত ভুল ঘর ঘুরে কাঁটা ওঠে, উলের অমরত্ব জুড়ে, কাঁটা পরে মায়াবী রোদ্দুরে । সে পশম গোলা অতীত থেকে শুধুই গড়িয়ে যায় ভবিষ্যতের শীতে, জড়িয়ে মরিয়ে যায় ধাপে ধাপে মধ্যবর্তী বছরগুলোর ঘটনা অঘটন নিয়ে ।
শীতকাল মানেই ছোটবেলার কতগুলো স্থির অনুষঙ্গ, যেগুলো আজীবন বদলায় না । আমার যেমন সেই নীল সাদা সোয়েটার'টা মনে পরে, নতুন'পিসির হাতে বোনা । বুনতে বুনতে কতবার ছোট্ট পিঠের ওপর মেলে মাপ নেওয়া আর হাসির হররা মাখা দুপুরের রসালাপ, তাপ নিতে নিতে বোনা ওই সোয়েটার'টা আজও আমার মনের দেহটাকে গরম করে রাখে, সে ওম ফুরনোর নয় । বন্ধুরা জিগ্যেস করলেই, জানিস, এটা আমার জন্যে নিজের হাতে করে দিয়েছে আমার পিসি ...কেবলমাত্র আমার জন্যেই যে নিজের হাতে এমন একটা অদ্বিতীয় কীর্তি করা হয়েছে জগতে , সে আনন্দ সে বয়েসে অনেকখানি।.সেই বুক ফোলানো খুশি এখনো ভুস করে ভেসে ওঠে কোথাও | বিগ বাজারের ট্যাগ ছেঁড়া ইমপোর্টেড জ্যাকেট তো কই, সেই খুশি দেয় না ! আবার যেমন প্রথম ধুনুরীর হাতে লেপ তোষক তৈরির আনন্দ ।সকাল সকাল শাহজাদ কাকা হাজির , এক কাপ চা খেয়ে লেগে পড়ল বাড়ির সামনের দাওয়ায় তুলো ধোনার কাজে, আর আমরা ছোটরা সার সার বেঁধে সামনে । অদ্ভূত সুরে উঠছে পরছে, ধুনুরীর হাতের ছিলার সানাই, একটানা একঘেয়ে মন খারাপ শব্দের আবহে বাতাস জুড়ে উড়ছে ফুরফুরে শিমুল তুলো ইতস্তত, উত্তুরে হাওয়ার মাঝে মধ্যেই কয়েক পশলা দমকা আদর , ব্যাস, নিমেষে আমাদের ২৪৭, বাহির শ্রীরামপুর লেনের এঁদো গলি তখন দার্জিলিং কিম্বা বরফঢাকা মানালি। আসলে কল্পনাদের পাখা তো মেলাই থাকে, দেখা যায় না শুধু ।
শীতকাল মানে আদপে রোদের রং বদলানো একটা প্রলম্বিত সকাল । প্রায় দরজার মত লম্বা লম্বা গরাদ বসানো জানলা ছিল বাড়িতে সেকালে, বোধহয় ফ্রেঞ্চ উইন্দো বলা হত । সেই প্রচুর আলো আলো জানলার ধরে বসে আমাদের পড়া-পড়া খেলায় ভাগ বসাত অনেকে । এক বাটি মুড়ি বইয়ের মলাটের ওপর রাখা , তার অর্ধেক গেল পেটে আর বাকি অর্ধেক সামনের কাক, চড়ুই, শালিখ..".তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন" । লাফিয়ে লাফিয়ে একটা দুটো মুড়ি ঠোঁটের ডগায় নিয়ে ফুরুত করে উড়ছে পৌষের সকাল । গুড়ের নাগরী নিয়ে সাইকেল করে আসছে চেনা বিক্রেতা নগেন । ফি বছর শীতে তার বাঁধা ধরা বেসাতি । আরও একটু ভোরের দিকে খেজুর পাতার দোলায় চেপে আসাফুল মিয়ার টাটকা খেজুর রস আসতো ছলাত ছলাত । তরিঘরি রান্নাঘর থেকে এলুমিনিয়াম এর ডেকচি তে নেওয়া হলো খানিক , যতটা শব্দ করা যায়, ততখানি আওয়াজে সুরুত সুরুত করে চুমুক লাগলো মেজকা , তারপর হাত ঘুরে ঘুরে সেই মিষ্টি গুড়ের শীতকাল পাঁচমিশেলি সংসারের ঠোঁটের ডগায় ।
.আরো একজন ছিলেন যাকে ছাড়া শীতকাল ব্যাপারটাই অসম্পূর্ণ ছিল , তিনি মুস্তাক কাকা । প্রায় ৬ ফুট লম্বা আর ঝকঝকে সুদর্শন চেহারায় যে কোনো ফিল্মষ্টার কে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাঁচ গোল দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার ।আসতেন কাশ্মির থেকে বাহারি পশমের শাল, সোয়েটার, টুপি নিয়ে কিন্তু আদতে ছিলেন আমাদের অন্দরমহলের মানুষ । মুস্তাক কাকার সাইকেলের টিং টিং শব্দ সদরে শোনা গেলেই, সেদিনের মত পড়াশোনার পাট চুকে গেল । আলাপী মানুষটি জমিয়ে বসতেন খাটের ওপরে , সব্বার কুশল খবর নিতেন আর আমাদের ভাই বোনেদের চোখ শুধু অনুসরণ করত কখন তার ফর্সা গোলাপী হাত দুটো ঢুকবে ওর ল- ও- ম- বা জোব্বার পকেটে , কারণ ওখান থেকেই তো বেরোত ফি-বছরের শীতের মনপসন্দ নজরানা । আখরোট , পেস্তা, খেজুর, কিসমিস আরও অনেক রকম নাম না জানা শুকনো ফল, মিষ্টি নিয়ে আসতেন মুস্তাক কাকা । ঠিক মনে করে, কার কোনটা পছন্দ । ঠিক যেন আমাদের জেঠু , কাকুদের মতই আপনার মানুষটি....শুধু থাকেন সেই কাশ্মিরে । কাশ্মির জায়গাটা তো তখনও চোখে দেখিনি, শাম্মী কাপুরের ফিল্মের পর্দায় দু চারবার ছাড়া , কিন্তু কাকার দাড়ি ভরা নবাবি মুখ, লম্বা খাড়া নাক আর ঝকঝকে সহৃদয় দুটো চোখ দেখলেই মনে হত , কাশ্মির জায়গাটা নিশ্চই খুব ভালো নইলে এমন মানুষ থাকে সেখানে !কাকা এলেই মায়ের হাতের চা আর ডিমের অমলেট ছিল বাঁধা , কখনো কখনো চিঁড়ের পোলাও ,চানাচুর এমনকি পরোটা তরকারী, যা হত বাড়িতে । বাবা, কাকা এসে যোগ দিতেন আমাদের আড্ডায়, সেই পাহাড় বরফ ঢাকা জায়গাটার কতরকম গল্পে বিভোর হয়ে থাকতাম আমরা । প্রতিবারই আড্ডা শেষ হত মুস্তাক কাকার গলার গান দিয়ে । এক্কেবারে মহম্মদ রফির মত মিষ্টি সুরেলা গলায় একটার পর একটা হিট গান, গাওয়ার আবদার আসতো সকলের কাছ থেকে । গানে, গল্পে আড্ডার শেষ পর্বে ঝোলা থেকে বেরোত যদিও নতুন শাল কিম্বা ফুলেল রঙিন কার্ডিগানের নকশা তোলা জামা অথচ কোনদিন ক্রেতা বিক্রেতার সম্পর্ক তৈরীই হয়নি সেই মানুষটির সাথে। খাট জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শীত পোশাকের স্তুপ তখন চার চিনার কিম্বা ডাল লেকের ঝিলমিল ছুটির হিমেল রোদে ভরিয়ে তুলত আমাদের চুন বালি খসা দুঃখী ঘরটাকে । হাতের মুঠোয় আখরোট ভরা দিনগুলো হয়ে যেত যেন শাহজাদা , শাহজাদীর আরব্যরজনী ।
সময়ের সাথে সাথে সেই দিনগুলো বদলে গেল । মুশতাক কাকা আসা বন্ধ করে দিল অনেকদিন |..প্রথম প্রথম ওঁর চেনা জানা কেউ এলে তার কাছ থেকে একটু আধটু খবর পাওয়া যেত, পরে সেটাও না ।.মনের অনেক নিচের দিকে কোনো একটা স্তরে প্রায় আবছা হতে শুরু করেছিল ওঁর হাসি হাসি মুখটা কিন্তু সময় যাকে ফিরিয়ে নেয় তাকে আবার জীবনের কোনো একটা হঠাত মোড়ে ফিরিয়ে দেয় ও । বছর পাঁচেক আগে অফিস যাওয়ার সময় আরো একজন শালওয়ালা কে সদরে দেখে বেশ অবাক এবং বিরক্তই হচ্ছিলাম, এই সাতসকালে আবার কেনাকাটির সময় কোথায় ! ছেলেটি নার্ভাস মুখে একটুকরো হালকা হাসি টেনে যখন ওর পরিচয় দিল, বুকের ভিতরে দাঁড় টানার শব্দ পেলুম, কতদিন পরে । ভালো করে চোখের দিকে তাকাতেই, সেই সতের আঠেরোর সদ্য যুবকের মুখে খুঁজে পেলাম তাঁর পিতার আদল । মুস্তাক কাকার একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ । সে আসছে তার দেশোয়ালি কাকা, দাদাদের সাথে এখন, ঠিক তার বাবার মতই সাইকেলের কেরিয়ারে পুঁটলি বেঁধে , টুকরো টুকরো কাশ্মির আর বঞ্চনার ইতিহাস নিয়ে । শুধু তার বাবার কথা জিগ্গেস করতেই চোখ নামিয়ে জানালো মিলিটান্ট’দের গুলিতে সেই মানুষটা ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে অনেকদিন । পিপুল গাছের হলদে হয়ে যাওয়া বাগিচায় পাতার নিচে ওর কবরে চাপা পরে রয়েছে, আমার শৈশবের সোনালী অঘ্রানদিন , মহম্মদ রফির শর্মিলা ,মিঠে গানের গুনগুন কলি , আর প্রায় ম্যাজিশিয়ানের আস্তিনফেরত আনন্দ মুঠো জমানো, ছোটবেলার আখরোট ।
তবু তো শীত আসে । মুস্তাক কাকার স্মৃতি নিয়ে, ছোটবেলার ওঠাপড়ার স্মৃতি নিয়ে, বয়েসের প্রলেপ লাগা দেহ আর তার অনেকখানি অন্দরে থাকা কমলালেবু ছোটবেলার মন নিয়ে, শীত আসে এখনো । আমার শহর জাগে ঠিক ভোর চারটেয় । আমি জাগি অর্ধেক জীবনের ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন নিয়ে । কুয়াশার সাদা চাদর এর আদরে ঢাকা ময়দানের মাথায় আবছা রহস্যে মেঘ সরিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে ভিক্টোরিয়ার কালো পরি । তার বাঁশি উঁচিয়ে শান্ত সমুদ্রের মত ফেনা ওঠা বাসীঘুমে শহরের বুকে মাস্তুল তুলে, সে ইশারা করে ভোরের নবাগত সূর্যের দিকে । সে বাঁশির আওয়াজ আসে গঙ্গার বুকে ঠান্ডা মাটি জলের মধ্যে নতজানু ঠায় ভিজে নোঙ্গর ফেলা স্টিমার এর বুকের হাপর ঠেলে । সে আওয়াজ বড় করুন , বড় শান্ত | থেমে থেমে বেজে এ শহরকে জাগায় সে । নৌকার গলুই থেকে মুখ বাড়ায় মাঝির কালো মুখ । নদীর বুক থেকে তিরতির করে ওঠে টলটলে সুখের ধোঁয়া । হাওড়ার প্রাগৈতিহাসিক সেতু ছবি হয়ে ঝুলে থাকে রসিকার বক্ষবন্ধনির মত এ হৃদয় থেকে ও হৃদয় জুড়ে ,জলের সাথে শুরু হয় তার সকাল সকাল প্রেম পঁয়জার ।
ঘুম ভেঙ্গে ময়দান জুড়ে শুরু হয় উত্সাহী বাদামী ঘোড়াদের দাপাদাপি । জোড়া জোড়া পায়ের আঘাতে সবুজ ঘাসের বুকে মোলায়েম উত্তাপ লাগে । গত রাতের ভালোবাসাবাসির চিন্হ লুকিয়ে ফেলে ঘাস, তার নম্র বুকের গভীরে । ওদিকে নরম শান্ত গির্জার মত রোদ শতাব্দীর জারুল শিমুল এর আদিম গাম্ভীর্য থেকে আবডালে নেমে আসে ব্যস্ত অফিস পাড়ার প্রাতরাশে , টুক করে ছুঁয়ে দেয় হঠাতই আলাপী ট্রামলাইন কে আরও একবার । লজ্জায় আরও খানিকটা এঁকেবেঁকে লালচে হয়ে পাশ ফিরে শোয় সে । শুরু হয় শীত শহরের নকশী কথার হাট।
ছেলেদের ইশকুল বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরি আর চাদ্দিকে এই খুশির ফরমান জারি হয়েছে দেখে, অজান্তেই মনটা খুশি তে ঝিলমিল করে ওঠে । টালা থেকে টালিগঞ্জে সাইকেল আর ট্রামের টিং টিং ঘন্টিতে দাঁত মাজে এ শহর ,এক চিলতে ব্যালকনির একটুকরো সুখে পাশাপাশি চা খায় অশীতিপর দাম্পত্য ,দুটো হলদেটে বেতের চেয়ারে । মানিকতলা বস্তির রশিদ নির্ভুল টিপে ছুঁড়ে দেয় দড়ি পাকানো খবরের কাগজ , কসবার হাউসিং এর তেতলার ব্যালকনিতে ।চেয়ারের ধরে কুন্ডলী পাকানো বেড়ালটা এক চোখ খুলে একবার পড়ে নেয় সে বৃত্তান্ত আবার ঘুমের নরমে ডুব দেবে বলে । চন্দ্রমল্লিকার টবের মাটি ঝেড়ে কাগজ তুলে হাতে নেয় রূপসী কলকাতা । আগের রাতের আই লাইনার ঘেঁটে যাওয়া ঘোলাটে চোখে ঘুম মুছে হঠাত হাতঘড়িতে সময় দেখে যাদবপুরের থার্ড ইয়ারের ছাত্রীটি । নরম কুশনে কাগজ নিয়ে ঠেস দিয়ে বসতেই মোবাইলের আট ইঞ্চি স্ক্রিনে হোয়াটস এপ এর সবুজ যুবক আলো জানান দেয় ‘গুড মর্নিং’ । দিল্লির লোধী গার্ডেনের সকাল থেকে প্রযুক্তির হাত্চিঠি নিয়ে আসে একটি আহির ভৈরোর গান এর এটাচমেন্ট , হলদেটে মুখের গোল পানা হাসিমুখের স্মাইলি, অমনি কলকাতা ছাড়িয়ে পাড়ি দেয় নিমেষে দিল্লির যুবকের মুঠোয়।
আমার ফেরার পথে দিন শুরু হয় বাগবাজারের মহাকালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের সহদেব এর । অভ্যস্ত ব্যস্ততায় দ্রুত হাত সিঙ্গারার পুর ঠেসতে ঠেসতে সাবধানী মন উদাস হয়ে যায় তার কোনো কোনদিন ।এক ভাঁড় চা নিয়ে একটু বসি ওর পাশে । কেমন আছ গো ? বাড়ির সব কেমন ? মুখে ছায়া পড়ে সহদেবের । ‘আর বলবেন না , ছেলেটার জ্বর বেড়েছে বেশ , নদিয়া থেকে বউ এর ফোন এসেছিল গতরাতে’। ওদিকে ডালডার সুগন্ধে ম-ম গরম কড়ায় মুচমুচে ভাজা হয় সোনালী শহর । কাঠের বড় বারকোষে ছানা ঠেসে আদরের গুড় মেখে সারি সারি হাঁসেদের ছানা মিঠে রোদ্দুরের দিকে পিঠ করে বসে । চোখের মধ্যে একটি করে এলাচের দানা ফোটালেই তারা স্থান পাবে শো-কেসের শীতল অন্দরে । নতুন গুড়ের হাঁড়িটি তার বাবুই পাখির বাসার মতন গ্রামীন দেহাতি রূপে বড় বেমানান হয়ে ঝুলে থাকে কাউন্টারের একধারে , তার সঙ্গী হয় রঙিন নকশা কাটা জয়্নগরের মোয়ার শহুরে বাক্স । সবকিছুর অনেক ওপরে নির্বিঘ্নে বসে সব লক্ষ্য করেন গনেশ লক্ষী দেবাদিদেব আদি, ক্যালেন্ডারে উদাসীন প্রসন্নতায় । বাইরের বড় উনুনের ধোঁয়া তখন রোদের সঙ্গে শঙ্খ লেগে প্রনয় পার্বনে । অথচ সবকিছুর পরেও সহদেবের পিতৃত্বের চেনা চিন্তাটুকু ঝুলে থাকে সকালের ধোঁয়ায় ।ওকে খানিকটা ভরসা দিয়ে এগিয়ে চলি বাড়ির রাস্তায় ।' সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো '।
বাজার এর দিকে সকালবেলা একবার ঢু মারতে পারলে, সদ্য খেত থেকে তোলা টাটকা সবজির দেখা মিলবেই । দুটো হাসিখুশি ফুলকপির মাথা বাজারের ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতেই হঠাত খেয়াল হলো, কখন জানি জীবনের এই মিঠেকড়া রাস্তাটা অনেকটা পেরিয়ে এলাম । ঠিক এমন করেই তো আমার মাতামহকে দেখেছি, সকালবেলার বাজার সেরে ফিরতে । তখন লেপের আড়াল থেকে চোখ পিটপিট করে দেখতাম তাঁকে । সাতসকালেই আটপৌরে ফতুয়া আর ধপধপে সাদা ধুতি পড়ে,মানুষটি সাইকেল নিয়ে গেট ঢেলে ঢুকছেন । হাতে বাজারের ব্যাগ , আর তার মুখ দিয়ে উঁকি মারছে বাগান ফেরত শিশির ধোয়া শাক সবজি ।
বাজার ফেরত ব্যাগটাকে রান্নাঘরের দোরগোড়ায় রেখে একটু জিরিয়ে নিতেন তিনি ।দিদিমা কে ডেকে বলতেন, ‘শুনছ , আজ খুব ভালো দিশি পালং পাওয়া গ্যালো অনেকদিন পরে । বেগুন আর বড়ি দিয়ে বেশ ডুমো ডুমো করে কোরো এখন ।‘ চায়ের জন্য গলাটা খুব উশখুশ করছে বটে, তবে গিন্নির মেজাজ দেখে তবেই আবদারটা পাড়তেন । ও ঘরে হারমোনিয়াম তুফান তুলেছে ততক্ষণে সাধন মাস্টার । আমার ছোট মাসি দক্ষিণীতে গান শিখতেন । তার জন্যেই বাড়িতে সকাল বিকেল প্র্যাকটিসের সুবন্দোবস্ত । মাতামহ এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসতেন , ও ঘর থেকে গানের কলি ভেসে আসতো |"রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি..",,,দাদামশাই দুই দিকে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলতেন , ‘আহা, কতদিন পরে সেই ফরিদপুরের সকাল মনে পরে গেল’ । ওদিকে দিদিমা আজ দেরাজ খুলে বের করেছেন দস্তুরমত পুরনো আলোয়ান , পশমি ফুলতলা চাদর আর লাল শালু তে মোড়া লেপ । সব রোদে দিয়ে তবে না গায়ে দেওয়া । কার্তিক মাসের হিম , এ বড় গায়ে লেগে যায় । দেরাজের একেবারে পিছনের দিকে হাত বাড়াতেই বেরিয়ে এলো লাল ডুরে তাঁতের শান্তিপুরী শাড়িটা । পাড়ে সোনালী হাঁসের আল্পনা আঁকা । জায়গায় জায়গায় নেপথলিনের গন্ধে ভেজা স্মৃতিতে পিঁজে গিয়েছে শাড়িটা । ওমা, এটা এখেনে ছিল । গালে হাত দিয়ে বুড়ি ভাবতে বসলেন, এ হল তার সেই ছেষট্টি সালের শাড়ি । কলকাতায় বদলির খবর এলো আর কত্তা হাটবারে গিয়ে কিনে আনলেন এই শাড়ি ।সে কি আজকের কথা । কি আনন্দ ওটা হাতে পেয়ে তাঁর । চুপি চুপি গিয়ে শাড়িটা পরে নিজেকেই আয়নায় দেখে মুখ টিপে হাসলেন । গরম ধোঁওয়া ওঠা চা এর কাপ ছলকে গেল আজ , কাঁপা হাতে লাজুক মুখে গিয়ে দাদামশাইকে ধরালেন কাপ । খবরের কাগজ সরিয়ে ছানা বড়া চোখে দাদামশাই দেখলেন সব, চশমাটা চোখ থেকে খুলে হঠাত সে কি হো হো হাসি । ছাদের পায়রারা এ সব খুনসুটি দেখে হাসির হররায় উড়ে যেত ভবানীপুরের ছাদ থেকে । সকালের রোদ নতুন গুড়ের মত রক্তাভো লাল হত, কলকাতা নড়েচড়ে বসতো সকালের এই বেগমবাহার রূপ দেখে ।কিছু কিছু কিসসা কোনদিন ফুরায় না , কিছু কিছু শীতকাল ও| এসব এখন শুনলে অলৌকিক লাগে, মনে হয় আর জন্মের গল্প ।তবু তো এ গল্প ফুরোয় না । প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে ।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

তখনও নটা পনেরো'র বোটটা ছাড়েনি । কোনক্রমে টিকেটটা ঘাটের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে দৌড় লাগালাম উর্ধশ্বাসে । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মানে, আমি ওকে ওই নামেই মনে মনে ডাকি আর কি । উনি এই ফেরিঘাটের টিকেট কালেক্টর । আসলে হয়েছে কি , ভদ্রলোককে অবিকল হেমন্তবাবুর মতই দেখতে । ঐরকম হাইট , ব্যাকব্রাশ করা চুল, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা আর সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট যেটা, সেটা এই ২০১৫ তেও ওঁর পরনে ধুতি শার্ট । নরুন পাড় ধুতির ওপর হাত গোটানো লম্বা ধোপাবাড়ি ফেরত বাংলা শার্ট । ওঁকে দেখছি প্রায় বছর সাতেক ঠিক এই ভাবেই । বয়েস প্রায় সত্তরের কোঠায়, কিন্তু চেহারাটা বেশ কেঠো বলেই কিনা জানিনা, শীত, গ্রীষ্ম ,বর্ষা ওই একই পোশাকে ওনাকে দেখি এবং সবমিলিয়ে সুস্থই দেখি । একদিন ফেরার পথে একটু আলাপ জমানোর ইচ্ছে হলো । টিকেটটা হাতে গুঁজে দিয়ে , বলেই ফেললাম , "ইয়ে, মানে, কাকাবাবু আপনাকে না অবিকল হেমন্তবাবুর মতই ইয়ে , মানে ....দেখতে !" ভদ্রলোক বেশ মিতবাক । আমার কথা শুনে মনে হলো না খুব একটা নতুন কিছু শুনলেন ! হয়ত অনেকেই ওকে এভাবেই রেকগনাইজ করেন । শুধু সামান্য ঘাড় নেড়ে, একটু হাসার চেষ্টা করলেন এবং চুপ করে গেলেন । কথা আর আগে বাড়ছে না দেখে, ভাবলাম , উনি বোধহয় মনে মনে বিরক্ত হলেন , তাই আর কথা বাড়ালাম না , পা বাড়ালাম ।
দিন সাতেক পর বাড়ি ফেরার সময়ে টিকেট দিয়ে বেরিয়ে আসছি হঠাত পিছন থেকে ডাকলেন উনি, একবার । জলদগম্ভীর গলাটা শুনে বেশ চমকে উঠলাম । আরে , এ তো সেই ,'আয়, খুকু আয়' এর গলা । ঠিক সেই রকম আবেগী , পিতৃসুলভ আর অসম্ভব পুরুষালি ব্যারিটোন । আমি ফিরে তাকাতেই, খুক খুক করে একটু কেশে বললেন, ' সেদিন বলছিলেন না, ওই হেমন্তবাবুর সাথে আমার মিল... ইত্যাদি !' আমি ঘাড় নেড়ে , মানে একটু বোকার মতই বললাম ,' হ্যা , মানে' ! এবার আমায় থামিয়ে দিয়ে, একটু থেমে থেমে উদাস হয়ে উনি বললেন, ' এই শহরে আসি আটাশ বছর বয়েসে , আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান ।' হঠাত থেমে জিগ্গেস করলেন , 'হাতে সময় আছে তো ?' আমি হ্যা বলতে আবার শুরু করলেন, ' গান গাইতাম ছোট থেকেই। পাড়ার লোকে বলত একদম হেমন্ত মুখার্জি ।' এই অব্দি বলে, পকেট থেকে একটা নস্যির ডিবে বের করলেন ,নাকে খানিকটা নস্যি নিয়ে আবার বলতে শুরু কল্লেন ' হেমন্তবাবু, মান্না বাবুর তখন সাম্রাজ্য । বুইলেন । শুনে শুনে গাইতুম, গান শিখিনি তো কক্ষনো । বাপ, মা মরা ছেলে । শিকবুই বা কোতায় ! কলকাতায় এলাম আটাত্তরে । শ্যালদায় একটা বন্ধুর মেসে থাকতুম । প্রথম প্রথম তো তেমন ডাক আসতো না, অরিজিনাল হেমন্তবাবু তখন বেঁচে , কন্ঠি আর কে শোনে । এই টুকটাক ফাংশন এ গান গাওয়ার ডাক পড়ত । কতই বা রোজগার ! যা হোক , বিয়ে কল্লুম । সংসার কল্লুম ,বছর দশ ।সন্তানাদি হলো না । গিন্নি চলে গেলেন কিডনির রোগে । চিকিচ্ছে করাতে পারিনি । এরমধ্যেই উননব্বুইতে হেমন্তবাবু পরলোক গমন কল্লেন । কলকাতা তখন খাঁ খাঁ কচ্ছে, বুইলেন । জলসায় তকন আমার খুব কদর । আমিও ঠিক ঐরকম ধুতি জামা ,চশমা পড়তে শুরু কল্লুম । ওঁর যত ভালো ভালো গান , সেই সবই গাওয়ার ফরমাস আসতো । সেভাবেই চলছিল । তারপর একটা সময় বাংলা গান টান কেমন বদলে গেল । কেউ আর ত্যামন ডাকে না । নতুন নতুন সব শিল্পী এয়েছেন । সময়টা আবার পড়ে গ্যালো ।' এই অব্দি বলে ,ভদ্রলোক, চুপ করে মাথা নিচু করে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ । হঠাত জিগ্গেস করলেন,' আপনার কাছে একটা সিগারেট হবে ?'
সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে দিলাম একটা সিগারেট । দু আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেটটা বেশ আয়েশ করে ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ভদ্রলোক বললেন, " আসল আসলই হয় মশাই, নকল কক্ষনো আসল হয় না । আমি যতই ওঁর মত ধুতি, জামা পরি, টেরি কাটি না কেন, লোকে তো বুজত, এ লোকটা নকল । তাই গানগুলোও নকল । কিন্তু বিশ্বাস করুন, গান গাইতুম একদম ভেতর থেকে, চোখ বুজলেই দেকতুম, হেমন্তবাবুর আঙ্গুলগুলো হার্মনির রিড এর ওপর উটছে , পরছে । গলায় সেই কাজ করতুম .....পারলুম না । শেষে , ট্রেনে ট্রেনে কামরায় ঘুরে ঘুরে গাইতাম কিছু দিন । শরীর দিল না , বয়েস তো হলো । গলাটাও আর আগের মত জোর নেই, বুজলেন কিনা । এক পরিচিত দেখে এইখেনে চাগরি দিলেন , এখন এই কালেক্টর হয়েই দিন কাটাচ্ছি । এরা যা দেয়, কোনো ক্রমে একলার পেট চালিয়ে নি । " খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম । গলা খাঁকরি দিয়ে উঠে পরলাম । কি বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না । আমার কাছে শুধু চেহারা গত সাদৃশ্য দিয়ে মনে মনে যে মজাটা করে আসছিলাম , একজনের জীবনে তার প্রভাব কতখানি সুদূরপ্রসারী, সেটা জানতে পেরে কেমন একটা চাপা কষ্ট হচ্ছিল ।
বিদায় জানিয়ে 'আসি' বলে ঘুরে দাঁড়াতেই উনি আরেকবার পিছু ডাকলেন । একটু ইতস্তত করে বললেন ,'' আচ্ছা, আপনারা, কোনো চেনাশোনা জলসায় হেমন্ত কন্ঠি খোঁজেন না আজকাল ? লাগলে বলবেন । ওই পুজোর সময়- টময় । অল্প পয়সায় গেয়ে দোবো । চেহারাটা তো এখনো রেখিচি । আমার তো ফোন নম্বর নেই , এই টিকিট কাউন্টারে বলে দিলেই ওরা আমায় জানিয়ে দেবে ! '' জানাবো বলে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে এলাম । ততক্ষণে পরের বোটের লোকজন চলে এসেছে । ফেরিঘাটের পাশের কালিমন্দিরের চাতালে ততক্ষণে তাস খেলুড়েদের ভিড় জমেছে । কারুর ট্রানসিস্টর রেডিও থেকে ভেসে আসছে গান ,"এ ব্যথা কি যে ব্যথা, বোঝে কি আনজনে, সজনী আমি বুঝি, মরেছি মনে মনে ....." কি মনে হলো, পিছন ফিরে দেখলাম । লম্বা,শীর্ণ, দীর্ঘদেহটা ভিড়ের সব মাথা ছাড়িয়ে দূর থেকে দেখা যাচ্ছে । আবার নিত্যযাত্রীদের কাছ থেকে একমনে মাথা নিচু করে টিকেট কালেক্ট করছেন আমার 'হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ' কাকাবাবু ।

বাজীরাও মাস্তানি ! চিত্র আলোচনা ~

"অহো কি দেখিলাম, ইহ জীবনেও ভুলিব না । " ভানুশালীর লীলা দেখতে বসে মহাভারত দ্রষ্টা সঞ্জয় এরও বোধকরি এইরকম হাল ঘটবে আর সে দৃশ্য বেচারা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বর্ণনা করা বোধহয় তৎক্ষনাত ওঁর পক্ষেও সম্ভব হবে না, কেননা মশায় , ভদ্রলোককে তো দম নেওয়ার ফুরসতটুকু দিতেই হবে । দম নেবার ফুরসতটুকু আপনিও পাবেন কিনা ঘোর সন্দেহ আছে, কেননা ছবির টাইটেল থেকে শুরু করে টানা ২ ঘন্টা ৪৮ মিনিটের এই ম্যাগনাম ওপাস দেখে, পিঠের শিরদাঁড়া এবং চোখের বিশ্রামের প্রভূত প্রয়োজন হবে আপনারও । সঞ্জয় লীলা ভানুশালীর কাছে যদিও এসব নিছকই "মেগায়িত" ঐতিহাসিক প্রেমের লার্জার দ্যান লাইফ "লীলায়িত আখ্যান "।কারণ যে দাপটে এবং যে মুন্সীয়ানায় তিনি পেশওয়া বাজীরাও এর জীবনের এমন বৃহদাকার মহাকাব্যিক আউটপুট পেশ করেন , এমন সব জীবনাপেক্ষা বিরাট বহুমাত্রিক চালচিত্র আমদানি করেন ও মেগা ঝলমলে দৃশ্যপটে আপনাকে ৩৬০ ডিগ্রীর ভার্চুয়াল ট্যুর করান , সে দাপট এর আগে একমাত্র "মুঘল-এ-আজম " অথবা "তাজমহল" জাতীয় খানকয়েক বিশ্ববন্দিত আগমার্কা ভারতীয় ইতিহাসের ছবি ছাড়া দেখা যায় না ।
ভানুশালীর কাজের সাথে যারা পরিচিত আছেন, তাদের কাছে অবিশ্যি এ নতুন কথা কি ? উনি চাকচিক্য, জাঁক জমকে, দেখানেপনায় বড় উগ্ররকম বিশ্বাসী । সাদামাটা মনুষ্য জীবনের সাধারণ রোজকেরে গপ্প ওঁর মোটে পছন্দ নয় । উনি দিন কে রাত, রাত কে দিন আখচার করে থাকেন ও শিল্পের খাতিরে শরত চাটুজ্যের দেবদাসের মত অমন সাদামাটা পারাগায়েঁর গপ্পকেও এমন ডামাডোল বাজিয়ে হীরামানিক খচিয়ে গাছে চড়িয়ে দেন, যে মনে ধ্বন্দ জাগে, স্বয়ং শরতচন্দ্রও ওই গাছ থেকে নামতে মই খুঁজে পাবেন কিনা । তা যাকগে । ভানুশালীর সাম্প্রতিকতম এই লোমহর্ষক প্রেমকাহিনী দৃষ্টিসুখের উল্লাসে আপনাকে আগাগোড়া মাতিয়ে রাখবে । উফ, কি সব পোশাক আশাক , উফফ কি দারুনটাই না দেখিয়েছে দীপিকা পাদুকোন কে , থুড়ি মস্তানিবাইকে । প্রেমের দিওয়ানি, জওয়ানির পরে ওঁর পাগড়িতে এমনধারা মস্তানির পালক বসিয়ে দীপিকা একেবারে চারচন্দ্র লাগিয়ে দিয়েছেন বলিউডের প্রেমাকাশে । নিন্দুকে যাই বলুক, গুগল ঘেঁটে একবার দেখুন তো মস্তানিবাই এর ব্রিটিশ শিল্পীকৃত তৈলচিত্র আর হাতে গরম মিলিয়ে নিন দীপিকার সাথে । কোনো ফাঁকি পাবেন না । অনবদ্য সব কস্টিউমের কাজ আর দীপিকা রনবীর এর শরীরী ভাষার গুমগুমে আগুনের ধক্ধকে আঁচের রসায়ন একেবারে মুচমুচে ও গরমাগরম ।রনবীর সিং এ ছবিতে এতটাই সহজাত , উচ্চকিত ও কনফিডেন্ট যে ওঁকে বাদ দিয়ে ঐতিহাসিক চরিত্র এবার তৈরী করা যাবে কিনা সন্দেহ আছে । চরিত্রটির জন্যে একেবারে সঠিক পছন্দ রনবীর আর উনি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য একটি জায়গা তৈরী করেছেন শ্রীমন্ত এর চরিত্রে । যেমন বীরত্বব্যঞ্জক তেমনি রমনীরঞ্জক ও । মাসল টাসল ফুলিয়ে একেবারে দর্শকের চোখের আরাম ( পড়ুন, বিশেষত মহিলা দর্শকের ও পুরুষের ঈর্ষার কারণ ) । এবার আসি এ ছবির তৃতীয় স্তম্ভ প্রিয়াঙ্কার কথায় । প্রিয়াঙ্কা যে একজন জাত অভিনেত্রী , সে কথা আর বলে দিতে হয় না । তাঁর এ ছবিতে অভিনীত চরিত্রটি নিয়ে যখন ইতিহাসও আশ্চর্য রকম ভাবেই নীরব, সেখানে পরিচালকের দেখানো পথেই কাশিবাই প্রিয়াঙ্কা হেঁটেছেন, একেবারে অন্যরকম একটা ধাঁচে । তেমন প্রামান্য কোনো রেফারেন্স ছাড়াই বাজীরাও এর প্রথম স্ত্রী কাশিবাই এর চরিত্রের ছেলেমানুষী, ঘরোয়া স্ত্রী সুলভ ন্যাকামি, বোকামির সাথেই স্বামীর অন্য মেয়েমানুষে আসক্তি মেনে নেওয়ার অসহায় বিষাদটুকু চমত্কার ফুটিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা । অবিশ্যি তাঁর চরিত্রের চেহারাগত 'লুক'টির ক্রেডিট যে রাজা রবি বর্মার আঁকা স্বনামধন্য ছবিগুলির সৌজন্যে, সে সৌজন্য পরিচালক মশাই দেখালেন না দেখে আশ্চর্য বোধ করলুম । বিশেষ ভাবে যার কথা না বললেই নয় , তিনি তানভী আজমি । বাজীরাও এর মা রাধাবাই এর চরিত্রে ওঁর আশ্চর্য রকম শক্ত ,নির্বিকার চরিত্রায়ন একেবারে শতকরা একশভাগ অভিনয়হীন অভিনয় । মিলিন্দ সোমান এ ছবিতে এক দারুন আবিষ্কার । খুব তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকায় দারুন কাজ করেছেন তিনি ।
তবে ওপরে যা যা বললুম, সে তো এই মুখ্য চরিত্রগুলির অভিনয়, পোশাক আশাক ও ঝাঁ চকচকে সেট নিয়ে । হাতে রইলো বাকি গল্পটা আর পরিচালকের কারিংকুরিং এর কাটা ছেঁড়া । একন, ইতিহাস ঘাঁটলে কি বলে জানি না, তবে উইকিপিদিয়া যতটুকু বলে বাজীরাও এর ব্যাপারে, সঞ্জয়ও ততটুকুই বলেছেন এবং তার সাথে 'আপন মনের মাধুরী মিশায়ে' রচেছেন 'মুঘল এ আজম' পার্ট - টু, ব্রডওয়ে স্টাইল অপেরাসুলভ ধামাকা দিয়ে । সেই শাহজাদা সেলিমের শিশমহল এখানে হয়েছে আয়না মহল, সেই মধুবালার মেহেরুন্নিসা এখানে হয়েছেন মস্তানি বাই এবং প্রেমের ওপর জাত ধর্মের উপর্যুপরি অত্যাচারের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে শহীদ হচ্ছেন শেষ অবধি প্রেমিক যুগল ও প্রেমের গজদন্ত মিনারের ওপর ধ্বনিত হচ্ছে ' জব প্যার কিয়া তো ডারনা কেয়া'র অকুতোভয় প্রভাতফেরী , এই অবধি ফর্মুলাটা একইরকম । যা আলাদা, তা হলো ভি-এফ-এক্সে আকাশ থেকে আগুনে তীর বৃষ্টি, এনিমেশনে ভয়াল ভয়ংকর যুদ্ধ, ' ৩০০' বা 'ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন ' এর মত নামজাদা হলিউড ছবি থেকে স্ক্রিন টু স্ক্রিন একশন টেক্শন এর অনুপ্রেরণা । ঐসব ভিজ্যুয়াল এলিমেন্ট বাদ দিলে গল্পটা ওই সরলরেখায়, দু চার কথায়ই শেষ । মিউসিক বেশ সময়োচিত । নাচে গানে ভরপুর । তবে দেবদাসের "ডোলা ডোলার " ওই একটি কিনলে, আরেকটি ফ্রি ফর্মুলাতে, পেশোয়ার দুই রানীকে একসাথে নাচানোর কি খুব প্রয়োজন ছিল ? ইতিহাস কি বলছে ? খোদায় ..থুড়ি, ভানুশালীই জানেন ।

চলুন বেড়িয়ে আসি ~

বেলা বারোটা নাগাদ ছোটকা হনহনিয়ে বাড়ি ঢুকে সদরঘরের তক্তাপোষের ওপর ধপ করে বসে পড়লেন । পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে চোখ নাচিয়ে বললেন," টিকিটটা কেটেই ফেললাম বৌদি,এবার শীতে শিমলা" । রান্নাঘর থেকে চায়ের বাটিতে ফু দিতে দিতে মা আসছিলেন, বেড়াতে যাওয়ার খবর শুনেই ওঁর মাথা থেকেও ঘোমটা খসে পড়ল ,উনুনের আঁচে নাকি আনন্দে মা'র গালগুলো দেখি লাল!! , "ওমা সেকি ।" দু কান এঁট করা হাসি হেসে ছোটকা পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা হলদেটে কাগজ বের করে আনলেন, ঠিক যেন ম্যাজিশিয়ানের আস্তিন থেকে জাদু তাস ।চায়ের কাপে শব্দ করে একটা চুমুক দিয়ে বললেন " সবে চাঁদুর চায়ের দোকানে বাজারের ব্যাগটা রেখেছি বুঝলে, দেখি কিনা ব্যাটা কাগজ সেঁটেছে , একেবারে শিমলে । খোঁজ খবর নিয়ে এক্কেবারে টিকেট কেটে, পয়সা জমা দিয়ে এলাম । বিল্টুটারও তো ও সময় ইস্কুলের ছুটি । দাদা নয় দু দিন ছুটি নেবে'খন ।" আনন্দে বুক তিরতির আমারও , ভাঁজ করা হলদে কাগজটা খুললাম । বড় বড় হরফে রং তুলি দিয়ে লেখা, " চলুন বেড়িয়ে আসি । শিমলা, কুলু, মানালি, আহারাদি সহ মাত্র ৫০১ টাকা ।" নিচে একটা বরফের পাহাড়ের কাঁচা হাতের ড্রয়িং । দুটো নীলরং পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সূর্য উঠছে টকটকে লাল । আহা, শীতকাল। আহা, গোলাপফুল আঁকা বাক্স তোরঙ্গ নিয়ে বাঙালির "'চলুন ,বেড়িয়ে আসি'র " কুন্ডু স্পেশাল শুভযাত্রা ।
সেকালে সকলে পশ্চিমে যেত ।মানে জায়গাটা রাঁচি হোক বা ধলভূমগড়, তোপচাঁচি হোক বা পরেশনাথের পাহাড়, বাঙালির মুখে বাঁধা বুলি, পশ্চিমে চললেম । প্রধানত বিয়ের যৌতুকে পাওয়া গোলাপ বা পদ্মফুল, লতাপাতা আঁকা বাক্সতোরঙ্গ নিয়ে পেটরোগা বাঙালি হাওয়া খেতে যেত শিমুলতলায় কিম্বা দার্জিলিঙে সপরিবারে । শীতের পড়ন্ত বেলায় রেলগাড়িতে চড়ে ঝমাঝম ঝমাঝম মাঠ পেরিয়ে, ঘাট পেরিয়ে সেই নিরুদ্দেশ যাত্রার রোমান্টিকতায় কিন্তু আজও ঘাটতি পড়েনি এতটুকু , শুধু তার ধরন ধারণ বদলেছে মাত্র । উদ্দেশ্য কর্মসূত্রে হোক অথবা নিছক বায়ু ভক্ষণ, রেলগাড়িতে জানলার ধারের আরামটুকু কিনে নিতে পারলেই ব্যাস, আধা কাজ আপনার সারা । এরপর পানসি চলুক না,.বেলঘরিয়া অথবা তিনধারিয়া, যেখানে খুশি । আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ । তাই সেই ছোট্ট বেলার কু -ঝিকঝিক এঘর ওঘর ভাইবোনেদের খুশি গাড়ির সারি সারি এখনো দৌড়োয় মনের মধ্যে, আনমনেই । 'রেল কম ঝমা ঝম'..তারপরে যদিও আর পা পিছলে আলুর দম হয় না আজকাল, তবুও বিমান যাত্রার হূঊঊশ করে চটজলদি উড়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্য সুখ এর চেয়ে ঢের ভালো এই ঢিকঢিকিয়ে চলার অ-কুলীন যাত্রার নির্মল আনন্দ। আমার কাছে সে খুশি সময়ের সাথে একটুও কমেনি , বরং বেড়েছে বলা যায় ।
বেলাবেলি যাত্রা শুরুর নান্দীমুখটাও সেরে রাখি এবেলা । যাত্রার শুরুতেই হাওড়া স্টেশনের বড় ঘড়ির নিচে দাঁড়ানোর অমোঘ প্রতিক্ষাটা ছিল সেকালে প্রায় জাপানি হাইকুর মতই নির্মেদ, সরল একটুকরো রোদেলা কবিতা । সেই নেই মোবাইলের যোগাযোগহীন যুগে, দুরুদুরু বুকে ওই দুমুখো ঘড়ির নিচে দাঁড়িয়ে কতই না আশাতীত, আষাড়ে দাম্পত্যের সূচনা আবার সমাপ্তি দুটিই ঘটেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের সুচরিতা সান্যাল সেই যে কমল মিত্তিরের মতন বাবাকে ফাঁকি দিয়ে 'বড়পিসির বাড়ি চিত্তরঞ্জন চললাম ' বলে আসলে পাড়াতুতো চিত্তদার সাথে পাড়ি দিল বোলপুর পৌষ মেলায় অথবা অল ইন্ডিয়া রেডিওর আমন্ত্রণে সেই যে বাড়ি ছেড়ে 'অডিশন দিয়ে আসছি' বলে হাঁটা দিলেন হাতিবাগানের শশধর মিত্র, এদের অনেকেরই জীবন পথের গতি প্রকৃতি বদলেছে হাওড়ার এই ঐতিহাসিক সময়-সান্ত্রীটির নিচে । স্টেশন জুড়ে ঘনঘন ব্যস্ততা, হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে কুলির মাথায় সুটকেস, মুখে চিমনির মত একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ভিড় হটাতে হটাতে বীরদর্পে গাড়ি ধরছেন সপরিবারে বাঙালি সাহেব , মাইকে মাঝে মধ্যেই ঘোষণা , অমুক এক্সপ্রেস ,তমুক সময়ে তমুক নম্বর প্লাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে । ওদিকে ঘড়ির নিচে প্ল্যাটফর্মের দিক করে দাঁড়িয়ে আছেন জনৈকা সুচরিতা সান্যাল। ফুলছাপ সিল্কের শাড়ি আর জোড়া বিনুনি করা সুচারু কপালে বিন্দু বিন্দু টেনশন ঘাম আর হাতের মুঠোয় একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ । কাগজে সস্তার ফাউন্টেন পেনে লেখা এক লাইনের আমন্ত্রণ, ' চলে এসো, ঠিক বিকেল পাঁচটার সময়, স্টেশনে বড় ঘড়ির নিচে' - - ইতি চিত্তরঞ্জন বোস , এমন সব কত প্রনয়গাথার সাক্ষী এই স্টেশন আর প্লাটফর্ম ছাড়া,হুইসল দেওয়া গাড়ি । আর আজকের কথা তো নয়, সেই রবি ঠাকুরের সময় থেকে বাঙালির ভ্রমন পঞ্জিকায় রেলগাড়ির যে মাহাত্ব্য তা কি কোনভাবে অস্বীকার করতে পারেন ? সেই যে মেয়েটির নাম , কমলা নাকি ক্যামেলিয়া ? তার সাথেও তো এই রেলগাড়ির কামরাতেই দেখা হয়েছিল কবির ।
রেলগাড়িতে বেড়ানোর, বিশেষত স্লিপার ক্লাসে বেড়াতে যাওয়ার একটা চিরকালীন আকর্ষণ ( শৌচাগার এর অস্বাচ্ছন্দ্য টুকু বাদ দিয়ে ) আছে, তা কি অস্বীকার করতে পারেন ? বেতের ঝুড়িতে উঁকি মারবে মরশুমী কমলালেবু , শৌখিন বাঙালি পরিবার গুছিয়ে জমিয়ে বড়, ছোট, মেজ, সেজ, ন , নতুন, রাঙ্গা, সোনা ইত্যাদি ইত্যাদি পাঁচমিশেলি সাইজের ক্রমানুসারে মাথা গুনে বসবে সিট জুড়ে । তারপর গাড়ি ছাড়লেই ছোট খোকার চাই ঝাল বাদাম , বড় খুকির চাই ঘটি গরম । সেজখুড়ির চাই গরম চা মাটির ভাঁড়ে , বড় জেঠামশাই এর খবরের কাগজ । মা বসবেন পশমের ব্যাগ খুলে পশমি সোয়েটারের উল কাঁটা গোলা নিয়ে । মধ্যে মধ্যেই ছোট খুকির পিঠের মাপ নেওয়া হবে আর হাত চলবে ট্রেনের চাকার মতই দ্রুত । বাবা গম্ভীর ভাবে গলা খাঁকারি দিয়ে চোখের কোন দিয়ে ইশারা করবেন সেজকাকা'কে ব্যাগ থেকে জয়্নগরের মোয়াটা বের করতে আর অমনি সেজকাকি ঝাঁঝিয়ে উঠেবন, গাড়িতে উঠে থেকেই তোমাদের খাই খাই শুরু ,বলি তোমরা তো ছেলেপুলেদের এক কাঠি ওপরে দেকচি । ছোটপিসি আর রাঙ্গাপিসি সিনেমা পত্রিকা নিয়ে নিজেদের মধ্যে জোর তর্কাতর্কি চালাবে, অপর্ণা সেন এর চুলটা অমুক সিনেমায় আসল না পরচুলো, সুপ্রিয়ার সাথে নাকি সুচিত্রার সাথে ,কার সাথে উত্তমকুমার কে সবচেয়ে বেশি মানায়, ইত্যাদি ইত্যাদি । এর মধ্যে গাড়ি ঢুকবে বর্ধমান স্টেশন । মেজোকাকা সবাইকে ধাক্কা টাক্কা মেরে গুঁতিয়ে গাঁটিয়ে তার মুষ্টিযোদ্ধার মতন চেহারাটা নিয়ে বুলেট গতিতে বেরোবেন এবং কি অলৌকিক উপায়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্লাটফর্ম থেকে উদ্ধার করে আনবেন শালপাতার ঠোলায় দেলখোশ মিহিদানা, নবাবভোগ্য সীতাভোগ ( সীতা কোন কালে এটি ভোগ করেছিলেন কিনা, রামায়ন অবিশ্যি বলে না ! )আর ফ্লাস্কে ভরে মালাই দেওয়া প্রায় রাবড়ির মত মিষ্টি চা।পরবর্তী স্টেশনগুলির খোরাক হাসিরাশি নজরানা পৌছে যাবে, মা, কাকিমাদের কাছে । তারপর.. বাসী খবরের কাগজ সিটের ওপর পেতে সকলে মিলে খানাপিনার খুশিয়াল বেত্তান্ত । রেল এর সাথে যাত্রীদের সম্পর্কের এই স্নেহ সন্দিহান সারণী ফুরোবে কি কোনদিন ? রেলযাত্রার এমন সব উপভোগ্য দৃশ্য কি বাঙালির জীবন থেকে একেবারেই মুছে যাবে ? বিমানের কথা না'হয় ছেড়েই দিলাম, এসি কামরায় ছিমছাম পেপারব্যাক পড়তে পড়তে আর চিপস খেতে খেতে কর্পোরেট বাঙালির ট্রেনযাত্রায় কি সেই আনন্দ আছে ?
কিশোরবেলায় আমার একটা খুব প্রিয়তম স্বপ্ন ছিল ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চপান্ডবের থেকে ধার নেওয়া । মানে সেই বাবলু, বিলু, বাচ্ছু দের দুরন্ত পাঁচজনা যারা কিনা হাজার রকম রহস্যের কিনারা করতে প্রায়ই দুমদাম করে বেরিয়ে পরত রাতের রেলগাড়িতে চেপে , কখনো হাজারিবাগ, কখনো শিমলা আবার কখনো বা হরিদ্বার । হইহই দুরন্ত ওই কচিকাঁচাদের সাথে থাকত মায়ের দেওয়া টিফিন কেরিয়ারে জিভে জল আনা সব খাবার দাবারের সম্ভার আর গাড়ি ছাড়লেই কেমন পাঁচজনে জানলার ধারে বসে তুমুল বাকবিতন্ডার মধ্যে সাবাড় করত সেসব সুখাদ্য , তার অভিভূত রকম বিবরণ পরে পরে খুউউব ইচ্ছে হত, রহস্য টহস্য যদি নাই বা পাওয়া গেল, নিদেন পক্ষে লুচি আলুরদম আর সন্দেশ নিয়ে রাতের রেলগাড়িতে দিকশুন্যপুরের দিকে যদি কোথাও একটা অজানায় অচেনায় চলে যেতে পারতাম ! সে আনন্দ কি আদপেও জুটবেনা আদতে এই জীবনে ? খুব দুঃখ করতাম, গৃহবন্দী মন ছটফট করত সেসব লেখা পড়ে । সেকালে ইস্কুলে ইস্কুলে এক্সকারশন বা শিক্ষামূলক ভ্রমনে যাওয়ার একটা চল ছিল । পি.টির মাষ্টারমশাইরা মুখে হুইসল পুরে ফিরিক ফিরিক করে কারণে অকারণে বাঁশি বাজিয়ে ছাড়া গরুর দল নিয়ে ট্রেনে উঠছেন ঝাড়গ্রাম কিম্বা শালবনির উদ্দেশে , সেসব ভারী প্রিয় দৃশ্য ছিল আমার । অনাগত স্বাধীনতার এই সব পুলক জাগানো কল্পনাতেই বিভোর হয়ে থাকতাম অথচ কপাল মন্দ, তেমন কোনো দূরপাল্লা'র শিকে ছিঁড়লোই না বরাতে । রাতের রেলগাড়ির স্বপ্ন ঝিক ঝিক ঝম ঝম করে ঘুমের মধ্যেই বেজে উঠত কেবল , কত দিন, কত রাত, বড় হওয়ার কষ্ট দিনলিপি জুড়ে ।
বিচ্ছেদের অফুরান আঘাতেই তৈরী হয় মিলনের অনাগত ইচ্ছে আর তার পুর্ণতাও মেলে ঠিক সময়ে । কাজেই বড় হয়ে ওঠা ইস্তক ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হলেন এবং পেশাগত ভাবে রেলগাড়ির সাথে এমন দাম্পত্য জুড়ে দিলেন যে পরবর্তী বছর পাঁচেক কাটল কেবলমাত্র এ গাড়ি, ও গাড়ি করে । ইষ্টিশনই তখন ইষ্ট-দেবতা আর রেল গাড়িতেই মোক্ষ , ঠিক ওই সময়তেই এদেশটাকে বেশ রোমাঞ্চ ভরে দেখলুম, প্রাণ ভরে প্রত্যক্ষ করলাম জীবন। কাজের প্রয়োজনে খুব ছোটাছুটি করলাম ওই ক'বছর । বিমানে তো বটেই তবে বেশিটাই ট্রেনে। সঙ্গের ব্যাগপত্তরের মধ্যে যে জিনিসটা নিতে কক্ষনো ভুলতাম না, সে হলো আমার একা, বোকা নিভৃত ডায়েরি আর পেন । আপার বার্থের মাথায় চড়ে জানলার ধারে পড়ন্ত বিকেলের মায়াবী আলোয় 'ক্যামেলিয়ার' মত সেই অপার্থিব সুন্দরী মেয়েটির মুখ দেখে দেখে গোপনে কাগজে ফুটিয়ে তোলা তার মুখের আভাস অথবা হঠাত লিখে ফেলা দু চার লাইনের রক্তাভ কবিতার মধ্যে কি যে এক পরম পাওয়া লুকিয়ে থাকত, তা রসিক মাত্রেই অনুভব করতে পারেন । শেষ দুপুরের লালচে আলোয় জানলায় ছুটে চলা মাঠ, দোলমঞ্চ, বটতলা, বাউল প্রকৃতি, পানের বরোজ , শাপলাপুকুর সব যখন পিছনদিকে ছুটে যেত নির্ভুল তখন বেপথু মন এগিয়ে যেত সামনের দিকে , অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। নাম না জানা স্টেশনটির লাল কাঁকুরে জমিতে রাঙ্গা ছোট প্লাটফর্ম এ গাড়ি যখন দাঁড়াত ক্ষণিক জিরিয়ে নিতে, মনও কি দাঁড়াত না একটুখানি ? মনে হত না , দুম করে নেমে যাই ! নিশ্চিত গন্তব্যে কি সব্বাইকে পৌঁছতেই হবে , সেই অরিন্দমের মত ? সত্যাজিয় রায়ের 'নায়ক' ছবির নায়ক অরিন্দম যেমন পৌঁছোন এক্কেবারে সঠিক স্টেশনে আর ভক্তদের আলিঙ্গনে, মালাচন্দনে ভূষিত হয়ে কালো চশমার আড়ালে লুকিয়ে নিতে পারেন , তাঁর যাবতীয় পিছনে ফেলে আসার ম্লান ইতিহাস এর স্টেশনগুলো। আমার কাছে নাহয় সেই না পাওয়ার ম্লান ইতিহাসগুলোই থাক পড়ে । বাকি সব বাক্সপত্তর, বংশপরিচয় থাক পড়ে । পড়েই থাকুক সিটের নীচে বিছানাবিলাস, আয়েশী সম্ভ্রম, থাক পড়ে দামী জুতোজোড়াটাও। আবার এই অচেনা দেশে হলুদ সর্ষে খেতের মধ্যে জীবন শুরু করি , কৃষান বালকের মত, নামগোত্রহীন দেশয়ালিদের মত ! হয় না ? ওই যে দূর থেকে দুরে টেলিগ্রাফের তার ছাড়িয়ে, ডালে ঝুলতে থাকা ফিঙের গান ছাড়িয়ে তিলমাত্র প্রদীপের মতন জ্বলছে সাদা বাড়িখানা , ঐখানে নতুন এক পরিচয়ে সংসার পাতলে কেমন হয় ? কত মানুষের তো গাড়ি ধরা হয় না চিরকাল, কত মানুষ তো ভুল করে, ভুল গাড়িতে চেপে বসেন আর পৌঁছে যান অন্য গন্তব্যে । স্টেশন ছেড়ে যাক না চলে, আমার স্মৃতি... সত্তা, আর যা কিছু ..ভবিষ্যত থাকুক কুয়াশা মেখে নিঃঝুম !....অপেক্ষা করে করে বাঁশি বাজিয়ে শেষমেষ ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাক রাতের নিশ্চিত রেলগাড়ি । কোথাও নিশ্চিত পৌঁছনোর প্রয়োজনটাই বা কি ? এমনি এমনিও তো বেড়িয়ে আসা যায় । চলুন, বেড়িয়ে আসি বরং ।