Thursday, June 23, 2016

বছর শেষের ফুল পঞ্জিকা : সাল ২০১৫ ~

বছর শেষ । এক বছরের হিসেব কিতেব খোলা খাতায় রইলো পরে, হাতে রইলো শুন্য । পাওয়ার হিসেব , হারানোর হিসেব সব যে যার, তার তার । আমি শুধু ক্যালেন্ডারের মত , খবর কাগজের পাতার মত ,লিখে রাখলুম, যা যা পড়ল মনে । হাজার হোক, এক বছরের ইতিহাস, সে তো আর চাড্ডিখানি কথা নয় রে বেল্লিক । জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বরের এই দেশ দশের কথায় অনেক ভুললাম, আপনাদের মনে থাকলে কমেন্ট করে জানাবেন, কি কি মিস কল্লুম ।
জানুয়ারী ~
বারাক ওবামা এলেন ভারতে । রিপাবলিক ডে'তে সে এক প্রবল মোচ্ছব হলো । বলি, এমনি এমনি তো নয় , এ তো রামা, শ্যামা নয় এ বামা , মানে "ওবামা " । গোটা পৃথিবীর মাথায় এঁরা নাকি কতায় কতায় হাগেন , পান থেকে চুন খসলে এঁদের একটি টুসকিতে গণতন্ত্র ছলকে ছত্তিরিশ । হ্যা, একবার ওই ওসামা না কে জানি, ওদের টুইন টাওয়ারের গজদন্তমিনারে বিমান বোমা পাঠিয়ে ইগোর প্রাসাদ সে এক্কেবারে চুরচুর করে ভেঙ্গে দিয়েছিল, সে আলাদা কথা । তবে, এ অ্যামেরিকা বলে কতা । সেই দেশের প্রেসিডেন্টকে নেমন্তন্ন করে আনলেন আর গৃহকত্তা সাজুগুজু করবেন না ,সেও কি হয় ! তাই নরেন্দ্রবাবু ঘন ঘন পোশাক বদলালেন । কমলা শালে কাশ্মীরি স্টিচ অথবা স্যুটপিসে মোদী-নামা খুদে হরফে , " ফ্যাশনহীনতায় , কে বাঁচিতে চায় রে ? " ওবামা গিন্নি অনাথ আশ্রমে ইশকুল টিশ্কুলে গিয়ে খুদেদের সাথে এট্টু নাচানাচি কল্লেন আর ওবামা ক্যালেন্ডারে " মেরা ভারত মহান" ক্যালেন্ডারে যা যা দেকতে পাওয়া যায়, সেই সব দেকলেন । কূটনীতির সম্পক্কে অবিশ্যি বিশেষ কোনো হেলদোল হলো না নিন্দুকে বলে ঠিকই , কিন্তু কানাঘুষো শোনা গেল, মোদীর ফ্যাশন ডিজাইনার ভদ্দরলোকটি নাকি বেশ দু পয়সা পিটিয়েছেন ফাঁকতালে ।
ফেব্রুয়ারী ~
ওরেবাব্বা । ১৪ তারিখে ভিক্টোরিয়ায় কোনের বেঞ্চিতে বসে ভালেন্টাইন মানাবো কি, দেশ জুড়ে সোয়াইনের বাচ্ছারা কি একটা সাংঘাতিক অসুখ ছড়ালে । বাপের জম্মে শুনিনি ফ্লু'এরও আবার কুকুর, বেড়াল, শুয়োর হয় । ফ্লু মানেই ওই নাক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ, গা জ্বর জ্বর , পাড়ার মোড়ের সলিলকাকুর অ্যালোপ্যাথি দোকান থেকে চারটে ট্যাবলেট গিললেই ঠিক হয়, আর শীতকাল হলে রাতের দিকে এট্টু রামনাম গরম জল দিয়ে...হেঁ..হেঁ , মানে বুজতেই পাচ্ছেন আর কি । তা এ যে কি সাংঘাতিক হলো সক্কলে দেখি রাস্তায় কালো মুখোশ পরে নাক, মুখ ঢেকে দৌরচ্চে ।দেশশুদ্ধু লোক রাতারাতি সব্বাই উগ্রপন্থা নিলে । ট্রেনে কুড়ি টাকায় মুখোশ বিকোলো । কে যে সোয়াইন আর কে যে ওয়াইন কিছু বোঝার আগেই প্রায় ৬০০ জান নিল এই সোয়াইন ফ্লু । শুয়োর দেকলেই লোকজন দৌড় মারছে চো চা করে । কি ভাগ্যিস নাসিরুদ্দিন শাহ "পার" ছবিটা অদ্দিনে পার করে এয়েছেন । নইলে আর শুয়োরের নাতি'দের উপায় ছিল ? ওদিকে এত ফ্লু'য়ের পরেও দিল্লিতে শেষ হাসি হাসলেন আম আদমী অরবিন্দ কেজরীওয়ালা । গলায় মাফলার ছিল বলেই বোধহয় বেঁচে গেলেন সে যাত্রা । ফেব্রুয়ারী তো এমনিতে প্রেমের মাস বলেই লোকে জানে । কিন্তু ২০১৫'৪ ফেব্রুয়ারী অন্য কথা বলল । বাংলাদেশে অভিজিত রায় নামের এক ব্লগার'কে নৃশংস ভাবে খুন করলো মৌলবাদীরা । তাঁর অপরাধ , তার মুক্ত মনের খোলা চিন্তাধারা, লেখাপত্তর । ইসলামী মৌলবাদ সেটি মোটে সাপোর্ট করেন না, তাই তাঁকে দিনদুপুরে বইমেলা মাঠে রক্তাক্ত করা হলো । সেই শুরু ।
মার্চ~
মার্চে অবিশ্যি স-ও-ব ভালো ভালো ব্যাপার হলো । একে বসন্তকাল । কোকিল ডাকছে কু-উ , কু- উ অষ্ট প্রহর । ট্রেনে বাসে, আপিসে, ক্লাসে সবার মোবাইলে এক রিংটোন । সব্বাই এট্টু ন্যাকামি মিশিয়ে বলছে "বসন্ত এসে গ্যা-চ-ছে, বসন্ত এসে গ্যা-চ-ছে ।" চতুষ্কোণ , সে 'বই' তো বেরিয়েছিল সেই আগের বছর কিন্তু দ্যাকো, ওই একটা গানের সে কি ক্রেজ । অ্যাদ্দিন আপামর বাঙালি হেদিয়ে মরছিল কেননা বসন্ত না আসা অবধি কেউ এ গানটা বুকে হাত রেকে গাইতে পারছিল না বলে , এইবার আর কোনো গোল নেই । হোলে হোলে দোলে দোলে, ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে....ধুত্তর, ওটা ব্যাক ডেটেড । লগ্নজিতা খায় না মাথায় মাখে কেউ জানে না, কিন্তু সে কি শুভ লগ্ন মায়িরি , এই গানটা সুপারহিট হয়ে গ্যালো । আরও ভালো ভালো যা হলো মার্চে , অটলবিহারী ভারতরত্ন পেলেন । ওনার পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দের কবিতাটুকু অবিশ্যি শোনা গেল না, মিডিয়া নাকি নরেন মোদী'র ফরেন ট্যুরের বাইট নিতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পরেছিল, ( আসলে ব্যাপারটা সময় সাপেক্ষ কিনা ! ) তাই অটলবাবু অতলেই রইলেন । ওদিকে বাড়ির কাছে আরশিনগর ,বাংলাদেশে আবার পরপর ব্লগার হত্যা । এবার ওয়াশিকুর রেহমান । মৌলবাদের কারবারীদের সাফ কথা ধর্ম, অধর্ম নিয়ে খোলা মনে আলোচনা করার আপনি কে বাপু ? ওসব তো কুরআন শরীফেই লেখা আছে । আপনি রনভির, দীপিকাকে নিয়ে ব্লগ লিখুন, গরম থেকে বাঁচতে গোলাপ জলের প্রয়োগ নিয়ে ব্লগ-বক করুন, কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ইমান ধরম নিয়ে কোনো কথা হবে নাকো ।
এপ্রিল ~
ও মাসটাও 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলেই' গেসলো যদ্দুর মনে পরছে । না, মানে এপ্রিল ফুলে ছাপ তো চুপচাপ অ্যাদ্দিন দিয়েই আসছিল জনতা । বোকা হওয়ার আর বাকি কি ? কিন্তু সরকার বাহাদুর যে এভাবে বোকা বানাবেন , সে কি আর জানতুম রে ভাই । বলে কিনা, এল.পি.জি'র সাবসিডি ছাড়ো । গরিব মানুষে গ্যাস পাবে । বলি, আমরা কি পেটে গামছা বেঁধে দিন কাটাব ? একে মা রাঁধে না ! তায় তপ্ত আর ... আর মাসে চাদ্দিন মাংস খাই বলে আমরা গরিব নয় কে বলেছে ? ওদিকে অমিতাভ বচ্চন, দিলীপ কুমার পদ্মবিভূষণ পেলেন , উফ, কি আনন্দ । আরও সঙ্গে সঙ্গে কারা কারাও পেলেন, তবে তাদের আর কে চেনে । অঙ্কের মাষ্টার মঞ্জুল ভার্গব , কম্পুটার বিজ্ঞানী বিজয় ভাত্কর আর স্পিরিচুয়াল গুরু স্বামী সত্যমিত্রানন্দ , আগা খান এরাও পদ্ম সম্মান পেলেন, কিন্তু আমরা বাপু ফিলিম এস্টার ছাড়া আর কাউকে চিনি না, এই বলে রাখলুম । শিবপ্রসাদ নন্দিতার নতুন ছবি বেলাশেষে রিলিস করলো এ মাসে সঙ্গে আবার সৃজিত মুখুজ্যের 'নির্বাক' ও । ওরে কাকা , সেকি নির্বাক চলচ্চিত্র মাইরি । কেউ কিসসু বুঝলো না, স-ও-ব মাথার ওপর দিয়ে ট্যান । তবে হ্যা, বেলাশেষে দেখিয়ে দিল বাঙালি সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে বেওসা করতে শিকে গ্যাছে বাংলা ছবি । এ ছবিতে নিভু নিভু শেষ বেলার দাম্পত্য একেবারে জোরদার । সেন বাবু, ঘোষ বাবুদের পছন্দের লিস্টে একেবারে গোড়ায় এ ছবি । বেলা তো শেষ হলো কিন্তু মাসের শেষের দিকে এমন যে একটি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটবে, সেরকম তো কতা ছিল না । কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটলো । নেপালে এমন মাটি কাঁপলো , সে কাঁপন একেবারে খোদ কলকাতায় বসে আমরা টের পেলুম । ভূমিকম্পে নেপাল তো হুরমুরিয়ে মাটি চাপা পড়লই, প্রকৃতির রোষ যে কি জিনিস, সে জিনিস হিল্লি দিল্লি টের পেলুম সক্কলে ।
মে ~
সে কি গরম বাপু ! কলকাতার শহরে বসে বেলুচিস্তানের মত ধু ধু, লু বইছে । গরম পিচের রাস্তায় যখন তখন জুতোর শুকতলা গলে আটকে যাচ্ছে, এমন আগুন হল্কা হাওয়ায় । সে প্রায় ৪০০ লোকের নিকেশ করলো তাপপ্রবাহ দেশ জুড়ে । আগুন জ্বললো বাংলাদেশে আবার । মোমবাতি জ্বললো আরেক ব্লগার হত্যায় । এবার মুক্ত মনের খেসারত দিলেন অনন্তবিজয় দাস । ইদিকে আগুন জ্বললো তামিলনাড়ু'তেও । জয়া আম্মা ধরা পড়লেন হিসেববিহীন সম্পত্তি রাখতে গিয়ে । বলি হতচ্ছাড়া, তোরা হিসেবের বুজিসটা কি ? হাতিশালে হাতি, আর ঘোড়া শালে ঘোড়া, এ হিসেব তো সেই রূপকথার আমল থেকে গপ্পে পড়ে এসেছি । জয়া আম্মা কি আর যে সে নেত্রী বাপু । তার হাজার হাজার শাড়ি থাকবে কয়েক'শো গাড়ি থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক । তার গয়নার হিসেব দেকলে , রামপ্রসাদেরও চোখ কপালে উঠবে , "এত গয়না ,বেটি কোথায় পেলি ?" অমন মুক্তোর মত রুপুলি পর্দার ঝকঝকে নায়িকা বলে কথা, প্রাক্তন বলে কি তার একটা 'ইয়ে' থাকবে না । বলি, সবাই কি আর তোদের পিসিমণি, যে হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে আর টালির চালের নীচে শুয়ে সস্তার সেন্টিমেন্ট-কুর্নিশ আদায় করবে দুবেলা ! বাঙালি হয়েচ মানেই ওই পটল ডাঙার ইউনিভার্সাল প্যালারাম । পেট ছাড়া আর পেটের রোগ ছাড়া তোদের আর আছেটাই বা কি ! দারোগা হওয়া তো হলনা কাজেই পেটরোগা হয়ে আর জেলুসিল খেয়ে 'ভাস্কর ব্যানার্জি' হয়েই দিন কাটাও ! এইতো, সদলবলে 'ওমিতাভ বচ্চনের' নতুন বাংলা 'বই' পিকু দেখতে গ্যালো বাঙালি, তা কি দেখলো ? সেই অম্বল আর কোষ্ঠকাঠিন্যের বাথরুম বৃত্তান্ত এবার সর্বভারতীয় মান্যতা পেল, এই আর কি। ওদিকে গোধরা কান্ডের গুজরাট কিন্তু থেমে নেই। এত্ত কান্ডের পরেও উন্নয়ন সেখানে অখন্ড । ইতিমধ্যে নরেন বাবু কিন্তু দারুন দারুন সব যোজনা, বিমা রিলিস কল্লেন ।প্রধান মন্ত্রী বিমা, জীবন জ্যোতি বিমা, অটল পেনশন যোজনা সে লিস্টি মস্তবড়, ইন্সুরেন্স তো হলো ভবিষ্যতের জন্যে, বলি এখন খাব কি ? এ তো দেখি, প্রধানমন্ত্রী মশায় প্রায় এল. আই. সি এজেন্টের মত পিছনে পড়ে গেলেন ? এটিই বোধহয় ' আচ্ছে দিনের ' , আচ্ছা প্রস্তাবনা ছিল ! বোঝো !
জুন ~
জুন মাসটা খবরের কাগজের লোকজনদের জন্যে মোটে ভালো নয়, এ জিনিস বুঝিয়েছে ২০১৫'র জুন । মম্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির জুর্ম এ সাংবাদিককে জ্যান্ত জ্বালানো হলো পুলিশের অনুপ্রেরনায় । লাখনাউ তে এ ঘটনা, একেবারে সাংঘাতিক ও সাংকেতিকও । মানে, অসহিষ্ণুতার আগুন যে কোথায় পৌঁছেছে দেশ জুড়ে , তার একটা সিগনাল দিল এই ঘটনা । মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জিলা থেকেও আরেক সাংবাদিককে অপহরণ করে খুন করা হলো, শাসকের বিরুদ্ধে মুখ খোলার অপরাধে । গণতন্ত্রের কতটা তেলে আর কতটা জলে, তা কে মাপবে ? আর সকলে জানে, তেল-জল মিশ খায় না । দুঃখের কথা, ওই সাহসী সাংবাদিক দুজন বোধহয় এটি জানতেন না । ওদিকে মনিপুরে মিলিট্যান্ট আক্রমনে গোলাগুলি চলল ব্যাপক । দু-ডজন মানুষ কমপক্ষে গত হলেন । অবিশ্যি , মনিপুর-টুর তো আবার ঠিক আমাদের অ্যাণ্টেনায় ধরা পরে না, সে'রম মেনস্ট্রিম নয় কিনা । আমরা বরং নরেন মোদী তেই ফিরে আসি । হ্যা, এইবার আমাদের 'ইয়োগা'র ' একটা হিল্লে হলো । প্রধানমন্ত্রী মশাই আমাদের 'ইয়োগা' কে পৃথিবী জুড়ে স্বীকৃতি দেওয়ার একটা বিধি ব্যবস্থা কল্লেন । বাবা রামদেব যতই এক চোখ বুজে ফোঁস ফোঁস করে পেট কুঁচকে আসন দেখান না কেন, ইন্টারনেশনাল বিশ্বসভায় 'বিশ্ব যোগ দিবস' তো আর তিনি করে ফেলতে পারলেন না , ওঁর দৌড় ওই রামলীলা ময়দান পর্যন্তই । কি বললেন ? 'যোগ' মানে 'যোগাসন' এর উপকারিতা আগেও জানতেন ? বলেন কি, মশয় ?
জুলাই ~
তব্বে ! খুব যে বলেছিলি আমরা ডিজিটাল হতে পারবনা , আজীবন অ্যানালগই থাকবো । দ্যাখ দিখি । মন্ত্রী মশাই এতদিনে ডিজিটাল ইন্ডিয়া'র উদ্বোধন কল্লেন । ফেসবুকে জনে জনে প্রোফাইল ছবিতে ডিজিটাল তেরং লাগালো। অবশ্য দমদম বস্তি'র লাগোয়া কলোনির লোকজন কিম্বা দুবরাজপুরের ওঁরাও পরিবারের অন্ত্যজদের তাতে বিশেষ কি সুবিধে হলো , সেটা ঠিক বুইতে পারিনি এখনো , তবে আশা আছে , নিশ্চই বুজে যাব খুব শিগগিরই । জুলাই মাস এমনিতেই শোকের মাস । বিশেষত বাঙালিদের কাছে, কারণ এ মাসেই উত্তম কুমার চলে গেছিলেন আমাদের মনের রুপালি পর্দা ছেড়ে । তার ওপর কালাম সাহেব ও চলে গ্যালেন এইবার । স্মরনকালের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি ও বৈজ্ঞানিক, লেখক, ও হেভিওয়েট ম্যানেজমেন্ট গুরু এপিজেকে ভালো বাসতেন না, এমন মানুষ কম । শিলং এ একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে রাখতেই নাটকীয় ভাবে শেষ হলো ওঁর জীবন । স্মরণে , বরণে কালাম থেকে যাবেন মানুষের মনে, শুধু মসনদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয় । শোকের অবিশ্যি তখনও বাকি ছিল । অন্ধ্র প্রদেশের রাজামুন্দ্রীতে তীর্থ করতে গিয়ে পায়ে চাপা পড়ে তীর্থযাত্রা সফল করলেন ২৯ জন পুন্যার্থী । ওঁদের স্বর্গপ্রাপ্তি হয়েছিল কিনা জানি না, তবে এ দেশের তীর্থস্থানগুলোতে এই ২০১৫ সালেও যদি এত অব্যবস্থা থাকে, তবে ডিজিটাল ইন্ডিয়া কার কি উপকার কল্লে, খোদায় জানেন । ওদিকে 'কোমেন' না কি সব ঝড় এসে তো উপকূলবর্তী বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে সে কি ঝড় দিলে । বৃষ্টিতে দেশকাল একেবারে ডুবুডুবু । তবে কিনা আয়লা বা ক্যাটরিনার মত যত গর্জালো, তত বর্ষায়নি কোমেন, এই যা রক্ষে । অল্পের ওপর দিয়ে বাঁচলুম আমরা ।
অগাস্ট -
আবার ব্লগার হত্যা !! বলি, এ কি চলছে ? তালিবানি নিধন যজ্ঞ ? এবার নিলয় চ্যাটার্জি ।ঢাকার বাড়িতে ঢুকে পিটিয়ে মারা হলো তাকে । সিনেমা হলে সিটি দিতে দিতে সদ্য মুক্তি পাওয়া ব্লকবাস্টার বাহুবলির শিব উপড়ে ফেলা দেখতে দেখতে সুচিন্তিত দু- চারটে সিটি দিতে তো কেউ ছাড়লে না, কিন্তু পড়শি দেশের বুক থেকে আতঙ্কের এই বাজার নিয়ে তো কেউ দু- চার শব্দ কয় না দেখি । এমন কি পড়শি কেন , এ দেশেই প্রখ্যাত কন্নর লেখক ডক্টর এম.এম.কালবুর্গি কে বাড়িতে ঢুকে বুলেট বিঁধিয়ে দিল অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা । মৌলবাদ তাহলে এ দেশেও ঘাঁটি গেড়েছে গোপনে গোপনে, শুধু রংএর কল্যানে আপনেরা 'জানতি পারেন নি' । সবুজ আতঙ্ক, আতঙ্ক আর গেরুয়া অত্যাচার , আতঙ্ক নয় ? সেক্ষেত্রে মোমবাতি মিছিলেই কাজ সারা ? অগাস্টে যখন এসে গিয়েছেন আরেক ভাইজান, যিনি কিনা বাজরাঙ্গি'র মতই বাহুর বলে বলীয়ান এবং যার সাদা মনেও এতটুকুন কাদা নেই, তিনি স্বনাম ধন্য সালমান খান । হাসতে হাসতে সাজা প্রাপ্ত কেসের আসামী সিনেমার দৌলতে ক্যামন 'হিউম্যান' হয়ে উঠলেন , বলুন দিকি । মাঝরাতে মদ্যপ হয়ে ফুটপাতে গরিব মানুষের বুকের ওপর গাড়ি চাপিয়ে দিলেই বা কি, এমন ব্লকবাস্টার তো তোরা রোজ রোজ দিতে পারিস না । কাজেই, গরিবের কিবা দিন, কিবা রাত , বেঁচে থাকুক ষ্টারডম । সত্যমেব জয়তে ( ইতি বি.আর.চোপড়ার টিভি সিরিয়ালে ) । দু দুটো সুপার হিটের বাজার সামলাতে সামলাতে চুপচাপ গুটি কয়েক ছবিঘরে মুক্তি পেল তসলিমা নাসরিনের জীবন আশ্রয় করে বানানো ছবি 'নির্বাসিত' । আমরা তো আমাদের শুভ বুদ্ধিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছি আগেই, তাই ও নিয়ে আমাদের বাপু বিশেষ মাথাব্যথা ছিলনা । ও বলতে ভুলে গেছি, চুলচেরা অপারেশনে দেশ থেকে জনা চার উগ্রপন্থী এই মাসে ধরা পরেছে পুলিসের জালে ।
সেপ্টেম্বর ~
দুগ্গাপুজোর বাজনা বেজে গ্যাছে । বাঙালির আর নিশ্বাস ফেলার জো নেই । তবে ভূ-ভারতের তো আরও অন্য কাজও আছে রে বাপু । এই যে রেল কতৃপক্ষ, গুগলের সাথে গাঁট ছড়া বেঁধে দেশ জুড়ে ৪০০ স্টেশনে ফ্রি'তে ওয়াই-ফাই দিলে সেপ্টেম্বরের গোড়ায়, সে কথাটা এবলা বলে দেওয়া যাক । স্মার্ট ফোনের দৌলতে সক্কলে পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে পাশাপাশি ফোনের বোতাম টিপে নেটে ঘেঁটে দেখছেন, শুধু কেউ কারোর সাথে কথা কইছেন না , এ দৃশ্য দেখার জন্যে আমাদের এমন অনেক বিপ্লব সহ্য করতে হবে ভদ্রমহদয় গণ । এই যে মানুষে মানুষে শুধু ফোন আর চ্যাটে কথা কয় , এ বড় সুসময় । আমরা প্রায় 'ষ্টার ওয়ারস' এর কাছাকাছি চলে এসেছি । যন্তর ছাড়া কথাবার্তা প্রায় বন্ধর দিকে । তবু হাজার হোক, বছরের ক্যালেন্ডারে এইটে একটা বড় সংযোজন । গুগলের মত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষ পদে বসলেন আমাদের 'সুন্দর পিচাই' । এর থেকে সুন্দর আর কিই বা হতে পারে । ভারতীয় হিসেবে আমাদের আজ আল্হাদে গদগদ অবস্থা , কিন্তু আদপেই এই সন্মান দেশের জন্যে কতটা উপকারী সেইটেই দেখার, দেখা যাক কোথাকার জল কদ্দুর গড়ায় ! ওহ বলতে ভুলে গিয়েছি, আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে এখন লন্ডনের বিগ বেন ঘড়ি বিশ্বে দুটি । একটি, ওই..মানে, লন্ডনেই আরেকটি হেঁ...হেঁ, খোদ কলকেতার বুকে লেক টাউনে । একদিন দেকেই আসুন না, কেমন ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজছে ঘন্টায় ঘন্টায় , আর আমরা আন্তর্জাতিক বাঙালি হচ্ছি । কানাঘুষো শুনলাম লন্ডন এর পরে এবার শহরটাকে প্যারিস বানাতেও মুখ্যমন্ত্রী কসুর করবেন না । এদিকে দেশ কতটা আন্তর্জাতিক হলো তার নিরিখে আরেকটি খবর না বললেই নয় । শুনে আপনি খুব আনন্দ পাবেন, নিয্যস বলছি, উত্তর প্রদেশের দাদরি'তে ফ্রিজে গোমাংস রাখার 'অপরাধে' ৫২ বছর বয়সী প্রৌড় মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে খুন করেছেন কে অথবা কারা । এ দেশে মানুষের চেয়ে এখন 'গরুর' দাম বেশি, জানেন তো ?
অক্টোবর ~
ঢাকের আওয়াজ বেজে গেলে বাঙালির আর মাথার ঠিক থাকে না , এই সাফ বলে দিলুম । পুজো নিয়ে আমরা হেব্বি বিজি এখন । দিদি ভুটান থেকে ফিরেই রাজ্যের সব ক্লাবকে লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে সার্বজনীন দুগ্যত্সবের পিদিম জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেছেন । নীল আর সাদা রঙ্গে প্রতিমা রং করতে পারলে আবার সে পুজোর সমস্ত খরচ ট্যাক্স ফ্রী । তবেই বুঝুন । আপনারা বাড়ি, গাড়ি , শাড়ি যা পাচ্ছেন এবলা নীল সাদা রং করে ফেলুন দিকি । দিদির পছন্দ তালিকায় আপনি থাকবেন সবার ওপরে । এবার কলকাতায় পুজো একটু টিমটিমে ঠিক ই , হাজার হোক সারদা কান্ডের পরে বাজেটের হেভি টান , পাবলিকের টাকায় মোচ্ছব না হলে , আর কিসের মজা রে ভাই ! চাঁদায় কি ওসব হয় ? এর মধ্যেই সৃজিতের হেবিওয়েট রাজকাহিনী রিলিস হলো পুজোর মুখে । সে, দেশ ভাগ আর মেয়ে মানুষ নিয়ে কিসব টানাহেঁচরা ছবি ভাই । ইতিহাস, টিতিহাস বুঝি না , মোদ্দা কথা, অনেকগুলো আদুর গায়ের মেয়ে দেখিয়েছে, এইটেই বড় প্রাপ্তি । দুঃখ একটাই দাদা, এ সমস্ত আমাদের সবার 'কাছের মানুষ, কাজের মানুষ ' মদনদা দেখে যেতে পারছেন না । ভদ্দরনোক'কে নাহক লাস্ট এক বছর ধরে ধরপাকর করে সি.বি.আই কি অত্যাচারটাই না চালাচ্ছে । একবার হাসপাতাল, একবার জেলখানা আর মাঝের সময়টুকু কোর্টের এজলাসেই ওঁর এ বছরটা গেল । 'চিরদিন, কাহার সমান নাহি যায় ', আহারে !
নভেম্বর ~
ওরেবব্বা , কি বৃষ্টিটাই না হলো চেন্নাইতে । যে দেশে গড় বৃষ্টিপাত সাধারণের নিচে, সেখানে উপর্যুপরি বৃষ্টিতে এক মাস ধরে চেন্নাই এর সে এক সাংঘাতিক বেহাল হলো । ২০১৫ সাল চেন্নাইবাসী মনে রাখবেন আজীবন । ঘর, বাড়ি, দোকানপাট, রেল লাইন, মায় বিমানবন্দর ডুবে গিয়ে সে এক কেঁচে গন্ডুষ অবস্থা । সেরে উঠতে চেন্নাই এর সময় লাগবে বেশ কিছুদিন । এর মধ্যে দেশ জুড়ে আবার নতুন কেলো, সব শিল্পী, সাহিত্যিক , বৈজ্ঞানিক সকলে মিলে গভীর ষর করে সরকার কে নাগাড়ে সব পুরস্কার ফেরত দিলে শুরু কল্লো । আমির খান তো আবার এক ধাপ এগিয়ে , বলে কিনা বউ বলছে, দেশ ছেড়ে চলে যাব, এত ভয় কচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি । বলি, এত যখন ইচ্ছে, যা না বাপু, পাকিস্তানে গিয়ে থাক । তোদের এ দেশে কে হিরো করেছে রে ? খাচ্ছিস, দাচ্চিস, হিরো হচ্ছিস , সে সব তো পাবলিকের পয়সায় তা আবার অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে 'পতিবাদ ' !!! যত্তসব ! কিসের অসহিষ্ণু রে ! রামরাজ্যে বসে গোমাংস খেয়েছে, পিটিয়ে মেরেছি, তার আবার অসহিষ্ণু কি ? যেখানে যেখানে হিন্দুত্বর খাতা থেকে ইদিক ওদিক বেচাল দেকবো, আমরা ছেড়ে কতা কইবো না । লোকের হেঁসেলে ঢুকব, বেডরুমে ঢুকব, বাথরুমে ঢুকব, সর্বত্র আমাদের লম্বা হাত । কাউকে ছেড়ে দেব না আমরা । সে তুমি যতই রঙের খোঁটা দাও, আমি শাহরুখ খানের মত দুদিকে হাত ছড়িয়ে বলবই বলব, 'মোহে রং দে তু গেরুয়া ' । গেরুয়ার এমনি প্রভাব , বাবা । অবিশ্যি দিদিমনি বলেছেন গুলাম আলী আর কোত্থাও না হোক, আমাদের শহরে গাইতেই পারেন । আমরা যাকে বলে, ইয়ে..মানে সেকুলার আর কি ।
ডিসেম্বর ~
এমাসটা টোটাল খিল্লির মাস । ঠান্ডা পরেছে জমিয়ে । নাহম'স এর কেক খান , এট্টু আধটু সন্ধ্যের পর চোখ লাল হোক । ভিড় বারুক ইকো, নিকো সব পার্কে। শাহরুখ, কাজল ২০ বছর পরে একসাথে ফিলিম করেছে 'দিলোয়ালে' ওদিকে আবার সঞ্জয়, লীলা দেখিয়েছেন বাজীরাও মস্তানি'তে কত বছর বাদে । কাকে ছেড়ে কাকে ধরি । দীপিকা, প্রিয়াঙ্কা, কাজল ঠান্ডায় সব গরম গরম গ্ল্যামার । এ মাসটায় শুরুর দিকেই ভারত পাক সম্পর্কে অমনি অনেক গরম গরম আতিথ্যের আঁচ পাওয়া গেল , কেউ বলছেন বরফ গলছে, কেউ বলছেন , রোসো বাপু , আগে দ্যাখো কদ্দুর কি হয় । মোদী সাহেব নওয়াজ কে দেখতে পেলেই জড়িয়ে ধরছেন, এমনকি নাতনির বিয়ে অব্দি খেয়ে এলেন ভরপেট আড্ডা মেরে । ওদিকে সুষমা স্বরাজও চোস্ত উর্দুতে কথা বলে নায়াজের মায়ের মন জিতে নিলেন, এ সব বড় আনন্দের কতা । শুধু কষ্ট হয় ওই বর্ডারে নিত্যি গোলাগুলিতে দুই দেশের যে নিরপরাধ প্রাণগুলি চলে যাচ্ছে, তাদের জন্যে । রাজায় রাজায় তো গলায় গলায় ভাব দেখছি, কিন্তু উলুখাগড়া ? ওদিকে সমকামিতা আইনে সংশোধন আনতে সুপারিশ দিয়েছেন শশী থারুর । তাই নিয়ে আবার কংগ্রেসের অন্দরমহলেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া । একে রামে রক্ষে নেই, তায় সুগ্রীব দোসর । তবে আজকাল আর কিছু থাকুক না থাকুক, স্মার্ট ও সময়োপযোগী হতে হলে, আপনাকে দুটি জিনিস করতে হবে, এক , সেলফি তুলতে হবে, ভেটকি মাছের মত ঠোঁট উল্টে আর দুই , সেম সেক্স এর একটি পার্টনার যোগার করে ফেসবুকে ছাপাতে হবে সেই যুগান্তকারী খপর । ব্যাস, আপনাকে আর পায় কে ? লাইকের বন্যা বইবে , সে আপনি সমকামী হোন ছাই নাই হোন, ট্রেন্ডি তো হলেন , নাকি !

আরশিনগর : চিত্র আলোচনা

বিঃ দ্রঃ : অনিবার্য কারণবশতঃ আরশিনগর ছবির কোনো রকম রিভিউ দেওয়া গেল না ।
......................................................
ভেবেছিলাম, এইরকমটাই লিখবো । কেননা, যাঁর ছবি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি , যাঁকে সুন্দরী নায়িকা ছাড়াও সংবেদনশীল পরিচালক হিসেবে বহুবার পেয়েছি , যাঁর কাজের ধারে ও ভারে তার মেধা ও প্রজ্ঞা নিয়ে এতটুকু সংশয় কোনদিন হয়নি, সেই অপর্ণা সেনের সাম্প্রতিক ছবি 'আরশিনগর ' দেখে এসে এতখানি হতাশ হয়েছি, সে অভিজ্ঞতা লিখতেও যারপরনাই কষ্ট হবে, কেননা পরিচালকের নাম 'অপর্ণা সেন '। বিশ্বাস করুন, ঋতুপর্ণ ঘোষের অকালশুন্যতায় এবং অনুপস্তিথিতে যদি একটিই নাম মনে পরে, তিনি অপর্ণা । বাংলা ছবিতে তাঁর কাজের সংবেদন নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না । অপর্ণার লেখার হাত ও ছবি পরিচালনায় একের পর এক মাইলস্টোন তাঁর ছবিকে এমন এক উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে যেখানে প্রত্যাশিত ভাবেই প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে । বিশেষত 'গয়নার বাক্স'র মত চমকপ্রদ ক্লাসিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর শেষ ছবিও তেমনটাই চমৎকার , যেমনটি অপর্ণার ক্ষেত্রে এ যাবৎ হয়ে এসেছে , কিন্তু কেন এই 'আরশিনগর ' ? এ কোন অপর্ণা ?
সাম্প্রদায়িক প্রেমের এই হিন্দু মুসলিম গপ্পে প্রতিটি চরিত্র একবারে পিকচার পোস্টকার্ডের মতই নিখুঁতভাবে সাজেন । এঁদের পোশাক আশাক, আদব কায়দা অবিশ্বাস্য রকম চড়া ও প্রতীকী , ঠিক যেন ঠিয়েটার। হিন্দু হলেই সিঁদুর, চাদর, মন্দির আর মুসলমান হলেই দাড়ি, টুপি, নমাজ ? বস্তির লোক মানেই ঝি , চাকর, আর ইস্ত্রীওয়ালা এবং ততোধিক স্বপন সাহা সুলভ সরলীকৃত ভ্যাদভ্যাদে আবেগে বস্তি উচ্ছেদ ও শপিংমল নির্মানের প্রটোটাইপ রাজনীতি ! রাজনৈতিক নেতা মানেই ঘুষখোর এবং সাংঘাতিক দুর্নীতিগ্রস্ত এবং উঠতে বসতে কালো টাকার কারবারীদের থেকে পার্সেন্টেজ নিয়ে দর কষাকষি ও বস্তুত সাধারণ মানুষের ঘর কেটে পুকুর চুরি ! প্রোমোটার মানেই তোলাবাজ অতএব গলায় সোনার চেন ও হাতে পিস্তল ! প্রেমিক মানেই আগমার্কা রোমিও ! বিশেষত 'রোমিও'র 'হোমিও' ( পড়ুন দেশীয় ) অবতার মানেই মাথায় ঝুঁটি ও কাঁধে গিটার নিয়ে 'ব্যান্ড' বাজাও হোমেযজ্ঞে না লাগা দুষ্কৃতি বাপের সুপুত্তুর ছেলে 'প্রেমিক রনো' । 'জুলিয়েট' মানেই প্রায় মধ্যযুগীয় মানসিকতার মুসলমান বাড়ির মেয়ে জুলেখা যে বন্ধুদের সাথে ডিস্কোথেকেও যায় মাথায় 'হিজাব' চড়িয়ে ! আর 'আরশিনগর ' মানেই, এই সাররিয়াল শহরের বস্তি থেকে রাজবাড়ি, গলি থেকে রাজপথ সর্বত্র ঝিকিমিকি 'আরশি' ফিট করা যেখানে নিজেদের আত্মস্বরূপ দেখছেন সকলেই , শুধু কোন সময়ের গপ্প এটা, সেইটে ধরা যাচ্ছে না মোটেই। এইসব চিরপরিচিত আশির দশকের ক্লিশে নিয়ে ইসে মানে .... ছবি করছেন অপর্ণা , ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল !
এ ছবির স্টারকাস্ট একবার মন দিয়ে লক্ষ করুন । কে কে আছেন ? বলুন , কে নেই ? শুধু 'মিষ্টি প্রেমের' হ্যান্ডসাম নায়ক 'দেব' না নবাগতা রূপসী দুষ্টুমিষ্টি 'ঋত্বিকা' নয়, যে নামজাদা অনসম্বল চরিত্রদের নিয়ে অপর্ণা বারবার কাজ করেন , সেই চেনা কৌশিক, রুপা, অপরাজিতা, শান্তিলাল , কমলেশ্বর , শুভাশিস, পরান, অনিন্দ্য, যিশু, শঙ্কর, জয়া শীল'রাও তাদের সুন্দর অভিনয় দিয়ে শেষ অবধি এ ছবি বাঁচাতে পারেন নি । আর ওয়াহিদা রেহমান ! ওঁর মতন এক অসামান্য অভিনেত্রীকে ঠিক কেনই বা নেওয়া হলো, কিই বা করানো হলো বোধগম্য হয়নি একফোঁটাও। রোমান্টিক দেবকে ঠিক সেটাই করতে হয়েছে যেটা তিনি তাঁর বাজার চলতি স-ও-ব ছবিতেই করেন । গোটা ছবি জুড়ে হয় গান নয় মারপিট, অভিনয়ের বিশেষ সুযোগ ওঁর ছিল না । ঋত্বিকা ছিপছিপে শরীর আর পাখির মত কন্ঠস্বর নিয়ে জুলিকে নায়িকাসুলভ বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছেন । গ্যাংযুদ্ধে কাজল পরা চোখের 'তায়াব' রুপী যীশু, নেগেটিভ চরিত্রে চোখ টেনেছেন , তবে অনেকের চেয়ে অনেক বেশি চোখ টেনেছেন চরিতাভিনেত্রী স্বাগতা মুখার্জি । ছোট পর্দার খল চরিত্রে খোলতাই অভিনয়ে চেনা মুখ স্বাগতা এ ছবিতে অনেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন এবং যথাসাধ্য ভালো কাজ করেছেনও ।
এ ছবি দেখতে গিয়ে খুব চেষ্টা করলাম, রীতিমত অপেক্ষাও যে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত ভালো কিছু দেখব। কিন্তু হাহতোস্মি । দুর্বোধ্য সাংকেতিক স্টাইলরোপিত এ ছবির সর্বত্র শুধুই হরেকরকম পরীক্ষার ছাপ যা ছবিটাকে কালচার খিচুড়ি ছাড়া আর কিছুই বানাতে পারেনি ।তাই এ মুহুর্তে যাকে মনে হলো শেখকবির 'মিড সামারস নাইট ড্রিম' এর বাংলা অনুভব যেখানে সমাজের আলাদা আলাদা স্তরের মানুষেরা 'দ্যাখ না দ্যাখ' কথায় কথায় চড়ারকম বৃন্দগানসুলভ নাচগানের মাধ্যমে তাদের রাগ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ, প্রেম ইত্যাদি বর্ণনা করছেন পরমুহুর্তেই আবার সেটি মনে হলো কোনো "মিউসিকাল" বা সাঙ্গীতিক অপেরাটাইপ অর্থাত নায়ক নায়িকা কথায় কথায় গান গাইচেন , কিম্বা ছড়া মিলিয়ে মিলিয়ে কথা বলছেন অবিকল থিয়েটারি ভঙ্গিতে। সেটের কাজও তথৈবচ । বাড়ির ফার্নিচার সকলই দেওয়ালে আঁকা ছবি ও আদ্যিকালের বাংলা ছবির মত কার্ডবোর্ডে আঁকা আকাশ ও শহর । এ সমস্ত গজব রকম কাঁচা কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে দেখিয়ে আর এতরকম নাটুকে প্রতীক জুড়ে জুড়ে শেক্সপিয়ার সাহেবের কালজয়ী ক্লাসিক 'রোমিও জুলিয়েট' কে দেশকাল ভেদে একালষেঁড়ে একটা শিশুবোধ্য বাংলা গপ্পের পোশাক পরিয়ে , বেশকিছু থিয়েটার এবং অপেরাসুলভ প্রতীকি চিহ্ন টিহ্ন দিয়ে , আদপে যেটা বানানো হলো, সেটি হলো ওই যাকে বলে গিয়ে 'দেব এর 'বই ' । না, অভিনেতা দেবকে আমি কোনো অংশে ছোট করছি না , তবে ছবিকে 'বই' বলার অর্থে এক বিশেষ শ্রেনীর দর্শকের রেফারেন্স এই কারণেই দেওয়া হলো, যাদের কাছে ভালো সিনেমা নয়, 'ঝাড়পিট' অথবা 'গরমাগরম' রোমান্সে, নাচে, গানে, একশনে ভরপুর ,'বই' দেখতে যাওয়াটা হপ্তাশেষের শ্রেষ্ঠ বিনোদন । সেই বিনোদনী চাহিদাও যদি এ ছবি পূর্ণ করতো সৎভাবে , তবেও হয়ত শেষ অবধি পরিচালকের মুন্সিয়ানা নিয়ে প্রশ্ন উঠত না । প্রশ্ন উঠছে এইকারণেই , কেননা ছবিটি কোনো নির্দিষ্ট ধারা কিম্বা রীতিতেই সৎ নয় ! কেনই বা অসম্ভব চেনা এই গল্প নিয়ে অত্যন্ত খারাপ চিত্রনাট্যে , দুর্বোধ্য 'লালন ফকিরি' দর্শন দেখানোর এই অপচেষ্টা ? কেনই বা শেষ অবধি সেই ধুমধারাক্কা খুনখারাপি এবং ছুরি চাকু বন্দুকে এক্কেবারে ষোলো আনা 'বাংলা' মারপিটে প্রায় হলিউডি 'ম্যাট্রিক্স' আর 'পরান যায় জ্বলিয়া রে'র মাঝামাঝি একটা দোআঁশলা কিছু তৈরী করার ফিকির ? ক্যামেরার কাজ বা স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত চোখকে যেমন ভারাক্রান্ত করে, মনকে তেমনি করে ক্লান্ত । দেবজ্যোতি মিশ্রের সুর সুফিতে শুনতে বেশ ভালো তবে তার সাথে ধরতাই দেওয়া ওই কান ফাটানো ব্যান্ডের গানগুলো ? অবিশ্বাস্য রকম খারাপ ।
মোদ্দা কথা আরশিনগর একটি আদ্যন্ত ধোঁয়াটে 'সাররিয়াল' শেক্সপিরিয়ান আখ্যানের আধাকাঁচা ইন্টারপ্রিটেশন । তবে হ্যা, আরশিনগরে দুটি জিনিস শুধু ভালো । এক, পার্বতী বাউলের দুটো মনকাড়া গান আর দুই ক্যারামেল ফ্লেভার্ড পপকর্ন । ওই দুটির অনুপান ছাড়া এ ছবি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে, নিশ্চিত থাকুন ।

আহা, আজি এ বসন্তে

ফ্ল্যাটের পুবদিকের জানলাটা থেকে সূর্যের আলো বেশ মসৃন একখানা আলোর রাস্তা তৈরী করে ছড়িয়ে পরেছে খাটের পায়ের দিকটায়। অনেকটা রেশমের কুচির মতন চিকচিক করছে ধুলো, ওই আলোর রশ্মির মধ্যেখানটায়। ঘরদোর এলোমেলো ,লন্ডভন্ড। খাটের ওপর ইতস্তত নানা মাপের ইস্কুলের জামা, প্যান্ট ,ভেজা তোয়ালে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছত্তিরিশ। টেবিলের ওপর আধ-খাওয়া ম্যাগির প্লেটের ওপর অনেকক্ষণ থেকে একটা মাছি টার্গেট করে ভনভন করে উড়ছে । মোবাইলে বাজছে বিশু পাগলের গান, " কে সে আমার স্বপনতরীর নেয়ে ? "...শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী তুনীরের খুব প্রিয়। গিন্নি সকাল সকাল বাড়ি না থাকলেই সেদিন এইটা ও চালাবেই। ঝিনুক খুব রেগে যায়, বকবক করতেই থাকে ,"খালি একটাই নাটক তোমায় শুনতেই হবে হাজার বার, যত্তসব !" ছোটবেলায় বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী টলি ছিল, এ বাড়ি , ও বাড়ি শিফট করতে করতে সব গেছে । তাই এখন মোবাইলই ভরসা। একটা গোল্ড ফ্লেক কিংসাইজ ধরিয়ে তুনীর বালিশে আধশোয়া হয়ে শুয়ে , ঢুলু ঢুলু চোখে এক কাপ সোনালী লাল মকাইবাড়িতে চুমুক মারছে সুরুত সুরুত করে আর আড় চোখে মেপে নিচ্ছে ব্যালকনি থেকে সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছের মগডালে বসা কোকিলটাকে। ব্যাটাচ্ছেলে সকাল থেকে ডেকে ডেকে একেবারে গলা চিরে দিলে। সিগারেটের শেষ টানটা বুক ভরে নিয়ে কুতকুতে চোখে একটা প্রমান সাইজের রিং হাওয়ায় ছেড়ে তুনীর ভাবছিল, আহ, আজ অফিসটা যদি ডুব মারা যেত ! এমন একটা দিব্যি টোটাল বসন্ত দিন কি রোজ রোজ আসে রে ভাই! ছেলেকে বগলদাবা করে বউ গেছে ইস্কুলে। আজ ওদের ধ্বজাপুজো।...এই সেরেছে, মাথা থেকে রক্তকরবীর বীজ আর যাচ্ছে না দেকচি, আই মিন আজ ওদের সেকেন্ড টার্মের শেষ দিন।তবে হ্যাপা যা , তাতে ধ্বজাপুজো কথাটা খুব খারাপ যে বলেনি, সেটা মনে করে একা একাই ফিকফিক করে খানিক হেসে নিল তুনীর। হাজার হোক তুনীরের ছোটবেলায় তো আর ওসব ছিল না, পরীক্ষা বলতে ছিল হাফ ইয়ারলি আর মার্চ মাসের অ্যানুয়াল পরীক্ষা। আলুসেদ্ধ দিয়ে গরম ফ্যানভাত একটুকরো কাঁচা লঙ্কা দিয়ে হাপুস হুপুস করে মুখের মধ্যে চালান করে গজলক্ষী টেলার্সের প্লাস্টিকের প্যাকেটে খবর কাগজের মলাট দেওয়া কোণা ভাঙ্গা বোর্ড আর পেন পেন্সিল স্কেল নিয়ে রওয়ানা দিত ওরা ইস্কুলের দিকে। বেরোনোর সময়ে বাড়িশুদ্ধ লোককে পেন্নাম করে ঠাকুমার হাতের দইয়ের ফোঁটা কপালে লাগিয়ে দরজার ওপরে সরস্বতীর ক্যালেন্ডারের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে নিয়ে বুক ঢিপ ঢিপ প্রনাম ঠুকেই, সাইকেল নিয়ে দে ছুট। সেসব পাস্ট আজ। আজকাল দুর্ধর্ষ দুশমন যেসব ইংরিজি কনভেন্টে খোকারা খুকুরা পড়াশোনা করে সেখেনে টার্ম আছে, ফাস্ট হোক, সেকেন্ড হোক, অ্যাসেসমেন্ট আছে, কিন্তু ওসব অসভ্যের মত হাফ ইয়ারলি, আনুয়ালির ইয়ার্কি নেই।কালকেও যথারীতি বাড়ি ফিরে রাত্তির নটার সময়েও মিরাক্কেল ছেড়েই ব্যাজার মুখে তুনীর বসেছে পাবলোর জি.কে.টা নিয়ে। রান্নাঘর থেকে পাস্তাতে সস ঢালতে ঢালতে তখনও ঝিনুক চিল্লিয়ে যাচ্ছিল," বুঝলে না তো কিছু, ছেলে গোল্লায় গেলে তারপর বুঝবে ! সবার বাবারা দিনরাত পড়াচ্ছে, এসব কনভেন্ট থেকে কম মার্কস পেলে ওরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় ! ক্লাস টু'তে আর উঠতে হবে না ছেলেকে ! সেসব চিন্তা আছে ? অসভ্য লোক কোথাকার ! সারাদিন অফিস আর কেউ করে না, আত্রেয়র বাবাকে দ্যাখো, সুস্মিতার বরকে দেখে শেখো......".ঝনঝন, কনকন, ভনভন, ইত্যাদি, ইত্যাদি। ..হাজার হাজার ক্যাকফনির মাঝে পাবলোর জি.কে শিকেয় উঠলো আর তুনীর রনে ভঙ্গ ! পারলে সারারাত পাবলোকে পড়াত ঝিনুক ! ভোর হতে না হতেই নড়া ধরে ঘুমন্ত ছেলেটাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে এগ্জাম দেওয়াতে। তবে রক্ষে এইযে, গল্পটা আজ এখানেই শেষ। ক্লাস টুতে ছেলে উঠুক না উঠুক, তুনীর আজ বুক ভরে নিশ্বাস নেবে।ওর পরীক্ষা শেষ আজ।
চায়ের কাপটা ছেড়ে খবরের কাগজটা টানতে গিয়ে চোখে পড়ল খাটের মাথার কাছে রাখা সাইডটেবলে ঝিনুক আর ওর একসাথে ছবিটা। পাবলো তখন একরত্তি, বছর দুয়েক। ডোরাকাটা অ্যানিম্যাল প্রিন্টের সোয়েটার পরা তুলোর পুতুলের মতন ছেলেটাকে কোলে নিয়ে তুনীর, এক হাতে ব্যাগপত্তর, কাঁধে জলের বোতল আর মহারানীর মত পোজ দিয়ে চোখে একটা আর মাথার ওপরে আরো একটা সানগ্লাস চাপিয়ে ফুরফুরে সমুদ্র নীল শিফন পরে ঝিনুক। দিব্য ছবিটা। পাবলো হওয়ার পরের বছর সিকিমে তোলা। ব্যাকগ্রাউন্ডে ওই কি জানি নাম, ভুলে গেছি , বুদ্ধিস্ট মনেস্ট্রিটা। দিনগুলো কি দ্রুতই যে কেটে গেল। ঝিনুকের সাথে ওর দাম্পত্যটাও কি রকম যেন বদলে গেল। পাবলো আসার পর ঝিনুক, শুধুই পাবলোর মা আর তুনীর পাবলোর বাবা।ঠিক আর পাঁচজন মা যেমন হয় ; আর পাঁচজন বাবাকে শাপশাপান্ত করতে করতে, পাঁউরুটিতে মাখন লাগাতে লাগাতে আর দড়ি তে কাপড় মেলতে মেলতে যেমন দিন কাটে, ঠিক সেইরকম। অথচ , বসন্ত একদিন আমাদের ও আসিলো রে ভাই! সেই বিয়ের পরদিন দমদমের পুরনো বাড়ির দেড়তলার মেজানিন ফ্লোরের যে ঘরটায় বরাদ্দ হয়েছিল ওদের থাকার ব্যবস্থা, সেখানে ঢুকে ঝিনুকের সে কি কান্না। চন্দন টন্ডন ঘেঁটে নাকের ডগায় চশমাটা সেট করতে করতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঝিনুকের সেই কান্না দেখে তুনীর তো কিংকর্তব্যবিমুড়। আসলে, বাপ মা মরা ছেলে তো ! সেদিন বুঝতেই পারেনি, ঠিক কি করলে ওর নতুন বউটি একটু ঠান্ডা হবে, শান্তি পাবে ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবনায় সে একেবারে দিশেহারা অবস্থা। আসলে বিয়ের পর পর যা হয় আর কি , একে অনভিজ্ঞ , তার ওপর একটা গোটা মেয়েমানুষ আমার সঙ্গে থাকবে এই কথাটা ভাবলেই কেমন হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যায়। ব্যাচেলর জীবন একরকম । এখন সব্বখন ছমছম, ঝমঝম, ঠুং ঠাং চুড়ির আওয়াজ আর ঘর জুড়ে কেমন জানি একটা ছমছমে মিষ্টি গন্ধ চলে ফিরে বেড়াবে । মা'য়ের চলে যাওয়ার পর ওই গন্ধটা আর কোনদিনও পেতোনা তুনীর। তাই বিয়ের পরের কটা দিন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন ব্যাপার স্যাপার। বাথরুমে ঢুকলেই চোখে পরত আয়নার গায়ে লাগানো সবুজ টিপ আর স্নানঘর জুড়ে কি একটা নাম না জানা শ্যাম্পু আর সাবানের মন কেমন করা একটা ফুরফুরে গন্ধ। ঝিনুক স্নান সেরে বেরোতো আর তুনীর বই ফাঁক করে আড় চোখে মেপে নিত একটু একটু করে ওর সুন্দরী বউটিকে।ঘাড় থেকে আলগোছে জড়ানো আধভেজা চুলে তখনও লেগে থাকা ফোঁটা ফোঁটা জল, আর সিঁথি থেকে ধুয়ে যাওয়া লালচে সিঁদুর ছড়িয়ে পরা কপালে ঝিনুককে যেন আরো সুন্দর করে দিত। শাড়িটা কোনক্রমে জড়িয়ে নিয়েই ঝিনুক রাগী চোখে তাকাত তুনিরের দিকে আর তুনীরের চোখ সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের পাতায়, ভিজে বেড়ালটি । যেন, কত ভালো ছেলে। ভাজা মাছ উল্টে খেতে উনি মোটেও শেখেননি ! এই সাইলেন্ট খেলাটা চলেছিল অনেকদিন, পাবলো হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর অবধিও। তখন ও জীবনে বসন্ত ছিল। তারপরে কবে জানি সব ফিকে হয়ে গেল। শুধুই মেমোরিজ ইন মার্চ !
আসলে জীবনে প্রায়োরিটি অনেককিছু বদলে দেয়। পাবলোর বড় হওয়া, স্কুল, অ্যাডমিশন, নতুন ফ্ল্যাট কেনা, ব্যাঙ্কের লোন, দমদমের বাড়ি ছেড়ে শিফট করা, অনেকগুলো জরুরি কাজের ভিড়ে অনেকগুলো বছর জাস্ট জলের মতন ভেসে গেল, তাই সম্পর্কের অ্যালবামের পুরনো ছবির মতই রংগুলো যেন অনেকটা ফিকে লাগছিল আজ। কলিং বেলের আওয়াজে সম্বিত ফিরল তুনীরের । রান্নার মাসি চলে এসেছে । ওরেব্বাবা, তার মানে সাড়ে নটা বেজে গেছে। আজ কপালে দুঃখ আছে।দরজাটা খুলে দিয়েই ঝিনুকের পাখি পড়া শেখানো বুলির মত তুনীর বলে গ্যালো, ফ্রিজে কালকের ভেন্ডি কাটা আছে, ওগুলো দিয়ে চচ্চরী হবে, পোনা মাছটা একটু ভিনিগার দিয়ে বরফ ছাড়িয়ে সর্ষে দিয়ে কোরো আর মুসুর ডাল আছেই আগের দিনের, গরম করে দিও। লাফ দিয়ে বাথরুমে ঢুকতেই শুনতে পেল তুনীর, মোবাইল ঝনঝন করে বাজছে।ধুস, বাজুক গে। হবে ওই রাতুলের বাচ্ছা ! রোজ বেরোনোর আগে ফোন মারবেই একটা,' গাড়ি নিয়ে দাঁড়াচ্ছি আজ বাইপাস হয়ে যাব।চলে আয়'। ও ফোন না ধরলেও চলবে।স্নান সেরে , শেভিং সেরে থুতনিতে আফটার সেভ লাগাতে লাগাতে বেশ ফুরফুরে মেজাজে তুনীর বেড রুমের আলমারিটা খুললো।হালকা নীল শার্ট আর কালো ট্রাউসারটা বের করে গলিয়ে নিল অঙ্গে। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতেই, ফোন আবার ঝনঝন। খাওয়ার ঘরের টেবিলের ওপর থেকে লগ্নজিতা সামনের গাছের কোকিলটার মতই থেমে থেমে গেয়েই যাচ্ছে, " থাক তব ভুবনের ধুলি মাখা চরণে, মাথা নত করে রব, বসন্ত এসে গেছে, বসন্ত এসে গেছে।" আরে, ছাতার মাথা বসন্ত এসছে তো হয়েছেটা কি ? তুনীরের জীবনে আর কিই বা এলো গেল ? নিজের মনে মনেই ওই গলাটার সাথে ঝিনুকের মাথা নত করা মুখ আর ছলছলে চোখের একটা কোলাজ বানিয়ে নিয়ে , তুনিরের বেশ ফুর্তি হলো খানিক। তারপরেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে নিজের মনেই বলল," থাক, দিবাস্বপ্ন দেখে আর লাভ কি বে" ! ড্রয়ারটা টেনে পার্সটা নিতে গিয়েই চক্ষুস্থির। একি !! ড্রয়ারের মধ্যে সযত্নে রাখা, এক গোছা টাটকা গোলাপ ফুল, তুনীরের প্রিয় সবুজ রঙের টাই আর বিশ্বভারতীর ছাপ দেওয়া রক্তকরবী একপিস। সঙ্গে ছোট একটা হাতচিঠি। লন্ড্রির স্লিপের পিছনে ঝিনুকের হাতের লেখা সবুজ কালিতে, লিখেছে .. .." যক্ষপুরীতে ঢুকে অবধি এতকাল মনে হত ,জীবন হতে আমার আকাশখানা হারিয়ে ফেলেছি । এমন সময় তুমি এসে আমার মুখের দিকে এমন করে চাইলে,আমি বুঝতে পারলাম আমার মধ্যে এখনো আলো দেখা যাচ্ছে। কেবল তোমার আমার মাঝখানেতেই একখানা আকাশ বেঁচে আছে। " - ইতি, তোমার ঝিনুক। জানি, নন্দিনী হতে পারলাম না তবুও আজ যে চৌঠা মার্চ , সেটা তুমি ভুলতে পারো, আমি পারি না। রক্তকরবী খুঁজে পেলাম না, তাই তোমায় গোলাপই দিলাম নাহয়। সঙ্গে তোমার প্রিয় নন্দিনী'কেও।বিকেলে তাড়াতাড়ি ফিরো, চিলি চিকেন বানাবো। শুভ বিবাহবার্ষিকী ! চিঠিটা শেষ করেই মোবাইলে তুনীর দেখল চারটে মিসড কল। হম, ঝিনুকই। পাবলোর স্কুল থেকেই বার চারেক ফোন করেছে বেচারী। তাড়াতাড়ি কল করলো ,ঝিনুককে । ফোনটা ধরেই খুব মিষ্টি গলায় ঝিনুক বলল," পাবলোর স্কুলের কম্পাউন্ডে একটা রক্তকরবী গাছ পেয়েছি , জানো তো ! ফেরার সময় নিয়ে আসব । জলদি ফিরো প্লিজ।" একটু লজ্জা লজ্জা, একটু ধরা ধরা গলায় সেই দমদমের বাড়ির বিয়ের পরদিনের ঝিনুকের মত, মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে তুনীর শুধু এটুকুই বলতে পারলো, " তাড়াতাড়ি ফিরবো।"সকালটা জাস্ট বসন্ত হয়ে গ্যালো।

কিস্তিমাত !! -Film review

"উজির" কথাটার বাংলা প্রতিশব্দ বোধহয় মন্ত্রী। যদিও রাজা, উজির কথায় কথায় প্রায়ই মেরে থাকি আমরা। কিন্তু ''ওয়াজির'' মানে সাদা বাংলায় ''উজির'' দেখতে গিয়ে আপনি তেমন কোনো উজির'কে খুঁজে পাবেন না। যাদের পাবেন তারা হলো এক সাসপেন্ডেড পুলিশ অফিসার , এক হুইলচেয়ার আঁকড়ে থাকা দু'পা কাটা বৃদ্ধ দাবাড়ু আর চৌষট্টি খোপের সাদা কালো দাবার ছক ঘিরে মূলত এই দুজন অসমবয়সী বন্ধুকে ঘিরে, সাদা কালো আরো কয়েকটি চরিত্র। এদের মধ্যে কেউ প্রথাগত ভাবে ভালো অর্থাত সাদা আর কেউ প্রথা মেনেই সাংঘাতিক খারাপ অর্থাত কালো। কেউ এক কদম চাল চাললে আরেক পক্ষ দুই কদম চাল দিয়ে কিস্তিমাত করে। এবং শেষ অবধি দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনই হয়, যেমনটি হওয়ার কথা ছিল এবং যেমনটি শেষতক 'ঢিসুম ঢিসুম' হিন্দি ছবিতে হয়ে এসছে।কিন্তু.....না. না ভয় পাবেন না! ওরকম করে তাকানোর কিছু নেই।এখানে সত্যিই একটা কিন্তু আছে। আর সেই কিন্তুটা কি তা দেখার জন্যেই এই ছবিটা আপনাকে দেখতেই হবে। মানে ওই ইংরিজিতে যাকে বলে 'মাস্ট ওয়াচ'।ভালো আর খারাপের লড়াইতে শতরঞ্জ খেলার সিমেট্রিটা নিপুন হাতে বুনেছেন এ ছবির তৃতীয় চরিত্র, এর চিত্রনাট্য। অনেকদিন আগে দেখা একটি ছবি মনে পরছে, স্বনামধন্য সত্যজিত রায়ের সে ছবিতে লাখনাউ এর পড়ন্ত দুই নবাবের নবাবিয়ানা ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল দেশকাল, ইতিহাস ও সামাজিকতার প্রেক্ষিতে যার মূলেও ব্যবহার করা হয়েছিল এই বুদ্ধির মার প্যাঁচের খেলাটিকে। হ্যা, আমি 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি'র কথাই বলছি।এ নবাব পেয়াদা এগোয় তো, ও ঘোড়া। এ হাতি পাঠায় তো আরেকজন মোক্ষম চালে নৌকো। কিন্তু গোড়ায় গলদ তাই তো বান্দা ছেড়ে কখন বেগম হারাতে বসেন নবাব সেই প্রতিপাদ্যই সেই অসম্ভব ভালো ছবিটির গল্প। যুদ্ধু যুদ্ধু খেলার ভি.এফ.এক্স ধুন্ধুমার অ্যাকশন ছেড়ে শুধু বুদ্ধির খেল, শুধু মগজাস্ত্র! তবে কিনা সে ছবিতে শতরঞ্জ অর্থাত দাবার ছক ব্যবহার হয়েছিল প্রতিকী হিসেবে, একটা অলস অথচ ভিতরে ভিতরে গুমরে ওঠা একটা ঐতিহাসিক 'পিরিয়ড'কে তার সিগনেচার ভিসুয়াল দিয়ে ধরবার জন্যে। তবে হালফিলের এই 'উজির' সে ধার মাড়ায় না মোটে।এ ছবিতে দাবাখেলা এ ছবির শিরদাঁড়া। এ ছবির প্রতিশোধী চরিত্রদের হাল jujহকিকত থেকে কিস্তিমাতের অন্তিম মুহূর্ত অবধি সন্তর্পনে চাল চালে। পাশা উল্টে যায়, খেলা বদলে যায়, ভালো নবাব বোকা পেয়াদাকে 'হাত' করে পর্যুদস্ত করেন বদমাশ 'নবাব'কে। ফ্রেমে ফ্রেমে শীতল রহস্য আর আদ্যপান্ত হলিউডি থ্রিলে দর্শক মেরুদন্ডে অনুভব করবেন শীতল স্রোত এবং শেষ অবধি 'দি বিগ বি'কেও ছাড়িয়ে জিতে যায় এ ছবির চিত্রনাট্য।
গল্পটা খুব সোজা ও সরল। আহামরি কোনো ব্যাপার স্যাপার নেই। মাথাগরম ( সামান্য গামবাট ) সুপারকপ ফারহান আখতার ( যিনি কিনা অ্যান্টি টেররিসম স্কোয়াডের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত অফিসার ) দানিশ, ছবির শুরুতেই খুব হালকা ও রোমান্টিক এবং দৃশ্যত ফুরফুরে। খুব সাদামাটা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত রোমান্টিক কোলাজ ঘিরে দেখানো হয় দানিশ ও তার স্ত্রী অদিতি রাও হায়্দারির বিয়ে, সংসার, ঘর, গেরস্থালি। তাদের একমাত্র আদরের কন্যাকে ঘিরে তাদের জীবন। হঠাতই এক টেররিস্ট'কে ধাওয়া করতে গিয়ে ব্যাপক গোলাগুলি, সংঘর্ষ, এনকাউন্টারে মারা যায় দানিশের কন্যাটি। ছবির মোড় ঘোরে এখান থেকে। অদিতি ছেড়ে যান তার স্বামী ফারহানকে এনং ঘটনার অনিবার্য নাটকীয়তায় চিত্রনাট্যে প্রবেশ করেন, আপাত নিরীহ, বিপত্নীক, পঙ্গু অধ্যাপক, বৃদ্ধ পন্ডিত শ্রীওমকার নাথ ধর অর্থাত কিনা এ গল্পের আসল খেলোয়াড় শ্রীবচ্চন, যিনি প্রখর বুদ্ধিধর, ঝাঁঝালো দাবাড়ু এবং মরমী রসিক তো বটেই তার সাথেই 'জখমী'ও বটে। তাঁর নিজের মেয়েকেও তিনি এক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন।স্ত্রীকে হারিয়েছেন এবং হারিয়েছেন নিজের দুটো পাও। শুধুমাত্র হুইল চেয়ার আঁকড়ে থাকা এই একলা মানুষটির সাথে দাবাখেলার আপাতনিরীহ আবহে সময় কাটানোর অছিলায় দানিশের সাথে বন্ধুত্ব হয় তার। এই বন্ধুত্বের শেষতক পরিণাম ? সেটা জানার জন্যেই এ ছবি দেখতেই হবে ! বাজি রেখে বলতে পারি, পয়সা উশুল যদি কোনো ছবির উত্কর্ষের মানদন্ড হয়, তবে আপনি নির্দ্বিধায় আড়াইশো টাকা খরচ করে এ ছবি দেখে আসতে পারেন। প্রথমার্ধে টানটান উত্তেজনা, থ্রিল ও অল্পস্বল্প অ্যাকশন এর সাথেই কন্যা হারানো দুই পিতার আবেগের সমানুপাতিক টানাপোড়েন ও ব্যাস্তানুপাতিক বন্ধুত্ব, সফল হলিউডি ছবির ততোধিক সফল বলিউডি অনুসরণ।দ্বিতীয়ার্ধে, এ ছবির গতি একটু স্লথ। গল্পের সুতো সময়ের একটু আগেই যেন জট খুলতে শুরু করে আর আপনি একদম বুঝে যান, রাজা উজিরের এই যুযুধান লড়াইয়ে রাজাটি কে আর উজিরটিও বা কে ? পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারদ্বয় বারবার ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করে সন্দেহের কাঁটার অভিমুখ অবধারিত ভাবে দর্শকের হাতে তুলে দেন, আর তুরুপের তাস হাতে পেয়ে গেলে পেশাদারী 'হু ডান ইট' এ যা হয় , অর্থাত টানটান সাসপেন্স আর নির্মেদ ছবি দেখার বুদ্ধিদীপ্ত কিকটা তেমন করে আর ঝাঁকুনি দেয় না, আপনিও হাতঘড়ি দেখতে থাকেন, ছবি শেষে শেষ ট্রেনটা পাব তো ?
অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে নতুন কোনো কথা বলতে হলে অভিধান খুঁজেও লাভ নেই। লোকটি যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন নিজেকেই ছাপিয়ে, নিজেকেই হারিয়ে, শেষ খেলার থেকে বিজয়্সুচক পয়েন্ট আরো একঘর বাড়িয়ে স্কোর করছেন আর জিতে যাচ্ছেন আবার বিপুল নম্বরে। শুধুমাত্র একপিস হুইলচেয়ারে বসে শরীরের অপরের অংশ ব্যবহার করে ওই লেভেলের অভিনয় বা অনভিনয় করা, শুধু বোধহয় ওঁর পক্ষেই সম্ভব।ওঁর জন্যে চরিত্র লেখা হয়, হয়েছে এবং হবেও।ফারহান আখতার যত না ভালো পরিচালক তার চাইতেও বোধহয় ভালো অভিনেতা হয়ে উঠছেন। টানটান শরীরী ভাষা আর ভাবলেশশুন্য বুদ্ধির দৌড়ে ফারহান টক্কর দিয়েছেন বচ্চনের সাথে। জন এব্রাহামের হাতে সত্যি কাজ নেই বোঝা যায় নইলে এমন ছোট একটি চরিত্রে তিনি কাজ করতেন না আর নিল নিতিন মুকেশ সাইকো খুনির কাল্পনিক তরজায় বেশ কাজ করেছেন কিন্তু কোনটা অতি অভিনয় আর কোনটা অভিনয় না করেও অভিনয় সেই মাপকাঠি তাকে শিখতে হবে ! অদিতি রাও এর বিশেষ কিছুই করার ছিল না তবে প্রায় সংলাপ শুন্য তার চরিত্রটির অভিব্যক্তি ফারহান কে সাহায্য করেছে তার চরিত্রটিকে তৈরী করতে। একজনের কথা বলতেই হয় যিনি এ ছবির এক বুদ্ধিদীপ্ত আবিষ্কার, তিনি মানব কাউল। খুরেশির চরিত্রে তার ক্ষিপ্র অথচ শান্ত অভিনয়, বলিউডে জায়গা করে নেবে।
শেষমেষ বলি, এ ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন বিধুবিনোদ চোপরা ও অভিজাত জোশী ( মুন্নাবাই খ্যাত ) ! কি বললেন ? হতেই পারে না ? সেটাই হয়েছে মশাই। বিধুবিনোদ বললেই আপনারা ললিত লাবন্যের লাভ স্টোরি ভেবে বসেন তো ! এবার দেখুন , ছুরি ছোরা, গুলি গোলা দিয়ে কি কান্ডটাই না বাধিয়ে বসেছেন ভদ্রলোক ! এর পরেও শুধোবেন 'উজির'টা কে ?

গল্প হলেও সত্যি !!

গল্প হলেও কিছু কিছু মানুষ সত্যি তো হন বটেই! সেরকমই একজনকে নিয়ে আজকের দিনে কথা বলতে হয়, শুনতে হয়, পড়তে হয়, নইলে কিন্তু অবশ্যই পিছিয়ে পড়তে হয়। তিনি বাঙালির প্রাণভোমর , তিনি ছদ্মবেশী দেবদেবতা, তিনি চিরকালীন মূল পর্দার বাইরের উইংসের পাশে দাঁড়ানো একা বোকা সম্রাট, যার ওপর কচ্চিত কদাচিত এক মুঠো আলো এসে পড়ে, তাও নায়কের মুখ থেকে ফোকাস ঘোরানোর সময় টময়। তিনি অধুনা কালিঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটের রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। যাঃ, চেনা গেল না বোধহয় ! হ্যা, ইনিও রবীন্দ্রনাথ বটে, তবে কালিঘাট থেকে জোড়াসাঁকোর মতই প্রায় দওশ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থান করা ইনি ওঁর নাথত্ব হারিয়ে, দস্তিদারি হারিয়ে, মানুষের স্মরণে চিরকালই নেহাতই সংক্ষিপ্তসারে 'রবি ঘোষ' হয়ে থেকে গেছেন। আসলে নিজে ছোটখাটো হলেও অত বড় নাম বয়ে বেড়ানোর মত কব্জির জোর মানুষটির ছিল, কিন্তু প্রায় স্বতপ্রণোদিত ভাবেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ওই ছোট নামটিই। আসলে কোথায় জানি, তিনি মনে মনে জানতেন যতই ব্যায়াম ট্যাম করুন, আসলে তো সাফল্যের উচ্চতার কাছে পৌঁছনো তার মত হা -সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, হাজার হোক , তিনি তো আর 'উত্তমকুমার' নন, বড়জোর ছবির পর্দায় তাঁর প্রেমিকাকে একবার রিকোয়েস্ট করে দেখতে পারেন সেকালের সব ঈর্ষাকাতর পুরুষের মত, 'আমায় একবার উত্তমকুমার বলবে?' তাই তথাকথিত রূপহীন, ক্ষমতাহীন, মানুষটির ঢাল হয়ে উঠেছিল তার মোটর স্কিল , তার অঙ্গভঙ্গির তাক লাগানো রিফ্লেক্স, তার নিখুঁত কমিক টাইমিং আর সেই বাঙালির জীবনবোধ, জানিয়ে প্রায় প্রফেসির মত একটি ছবি বানালেন, তপন সিনহা এবং গল্প হলেও এক চিরকালীন সত্যির জন্ম দিলেন সে ছবির গৃহভৃত্য ধনঞ্জয় ! শুধুমাত্রই বিবেক হয়ে দাপিয়ে বেড়ালেন পর্দায় এবং অভিনয় করতে শুরু করলেন জীবন নাট্যের সেই এক্সট্রা ভূমিকাটিতে যেখানে শেষ অবধি জিতে যায় ব্যাং রাজপুত্তুর। যেখানে সব হ্যা হ্যা, হো হো, বেঁটে মানুষটার প্রতি খ্যাঁক খ্যাঁক হাসি, বিদ্রুপ, কলুষ, টিটকিরির পরেও সিনেমা শেষের পথে ট্রামের টিকিট কেটে আপনার সঙ্গে বাড়ি যান, নাহ, নায়ক নয়, নায়িকাও নয়, আপনার চিরচেনা এই মানুষটিই তো। বাঙালির হাতের পাতার মত এই নাড়ি নক্ষত্র জানা মানুষটিই ছিলেন রবি ঘোষ।চরকি পাক ঘুরে, বোকার মত ফিক করে হেসে খানিকটা চোখ পিটপিট করে, খানিকটা মাথা চুলকিয়ে, অনেকটা হীনমন্যতা নিয়ে এই বিপুল পৃথিবীর মস্ত ত্রস্ত কান্ডকারখানা দেখে যিনি 'বাঘা বাইনের' ছদ্মবেশে কি করুন করে বলতে পারেন ..... 'কি দাপট!' আসলেতে এই কথাটা বাঘা বায়িনের মুখ দিয়ে বলেন সেই উনিশ শতকের বাঙালি, যারা শেকড় থেকে উঠে আসা, উদ্বাস্তু কলোনি থেকে উঠে আসা, বেড়া ডিঙিয়ে উঠে আসা সেই ভিতু, আত্মবিশ্বাসহীন, মেদুর অথচ স্বপ্ন দেখা, প্রত্যয়ী বাঙালি, যাদের প্রতিনিধি ছিলেন সর্বজনপরিচিত কৌতুক অভিনেতা রবি ঘোষ, যাঁর নামটা ছবির পোস্টারে 'শ্রেষ্ঠাংশেতে' থাকে না, থাকে অনেক নিচে , ছোট ছোট অক্ষরে ! পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এঁদের জন্ম হলে কি হত জানি না তবে এহেন ট্যালেন্ট, এইরকম প্রজ্ঞার মানুষ, জন্মেছিলেন এই দেশে তাই চিরকাল 'ছোটদের মত' প্রতিনিধিত্ব করেছেন মূর্তিমান খাপছাড়া, যেমন তেমন, উদ্বৃত্ত, বেঁচে যাওয়া, বাড়তি, ফাউ মানুষের আর হাসতে হাসতে আমরা যখন চোখের জলে, নাকের জলে অস্থির তখন আড়াল হয়ে সরে গেছেন সেই অন্ধকারে, যেখানে আলো পড়ে না, পড়ে নি কোনদিনও।

অনুরণন

অনুরণন কথাটার মানে সেভাবে আগে বুঝিনি। খুব বেশি হলে বুঝতাম, ইকো অথবা ভাইব্রেশন ! মানে, ওই পাহাড়ে গিয়ে রেলিং ধরে ঝুঁকে চেঁচিয়ে নিজের নাম ধরে ডাকলে, পাহাড় যেমন চার বার সেই নাম ধরে ফেরত ডাকে আমায়, সেইরকম ! কিন্তু অনুরণনের আসল অর্থ শুধুই যে সেই বিজ্ঞানটুকু নয়, সেটা আজ মনে হলো । অফিস আসার পথে রোজ যেমন ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে উঠে বিপুল, বিরাট জনতার ঠেসাঠেসি, চাপাচাপিতে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে ভীড় হয়ে মিশে থাকি এক কোনে, আজও তেমনি ছিলাম। মনটা নানা কারণে মেঘলা হয়ে ছিল আর অত ভীড়ে পকেট থেকে মোবাইলের হেডফোনটাও বের করার উপায় ছিল না, তাই দরজার ধারের ঝাপটা ঝাপটা গরম হাওয়ায়, চারপাশের কর্কশ আওয়াজ, গালাগালি, চেঁচামেচির মধ্যে কখন যে ভিতরে ভিতরে একা হয়ে কম্পার্টমেন্টের বহু থেকে মনে মনে একলা হয়ে গেছিলাম, বুঝতে পারিনি! মনে মনেই কখন যে পাড়ি দিয়েছি দিকশুন্যপুরে, আর কখন যে আমার মন ডুব দিয়েছে রূপসাগরে আর তুলে এনেছে ঠোঁটের ডগায় প্রিয় গান, জানতেই পারিনি! গাইছিলাম, গুনগুন করে। রবীন্দ্রনাথের গান ।" আহা, তোমার সাথে প্রানের খেলা...!" ওটা শেষ হতেই আবার গীতা দত্ত, শ্যামল মিত্র, কখনো বা নির্মলেন্দু ! খানিকক্ষণ পরেই খেয়াল করলাম, আশেপাশের মানুষ তাকাচ্ছেন, কেউ নিছক কৌতুহলে, কেউ সন্দিগ্ধ হয়ে, কেউ বা বোকার মত আবার কেউ যারপরনাই বিরক্ত হয়েও। ভাবখানা এরকম, যে এত ভীড়ে লোকের দাঁড়াবার জায়গা নেই, কোথায় দু চারটে চোখা চোখা ডায়লগ ঝেড়ে লোকের পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করবে তা নয় আবার গান !!! আদিখ্যেতা !! কিন্তু আমি তো আমিই ! আমার মত ! তাই গেয়েই চললাম! চোখ বুজে, সবাইয়ের থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে।...... একটু পরেই শুরু হলো ম্যাজিক ! সামনের ওই যে টাকমাথা সরকারী চাকুরে, মুখটা এতক্ষণ ডিস্পেপটিক বৃদ্ধের মত বিরক্তিতে কুঁচকে ছিল, সে লোকটির চোখ বুজে এলো, মৃদু মৃদু ডাইনে, বাঁয়ে মাথা নাড়তে শুরু করলেন, বুঝলাম, ওষুধ ধরেছে! কান পেতে বুঝলাম, তিনিও আমার সাথে গাইছেন। আবার আমার যেখানে গানের শব্দ দিতে ভুল হচ্ছে, আমায় ধরিয়েও দিচ্ছেন! আরেকটু পরেই ওই যে পিছনের ডান দিকের, হাতে ট্যাটু করা মুশকো ছোকরা, যে এতক্ষণ গলা ফাটিয়ে চেল্লাছিল, সেও দেখলাম চুপ ! কি একটা কিশোরকুমারের খুউব চেনা গানের সুর ভাঁজতে শুরু করেছে সেও ! তারপর গেটে ঢোকার মুখেই বিপুল ব্যাগ আর ততোধিক বিপুল পেট নিয়ে যে মার্কেটিং এ চাকরি করা বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক, এতক্ষণ সিন্ধুঘোটকের মত মুখ করে মোবাইল নিয়ে পিড়িং পিড়িং করছিলেন, তিনিও দেখলাম, প্রানপনে তার ডাবল চিনের মধ্যে দিয়ে সুর খুঁজে আনছেন, গাইছেন, "তুঝ সঙ্গ নয়ন লাগায়া.." শুধু তাই নয়, ঐযে অপ্রস্তুত মহিলা, হাজার হাজার পুরুষের ভীড়ে উঠে পরে ভারী বেকায়দায় পরে, বিব্রত মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই তিনিও। রুমালে মুখ মুছে চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তাঁর মুখেও। কি যেন একটা খুব চেনা ঠুমরীর সুর এলো ঘুরে ঘুরে তাঁর গলায়। এখন শুধু সুর, গলায় গলায় সুর, ভালোবেসে প্রিয় গান। সকলেই ফিরে যাচ্ছেন তাঁর তাঁর নিজস্ব অমরায়! গন্তব্যের নির্দিষ্ট স্টেশন আসা অবধি আপাতত আর কেউ ঝগড়া করবেন না, কেউ মারমুখী চেহারা নিয়ে তেড়ে যাবেন না, মৃদু হেসে পাশের মানুষটিকে জায়গা করে দেবেন অথবা শান্ত মনে পৌঁছবেন নিজের নিজের কাজের জায়গায় ! তখনি মনে হলো, সুর সক্কলের কাছে সমান, সঙ্গীত সক্কলের মনে এক শান্ত, নিভৃত পাড়া।নানারকম অশান্তি, অস্বস্তি থেকে মানুষকে সমে বাঁধে যে গীত, সেই তো সঙ্গীত ! সুর এত ম্যাজিক জানে তবে ? তবে চারপাশে এত অ-সুর কেন? আসলে, সেই যে হ্যামলিনের একজন বাঁশিওয়ালা ছিল, যার সুরে মুগ্ধ হয়ে গোটা শহর তার পিছু নিয়েছিল, অমন বাঁশিওয়ালা আর একটিও নেই। নেই রবি ঠাকুর, নেই হেমন্ত বাবু, নেই মান্না দে, নেই রবিশংকর। চারদিকে নেই'র পাল্লাটা বড় ভারী হয়ে উঠেছে। নইলে কবেই এই গোটা শহরটা 'আছে'র এক সুরে বেঁধে যেত, সুরের অনুরণনে চেনা, অচেনা, অগুন্তি ভিড়ের মত মানুষ এক সুরে গেয়ে উঠতেন গান, জীবনের গান। ভালোবেসে গাওয়া গান, অনুরনিত হয়ে গাওয়া গান!

Wednesday, June 22, 2016

প্রাক্তন ~ চিত্র আলোচনা

"রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা , ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন !..."
সম্ভব যে হবে , কে আর ভাবি বলুন তো ! যে সম্পর্কগুলোকে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে আসি, যে সম্পর্কের সিঁড়ি ভেঙ্গে জীবনের উজান স্রোতে আমরা এগিয়ে যাই স্মৃতিরঙিন অথবা স্মৃতিমলিন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে, কজন ভাবি সেই সম্পর্কের শব আবার দেখতে পাবো দিনের আলোয় ? ভাবি না, ভাবতে চাইও না ! অভিমানে, অভিযোগে, রাগে ঘৃণায় কালশিটে পড়া মনে যে আগুন ধিকিধিকি জ্বলে সেই আগুনের আঁচ পুইয়েই তো জেদের বশে অথবা নেহাত প্রয়োজনে নতুন করে গড়ে তোলা, খেলনামাটির ঘরের দেওয়ালের মাটি শক্ত হয় !তাই নয় ? তবে তাই যদি হবে, তবে কেন ভুলতে পারিনা পুরনো ফেলে আসা ঠিকানার চেনা ল্যান্ডমার্কটুকু ! কেন ' ব্যর্থ আশা মরিতে মরিতেও মরে না ?' কেন ওই কবিতাটা মনে পড়ে ?.....
- "ঠিক সময়ে অফিসে যায় ?/ ঠিক মত খায় সকালবেলা ?/ টিফিন বাক্স সঙ্গেই নেয়,/ না ক্যান্টিনেই ......?"
হ্যা, জয় গোস্বামীর 'প্রাক্তন' ! কি দরকার ছিল এসব জানতে চাওয়ার ? অত্যাচারিত, ক্লান্ত, রিক্ত সম্পর্ক পেরিয়ে এসেছেন যে স্ত্রী, এসেছেন নতুন ঠিকানায়, কেন এখনো জানতে চান 'প্রাক্তনের' কথা ? ছেড়েছেন তো সবকিছুই তবুও তার সওব কিছু ছেড়ে আসতে পারেননি তবে ! ক্লান্ত ভালবাসা সেই রয়ে গিয়েছে ছেড়ে আসা ঠিকানায়, ফেলে আসা আলনা, বিছানা, দেরাজে, ভাঁজ করা কাপড়ের মধ্যে রাখা একটুকরো কাগজে, একটু একটু করে... ! আসলে অভ্যেস তো ! সব একদিনে বদলায় না যে ! সুটকেস বন্দী করে নিজের যা যা ছিল, সব গুছিয়ে দাম্পত্যের সামাজিক বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে চলে আসা গেছে হয়ত, কিন্তু ও বাড়ির ছাদে দুজনের শীতদুপুরের খুনসুটিটুকু ? ওটা তো রয়েই গেল! সেবার শীতে যে হাতে বোনা সোয়েটারটা দিয়েছিলাম ? ওটা তো ফেরত নিয়ে আসা হলনা ! একসাথে বৃষ্টিভিজে পাহাড়ের পাকদন্ডি হাঁটার মুহূর্তগুলো তো ফেরত নিয়ে এলাম, কিন্তু একটা ছাতার নিচে একসাথে ভেজার, ভিজে মনটুকু যে প্রাক্তনের ব্যালকনিতে মেলে এলাম, সেটা তো ফেরত এলো না ? রয়েই গেল ! রয়েই যায়, এমন কত কিছু ! ঠিক যেন কবিতার মত! হ্যা কবিতাই, তবে জয় গোস্বামীর 'প্রাক্তন' নয় বরং রবি ঠাকুরের 'হঠাৎ দেখা'ই শিবপ্রসাদ- নন্দিতার নতুন ছবি 'প্রাক্তনের' কাব্যিক শিরদাঁড়া ! এই ছবির গল্প তাই শুধুই ফেলে আসা তিক্ততার, ছেড়ে আসা সম্পর্কের বিষাদ এলিজি নয়, প্রাক্তন দুই মানুষ মানুষীর সম্পর্কের রসায়নে কোথায়, কত ফোঁটা ভুল ছিল, সেই ভুলটিকেও দশমিকের হিসেবে ঠিক করে দেখায়, সহজ করে, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় সুদীপা আর উজানের সম্পর্কে নবাগতা তৃতীয় মানুষ মালিনীর হাত ধরে !
"........আগে ওকে বারবার দেখেছি লাল রঙের শাড়িতে, দালিম ফুলের মত রাঙ্গা, আজ পড়েছে কালো রেশমের কাপড় ,আঁচল তুলেছে মাথায়|দোলন-চাঁপার মত চিকন গৌর মুখখানি ঘিরে !"
লাল থেকে কালো ! কিভাবে একটা সম্পর্ক সময়্সরণী ধরে চলতে চলতে তার সব রং হারায় ! কালো হয়ে আসে রঙিন আসমানী বিকেল ! প্রাক্তনের গল্পটি খুব সহজ ও সরল ! মুম্বাই থেকে কলকাতার এক দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় মধ্য ত্রিশের কেরিয়ায় সফল (?) সুদিপার সাথে আলাপ হয় সহযাত্রী মালিনীর ও তার বছর ছয়েকের কন্যার ! একই ক্যুপে ট্রাভেল করা এই দুই নারীর দেখাই আসলে এখানেতে হঠাৎ, আর তাদের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসে মালিনীর বর্তমানের সুখী দাম্পত্যের জলছবি আর সুদীপার ছেড়ে আসা দাম্পত্যের প্রাক্তনীর যোগসূত্রটুকু ! হ্যা, একটিই পুরুষ তাঁদের জীবনে ! সেই উজান মুখার্জির প্রাক্তন আর বর্তমানের হাত ধরে ট্রেন এগিয়ে চলে কলকাতার দিকে। একই কামরায় ট্র্যাভেল করছেন আরও নানারকম দম্পতি! বর্ষীয়ান সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী আছেন যেমন তেমনি আছেন সদ্য হানিমুন রঙিন বিশ্বনাথ ও মানালিও ! আবার নিজের নিজের চরিত্রেই আছেন ভূমি-খ্যাত সুরজিত, অনুপম রায় আর চন্দ্রবিন্দু খ্যাত অনিন্দ্য ও উপলেরা ! এই নানারকম জুটির মধ্যেই আদরের বউকে জন্মদিনের সারপ্রাইস দিতে নাগপুর থেকে উঠে পড়েন ঋতুপর্ণার 'প্রাক্তন' সঙ্গী প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়, এ ছবির উজান !
".......মনে হলো, কালো রঙে একটা গভীর দুরত্ব ঘনিয়ে নিয়েছে, নিজের চার দিকে ,যে দুরত্ব সর্ষে খেতের শেষ সীমানায় ,শালবনের নিলাঞ্জনে।থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা ,চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে !"
যাঁর সাথে কলকাতার পথে পথে হেঁটে এই শহরটাকে চিনতে শেখা, যার সাথে ঘরকন্নার, কান্নাহাসির দাম্পত্যের সকাল বিকেল, যাঁর সারা গায়ে কোনখানে কটা তিল; কেমন গন্ধ, কখন রাগ ,কখন গুমোর, সেই সমস্তটুকু চেনা, কেমন লাগে সেই চেনা মানুষকে যখন অচেনার গাম্ভীর্যে গ্রহণ করতে হয় ? চলন্ত ট্রেনে যে দাম্পত্যের ব্যালকনিটুকুও নেই, তাই কাঁদতে হলে বাথরুমে গিয়ে বন্ধ দরজার আড়াল নেওয়াই শ্রেয় ! ঋতুপর্ণা এ ছবিতে নিজেকে সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। কালো চশমার আড়ালে নিজের চারদিকে এঁকে দিয়েছেন গভীর দুরত্ব ! দুরত্ব ঘনিয়েছে উজানেরও। বয়সে, চেহারায়, মননে ঋদ্ধ প্রসেনজিত ও ঋতুপর্ণা, প্রায় ১৫ বছর পর একসাথে কাজ করলেন এবং প্রমান করলেন, বাংলা ছবির এ যাবৎ সেরা জুটিগুলির মধ্যে তারা কিন্তু সত্যিই অন্যতম। ১৫ বছর কেন একসাথে কাজ করেননি, কোন ব্যক্তিগত অভিমান বয়ে বেড়িয়েছেন, সেসব কথা থাক, কিন্তু তাঁদের একসাথে ফিরিয়ে আনার জন্যে যেন ঠিক এই ছবিটিরই দরকার ছিল। অনুপম যখন সদ্য বিয়ে হওয়া স্ত্রী পিয়ার জন্যে এ শহরে ফিরতে মুখিয়ে থাকেন স্ব-পরিচয়েই অথবা ভূমির সৌমিত্র-সুরজিতের দলগত বিচ্ছেদ যে শ্রোতারা এখনো ভুলতে পারেন না এমন সব বাস্তবের রেফারেন্স দর্শকেরা যারপরনাই আনন্দ করে গ্রহণ করেছেন ! রিল যখন রিয়ালে মেশে, তখন সেইসব চরিত্র বা জুটিকে পর্দায় তাঁদের স্বপরিচয়ে দেখলে এক অদ্ভূত রোমাঞ্চ থাকে বৈকি ! গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটি তখন ফিকে হয়ে যায় দর্শকের কাছে, আর সেইখানেই বাজিমাত করেন পরিচালক!
বাজিমাত করলেন আরো একজন, যাঁর জন্যে একটা আলাদা প্যারাগ্রাফ লিখতেই হলো, তিনি অপরাজিতা ,অর্থাৎ এ ছবির মালিনী, সংক্ষেপে মলি ! কি স্বাভাবিক অভিনয়, কি সহজাত স্ফুর্তিতে এক সামান্য, সাধারণ, আলাপী, গল্পমুখর, উচ্চকিত গৃহবধুর চরিত্রে নিজেকে কি চমৎকার খাপ খাইয়ে নিয়েছেন তিনি ! ঠিক যেন আগেকার বাংলা ছবির সাবিত্রী দেবী! সংলাপ যেন সংলাপ নয়, অভিব্যক্তি যেন অভিনয় নয়, শুধুমাত্র চরিত্রটিকে পর্দায় আচরণ করা ! অভিনয়ের কোথাও কোনো অভিনয়ের ছাপ নেই! এই চরিত্রটি তাঁরই জন্যে শুধুমাত্র লেখা যায় যেন! বেলাশেষের পর এ ছবি, অভিনেত্রী হিসেবে অপরাজিতা আধ্যের জাত বুঝিয়ে দেয়। ঋতুপর্ণার আপাতকঠিন দেওয়ালের বিপরীত মেরুতে অপরাজিতার আপাত সরল মুখটুকু যেন পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে।
"......আমাদের যে দিন গেছে, একেবারেই কি গেছে ? কিছুই কি নেই বাকি ?"
না, এখনো বাকি রয়ে গছে বাঙালির এই আজন্মলালিত পরিচয়টুকু ! ঠিক যেমনটি ছিল এক সময়ের কালজয়ী সাদাকালো বাংলা ছবির সাফল্যের গল্পে ঠিক তেমন ঝগরুটে, খ্যাপাটে, আতুপুতু, ট্যালেনটেড, ঘরোয়া, কমপ্লেক্স ভোগা হরেক রকম বাঙালি চরিত্র তাদের স্বাভাবিকতম সেরাটুকু নিয়ে হাজির থাকে শিবপ্রসাদের ছবিতে। তাই সিনেম্যাটিক এক্সেলেন্স তখন আর সাফল্যের আয়না ধরে না, দর্শকের চেনা অনুভবই জিতিয়ে নেয় দর্শক মন। নিপাট সারল্য ও সহজ গল্প যেখানে সব বলে দেয় সেখানে সিনেমা ইশকুল সুলভ কোনো আরোপিত জ্ঞানদানের আয়োজন থাকে না শিবপ্রসাদ নন্দিতার ছবিতে ! পরিচালনার সাথেই চমৎকার এ ছবির গান, অনুপম রায়, অনিন্দ্য, সুরজিত , ইমন সক্কলে খুব ভালো গেয়েছেন। ক্যামেরার নির্ভার লিরিকাল কাজে চেনা শহর ও অচেনা প্রেমের চিরকুট নিয়ে সামনে এসেছে বারবার। ছুঁয়ে গেছে বিকেলের আলোয় জানলার কাঁচে মুখ রাখা অভিমানী নায়িকার সিলুয়েট।তাই জুটি নন্দিত এ ছবির অন্যতম পরিচালক জুটি শিবপ্রসাদ নন্দিতাও একসাথে মানুষের ভালবাসা পাচ্ছেন একটিই কারণে, সেটি হলো বাংলা ও বাঙালির শিকড়কে তারা যেমন ভাবে বোঝেন ও পর্দায় উপস্থাপনা করেন, সেটি যাকে বলে আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত উক্তির মতই আগমার্কা। শুধু একটু বদলে বলাই যায়, " ফিল্ম মেকার অফ দা বেঙ্গলি, বাই দা বেঙ্গলি, ফর দা বেঙ্গলি"।
ট্রেনে উঠে ফাস্ট ক্লাস এসি কামরায় ভ্রমন মানেই যেমন দার্জিলিং চায়ের টি-ব্যাগ থেকে রবীন্দ্রনাথ থাকেন বাঙালির সঙ্গে, তেমনি থাকে বোরোলিন, কম্বল থেকে বাথরুম নিয়ে খুঁতখুঁতানি অথবা শীতকাতুরে বাঙালির চিরকালীন আর্জি, 'এ.সি.টা বড্ড বেশি' অথবা 'চাদরে তরকারির দাগ ' এ জাতীয় অভিযোগের পাহাড় ! আবার সারা বছরের শক্তি, সুনীল, গার্সিয়ার দার্শনিকতার সাথেও নির্ভুল ব্যালেন্সে থাকে শনি মঙ্গলবার, বারব্রত, কু সংস্কারের বিচিত্র মিশেল। চার মাথা বঙ্গসন্তান এক হলেই থাকে সময় কাটানোর নিতান্ত বাঙালি আয়োজন, তাস পেত, লুডো খেলা অথবা নির্ভেজাল আড্ডা থেকে অন্তাক্ষরী। এ জাতীয় টিপিকাল বাঙালিয়ানাকে সঠিক অনুপানে মিশিয়ে তাতে আবেগের ঝাঁঝালো আরক মিশালে, যা তৈরী হয়, তা বক্স অফিস সাফল্যের নির্ভুল চাবিকাঠি! প্রমান করেছেন শিব-নন্দিত তাঁদের বিষয়ভিত্তিক অজস্র ছবিতে, এবং অবশ্যই বেলাশেষে'তে! মৌলিক পরিচালনার দক্ষতার প্রশ্নে এলে অবিশ্যি অনেক কথাই আসতে পারে, আপনি বলতে পারেন এ ছবিতে ছায়া পেয়েছেন সত্যজিত রায়ের 'নায়ক' ছবির, মিল পেয়েছেন নাসিরুদ্দিন , রেখা অভিনীত 'ইজাজত' এর, খুঁজে পেয়েছেন বাঙালির মননের গভীরে মিশে থাকা এমন আরও অনেক কালজয়ী ছবির রেফারেন্সও !
কিন্তু সব প্রাক্তন প্রেমের গল্পই কি এক জায়গায় গিয়ে একই কথা বলে না ? আর সেই বলার ভঙ্গিতে অনুলেখকটি যদি হন রবি ঠাকুর, তবে তো আর কথাই নেই! কে না জানে, বাঙালির মন জয় করতে রবিঠাকুর আজও সব জাগতিক প্রাসঙ্গিকতার উর্দ্ধে!
".....আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই , দুরে যাবে তুমি , দেখা হবে না আর কোনদিনই !"
যাত্রা শুরু হলে একসময় শেষ হয় ! শেষ স্টেশনে নেমে যায় চারপাশের সহযাত্রীরা, একসাথে কাটানো মুহুর্তগুলো গল্প হয়ে থেকে যায়, গন্তব্যে পৌছে যায় খেয়ালী মন ! তবু তো না বলা প্রশ্নগুলো থেকে যায় ! থেকে যায় ভিড় কাটিয়ে দুই প্রাক্তনের বারবার ফিরে দেখার দৃশ্য টুকু !হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় কানে এলো পাশে বসা দুই মহিলার সংলাপ, জনৈক আর জনৈকা বিবাহ বিছিন্ন কোনো দম্পতির উদ্দেশ্যে,..." ওরা এ ছবি দেখলে পারতো একবার ?" সঙ্গের বন্ধুটি বললেন," নাহ, ওরা দুজনে দুজনকে শিফট- কন্ট্রোল- ডেল করে দিয়েছে রে ! এমনকী রি-সাইকল বিনেও আর নেই !" ওদের দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে গেল হলফেরত মানুষের ভিড়ে ! প্রশ্নটাও রয়ে গেল ! কিন্তু আমার মাথায় গুনগুন করে উত্তর দিয়ে গেলেন সেই রবি ঠাকুর ,
"....একটুকু রইলেম চুপ করে, তারপর বললেম, রাতের সব তারাই আছে, দিনের আলোর গভীরে !"